১
দুনিয়াটা যে গোল—এই সত্যটা ভূগোল বইয়ের পাতায় লেখা থাকলেও শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন কাউন্টারে পৌঁছালে সেটা বদলে চ্যাপ্টা এবং কিছুটা অদ্ভুত রকমের তিকোনা হয়ে যায়। রিফা তামান্না, সোহানি ইসলাম সমাপ্তি এবং নাজনীন—তিনজন প্রাপ্তবয়স্ক, শিক্ষিত এবং আইনসম্মতভাবে স্বাধীন নারী হয়তো ভেবেছিলেন পৃথিবীর মানচিত্রে নেপাল নামের রাষ্ট্রটি এশিয়ার ভেতরেই অবস্থিত এবং সেখানে যাওয়ার জন্য বৈধ পাসপোর্ট, এন্ট্রি পারমিশন আর বিমানের টিকিটই যথেষ্ট। তারা ভুলে গিয়েছিলেন, সাধারণ মানুষের জন্য যা ভ্রমণ নথি, আমাদের দেশের প্রশাসনিক মেজাজের কাছে তা কেবলই কিছু কাটাকুটি কাগজ। আসল পাসপোর্ট নাকি লুকিয়ে থাকে মানুষের বৈবাহিক অবস্থার ভেতর, আর আসল ভিসা দেয় কোন এক অদৃশ্য অলিখিত সামাজিক সনাতন স্বত্ব!
তিনজন প্রাপ্তবয়স্ক নারী একসঙ্গে ঘুরতে যাচ্ছেন—এই দৃশ্যটি সম্ভবত ইমিগ্রেশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের কাছে কোনো ভৌগোলিক যাত্রার চেয়েও বড় কোনো মহাজাগতিক বিস্ময় বা মারাত্মক অনাকাঙ্ক্ষিত সামাজিক বিপর্যয় বলে মনে হয়েছিল। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা আর মানবপাচার রোধের মহৎ দায়িত্ব যাদের কাঁধে, তারা মুহূর্তের মধ্যে নিজেদের রাষ্ট্রীয় আমলা থেকে উন্নীত করে ফেললেন পাড়ার মোড়ের সর্বজ্ঞ, সচিন্তিত প্রবীণ মুরুব্বির পদে। নথিপত্রের সিল-ছাপ ঠিক আছে কি না তা দেখার বদলে তাদের দৃষ্টি গিয়ে আটকে গেল এক বিষম আর দুর্বোধ্য প্রশ্নে—এরা তিনজনই অবিবাহিত কেন?
যে দেশে একজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ একা, জোড়ায় বা দলবেঁধে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে যাওয়ার সময় ইমিগ্রেশনে দাঁড়িয়ে নিজের কপালে বিবাহিত বা সংসারী সিল মেরে প্রমাণ দিতে বাধ্য হন না, সেই একই দেশে তিন নারীর পাসপোর্টের পাতা উল্টাতে গিয়ে প্রশাসন যেন হঠাৎ নৈতিকতার এক গভীর মহাসমুদ্রে হাবুডুবু খেতে শুরু করল। শুরু হলো জেরা—বাসায় জানে? বিয়ে করেননি কেন? অভিভাবক কোথায়? যেন বিমানটি কাঠমান্ডুর উদ্দেশ্যে না উড়ে কোনো গভীর সামাজিক অনাচারের দিকে ডানা মেলতে যাচ্ছে, আর রাষ্ট্র দাঁড়িয়েছে সেই অনাচার থেকে তাদের উদ্ধার করতে! পাসপোর্ট আর টিকিটের শক্তিকে এক ফুঁয়ে উড়িয়ে দিয়ে কর্তৃপক্ষ স্মরণ করিয়ে দিল—কাগজে-কলমে আপনি নাগরিক হতে পারেন, কিন্তু বিমানবন্দর পার হতে গেলে আগে প্রামাণ্য পারিবারিক অভিভাবকত্ব আর বৈবাহিক ছাড়পত্র দাখিল করতে হবে। নাগরিকের ভ্রমণ-অধিকার তখন কাউন্টারের ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা কোনো কর্মকর্তার ব্যক্তিগত সংস্কার আর লিঙ্গভিত্তিক অমূলক সন্দেহের কাছে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হলো।
