তখন পড়ি হয়তো প্রি-ওয়ান বা ওয়ানে। আমার ফেভারিট ক্লাস ছিল দুটো, একটা ড্রইং আরেকটা গানের। বাচ্চাদের কাছে গানের ক্লাসের চেয়ে মজার কিছু নেই পৃথিবীতে! কারণ পুরো স্কুল টাইম চিল্লাবে না, আস্তে কথা বলো শোনার পর, গানের ক্লাসে গিয়ে গলা খুলে চিল্লানোর একটা সুযোগ পাওয়া যায়। যেহেতু বেশিরভাগই কোরাস, তাই একটু সুরে মিললেই হয়! বাকিটা হেঁড়ে গলা হোক আর মিষ্টি, তাতে কিছু আসে যায় না!
তো এই গানের ক্লাসে শেখা অনেক গানের মধ্যে একটা গান ছিল, We Shall Overcome… এই গানটার ইংলিশ অর্থ বোঝার তখনও সময় হয়নি। তবে এরই সঙ্গে গাইতাম বাংলাটাও,
আমরা করব জয়
আমরা করব জয়
আমরা করব জয় একদিন
ওহো বুকের গভীরে আছে প্রত্যয়
আমরা করব জয় একদিন!
গানটার অন্তর্নিহিত অর্থ না বুঝলেও গানটা সবার ভালোই লাগত। কারণ সব বাচ্চাকাচ্চা গলা ছেড়ে ম্যাডামের সঙ্গে গাইতাম! তারপর হাততালি দিতাম। গানটা গাইলেই আমাদের মাঝে যেন একটা অন্যরকম শক্তি আসত!
সেই মিষ্টি ছোটবেলা ছেড়ে এসেছি। হঠাৎ করেই সেদিন এই গানটি নিয়ে এক জায়গায় কথা হলো। এরপর জানলাম, এটা নাকি একটা বিপ্লবী গান ছিল! এখন এইটুকু জানলে তো আমার হবে না! আমার জানতে হবে কীভাবে এই গান এলো, কোত্থেকে এলো, কেমনে কী! তাই ডুব দিলাম ঘাটাঘাটিতে…
ঘাটাঘাটি করতে গিয়ে আবিষ্কার করলাম, গানটার ইতিহাস প্রায় ১০০ বছরের বেশি পুরোনো! একদম যেন Tale as old as time,
Song as old as rhyme…
এই গানটির কোনো একজন নির্দিষ্ট লেখক নেই! এমনকি এর আসল শুরু কোথায়, তা নিয়েও নাকি গবেষকদের মধ্যে ভালো একটা বিতর্ক আছে!
Library of Congress-এর গবেষণা অনুযায়ী, এই গানের একটা বড় শিকড় লুকিয়ে আছে ১৯০৩ সালে রেভারেন্ড চার্লস অ্যালবার্ট টিন্ডলির লেখা ধর্মীয় গান I’ll Overcome Some Day-এর মধ্যে। আবার গানটির সুরের মিল পাওয়া যায় আফ্রিকান-আমেরিকানদের আরেকটি জনপ্রিয় গসপেল গান I’ll Be All Right-এর সঙ্গে।
মানে, আমরা আজ যে We Shall Overcome শুনি, তা হুট করে একদিনে তৈরি হয়নি। ধর্মীয় সংগীত, লোকগান আর রাজপথের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে মানুষের মুখে মুখে বদলাতে বদলাতে এটি আজকের এই কালজয়ী রূপে পৌঁছেছে।
এবার এই গানের হাত ধরে চলে আসব ১৯৪০-এর দশক, আমেরিকায়। ১৯৪৫-৪৬ সালের দিকে আমেরিকার সাউথ ক্যারোলাইনার চার্লস্টনে তামাকশ্রমিকদের ধর্মঘট চলছিল। ধর্মঘটে থাকা শ্রমিকেরা পিকেট লাইনে গান গাইতেন। সেই শ্রমিকদের মধ্যে লুসিল সিমন্স খুব ডিপ আর শক্তিশালী, কিন্তু একটু স্লো টোনে এই গানটা গাইতেন। তাঁর মাধ্যমে গানটির একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটে বলে পরবর্তী স্মৃতিচারণে জানা যায়। ব্যক্তিগত I ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে দলগত We।
