৩ নভেম্বর, ১৯৫৭
মহাকাশে ছুটে গেল স্পুটনিক-২। তার মধ্যে ছিল ছোট্ট এক প্রাণ, লাইকা। সারাবিশ্বে প্রচার হলো, মহাকাশে প্রথম প্রাণী হিসেবে পাঠানো হয়েছে লাইকাকে! তখন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে চলছিল তীব্র শীতল যুদ্ধ। মহাকাশে কে আগে, কে বেশি এগিয়ে, সেই প্রতিযোগিতাও হয়ে উঠেছিল দুই পরাশক্তির রাজনৈতিক শ্রেষ্ঠত্ব দেখানোর লড়াই। সেই লড়াইয়ের বলি হয়েছিল লাইকা।
লাইকার আসল নাম ছিল কুদরিয়াভকা, রুশ ভাষায় যার অর্থ ‘কোঁকড়ানো’। সে ছিল মস্কোর রাস্তা থেকে ধরে আনা একটি ছোট্টো মিশ্র জাতের কুকুর। শান্ত স্বভাব ও সহজে প্রশিক্ষণ নেওয়ার কারণে তাকে পার্ফেক্ট মনে করা হয়েছিল। মহাকাশ অভিযানের জন্য বেছে নেওয়ার পর তাকে ছোটো জায়গায় অনেক সময় ধরে আটকে রাখা, প্রচণ্ড শব্দ ও কম্পনের সঙ্গে অভ্যস্ত করানো, ঘূর্ণায়মান যন্ত্রে বসিয়ে উৎক্ষেপণের চাপের অনুকরণ করা হয়েছিল। মানুষের জানা দরকার ছিল, মহাকাশে একটি জীবন্ত শরীর কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায়। তাই লাইকার শরীর হয়ে উঠেছিল সেই অজানা প্রশ্নের উত্তর খোঁজার জায়গা।
লাইকার যাত্রা শুরু হওয়ার আগেই তার পরিণতি মোটামুটি নিশ্চিত ছিল। স্পুটনিক-২ এত দ্রুত তৈরি করা হয়েছিল যে তাকে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনার কোনো ব্যবস্থা রাখা হয়নি। এমনকি মহাকাশযানের ভেতরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থাও পুরোপুরি প্রস্তুত ছিল না। উৎক্ষেপণের পর কিছুক্ষণের মধ্যেই পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে। পরে প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা যায়, মহাকাশযানের ভেতরের তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে উঠে গিয়েছিল। প্রচণ্ড গরম, আতঙ্ক ও শারীরিক চাপের মধ্যে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই লাইকার হার্টবিট থেমে যায়। তার মৃত্যু মোটেই সহজ ছিল না, বরং ভীষণ কষ্টের ও দুর্বিষহ ছিল। বহুদিন সোভিয়েত কর্তৃপক্ষ তার মৃত্যুর সময় ও কারণ নিয়ে সত্য গোপন রেখেছিল।
সবচেয়ে বেদনাদায়ক ব্যাপার হলো, লাইকার এই মৃত্যু কোনো অনিবার্য বৈজ্ঞানিক প্রয়োজন ছিল না। তার যাত্রা থেকে জীবন্ত প্রাণীর ওপর মহাকাশযাত্রার প্রভাব সম্পর্কে কিছু তথ্য পাওয়া গিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু পরে মিশনের সঙ্গে যুক্ত বিজ্ঞানী ওলেগ গাজেনকো নিজেই স্বীকার করেছিলেন, লাইকার মৃত্যুকে ন্যায্যতা দেওয়ার মতো যথেষ্ট গবেষণা তাদের হাতে ছিল না। ১৯৯৮ সালে তিনি এ নিয়ে গভীর অনুশোচনাও প্রকাশ করেন এবং বলেন, লাইকার সঙ্গে এমনটা করা উচিত হয়নি। অর্থাৎ তখনকার রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা ও দ্রুত সাফল্য দেখানোর তাড়না বিজ্ঞানের প্রয়োজনের চেয়েও বড় হয়ে উঠেছিল।
লাইকার সঙ্গে মানবসভ্যতা এক ধরনের প্রতারণাই করেছিল। যে প্রাণীটি মানুষের ওপর বিশ্বাস করে মহাকাশযানের ভেতর বসেছিল, সে জানতই না, তার জন্য পৃথিবীতে ফেরার কোনো পথ রাখা হয়নি। তার সরল বিশ্বাসের বিনিময়ে মানুষ তাকে দিয়েছিল ভয়, একাকিত্ব আর একটি নিশ্চিত মৃত্যু। আর এই জায়গাটিই লাইকার গল্পকে শুধু মহাকাশ অভিযানের ইতিহাস না বানিয়ে মানুষের ইতিহাসেরও একটি কঠিন আয়না করে তোলে।
কারণ লাইকা একা নয়। সভ্যতার অগ্রগতি, যুদ্ধ, রাজনীতি কিংবা বৈজ্ঞানিক সাফল্যের পথে ইতিহাসে অসংখ্য প্রাণীকে মানুষ ব্যবহার করেছে, পরীক্ষা করেছে, কষ্ট দিয়েছে। অনেক সময় তাদের যন্ত্রণাকে বলা হয়েছে প্রয়োজনীয় মূল্য। কিন্তু যার জীবন নিয়ে সেই মূল্য পরিশোধ করা হয়, তার কাছে সেটি কোনো সংখ্যা বা গবেষণার ফলাফল নয়, সেটিই তার পুরো জীবন।
লাইকার সরল বিশ্বাসের কাছে মানুষের এই প্রতারণা তাই এক গভীর ক্ষত। সেই ক্ষত পুরোপুরি মুছে ফেলা সম্ভব নয়। কিন্তু লাইকার মতো আরও অনেক প্রাণীর জন্য কিছু করা, তাদের কষ্টকে অদৃশ্য হয়ে যেতে না দেওয়া, হয়তো সেই ক্ষতের পাশে হাত রাখার মতো। মহাকাশে যাওয়া প্রথম প্রাণী হিসেবে লাইকার নাম ইতিহাসে থেকে গেছে। কিন্তু তার চেয়েও বেশি মনে রাখা দরকার, সে ছিল একটি ছোট্ট প্রাণী, যে মানুষের তৈরি অন্ধ প্রতিযোগিতার এক অসম যাত্রায় গিয়ে আর কখনো ঘরে ফিরতে পারেনি।
লাইকা, আমাদের ক্ষমা করো। তোমার জন্য অসীম ভালোবাসা।
তথ্যসূত্র:
১. NASA, 60 Years Ago: The First Animal in Orbit — NASA
২. Smithsonian Magazine, The Sad, Sad Story of Laika, the Space Dog, and Her Fateful Mission — Smithsonian Magazine
৩. Smithsonian National Air and Space Museum, Laika Declassified — Smithsonian National Air and Space Museum
৪. Radio Free Europe/Radio Liberty, Laika: The Dog Who Went Into Space
৫. Folha de S.Paulo, 1998 — Oleg Gazenko’s remarks on his regret over Laika’s mission and death.



পাঠকের মন্তব্য