২
যখন আইন, নিয়ম আর কমন সেন্স হেরে যায়—তখন ময়দানে নেমে আসে পারিবারিক ফোনালাপ। ইমিগ্রেশন কর্মকর্তারা যখন দেখলেন তিন নারীর অপরাধ নেহাত হালকা নয়—তারা অবিবাহিত এবং নেপালযাত্রী, তখন তারা তাদের হাতে এক অভাবনীয় আধুনিক প্রতিষেধক তুলে দিলেন: বাসায় ফোন দিন। ধরা যাক, একজন নাগরিক পাসপোর্ট আর ভিসার মতো রাষ্ট্রস্বীকৃত চূড়ান্ত ছাড়পত্র সাথে নিয়ে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দাঁড়িয়ে আছেন, কিন্তু রাষ্ট্র বলছে—না, এসব কাগজের মূল্য নগণ্য, তুমি আগে প্রমাণ করো তোমার বাসার ড্রয়িংরুমে বসে কেউ তোমার বিদেশযাত্রার কথা জেনে চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছে কি না! আইন যেন তখন আর বাংলাদেশ গেজেট বা সংবিধানে নেই, আটকে গেছে কোনো গৃহপ্রধানের সম্মতিসূচক কিংবা দ্বিধাগ্রস্ত টেলিফোনিক বার্তার মধ্যে।
তিন বান্ধবী ভদ্রভাবে পুলিশের আদেশ শিরোধার্য করলেন, বাসায় ফোন দিলেন, অভিভাবক রূপী স্বজনরা অপর প্রান্ত থেকে প্রমিত ও সুস্পষ্ট কণ্ঠে জানিয়ে দিলেন—হ্যাঁ, আমরা জানি এবং এতে আমাদের বিন্দুমাত্র আপত্তি নেই। আপাতদৃষ্টে নাটকের শুভ সমাপ্তি ঘটার কথা ছিল সেখানেই। কিন্তু ইমিগ্রেশনের নৈতিক পুলিশেরা তো আর কেবল উত্তর শোনার জন্য প্রশ্ন করেননি! তারা প্রশ্ন তুলেছিলেন একটা চিরন্তন পিতৃতান্ত্রিক সংশয় থেকে। ফলে অভিভাবকের সম্মতিও কর্তৃপক্ষের সেই স্বঘোষিত ও দুর্ভেদ্য আমলাতান্ত্রিক সন্দেহের বরফ গলাতে পারল না। টেলিফোন কথা বলল, সত্য যাচাই হলো, কিন্তু সবুজ বাতির বদলে জ্বলে রইল সেই রক্তচক্ষু লাল নির্দেশ।
কারণটা খুব সরল এবং সমানভাবে করুণ। আমাদের ইমিগ্রেশন ব্যবস্থার বড় একটা অংশ ধরে নিয়েছে, নারীদের একক বা যৌথভাবে পথচলা কোনো স্বাভাবিক নাগরিক অধিকারের চর্চা হতে পারে না; তার পেছনে নিশ্চিত কোনো রহস্য, ভুল সিদ্ধান্ত অথবা পারিবারিক অনিয়মের গন্ধ জড়িয়ে আছে। তাই অভিভাবকের টেলিফোনিক স্বীকৃতি পাওয়ার পরও কাউন্টারের মেজাজ বদলাল না। বিমান উড়ে গেল কাঠমান্ডুর দিকে, আর তিন নাগরিক দাঁড়িয়ে রইলেন টার্মিনালের মেঝেতে—হাতে অকেজো বোর্ডিং পারমিটের স্বপ্ন আর পকেটে বিমানে ওঠার বদলে বাড়ি ফেরার চরম অপমানজনক ফেরত টিকিট নিয়ে। রাষ্ট্র এখানে কেবল ভ্রমণেই বাধা দিল না, খুব নিঃশব্দে জানিয়ে দিল—পাসপোর্টে গণপ্রজাতন্ত্রী লেখা থাকলেও কিছু নাগরিকের ব্যক্তিস্বাধীনতা আসলে ব্যক্তিগত মেজাজ আর বৈষম্যমূলক লিঙ্গীয় মনস্তত্ত্বের কাছে কতখানি অসহায়!
