প্রাইমারি এডুকেশন বিসিএস লিমিটেড

১৫ পঠিত ০ ... ৮ ঘন্টা ১৩ মিনিট আগে

১.

আমি কালকে যাইলাম, আবার কালকে যাইলাম, আবার কালকে যাইলাম, আমি সারাদিনই স্কুলে যাইলাম! এখন স্কুলে যাব না!

আমার সাড়ে চার বছর বয়সী ছেলেটা ঘ্যানঘ্যান করে কথাগুলো বলল! সে বোঝাতে চাচ্ছে সে ডেইলি স্কুলে যায় তাই আজ যাবে না। কাল তার পরীক্ষা! তাকে আমি সাত মাস আগে স্কুলে ভর্তি করেছি। বাসার পাশের এক কিন্ডারগার্টেনে, প্লে-গ্রুপে। আমি ধরে নিয়েছিলাম এই ক্লাসে সে শুধুই স্কুলে যাওয়া-আসা, সোশিয়ালাইজিং, খেলাধুলা এসব করবে। কিন্তু অবাক করা ব্যাপার হচ্ছে তার প্রচণ্ড পড়ার প্রেশার! তার টোটাল সাবজেক্ট সাতটা! চারটা লিখিত, বাকিগুলো ওরাল!

এই ক্লাসেই তাকে স্বরবর্ণ, ব্যঞ্জনবর্ণ, এ-জেড, গণিত শেখানো হচ্ছে। সাথে ড্রইং, ধর্ম, স্পোকেন, হ্যান্ডরাইটিং আরও কিছু সাবজেক্ট! আমি অবাক হয়ে গেলাম। প্লে গ্রুপ মানেই কি খেলাধুলা শ্রেণি না? এখানেই যদি সব পড়ে ফেলতে হয় তো পরের ক্লাসগুলোতে সিলেবাসটা কী?

যাইহোক, আমি তাকে পড়ানো শুরু করলাম। কিন্তু তাদের স্কুল যেন পাগলা ঘোড়া! লাফিয়ে লাফিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। ছেলেটা আমার এর সাথে কোপ-আপ করে উঠতে পারছে না! আমি বিরক্ত হচ্ছি, বাচ্চাটা রেগে যাচ্ছে, কাঁদছে- এগোচ্ছে না খুব একটা পড়াশোনা। আমার মাথায় হাত! এ কী অবস্থা!

আমাদের আজকের শিক্ষাব্যবস্থার এটা সবচেয়ে অ্যালার্মিং ব্যাপার বলে মনে হয় আমার কাছে। একটা শিশুকে এখনকার সময়ে আমরা মাত্র তিন-সাড়ে তিন বছর বয়সে স্কুলে দিয়ে দেই। বয়সটা এখনে ফ্যাক্ট না, ফ্যাক্ট হচ্ছে এই বয়সী বাচ্চাদের সিলেবাস!

ছোটো একটা বাচ্চা নতুন নতুন স্কুলে যাবে, নতুন বাচ্চাদের সাথে পরিচিত হবে, খেলবে, সোশিয়ালাইজিং শিখবে-এর মধ্যে দিয়ে তার শিক্ষার-সামাজিকতার ভিত তৈরি হবে। বাচ্চাটার মধ্যেও স্কুলে যাওয়ার আগ্রহ তৈরি হবে- শেখার আগ্রহও তৈরি হবে।

কিন্তু প্রাইমারি লেভেলে কিন্ডারগার্টেনগুলো যে পরিমান প্রেশার ক্রিয়েট করছে তা রীতিমতো ভয়ের ব্যাপার! 

 

২.

একটু পুরো দুনিয়ার দিকে তাকাই। বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে ভালো শিক্ষাব্যবস্থা ফিনল্যান্ডের। তারা ৭ বছর বয়স হলে বাচ্চাদের স্কুলে পাঠানো শুরু করে। এর আগে তাদের ০-৫ বছর পর্যন্ত একটা অপশনাল প্রি-স্কুলিং আছে। যেখানে কোনো বই-খাতা থাকে না। শিশু কীভাবে অন্যদের সাথে মিশবে, নিজে নিজে খাবে, খেলাধুলা করবে এবং প্রকৃতির সাথে পরিচিত হবে; এগুলোই এখানে মেইন লক্ষ্য। ইচ্ছা করলে প্যারেন্টসরা বাচ্চাদের এখানে দিতেও পারেন, আবার না-ও দিতে পারেন।

