পৃথিবীর প্রথম শাহবাগীদের গল্প শুরু হয়েছিল ১৮৪৮ সালে!

২ পঠিত ০ ... ১ ঘন্টা ৪১ মিনিট আগে

26 (20)

 

১৮৪৮ সালের একটা ঘটনা। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের সেনেকা ফলস নামে একটা জায়গা। তারিখ ১৯ ও ২০ জুলাই। এই দুই দিনেই এমন একটা ঘটনা ঘটছে, যেটা পরবর্তী সময়ে নারীবাদী আন্দোলনের ইতিহাসে বেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এখানেই বসেছিল নারীদের অধিকার নিয়ে প্রথম বড় ধরনের সংগঠিত সম্মেলন। যেটাকে আমরা এখন ফার্স্ট-ওয়েভ ফেমিনিজম বা নারীবাদের প্রথম ঢেউ হিসেবে চিনি।

অবশ্য তার আগে নারীরা যে একদম চুপচাপ বসে ছিল, ব্যাপারটা এমন না। প্রাচীন রোমেও নারীরা রাস্তায় নামছে। পঞ্চদশ শতকে ক্রিস্টিন দ্য পিজান নারীদের শিক্ষার পক্ষে লিখছে। ১৭৯১ সালে ওলিম্প দ্য গুজ আর ১৭৯২ সালে মেরি ওলস্টোনক্র্যাফট নারীদের অধিকার নিয়ে লেখালেখি করছে। কিন্তু সমস্যা হইলো, এগুলো ছিল বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ। কেউ লিখছে, কেউ প্রতিবাদ করছে। কিন্তু সবাই মিলে নারীদের অধিকার নিয়ে বড় কোনো সম্মেলন করার ঘটনা তখনও ঘটে নাই।

এবার ওই সময়ের যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থা একটু বুঝেন। বিবাহিত নারীদের নিজেদের সম্পত্তির ওপর স্বাধীন অধিকার ছিল না। অনেক ক্ষেত্রে স্বামীর আইনি পরিচয়ের মধ্যেই তাদের সবকিছু আটকে থাকত। ভোট দেওয়ার অধিকার তো ছিলই না, উচ্চশিক্ষা কিংবা ভালো পেশায় যাওয়ার সুযোগও ছিল সীমিত। মানে সংসার সামলাবে নারী, সন্তান বড় করবে নারী, সমাজের যাবতীয় দায়িত্বও পালন করবে নারী। কিন্তু নিজের অধিকার চাইতে গেলেই যত সমস্যা! সমাজের নিয়মকানুন আবার পুরুষদের সুবিধামতোই বানানো।

অনেক নারী আবার দাসপ্রথা বিরোধী আন্দোলনেও বেশ সক্রিয় ছিল। ১৮৪০ সালে লন্ডনে একটা আন্তর্জাতিক অ্যান্টি-স্লেভারি কনভেনশন বসে। সেখানে যুক্তরাষ্ট্র থেকে যাওয়া নারী প্রতিনিধিদের বলা হইল, আপনারা আসছেন ভালো কথা, বসেন, দেখেন, কিন্তু কোনো কথা বলতে পারবেন না। ভোটও দিতে পারবেন না। অনেকটা মিটিংয়ে ডাকছে, কিন্তু কথা বলার মাইকটা দিচ্ছে না! অন্যের অধিকার নিয়ে কথা বলতে সমস্যা নাই, কিন্তু নিজের অধিকার নিয়ে কথা বলতে গেলেই আপত্তি।

এই ঘটনায় বেশ অপমানিত হয়েছিলেন লুক্রিসিয়া মট আর এলিজাবেথ ক্যাডি স্ট্যানটন। দুজনেই দাসপ্রথা বিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তারা ভাবলেন, অন্য মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য এত কিছু করছি, অথচ নিজেদের অধিকারই নাই। তাহলে নারীদের অধিকার নিয়ে আলাদা একটা আন্দোলন শুরু করা দরকার।

