দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের চেয়ে দুর্বল অর্থনীতির দেশগুলোতে শ্রমিকদের সর্বনিম্ন মজুরি বাংলাদেশের শ্রমিকদের সর্বনিম্ন মজুরির চেয়ে বেশি। অথচ ইউরোপ ও আমেরিকায় বাংলাদেশের পোশাক শ্রমিকদের তৈরি করা পোশাকের সুনাম রয়েছে।
যে শ্রমিক সবচেয়ে ভালো কাজ করছে, দক্ষিণ এশিয়ায় তার মজুরি সর্বনিম্ন কেন!
এর কারণ হলো, দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশে কিছু কৃষিজমিতে কৃষকদের দিয়ে কাজ করিয়েছে বা কমপক্ষে নিজের একটি দোকানে শ্রমিকদের দিয়ে কাজ করিয়েছে; এমন অভিজ্ঞতাসম্পন্ন পরিবারের ছেলেরা ব্যাংকঋণ নিয়ে বা নিজস্ব তহবিল জমা করে গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি চালু করেছে। অর্থাৎ মানুষের শ্রমের মূল্য দেওয়াটা সে পারিবারিকভাবে কিছুটা শিখেছে।
আর বাংলাদেশে পার্টির ক্যাডার চাঁদাবাজ; দল ক্ষমতায় থাকলে ব্যাংকঋণ নিয়ে গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি চালু করেছে। ব্যতিক্রম রয়েছে, কিন্তু ফলাফল দৃশ্যমান নয় বলে উল্লেখযোগ্য নয়। তার মানে, যার পারিবারিকভাবে কৃষক-শ্রমিকদের প্রতি কোনো মায়া নেই; বরং কৃষক-শ্রমিকের কাছে চাঁদাবাজি করে যে অভ্যস্ত, সে গার্মেন্টস মালিক হলে শ্রমিক ঠকানোর ব্যাপারটা হবে তার মজ্জাগত।
প্রচুর গ্লো ক্রিম ঘষে, ডিজাইনার জামাকাপড় পরে, নিজের ইংলিশ মিডিয়ামে পড়া ছেলেমেয়ের কাছে দুটি চটকদার ইংরেজি শব্দ শিখে চটর-পটর করলেও নৃশংস ঠগী সত্তাটি তার খুবই প্রকট।
গার্মেন্টস সেক্টর অতি দ্রুত বাংলাদেশ অর্থনীতির অন্যতম চালক হয়ে পড়ার সুযোগ এই ঠগীরা নিয়েছে পদে পদে। সরকারের ভর্তুকি, শুল্ক ছাড়, ঋণখেলাপি, পোশাক রপ্তানির আড়ালে পশ্চিমে টাকা পাচার—সবই করেছে তারা। নিজের স্ত্রী-সন্তানদের পশ্চিমের বেগমপাড়ায় রেখে দেশে শ্রম শোষণের মাধ্যমে স্লামডগ বিলিয়নিয়ার হয়ে পড়েছে।
গার্মেন্টস সেক্টরের প্রায় সাড়ে তিন দশক পার হওয়ায় এখন গার্মেন্টস মালিক মোকসেদ ও মোখলেসের ছেলেমেয়ে ফাইয়াজ ও সিনথিয়া নেপো বেবি হিসেবে পশ্চিমফেরত এমডি হিসেবে বসে যাওয়ার পর আর বোঝার উপায় নেই, মোকসেদ খবরের কাগজে তেল মুছে পরোটা খেত হোটেলের বিল না দিয়ে, মোখলেস জহুরুল হক হলের টিনশেডে বসে বোরোলিন মাখত, আর পাতলা চিরুনি দিয়ে রূপবান মার্কা চুল আঁচড়ে এলিফ্যান্ট রোডে যেত চাঁদাবাজি করতে। এলিফ্যান্ট রোড থেকে ছিনতাই করে আনা জিনসের প্যান্ট, শার্ট আর বেইলি কেডস পরে পুচ্ছ দুলিয়ে জয় বাংলা, জিন্দাবাদ করে বেড়াত কারণে-অকারণে।
গার্মেন্টস নৃপতি মোকসেদ কিশোরবেলায় মহিষ চরাতে গিয়ে মহিষ কাদায় পড়ে গেলে তাকে নির্মমভাবে পেটাত; ফলে এখন গার্মেন্টস শ্রমিক মজুরি বাড়ানোর দাবি করলে ষণ্ডা ভাড়া করে নিয়ে আসে কৈশোরে মহিষ পিটিয়ে নাম করা লোকেদের মাঝ থেকে। পুলিশে নিয়োগের একই যোগ্যতা, কৈশোরে মহিষ পেটানো।