এরপর আছে আরেকটা ম্যান্ডেটরি প্রি-স্কুলিং। ৭ বছর বয়সে প্রাতিষ্ঠানিক 'প্রাইমারি স্কুল' শুরু হওয়ার ঠিক আগের ১ বছর মানে ৬ বছর বয়সে প্রতিটি শিশুকে এই প্রি-স্কুলে যেতে হয়। এটি রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে টোটালি ফ্রি। কিন্তু এখানেও অ্যাজ ইউজুয়াল সিস্টেমেটিক কোন ক্লাস, হোমওয়ার্ক বা এক্সাম নেই। খেলাধুলা-বেসড পড়াশোনা এখানেও। ফিনল্যান্ড ‘কম পড়া, বেশি শেখা' থিওরিতে বিশ্বাস করে। প্রাক্টিক্যালি জীবনমুখী শিক্ষাই তাদের পড়াশোনার মেইন থিম।

এরপর আসি আরও কিছু ওয়ার্ল্ড-বেস্ট শিক্ষাব্যবস্থায়। সিঙ্গাপুরে মুখস্থবিদ্যার বদলে লজিক্যাল ও ক্রিটিক্যাল থিংকিং শেখানো হয়। জাপানে ১০ বছর পর্যন্ত এক্সাম-ফ্রি পড়াশোনা। সাউথ কোরিয়ায় শেখানো হয় ডিজিটালাইজেশন। কানাডায় আছে প্রজেক্ট-বেসড লার্নিং আর তার কস্টিং পুরোটাই রাষ্ট্র ক্যারি করে। এস্তোনিয়ায় প্রাইমারি লেভেলেই কোডিং, রোবোটিক্স, ই-লার্নিং শেখানো হচ্ছে। নেদারল্যান্ডসে শিশুদের খুশি ও মানসিক স্বাস্থ্যের দিকে খেয়াল রাখাই তাদের মেইন মটো। ইউনিসেফ বলছে, নেদারল্যান্ডসে সবচেয়ে সুখি শিশুরা বাস করে।

কম প্রেশার, রিলাক্সিং পড়াশোনা, জীবনমুখী শিক্ষা, প্রপার ফিজিক্যাল-মেন্টাল হেলথ, নেচারের ওপর ডিপেনডেন্সি এই ব্যাপারগুলোই এই চমৎকার শিক্ষাব্যবস্থাগুলোর মুলমন্ত্র।

এবার আসি বাংলাদেশের প্রাইমারি লেভেলের শিক্ষাব্যবস্থায়। বাংলাদেশে প্রাইমারি লেভেলের স্টুডেন্টদের ৫২.৬% পড়ে সরকারি প্রাইমারি স্কুলগুলোতে। আর বাকি অর্ধেক বাচ্চারা পড়ে বেসরকারি কিন্ডারগার্টেন, এনজিও স্কুল আর ইবতেদায়ি মাদ্রাসায়।

নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিক থেকে শহরগুলোতে কেজি স্কুলগুলোর সংখ্যা বাড়তে থাকে। কেন? কারণ, প্যারেন্টরা বলেন, সরকারি প্রাইমারিতে পড়াশোনা একদমই হয় না। কথাটা অনেকাংশেই সত্যি ছিল। টিচারদের অভাব, টিচারস ট্রেইনিংয়ের অভাব, নানান ধরনের ফাঁকিবাজি শিক্ষার মানকে কমিয়ে তলানিতে এনে ফেলেছিল। পরে নানা সরকারি উদ্যোগে এই অবস্থার কিছুটা আপগ্রেডেশন হলেও সেটা সামান্য।

তাই কেজি স্কুলগুলোর দাম বাড়তে থাকে। কেজি স্কুলগুলোতে খরচ বেশি, কিন্তু শুরুরদিকে তাদের পড়াশোনার মানটা কিছু ভালো ছিল।এই কেজি স্কুলগুলোতেই প্রথম প্রি-স্কুলিংয়ের ক্লাসগুল চালু হল লাইক, প্লেগ্রুপ, নার্সারি, কেজি। কিন্তু এই ক্লাসগুলোতেই তারা বাচ্চাদের মাথায় চাপিয়ে দিতে লাগলো বইয়ের পাহাড়, পড়ার বোঝা! আগে আমাদের দেশের বাচ্চারাও স্কুলে যেত ৬/৭ বছর বয়সে। সেটা ধীরে ধীরে এসে ঠেকল তিন-সাড়ে তিনে!

ধীরে ধীরে এই স্কুলগুলো হয়ে উঠল পিওর বিজনেস সেন্টার। মেইন বইগুলোর পাশাপাশি নানা ধরনের এক্সট্রা বই অ্যাড হল। বাড়ল বাচ্চাদের প্রেশার! নিজেদের ব্যাগ বাচ্চারা নিজেরা ক্যারি করতে পারে না-এতোই বোঝা তাদের মাথায়!