যেমন ভাবা, তেমন কাজ। ১৮৪৮ সালে একদিন চায়ের আড্ডায় বসে পাঁচ নারী মিলে এই পরিকল্পনা করলেন। তারা হলেন লুক্রিসিয়া মট, এলিজাবেথ ক্যাডি স্ট্যানটন, মার্থা রাইট, মেরি অ্যান ম্যাকলিন্টক আর জেন হান্ট। আড্ডা দিতে দিতেই ঠিক করলেন, নারীদের অধিকার নিয়ে একটা সম্মেলন করতে হবে। এরপর স্থানীয় পত্রিকায় ছোট্ট একটা বিজ্ঞাপন দিয়ে জানিয়ে দিলেন, নারীদের সামাজিক, নাগরিক ও ধর্মীয় অধিকার নিয়ে আলোচনা হবে।

এরপর যা হওয়ার তাই হইল। সম্মেলনের দিন সেনেকা ফলসের একটা ওয়েসলিয়ান চ্যাপেলে প্রায় ৩০০ মানুষ হাজির হইল। প্রথম দিন শুধু নারীদের অংশ নেওয়ার কথা থাকলেও দ্বিতীয় দিন পুরুষদেরও আসার সুযোগ দেওয়া হইল। মানে নারীদের অধিকার নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, সেখানেও পুরুষদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হইলো। অবশ্য সমাজের অর্ধেক মানুষকে বাদ দিয়ে সমাজ পরিবর্তনের আলোচনা করাও কঠিন।

এই সম্মেলনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল Declaration of Sentiments বা অনুভূতির ঘোষণা তৈরি করা। আমেরিকার স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের আদলে এলিজাবেথ ক্যাডি স্ট্যানটন একটা দলিল তৈরি করলেন। সেখানে বলা হইল, সব পুরুষ ও নারী সমানভাবে সৃষ্টি হয়েছে। খেয়াল করেন, আমেরিকার স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে এতদিন পুরুষদের সমান অধিকারের কথাই বেশি গুরুত্ব পাইসে। এবার সেই ভাষাতেই নারীরাও নিজেদের জায়গাটা দাবি করলেন।

এরপর নারীদের প্রতি সমাজ, রাষ্ট্র, আইন ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের বৈষম্যমূলক আচরণ নিয়ে একের পর এক অভিযোগ তুলে ধরা হইল। মোট ১৮টি অভিযোগ। পাশাপাশি পাস করা হইলো ১১টি প্রস্তাব।

তবে সবচেয়ে বেশি ঝামেলা হইল ভোটাধিকার নিয়ে। নারীদের ভোট দেওয়ার অধিকার থাকতে হবে, এই দাবিটা সম্মেলনে সবাই সহজভাবে নিতে পারেননি। অনেকেই এর বিরোধিতা করছিলেন। মানে সম্পত্তির অধিকার, শিক্ষার অধিকার নিয়ে কথা বলা পর্যন্ত ঠিক আছে, কিন্তু ভোট দিতে চাইলে সেটা আবার বাড়াবাড়ি! শেষ পর্যন্ত বিখ্যাত কৃষ্ণাঙ্গ অধিকারকর্মী ফ্রেডরিক ডগলাস এই দাবির পক্ষে জোরালো অবস্থান নিলেন। তার সমর্থনে ভোটাধিকারের প্রস্তাবটাও পাস হয়ে গেল।

সম্মেলন শেষে ঘোষণাপত্রে সই করলেন ১০০ জন। এর মধ্যে ৬৮ জন নারী আর ৩২ জন পুরুষ। চিন্তা করেন, ১৮৪৮ সালে একটা ছোট শহরে দাঁড়িয়ে ১০০ জন মানুষ প্রকাশ্যে বলতেছেন, নারীদেরও ভোট দেওয়ার অধিকার থাকতে হবে! আজকের দিনে কথাটা খুব স্বাভাবিক মনে হলেও তখন এই দাবির জন্যই তাদের নিয়ে হাসাহাসি করা হইছে।