মালিকও নয়, শ্রমিকও নয়, এমন কিছু ফড়িয়া রাশেদ খান মেননের বেশে ঘোরাঘুরি করে; শ্রমিক দিবসে টিভিতে ফ্যাসফ্যাস করে শ্রম অধিকারের গল্প বলার মধ্য দিয়ে তারা প্রবল শ্রমিক নেতা হয়ে ওঠে। কিন্তু পোশাক-আশাকে তারা জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির বাবু। এদের কাজ হচ্ছে শ্রমিকদের প্রশমিত করে এসে গার্মেন্টস মালিকের সঙ্গে বসে স্কচ খেতে খেতে রবীন্দ্রসংগীত শোনা। এইভাবে কত মেনন মন্ত্রী হয়; কিন্তু শ্রমিক দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন মজুরি পায়।
'ক্যান সাব-অল্টার্নস স্পিক' বলে বলে শত বছর ধরে শ্রমিকের মুখপাত্র হয়ে নতুন নতুন রাজনৈতিক ও এনজিও জমিদার জন্ম নিয়েছে। কিন্তু সাদা জুঁইফুলের মতো ভাতের জন্য, রানা প্লাজায় মৃত সেলাই কন্যার নুপুর পরা পায়ের ছবি, গোলাপি হিজাব পরা সেলাই কন্যার চারপাশে রাষ্ট্রের রাখালদের উদ্যত লাঠির ছবি; আর মালিকের ভাড়া করা ষণ্ডা অথবা রাষ্ট্রের রাখালের নিষ্ঠুরতায় ফুলফুল একটা চাদরে জড়ানো প্রায় কিশোর শ্রমিকের মৃতদেহ অস্ফুট স্বরে বলে, ইয়ে আজাদি ঝুটা হ্যায়।
স্বাধীনতার ৫৫ বছরে রাজনীতিক-আমলা-ব্যবসায়ী পাতলা খান লেনের ছাপড়া থেকে গুলশানের দালানে উঠেছে; এখন তাদের ছেলেমেয়েরা কথায় কথায় লোকজনকে ছাপড়ি বলে গালি দেয়। ঠিক যেভাবে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের জমিদারের ছেলেমেয়েরা লোকজনকে ছোটলোক বলত।
যতবার বাংলাদেশে শ্রমিকেরা তাদের মজুরি বৃদ্ধির দাবি তুলেছে, ততবার টিভিতে ক্ষমতাসীন সরকার টকশোর চৌবাচ্চায় কতগুলো আফ্রিকান মাগুর মাছ ছেড়ে দিয়েছে। 'যন্ত্র ঐ একটাই ষড়যন্ত্র' চিত্রনাট্য ফটোকপি করে করে ঝাঁঝরা হয়ে গেছে; তবু রাষ্ট্রের মিথ্যাবাদী রাখালের মুখে একই গল্প, বাঘ এসেছে, বাঘ এসেছে।
শ্রমিককে শোষণ করে বিলিয়নিয়ার হয় স্লামডগ, শ্রমিক প্রশমন করে কথিত সাম্যবাদী নেতা তার একটি আসনের দল নিয়ে আর একটি মন্ত্রিত্ব নিয়ে জমিদার হয়, পোশাক রপ্তানির বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে সেই অর্থ বিদেশে পাচার করে জমিদার তালিকায় নাম লেখায় সরকারি মন্ত্রী-এমপি-আমলা। বিরোধী পক্ষ সরকার পতনের জন্য শ্রমিকদের ভিড়ে মিশে গিয়ে নাশকতা করে। এই পুরো দুষ্টচক্র মিলে শ্রমিকদের জীবন-মৃত্যুর সওদাগরি করে।
জুঁইফুলের মতো সাদা ভাত, বাচ্চাটাকে স্কুলে পড়ানো, অসুখ-বিসুখে ওষুধ, মাথার ওপরে ভাড়া করা ছাপড়া; শুধু এইটুকু চাওয়া নিয়ে নদীভাঙনের গ্রামের ছেলেমেয়েরা ঢাকায় আসে গার্মেন্টসে শ্রম দিতে। অথচ সে বুঝতেও পারে না, সে আত্মকেন্দ্রিক মালিক, শ্রমিক নেতা, মালিকের ষণ্ডা রাখাল, রাষ্ট্রের রাখাল আর পুচ্ছ বাঁচিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে উদগ্রীব সরকার ও তাকে ফেলতে সক্রিয় শত্রুপক্ষের তৈরি করা এক অগ্নিধাঁধায় ঢুকে পড়েছে। শ্রমিক জানে কীভাবে এই মৃত্যুর শহরের অগ্নিগোলকে ঢুকতে হবে; কিন্তু বের হওয়ার পথ তার জানা নেই।



পাঠকের মন্তব্য