 

৩.

যদি আজকালকার কথা বলি তাহলে অবস্থা আরও ভয়াবহ। প্রতি ৫/৭টা বাসার মধ্যে একটা বাসায় একটা করে কিন্ডারগার্টেন বা মাদ্রাসা আছে। আমি ঢাকা শহরের কথা বলছি, কিন্তু অন্যান্য শহর বা মফস্বলি এরিয়াগুলোতেও একই অবস্থা। এই প্রতিটা স্কুল একে অপরের সাথে পাল্লা দেয়; কার কারিকুলাম কতখানি পাওয়ারফুল! আর জীবন বেরিয়ে যেতে থাকে বাচ্চাগুলোর! তাদের রঙ্গিন সহজ শৈশব আটকে যাচ্ছে বইয়ের বোঝা, এক্সামের প্যারা আর মানসিক প্রেশারে!

সমস্যা আরও আছে। এত এত স্কুল হওয়ায় এখন এইসব কেজি স্কুলগুলোর শিক্ষার মান নিচে নামতে নামতে পাতালে চলে গেছে। এই স্কুলগুলোতে যারা পড়ান তাদের প্রপার শিক্ষা ও ট্রেইনিং দুইটারই অভাব। স্যালারি এখানে নামমাত্র, তাই তার ফলাফলও ভয়াবহ।

আর এক্সামের তো ছড়াছড়ি! তিনটা মেইন টার্ম পরীক্ষা, তিনটা মডেল টেস্ট, তাছাড়া ক্লাসটেস্ট ব্লা ব্লা তে এই ছোট্ট বাচ্চাদের দম আসে যায়! 

আমি বলছি এভারেজ স্কুলগুলোর কথা। আর যেগুলো বাকি আছে সেগুলোতে পড়ার চাপ কম হতে পারে, কিন্তু খরচ সাধারণের হাতের বাইরে।

কাহিনি এখানেই শেষ নয়। এই এভারেজ স্কুলগুলোর পরিবেশের মানও ভয়াবহ। কোনরকম কোন একটা বাসার নিচতলা বা যেকোনতলা ভাড়া নিয়েই খোলা হয় স্কুলগুলো। ছোট্ট ছোট্ট রুম; না তাতে আছে প্রপার আলো, না আছে ভেন্টিলেশন সিস্টেম!  স্কুল মাঠের কথা বলা মানে আকাশ কুসুম চাওয়া! দিনেই লাইট জ্বালিয়ে ক্লাস চলছে, কারন তাছাড়া ভেতরে গাঢ় অন্ধকার। ফ্যানগুলোর করুণ দশা। প্রচণ্ড গরমে তারা ঘেমে ভিজে ক্লাস করে যাচ্ছে! দু-তিনদিন পরপর হয়ে পড়ছে অসুস্থ! কার দায়? কর্তৃপক্ষ? সেটা আসলে কী? দেখেছে কেউ কখনও?

 

৪. 

এবার আসি আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ টপিকে। এই শিক্ষাব্যবস্থা আমাদের বাচ্চাদের জন্য কতখানি ক্ষতিকর? 

বিজ্ঞান বলছে, একটা শিশুকে ৬ বছরের আগে কোনভাবেই প্রথাগত পড়াশোনায় যেতে দেওয়া ঠিক না। কেন? হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির এক গবেষণা বলছে, ৬ এর কমবয়সী শিশুর ব্রেইনের প্রি-ফ্রন্টাল করটেক্স প্রপারলি ডেভেলপড না। এই অংশের কাজ হচ্ছে মনোযোগ ধরে রাখা, লজিক্যালি ভাবা, এবং ইমোশন কন্ট্রোল করা। আন্ডারডেভেলপড হবার কারণে যখনই এখানে প্রেশার দিয়ে কিছু ঢোকানো হয় তখনই তা বাচ্চার ব্রেইনে স্ট্রেস তৈরি করে। তার মানে আমরা কন্টিনিয়াসলি আমাদের বাবুদের সাথে এই কাজটাই করছি!

