একসময় সিনেমা হল ছিল মানুষের বিনোদনের অন্যতম প্রধান জায়গা। নতুন সিনেমা মুক্তি পেলেই হলের সামনে টিকিটের জন্য লম্বা লাইন পড়ত। পরিবার, বন্ধু কিংবা প্রেমিক-প্রেমিকা, সবারই সিনেমা দেখার আলাদা একটা আনন্দ ছিল। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরে গড়ে উঠেছিল অনেক পুরোনো সিনেমা হল। এর মধ্যে কিছু হলের বয়স ১০০ বছরেরও বেশি। সময়ের সঙ্গে দর্শক কমেছে, অনেক হল বন্ধ হয়ে গেছে, কিছু জায়গায় তৈরি হয়েছে মার্কেট বা বহুতল ভবন। যেসব জায়গায় একসময় সিনেমার পর্দা জ্বলত, সেখানে এখন অন্য ব্যবসা চলছে।
১. লায়ন সিনেমা হল (ইসলামপুর, ঢাকা)
ঢাকার ইসলামপুরে ১৮৮৭-৮৮ সালের দিকে ডায়মন্ড জুবিলী থিয়েটার নামে একটা বিনোদনকেন্দ্র তৈরি হইছিল। পরে এটার নাম হয় লায়ন সিনেমা হল। ১৯৩২ সাল থেকে লায়ন নামে পরিচিতি পায়। একসময় পুরান ঢাকার মানুষের সিনেমা দেখার বেশ জনপ্রিয় জায়গা ছিল এটা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে দর্শক কমতে থাকে। শেষ পর্যন্ত ২০০৫ সালে পুরোনো হলটা বন্ধ হয়ে যায়। এরপর ২০২২ সালে কেরানীগঞ্জে লায়ন সিনেমাস নামে নতুন একটা মাল্টিপ্লেক্স চালু হয়। তবে পুরান ঢাকার সেই লায়ন সিনেমা হল আর ফিরে আসে নাই। রয়ে গেছে শুধু নাম আর পুরোনো দিনের স্মৃতি।
২. শাবিস্তান সিনেমা হল (আরমানিটোলা, ঢাকা)
ঢাকার আরমানিটোলায় ১৯১৩-১৪ সালের দিকে পিকচার হাউস নামে একটা সিনেমা হল চালু হইছিল। এটাকে ঢাকার প্রথম স্থায়ী সিনেমা হল বলা হয়। তখন সিনেমা দেখানোর ব্যবস্থা এখনকার মতো ছিল না। হারিকেন আর লণ্ঠনের আলো জ্বালিয়ে সিনেমা দেখানো হইতো। পরে হলটার নাম হয় নিউ পিকচার হাউস। ১৯৫৬ সালে নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় শাবিস্তান। একসময় এই হলে সিনেমা দেখার জন্য মানুষের বেশ ভিড় হইতো। কিন্তু সময়ের সঙ্গে দর্শক কমতে থাকে। শেষ পর্যন্ত একুশ শতকের শুরুর দিকে হলটা বন্ধ হয়ে যায়। এখন সেখানে আর সিনেমা দেখানো হয় না। জায়গাটা দোকান আর গুদাম হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে।
৩. সিনেমা প্যালেস / রূপমহল (সদরঘাট, ঢাকা)
পুরান ঢাকার সদরঘাট এলাকায় ১৯২৪ সালের দিকে সিনেমা প্যালেস নামে একটা হল গড়ে ওঠে। পরে বিভিন্ন সময়ে এর নাম পরিবর্তন হয়ে মতিমহল ও রূপমহল হয়। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে এই হলের একটা বিশেষ জায়গা আছে। ১৯৫৬ সালে বাংলাদেশের প্রথম সবাক চলচ্চিত্র মুখ ও মুখোশ এখানেই প্রদর্শিত হয়েছিল। ছবিটির উদ্বোধন করেছিলেন শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক। একসময় এই হলে সিনেমা দেখতে দর্শকদের ভিড় হতো। কিন্তু সময়ের সঙ্গে হলটির জনপ্রিয়তা কমে যায়। পরে পুরোনো ভবন ভেঙে সেখানে বহুতল ভবন তৈরি করা হয়। এখন আর সেই রূপমহল সিনেমা হলের অস্তিত্ব নেই।
৪. আজাদ সিনেমা হল (জনসন রোড, পুরান ঢাকা)
১৯২৯ সালে পুরান ঢাকার জনসন রোডে মুকুল টকিজ নামে একটা সিনেমা হল চালু হয়। মুকুল ব্যানার্জী নামে একজন এটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। শুরুর দিকে এখানে নির্বাক চলচ্চিত্র দেখানো হতো। ঢাকায় নির্মিত প্রথম দিককার চলচ্চিত্র দ্য লাস্ট কিস এই হলে প্রদর্শিত হয়েছিল। পরে ১৯৬৪ সালে হলটির নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় আজাদ সিনেমা হল। একসময় পুরান ঢাকার সিনেমাপ্রেমীদের কাছে বেশ পরিচিত ছিল জায়গাটা। তবে সময়ের সঙ্গে দর্শক কমে যায়, হলটির অবস্থাও খারাপ হতে থাকে। এখনো ভবনটি টিকে থাকলেও আগের মতো সিনেমা প্রদর্শন ও ব্যবসা নেই।
৫. তাজমহল সিনেমা হল (মৌলভীবাজার, পুরান ঢাকা)