স্বাভাবিকভাবেই তখনকার পত্রপত্রিকায় এই ঘটনা নিয়ে কম ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ হয় নাই। কেউ হাসাহাসি করতেছে, কেউ দাবিগুলোকে অযৌক্তিক বলতেছে। নারীরা আবার ভোট দেবে, সমাজ চালাবে, সিদ্ধান্ত নেবে! এসব শুনে তখন অনেকেরই গায়ে জ্বালা ধরছে। কিন্তু মজার ব্যাপার হইল, এসব সমালোচনার মধ্য দিয়েই নারীদের অধিকার নিয়ে আলোচনা আরও ছড়িয়ে পড়ল।

এই সম্মেলন পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের নারী অধিকার আন্দোলনের একটা বড় ভিত্তি তৈরি করছে। এরপর শুরু হইল ভোটাধিকারের জন্য দীর্ঘ লড়াই। প্রায় ৭২ বছর ধরে আন্দোলন চলার পর ১৯২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের ১৯তম সংশোধনী অনুমোদিত হয়। এর ফলে লিঙ্গের ভিত্তিতে ভোটাধিকার অস্বীকার করার ওপর সাংবিধানিক নিষেধাজ্ঞা আসে। যদিও বাস্তবে কৃষ্ণাঙ্গসহ অনেক নারীকে বর্ণবাদী আইন ও নানা বাধার কারণে আরও বহু বছর ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে দেওয়া হয় নাই। কাগজে অধিকার পাওয়া আর বাস্তবে সেই অধিকার ভোগ করা যে এক জিনিস না, সেটাও তখন পরিষ্কার হয়ে যায়।

তবে এই আন্দোলনেরও কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল। এর নেতৃত্বে মূলত মধ্যবিত্ত শ্বেতাঙ্গ নারীরাই বেশি ছিল। কৃষ্ণাঙ্গ ও দরিদ্র নারীদের অভিজ্ঞতা, দাবি কিংবা অংশগ্রহণ সেভাবে গুরুত্ব পায় নাই। ফলে পরবর্তী সময়ে এই আন্দোলনের বর্ণ ও শ্রেণিগত সীমাবদ্ধতা নিয়েও সমালোচনা হইছে। অর্থাৎ সমান অধিকারের আন্দোলন করলেও সেই আন্দোলনের ভেতরেও সবাই সমান গুরুত্ব পায় নাই। ইতিহাসের একটা মজার প্যারাডক্স বলতে পারেন!

তারপরও সেনেকা ফলসের সম্মেলন ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে আছে। কারণ, এখানে নারীদের অধিকার নিয়ে বিচ্ছিন্ন প্রতিবাদগুলো একটা সংগঠিত আন্দোলনের রূপ নিতে শুরু করে। এতদিন সমাজ নারীদের বলে আসছিল, তোমাদের কাজ সংসার সামলানো, পুরুষদের সিদ্ধান্ত মেনে চলা। আর ১৮৪৮ সালে এসে একদল নারী প্রকাশ্যেই বললেন, ব্যাপারটা এমন হবে না। আমাদেরও অধিকার আছে, আমাদের কথাও শুনতে হবে, সিদ্ধান্ত নেওয়ার জায়গাতেও আমাদের থাকতে হবে।

সহজ কথায়, পুরুষতান্ত্রিক সমাজ এতদিন নিয়ম বানাইছে, নারীরা সেই নিয়ম মেনে চলছে। ১৮৪৮ সালে কিছু নারী এসে বললেন, নিয়মটা এবার একটু রিভিউ করা দরকার!

 

 

২ পঠিত ০ ... ১ ঘন্টা ৪১ মিনিট আগে

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top ​