৩
অন্যায়ের পর সব সাধারণ মানুষই ভাবে, দেশের একটা তো প্রশাসনিক কাঠামো আছে, একজোড়া উচ্চপদস্থ কর্তাব্যক্তি আছেন, যাদের টেবিলগুলো বড় এবং চেয়ারগুলো মসৃণ। তিন বান্ধবীও সম্ভবত সেই শিশুসুলভ ভুলটিই করেছিলেন। তারা ভাবলেন, বিমানবন্দরে যা ঘটে গেছে, তা হয়তো ইমিগ্রেশনের কোনো অতি-উৎসাহী অধস্তনের ব্যক্তিগত বিচারবুদ্ধির অভাব কিংবা ক্ষণিকের ভুল বোঝাবুঝি। সুতরাং, অভিযোগ জানাও! ইমিগ্রেশন শাখার সর্বোচ্চ দফতরে চিঠি পৌঁছাল—হিসেব সাফ: এই অন্যায় আটকানোর নিরপেক্ষ তদন্ত হোক, সিসিটিভি ফুটেজে ধরে রাখা পুলিশি কারসাজির সত্যতা যাচাই হোক, গাফিলতি করা কর্মকর্তাদের কান ধরে একটু আইনি শিক্ষা দেওয়া হোক, আর ওই যে পকেটের গাঁটের টাকা খসিয়ে কেনা বিমানের টিকিট ও নেপালের হোটেল বুকিংয়ের টাকা—তার ক্ষতিপূরণ মেটানো হোক।
কিন্তু আমরা যে মহাদেশে বাস করি, সেখানে সাধারণ নাগরিকের লিখিত অভিযোগের ভাগ্য সাধারণত কোনো লোহার ফাইলের নিচে ধুলো জমে নিশ্চুপে জীবনাবসান ঘটাতে ভালোবাসে। অতিরিক্ত আইজিপির দফতর যেন হঠাৎ গভীর এক ধ্যানমগ্নতায় ডুবে গেল। তাদের কাছে দেশের একজন প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের বিদেশযাত্রার অধিকারের চেয়ে সম্ভবত দুপুরের চা-শিঙাড়ার আড্ডা আর ফাইল চাপা দেওয়ার ধ্রুপদি চর্চা অনেক বেশি জরুরি ও জাতীয় গুরুত্বসম্পন্ন মনে হয়েছিল। অভিযোগ জমা পড়ল, দিন পেরুল, বাতাস বইল—কিন্তু আমলাতন্ত্রের সেই বিশাল সিংহদুয়ার থেকে কোনো টু শব্দটিও নির্গত হলো না।
যখন প্রশাসনিক আবেদন কোনো এক জাদুকরী নীরবতার চাদরে ঢাকা পড়ে গেল, তখন আইনজীবীর হাত ধরে পাঠানো হলো আইনি নোটিশ। কিন্তু আমাদের পুলিশি শাসন আর আমলাতান্ত্রিক অহংবোধ আইনি নোটিশকে একটা রুটিনজাতীয় সাদা কাগজ ছাড়া আর কিছু মনে করে না। নোটিশ পাঠালে আইনত একটা জবাব দিতে হয়—এই ন্যূনতম ভদ্রতা ও বাধ্যবাধকতার কথা তারা হয়তো রাষ্ট্রবিজ্ঞানের কোনো ছেঁড়া পাতায় পড়ে ভুলেই মেরে দিয়েছিল। উত্তর এল না। নাগরিকের ক্ষতি হলো, অপমান হলো, বাকস্বাধীনতা ও চলাফেরা অবরুদ্ধ হলো—কিন্তু দরজার ওপারে বসা রাষ্ট্রযন্ত্র এমন এক নির্বিকার ভঙ্গিতে বসে রইল, যেন তিন নারীর স্বপ্ন ও ভ্রমণের ইচ্ছাকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়াটা তাদের কোনো প্রাত্যহিক দাপ্তরিক দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে!