১৯২৯ সালের দিকে পুরান ঢাকার মৌলভীবাজার এলাকায় তাজমহল সিনেমা হল প্রতিষ্ঠিত হয়। মোখলেছুর রহমান ও আরিফুর রহমান নামে দুজন এটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বলে জানা যায়। একসময় পুরান ঢাকার মানুষের সিনেমা দেখার পরিচিত জায়গা ছিল এই হল। বাংলা সিনেমার পাশাপাশি এখানে ইংরেজি সিনেমাও দেখানো হতো। ছুটির দিনে দর্শকদের বেশ ভিড় জমত। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সিনেমা হলের ব্যবসা কমতে থাকে। আশির দশকে পুরোনো ভবনটি ভেঙে ফেলা হয়। সেখানে বহুতল ভবন তৈরি হওয়ায় তাজমহল সিনেমা হলের আর কোনো অস্তিত্ব নেই।
৬. মানসী সিনেমা হল (বংশাল, ঢাকা)
পুরান ঢাকার বংশালে ১৯৩৬ সালের দিকে মানসী সিনেমা হল চালু হয়। একসময় এই এলাকার মানুষের বিনোদনের অন্যতম জায়গা ছিল হলটি। নতুন সিনেমা মুক্তি পেলেই দর্শকদের ভিড় জমত। আশির দশকেও হলটির বেশ জনপ্রিয়তা ছিল। এমনকি রাত ১২টা পর্যন্ত সিনেমা প্রদর্শন করা হতো। কিন্তু ধীরে ধীরে দর্শক কমতে থাকে। সিনেমা হলের ব্যবসা আগের মতো না থাকায় শেষ পর্যন্ত ২০১৯ সালে হলটি বন্ধ হয়ে যায়। এখন সেখানে মানসী কমপ্লেক্স নামে মার্কেট তৈরি হয়েছে। যেখানে একসময় মানুষ সিনেমা দেখতে যেত, সেখানে এখন কেনাকাটা করতে যায়।
৭. প্যারাডাইস টকিজ (আলী দেউড়ি, পুরান ঢাকা)
পুরান ঢাকার আলী দেউড়ি এলাকায় একসময় প্যারাডাইস টকিজ নামে একটা সিনেমা হল ছিল। ১৯৩৮ সালে হলটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বলে জানা যায়। তবে কিছু সূত্রে ১৯২৭ সালে কমলা টকিজ নামে এর যাত্রা শুরুর কথাও পাওয়া যায়। পরে নিউ প্যারাডাইস নামেও পরিচিতি পায়। একসময় এলাকার মানুষের সিনেমা দেখার পরিচিত জায়গা ছিল এটি। নতুন সিনেমা মুক্তি পেলে দর্শকদের ভিড় হতো। কিন্তু সময়ের সঙ্গে হলটি বন্ধ হয়ে যায়। এখন আর সেই সিনেমা হলের অস্তিত্ব নেই। পুরান ঢাকার হারিয়ে যাওয়া সিনেমা হলগুলোর তালিকায় প্যারাডাইসও একটা নাম।
৮. ব্রিটানিয়া সিনেমা হল (ঢাকা)
ঢাকায় ব্রিটানিয়া নামে একটা সিনেমা হল ছিল, যেটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় অর্থাৎ চল্লিশের দশকে চালু হয়েছিল বলে জানা যায়। তখন ঢাকায় সিনেমা দেখার জায়গা খুব বেশি ছিল না। ব্রিটানিয়ায় মূলত ইংরেজি সিনেমা দেখানো হতো। তাই তৎকালীন ইংরেজি ভাষাভাষী ও অভিজাত দর্শকদের কাছে হলটি পরিচিত ছিল। তবে খুব বেশি দিন টিকে থাকতে পারেনি। পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি সময়েই হলটি বন্ধ হয়ে যায়। ঢাকার সিনেমা হলের ইতিহাসে ব্রিটানিয়া এখন অনেকটাই বিস্মৃত একটা নাম।
৯. সিনেমা প্যালেস (কেসি দে রোড, চট্টগ্রাম)
চট্টগ্রামের কেসি দে রোডে সিনেমা প্যালেসের ইতিহাস বেশ পুরোনো। ১৯২৮ সালে এটি থিয়েটার হল হিসেবে যাত্রা শুরু করে। পরে ১৯৪৩ সালে সিনেমা হলে রূপান্তর করা হয়। দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রামের মানুষের সিনেমা দেখার অন্যতম জায়গা ছিল এটি। কয়েক প্রজন্মের দর্শক এই হলে বসে সিনেমা দেখেছেন। কিন্তু পুরোনো ভবনটি একসময় ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে নিরাপত্তার কারণে হলটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। চট্টগ্রামের চলচ্চিত্র ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ একটা অধ্যায় এভাবেই থেমে যায়।
১০. উল্লাসিনী হল (খুলনা)
খুলনার প্রথম দিককার সিনেমা হলগুলোর মধ্যে উল্লাসিনী অন্যতম। ত্রিশের দশকের মাঝামাঝি সময়ে হলটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ পাওয়া যায়। প্রমথনাথ দাশ বা কুরী নামে একজনের উদ্যোগে এটি তৈরি হয়েছিল বলে জানা যায়। স্ত্রীর নাম অনুসারেই হলটির নাম রাখা হয়েছিল উল্লাসিনী। একসময় খুলনার মানুষের সিনেমা দেখার অন্যতম বিনোদনকেন্দ্র ছিল এটি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে হলটি বন্ধ হয়ে যায়। পরে সিনেমা হলের জায়গাটি গুদাম হিসেবে ব্যবহার হতে থাকে। এখন উল্লাসিনী নামটা খুলনার পুরোনো সিনেমা সংস্কৃতির স্মৃতি হয়েই টিকে আছে।



পাঠকের মন্তব্য