জন মিল্টন, ইংরেজি সাহিত্যের মহাকবি! যিনি কিনা অন্ধ হয়েও দুনিয়া কাঁপানো মহাকাব্য লিখে গেছেন। কিন্তু তার জীবনের পেছনের গল্পগুলো শুনলে মনে হবে, তার মহাকাব্যের চেয়েও জমজমাট কোনো কাহিনি! আজ সেই মহা-গম্ভীর পিউরিটান কবির জীবনের অন্যরকম কিছু ঘটনা।
১. মিল্টনের বয়স তখন মাত্র ১৮, কেমব্রিজে পড়ছেন। অল্প বয়স, চোখে পিংকি চশমা! একদিন এক রূপসীকে দেখে তার মনের মধ্যে লাড্ডু ফুটলো! মনের মধ্যে তো আগে থেকেই তার কবি কবি ভাব! জীবনের প্রথম প্রেম নিবেদন করে এক ল্যাটিন কবিতা লিখে ফেললেন, ‘এলিজিয়া সেপটিমা’। মজার ব্যাপার হলো, একটু বয়স বাড়তেই তার হুঁশ ফিরল! তিনি কবিতার নিচে একটা ফুটনোট জুড়ে দিলেন, যৌবনের মোহে পড়ে তিনি এমন ‘তুচ্ছ’ কবিতা লিখে ফেলেছেন! নিজেই নিজের ‘রোমান্টিক ক্রাইসিস’-এর ময়নাতদন্ত করে গেছেন।
২. ১৬৪২ সালে মিল্টন ১৭ বছরের তরুণী মেরি পাওয়েলকে বিয়ে করলেন। কিন্তু বিয়ের কয়দিন যেতে না যেতেই বউ বাপের বাড়ি! আ যাবে না-ই বা কেন? সারাদিন গম্ভীর মুখে মহাকাব্য নিয়ে পড়ে থাকা স্বামীর সংসার কার ভালো লাগে? মিল্টন ক্ষেপে গিয়ে বিবাহবিচ্ছেদের আইনি অধিকার চেয়ে একের পর এক ফায়ারব্র্যান্ড লজিক্যাল পুস্তিকা বের করে ফেললেন। সেই গোঁড়া যুগে এই কান্ডে এতই হুলুস্থুল পড়ে গেল যে, পাড়ার লোকজন তাকে ভালোবেসে নাম দিল, 'Milton the Divorcer'!
৩. মিল্টন মানুষ হিসেবে ছিলেন একদম খাঁটি পিউরিটান ও ধার্মিক। কিন্তু কপাল দেখুন! তার লেখা ‘প্যারাডাইস লস্ট’-এর শয়তান চরিত্রটা এত জোস, জটিল আর আকর্ষণীয় ছিলো যে, কবি উইলিয়াম ব্লেক আর পি.বি. শেলির মতো হেভিওয়েটরা বলতে শুরু করলেন, মিল্টন না জেনে বা না বুঝেই শয়তানের দলের লোক ছিলেন!
বেঁচে থাকলে একথা শুনে মিল্টন বলতেন, ইতা আমি কিতার মধ্যে সাহিত্য ঢাললাম!