৪
যখন সমস্ত দরজাই আমলাতন্ত্রের অহংকার আর বধিরতায় বন্ধ হয়ে গেল, তখন শেষ আশ্রয় হিসেবে আদালতের বারান্দাতেই কড়া নাড়তে হলো। হাইকোর্টে রিট আবেদন গড়ালে বিচারপতিদের এজলাসে যেন হঠাৎ সমাজের আসল চেহারাটা এক নির্মম আয়নার মুখোমুখি এসে দাঁড়াল। যে তিন নারীকে বিমানবন্দর থেকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছিল তাদের অভিভাবকহীনতা আর অবিবাহিত থাকার অপরাধে, আদালত সেই একই রাষ্ট্রযন্ত্রের মুখপাত্রের কাছে কঠিন প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন—আইনের কোন ধারা, কোন বিধান বা কোন মহাজাগতিক যুক্তিতে একজন প্রাপ্তবয়স্ক, সক্ষম স্বাধীন নারীর বিদেশযাত্রাকে স্রেফ তার বৈবাহিক অবস্থা আর লিঙ্গ দিয়ে বিচার করা হয়? এই মধ্যযুগীয় বাধা দান কেন সরাসরি আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না?
আদালত কেবল রুল জারি করেই থামেননি; যেন পুরো ব্যবস্থার গালে একটা মৃদু কিন্তু স্পষ্ট থাপ্পড় কষিয়ে অতিরিক্ত আইজিপিকে সাত দিনের মধ্যে সেই চেপে রাখা অভিযোগ নিষ্পত্তির আদেশ দিলেন এবং ভবিষ্যতের জন্য পরিষ্কার বার্তা পাঠালেন—আইনি ভিত্তি ছাড়া কোনো নারীকে এভাবে লিঙ্গভিত্তিক ছুতানাতায় থামিয়ে রাখা যাবে না। আদালতের এই পদক্ষেপ নিশ্চিতভাবেই স্বস্তির, তবে একই সাথে অত্যন্ত লজ্জাজনকও বটে। কারণ, সংবিধানের ৩৬ অনুচ্ছেদে লেখা চলাচলের মৌলিক অধিকারটুকু আদায়ের জন্য একজন নাগরিককে যদি শেষ পর্যন্ত দেশের সর্বোচ্চ আদালতের কাঠগড়ায় গিয়ে দাঁড়াতে হয়, তবে বুঝতে হবে মাঝপথের পুরো প্রশাসনটাই কোনো গভীর পচন আর পিতৃতান্ত্রিক ব্যাধিতে আক্রান্ত।
আজ আদালতের রুলের জবাবে পুলিশ কিংবা প্রশাসন হয়তো কোনো একটা মাপা, কূটনৈতিক আইনি ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়ে পার পাওয়ার চেষ্টা করবে। কিন্তু ইতিহাসের খাতায় আর সামাজিক দলিলে এই সত্যটা চট করে মুছে ফেলা যাবে না। বিমানবন্দর থেকে আদালতের এজলাস পর্যন্ত এই দীর্ঘ যাত্রা কেবল তিন নারীর ব্যক্তিগত বিমান টিকিট বা হোটেল বুকিংয়ের টাকা হারানোর গল্প নয়; এটি আসলে এ দেশের সেই অগণিত স্বাধীন নারীদের অদৃশ্য রক্তক্ষরণের গল্প, যাদের ক্ষমতার অলিন্দে বসে থাকা কিছু নৈতিক চৌকিদার প্রতিনিয়ত মনে করিয়ে দিতে চায়—স্বতন্ত্র নাগরিক হওয়ার আগে তোমার আসল পরিচয় তুমি কার মেয়ে, কার স্ত্রী, আর তোমার অভিভাবক কে!



পাঠকের মন্তব্য