এই পরিবর্তনটি ছোট মনে হতে পারে। কিন্তু আসলে এখানেই গানটির দর্শন বদলে যায়।
I shall overcome মানে আমি জয়ী হব।
We shall overcome মানে আমরা জয়ী হব।
একজন মানুষের আশা থেকে পুরো একটা জনগোষ্ঠীর প্রত্যয়ে চলে আসে গানটি।
১৯৪৬ সালে টেনেসির Highlander Folk School-এর মিউজিক অ্যাক্টিভিস্ট জিলফিয়া হর্টন শ্রমিকদের কাছ থেকে গানটি শোনেন। পরে তিনি পিট সিগারকে গানটি শেখান। ১৯৪৮ সালে গানটি People’s Songs Bulletin-এ We Will Overcome নামে প্রকাশিত হয়। পিট সিগার পরবর্তী সময়ে will-এর জায়গায় shall ব্যবহার করেন এবং We’ll walk hand in hand-এর মতো লাইন যোগ করেন।
এখানেও একটা মজার বিষয় আছে। We Shall Overcome আসলে এমন একটি গান, যেটা এক ব্যক্তি বসে লিখে শেষ করে অন্যদের হাতে তুলে দেননি। বরং মানুষের মুখে মুখে, আন্দোলনের ভেতর, প্রয়োজন অনুযায়ী বদলাতে বদলাতে গানটি তৈরি হয়েছে।
১৯৪৫-৪৬ সালে চার্লসটনের তামাকশ্রমিকদের আন্দোলন
গান যখন আন্দোলনের হাতিয়ার
১৯৫০ ও ৬০-এর দশকে আমেরিকায় নাগরিক অধিকার আন্দোলন তীব্র হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গানটির গুরুত্বও বাড়তে থাকে। কৃষ্ণাঙ্গদের ভোটাধিকার, বর্ণবৈষম্য বিলোপ এবং সমান নাগরিক অধিকারের আন্দোলনে গান ছিল কেবল বিনোদন নয়। Library of Congress-এর Civil Rights History Project বলছে, আন্দোলনের গান মানুষকে দীর্ঘ মিছিলের সময় উৎসাহ দিয়েছে, হয়রানি ও সহিংসতার মুখে মানসিক শক্তি দিয়েছে, আবার কখনও অপেক্ষার সময়ও একসঙ্গে ধরে রেখেছে।
গাই কারাওয়ান ও ফ্র্যাঙ্ক হ্যামিল্টনের মাধ্যমে গানটির ছন্দ ও পরিবেশনের ধরন আরও বদলে যায়। ১৯৬০ সালে কারাওয়ান গানটি নাগরিক অধিকারকর্মীদের শেখান। এরপর গানটি ছড়িয়ে পড়ে ছাত্র আন্দোলন, সিট-ইন, মিছিল ও সমাবেশে।
১৯৫৭ সালে পিট সিগার Highlander Folk School-এ গানটি গেয়েছিলেন এমন একটি অনুষ্ঠানে, যেখানে মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র, রোজা পার্কস এবং রাল্ফ অ্যাবারনেথি উপস্থিত ছিলেন। পরে কিংয়ের নেতৃত্বাধীন নাগরিক অধিকার আন্দোলনের সঙ্গে গানটির সম্পর্ক আরও দৃঢ় হয়।
পিট সিগার, আজীবন ছিলেন সংগ্রামী মানুষের কণ্ঠস্বর, We shall overcome-কে করেছেন অমর!