WHO বলছে, অল্প বয়সে কঠিন নিয়মকানুন, হোমওয়ার্ক বা এক্সাম শিশুর শরীরে স্ট্রেস হরমোন কর্টিসলের লেভেল বাড়িয়ে দেয়। এটা ধীরে ধীরে  শিশুর ইমিউন সিস্টেম দুর্বল করে দেয় এবং ভবিষ্যতে ডিপ্রেশন ও এংজাইটির ঝুঁকি বাড়ায়।

৫-৬ বছর বয়সের আগে হাতের আঙুলের ছোট পেশি ও হাড় পুরোপুরি শক্ত হয় না। এর আগে পেন্সিল ধরে লেখালিখি করালে হাতের নেচারাল বৃদ্ধিতে সমস্যা হতে পারে।  একটানা কাছের বস্তুর দিকে (বই বা খাতা) তাকিয়ে থাকলে বাবুদের চোখে মাইওপিয়া বা দূরদৃষ্টির প্রবলেম হতে পারে। কখনো খেয়াল করে দেখেছেন আজকাল কত কত বাচ্চার চোখে চশমা?

ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় দেখা গেছে, খুব ভোরে স্কুলে পাঠানো শিশুদের পরবর্তীতে পড়ার প্রতি অনীহা তৈরি হয়। এদিকে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা ৫ বা ৬ বছরের পরে প্রথাগত স্কুলে পড়াশোনা শুরু করেছে, পরবর্তীতে তারা কম বয়সে পড়া শুরু করা বাবুদের চেয়ে বেশি ভালো ফলাফল করছে।

 

৫.

কিন্তু এত কিছু জানার পরেও কি প্রবলেম সলভ হয়? আমরা বন্দি আমাদের সমাজের কাছে। সমাজের আর দশটা বাচ্চা যে বয়সে স্কুলে যাচ্ছে, আমার বাচ্চা সেই বয়সে স্কুলে না গেলে পিছিয়ে পড়বে। পরে তাকে স্কুলে ভর্তি করলে সে অন্যান্যদের সাথে পেরে উঠবে না ব্লা ব্লা নানা চিন্তা আমাদের প্যারেন্টাল মেন্টালিটিকে প্রেশার দেয়। 

একটা সময় ছিল যখন বাচ্চারা ৬/৭ বছরে, ইভেন আরো পরে স্কুলে যেত। তখনকার সময়ের একটা পজিটিভ দিক ছিল যে বাবুর সোশিয়ালাইজিংটা হত ফ্যামিলি আর আশেপাশেই। জয়েন্ট ফ্যামিলিতে বাবুটা বাবা-মায়ের সাথে সাথে দাদা-দাদু, চাচা-ফুপু আর আরো কিছু বাচ্চাদের সাথে মিলেমিশেই বড় হত। তাছাড়া নেইবারহুডের একটা বিষয় ছিল। পাড়া-প্রতিবেশীরাও ছিল ফ্যামিলির এক্সপ্যান্ডেড ভার্সন। তাদের সাথে মিশে তাদের বাচ্চাদের সাথে খেলেই সোশিয়ালাইজিং কমপ্লিট হয়ে যেত।

কিন্তু এখনকার নিউক্লিয়ার ফ্যামিলিগুলোতে বাচ্চারা প্যারেন্টস ছাড়া আর কাউকে পায় না। নেইবারদের সাথেও এখন মেলামেশাও নেই বললেই চলে। তাই আমাদের বাচ্চারা এখন শুধুই ঘরবন্দি আর স্ক্রিনে আসক্ত! বাচ্চাদের নিজেদের জগৎ তৈরির জন্য অন্য বাচ্চাদের সাথে মেশাটা জরুরি। সো, প্রি-স্কুলিং ইজ আ মাস্ট। কিন্তু তাই বলে প্রি-স্কুলিং এর নামে পড়াশোনার টর্চার করাটা কি লজিক্যাল?

আমাদের মনে রাখতে হবে এই বাবুরাই আমাদের ভবিষ্যতের ধারক। ওরাই আমাদের এগিয়ে নিয়ে যাবে সামনের দিকে। আবার একই রকম ভাবে আমাদের কাজও হচ্ছে তাদের হাত ধরে সহজে সামনে এগিয়ে দেয়া। একদম ছোটবেলা থেকে প্রেশার দিয়ে পড়াশোনা করানো তার ভবিষ্যতের জন্য পজিটিভ না হয়ে নেগেটিভও হয়ে যেতে পারে! বাচ্চাদের সহজ রিলাক্সিং জীবন দরকার। প্রেশার তাদের জন্য না।

আমরাও আমাদের বাচ্চাদের জন্য ঐসব বেস্ট শিক্ষাব্যবস্থার মত শিক্ষাব্যবস্থা চাই। আমরাও চাই আমাদের সন্তানেরা সহজে, প্রকৃতির সাথে, আনন্দ নিয়ে জ্ঞান গ্রহণ করুক আর সহজ জীবনের পথে এগিয়ে যাক।

 

১৫ পঠিত ০ ... ৮ ঘন্টা ১৩ মিনিট আগে

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top ​