৪. ধীরে ধীরে মিল্টনের চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে আসছিল। গেলেন ডাক্তারের কাছে। সেকালের ডাক্তারদেরও যা ডাক্তারি! তারা মিল্টনের চোখ ভালো করার জন্য চোখ থেকে রক্ত বের করা, শরীরে গাদা গাদা জোঁক লাগিয়ে রক্ত চুষিয়ে নেওয়া এবং মারাত্মক সব ভেষজ প্রলেপ দেওয়া শুরু করলেন। চোখের বারোটা তো আগেই বেজেছিলো, উল্টো যন্ত্রণায় মিল্টনের অবস্থা একদম কাহিল।
৫. ‘প্যারাডাইস লস্ট’ পড়ার পর বন্ধু কবি থমাস এলউড এক আড্ডায় মিল্টনকে মুচকি হেসে বললেন, আচ্ছা দোস্ত, স্বর্গ হারিয়ে যাওয়ার কাহিনী তো লিখলি, কিন্তু স্বর্গ ফিরে পাওয়ার ব্যাপারে তোর কী বক্তব্য? ব্যস! এই একটা প্রশ্ন মিল্টনের মাথায় যেন সাইক্লোন তুলে দিলো। বাধ্য হয়ে ১৬৭১ সালে তিনি এর সিক্যুয়েল বের করে ফেললেন, 'Paradise Regained'। ফ্রেন্ড সার্কেলের পিয়ার প্রেসারে পড়ে মাঝখান থেকে মহাকাব্যের আরেকটা সিক্যুয়েল লেখা হয়ে গেল।
৬. মিল্টন নিজে অক্সফোর্ড-কেমব্রিজের ডিগ্রিধারী, মাল্টি-লিঙ্গুয়াল পণ্ডিত মানুষ। কিন্তু নিজের মেয়েদের বেলাতেই তার কত আপত্তি! সেকালের সামাজিক প্রথা তিনি নিজেও মানতেন। তার বিশ্বাস ছিল, নারীদের আবার ভাষা বা দর্শন শিখে কী হবে? ওসব পুরুষমানুষের কাজ! তাই তার মেয়েদের কাজ ছিল একটাই- অন্ধ বাবার পাশে বসে সারাদিন মুখে মুখে বই পড়ে শোনানো। বেচারিদের জীবনটা আস্ত একটা লাইব্রেরির অডিও বুক হয়ে কেটে গেল!
৭. মিল্টন আর গ্যালিলিও ছিলেন একই যুগের মানুষ। মিল্টন যখন ‘প্যারাডাইস লস্ট’ লিখছেন, তখন শয়তানের বিশাল ঢালটার সাথে তুলনা করার জন্য তিনি সোজা গ্যালিলিওর আবিষ্কৃত টেলিস্কোপ বা 'টুসক্যান গ্লাস'-এর রূপক টেনে এনেছিলেন! সাহিত্যের সাথে বিজ্ঞানকেও তিনি ভালোবাসতেন!
৮. অন্ধ হয়ে যাওয়ার পর মিল্টনের কবিতার প্রসব বেদনা শুরু হতো একেবারে ভোর চারটায়! ঘুম থেকে উঠেই মাথায় জমে থাকা কবিতার লাইনগুলো তিনি তার সহকারী বা মেয়েদের ডেকে বলতেন লিখে নেওয়ার জন্য। মিল্টন নিজেই এই প্রসেসটাকে মজা করে বলতেন- 'being milked'! মানে ঠিক যেন খামারে গরুর দুধ দোয়ানোর মতো শরীর থেকে কবিতার লাইনগুলো বের করে নেওয়া! মিল্কিং দ্য পোয়েট্রি!
৯. মিল্টন দেখতে কিন্তু হেভি কিউট ছিলেন! ফর্সা গায়ের রং, লম্বা কোঁকড়ানো চুল- একেবারে হিরো টাইপ চেহারা। কেমব্রিজের ক্রাইস্টস কলেজে পড়ার সময় তার এই রূপ দেখে সহপাঠীরা আদর করে বা টিটকারি মেরে তাকে ডাকত ‘লেডি অব ক্রাইস্ট’ বলে! মিল্টন এই ডাকনাম শুনলেই রেগে আগুন হয়ে যেতেন, আর বন্ধুরা সেই সুযোগে আরও বেশি জ্বালাতো!
১০. মিল্টনের মৃত্যুর ১৬ বছর পর, ১৭৯০ সাল। লন্ডনের সেন্ট জাইলস চার্চে চলছে রিপেয়ারিং। সেই সুযোগে কিছু সুযোগসন্ধানীরা পাবলিক মিল্টনের কফিনটাই উধাও করে ফেলল! এরপর লোভী জনতা স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে তার কফিন থেকে দাঁত, চুল এবং হাতের হাড় পর্যন্ত উপড়ে চুরি করে নিয়ে গেল। আরও শকিং ব্যাপার, মেলায় সেগুলোর সাজিয়ে বিক্রি করল! ভাবা যায়? মরে গিয়েও মানুষের হাত থেকে শান্তি পেলেন না লোকটা!
আহারে বেচারা!



পাঠকের মন্তব্য