১৯৬৩ সালের March on Washington for Jobs and Freedom-এর সঙ্গেও গানটির কথা নথিভুক্ত আছে। সেই সময়ের Library of Congress সংগ্রহে We Shall Overcome শিরোনামে মার্চের স্মারক সামগ্রীও সংরক্ষিত আছে।
একটা গান তখন আর শুধু গান নয়। মানুষ মিছিল করছে, পুলিশি বাধার মুখোমুখি হচ্ছে, কেউ গ্রেপ্তার হচ্ছে, কেউ ভয় পাচ্ছে। আর সেই পরিস্থিতিতে শত শত মানুষ একই কথা বলছে:
We Shall Overcome.
আমরা জয়ী হব।
তারপর গানটি আটলান্টিক পেরিয়ে বাংলায়
গানটির আরেকটি অসাধারণ যাত্রা শুরু হয় দক্ষিণ এশিয়ায়।
বাংলায় We Shall Overcome-এর সবচেয়ে পরিচিত রূপ আমরা করব জয়। এই অনুবাদের সঙ্গে যুক্ত নাম হেমাঙ্গ বিশ্বাস। তিনি শুধু গায়ক বা অনুবাদক ছিলেন না, উপমহাদেশের গণসংগীত আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্পীও ছিলেন।
হেমাঙ্গ বিশ্বাসের জন্ম বর্তমান বাংলাদেশের হবিগঞ্জের মিরাশী গ্রামে, ১৯১২ সালে। তরুণ বয়স থেকেই তিনি গণসংগীত, শ্রমিক-কৃষকের আন্দোলন এবং লোকসংগীতের সঙ্গে যুক্ত হন। তাঁর সংগীতচর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল, মানুষের কাছে পৌঁছানোর জন্য পরিচিত লোকসুর ও সহজ ভাষাকে ব্যবহার করা। বাংলাদেশের The Daily Star-এর স্মৃতিকথার ফিচারে তাঁকে গণসংগীতের অগ্রণী শিল্পী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
We Shall Overcome-এর বাংলা রূপান্তরেও সেই সহজ, সমবেত গানের চরিত্রটি রয়ে গেল:
আমরা করব জয়
আমরা করব জয় একদিন...
কিছু সূত্রের মতে, হেমাঙ্গ বিশ্বাস ১৯৬৫ সালে গানটির বাংলা রূপ তৈরি করেন। পরে ভূপেন হাজারিকার কণ্ঠে গানটি ব্যাপক পরিচিতি পায়। তবে এই নির্দিষ্ট সালটি নিয়ে খুব জোরালো তথ্যসূত্র পাওয়া যায় না, তাই এটাকে আনুমানিক সাল বলা যায়।
আর এখানেই গানটা আমার মতো বাংলাদেশের শিশুদের জীবনে ঢুকে পড়ে।
হেমাঙ্গ বিশ্বাস, যার হাত ধরে ইংলিশ থেকে আমাদের ভাষায় রূপ পায় এই কালজয়ী গানটি
আর বাংলাদেশের শিশুরা?
সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার, একটা সময় এসে গানটি এতটাই সাধারণ হয়ে যায় যে এর ইতিহাসটাই যেন হারিয়ে যায়।
বাংলাদেশ সরকারের চতুর্থ শ্রেণির সংগীত বিষয়ের শিক্ষক নির্দেশিকায় We Shall Overcome-কে বিশ্বসংগীত হিসেবে রাখা হয়েছে। সেখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, গানটির বাংলা রূপ আমরা করব জয়; মূল সুরেই এটি গাওয়া হয়। নির্দেশিকায় আরও আছে আমরা নই একা এবং আমাদের নেই কোনো ভয় ধরনের লাইন।
অর্থাৎ আমার শৈশবের সেই স্কুলের গানটি নিছক কোনো বিচ্ছিন্ন ব্যাপার ছিল না। গানটি আনুষ্ঠানিকভাবেও বাংলাদেশের শিশুদের শেখানোর মতো জায়গায় পৌঁছে গেছে।
আজ ভাবলে বিষয়টা বেশ অদ্ভুত লাগে।
একটি গান শুরু হয়েছিল আফ্রিকান-আমেরিকান ধর্মীয় সংগীতের ভেতর। শ্রমিকদের ধর্মঘটে তার নতুন অর্থ তৈরি হলো। নাগরিক অধিকার আন্দোলনে সেটি হয়ে উঠল সমবেত প্রত্যয়ের ভাষা। পিট সিগার, জিলফিয়া হর্টন, গাই কারাওয়ানসহ অনেক মানুষ গানটির যাত্রায় ভূমিকা রাখলেন। তারপর সেটি ভারতীয় উপমহাদেশে এল। হেমাঙ্গ বিশ্বাস সেটিকে বাংলায় গাইলেন। ভূপেন হাজারিকার কণ্ঠে তা ছড়িয়ে পড়ল। আর শেষ পর্যন্ত কোনো এক বাংলাদেশের কিন্ডারগার্টেনের শিশুরা দাঁড়িয়ে গাইল:
আমরা করব জয় একদিন।
তখন আমরা জানতাম না, We শব্দটার ওজন কতটা।
জানতাম না, এই We-এর মধ্যে কোনো একদিন চার্লস্টনের তামাকশ্রমিকেরা দাঁড়িয়েছিল। জানতাম না, এই We-এর মধ্যে নাগরিক অধিকারকর্মীরা দাঁড়িয়েছিল। জানতাম না, মিছিলের মানুষ দাঁড়িয়েছিল। জানতাম না, পৃথিবীর নানা ভাষায় গানটি নতুন নতুন We খুঁজে নিয়েছে।
আমরা শুধু গাইতাম।
হয়তো এটাই গানটির সবচেয়ে সুন্দর পরিণতি।
একটি গান যখন ইতিহাসের মালিকানা হারিয়ে মানুষের হয়ে যায়, তখন তার আর একটিমাত্র দেশ থাকে না। একটিমাত্র আন্দোলন থাকে না। এমনকি একটিমাত্র প্রজন্মও থাকে না।
তখন একটি আমেরিকান কৃষ্ণাঙ্গ শ্রমিকের কণ্ঠ থেকে বের হওয়া প্রত্যয় কোনো একদিন এসে বাংলাদেশের একটি শিশুর কণ্ঠেও জায়গা করে নেয়।
শিশুটি হয়তো জানে না সে কী গাইছে।
কিন্তু সে গাইছে:
বুকের গভীরে আছে প্রত্যয়,
আমরা করব জয় একদিন।
আর কয়েক দশক পর সেই শিশুটি যখন গানটির ইতিহাস খুঁজতে বসে, তখন বুঝতে পারে, ছোটবেলায় সে আসলে একটি সুর নয়, বরং সে শিখেছিল বহু বছর ধরে মানুষের অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে থাকার এক গান!
একটা গান, যার বয়স একশ বছরেরও বেশি। যার সুর পেরিয়েছে গির্জা থেকে শ্রমিকের পিকেট লাইন, পিকেট লাইন থেকে নাগরিক অধিকার আন্দোলনের মিছিল, আর সেখান থেকে কোনো একদিন এসে পৌঁছেছে একটা ছোট্ট স্কুলের গানের ক্লাসে।
এমন এক গান, যা কখনো কখনো হাজার অস্ত্রের চেয়েও শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে।
সিভিল রাইটস মুভমেন্টে মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র কথা বলছেন, পেছনেই বড় করে ব্যানারে লেখা We Shall Overcome
তথ্যসূত্র:
Library of Congress — Tracing the Long Journey of We Shall Overcome
বাংলাদেশ সরকারের চতুর্থ শ্রেণির সংগীত শিক্ষক সহায়িকা
The Daily Star — হেমাঙ্গ বিশ্বাস ও তাঁর গণসংগীতচর্চা নিয়ে ফিচার
Outlook India — We Shall Overcome-এর উপমহাদেশীয় যাত্রা ও হেমাঙ্গ বিশ্বাসের সঙ্গে বাংলা রূপের সম্পর্ক নিয়ে লেখা।







পাঠকের মন্তব্য