দিওয়ান-ই-শামস ই তাবরিজি: বই তো রুমির, কবিতা কার?

৬৭ পঠিত ০ ... ১১ ঘন্টা ৩১ মিনিট আগে

১.

সন্ধ্যা হয় হয় করছে। তুরস্কের কোনিয়া বা রুম। বাজারের এক কোনে কামারের দোকান। লোহার সেখানে বসে হাতুড়ির বাড়ি দিচ্ছে! ঠক-ঠকাঠক-ঠক! একই তালে বাড়ি পড়ছে, তৈরি হচ্ছে নতুন কিছু।

একজন মানুষ, বিশাল তার পাগড়ি- চোখেমুখে এক খোঁজ, এক অসহায়ত্ব! হনহন করে চলতে চলতেই এখানে এসে থমকে গেলেন যেন। একটু চুপ করে দাড়িয়ে থেকে একহাত ওপরে তুলে, আরেক হাত নিচে ছেড়ে দিয়ে যেন এক রিদমে ঘুরতে শুরু করলেন। আশেপাশের সবাই থেমে গেল। কারও চোখে দেখা গেল বিস্ময়, কারও চোখে বিরক্তি! কোনিয়ার রাস্তায় ঘুরে ঘুরে ‘সামা’ নেচে চলেছেন এক এক্স মুফতি, এক কবি, এক প্রেমিক। মওলানা জালালুদ্দিন রুমি! 

 

২.

অন্ধকার এক ঘর। চোখ বন্ধ করে বসে আছেন কবি। ঘরের অন্ধকারের সাথে মিলেমিশে এক হয়ে যাচ্ছে তার চোখের জল। আজকাল যেন শুকনো চোখে থাকতেই পারেন না রুমি। তার যে সব হারিয়ে গেছে! 

বন্ধ চোখের পাতায় ভেসে যাচ্ছে কতকিছু! মুফতি জালালুদ্দিন রুমি যাচ্ছেন রয়াল অফিসে। আশেপাশে তার ছাত্র-শিষ্য। হঠাৎ এলেন তিনি। এক অগোছালো দরবেশ। ঘুরে ঘুরেই বেড়ান তিনি। জ্ঞানের খোঁজে। শামস-ই-তাবরিজি! তারই প্রশ্নে আগাগোড়া ধাক্কা খেলো রুমির আটত্রিশ বছরের শিক্ষা-সাধনা! মাথা ঘুরে গেলো তার!

শামস তাকে হাতে ধরে শেখালেন- বইয়ের পাতা থেকে বেরিয়ে কীভাবে দুনিয়ার প্রতিটা ধূলিকণায় পরম স্রষ্টার সৌন্দর্যকে দেখতে হয়। থিওরি না, প্রাক্টিক্যাল ফিলিংয়েই পাওয়া যায় তাকে। নিয়ম না, ভালোবাসা-ই তাকে পাবার উপায়!

রুমি ভালোবাসলেন। এতদিনের কঠিন নিয়ম মানা মন তার নতুন করে প্রেমের রসে ডুবল! গুরু শামসের মতে মিলে গেল তার মত। শামস হয়ে গেলেন রুমির সোলমেইট! তাকে ছাড়া একমুহুর্ত কাটে না রুমির! 

কিন্তু এই চেইঞ্জ বাকিরা মানবে কেন? তারা চোখের সামনে তাদের স্কলার মুফতিকে কবি হয়ে যেতে দেখে যেন পাগল হয়ে গেল! তাবরিজিকে সরাতে হবে যেকোন উপায়ে! সব শেষ করে দিলো বুড়ো ভামটা!

তাদের যন্ত্রনায় তাবরিজি নিজেই একদিন চলে গেলেন। কিন্তু বুমেরাং হয়ে গেল! পাগল হয়ে গেলেন যেন রুমি! সারাক্ষণ কাঁদেন, কবিতা বাধেন। রাতে কোনিয়ার অলিতে-গলিতে খুঁজে বেড়ান শামসকে, চিৎকার করে শামসের নাম ধরে ডাকেন! বাধ্য হয়ে তার শিষ্যরা ফিরিয়ে নিয়ে আসলো তাব্রিজিকে। শান্ত হলেন রুমি!

 

৩.

এ কেমন সম্পর্ক ছিল গুরু-শিষ্যের? সেপারেশন সহ্য হয় না কেন সেখানে?

সুফি দর্শনে বিশ্বাস করা হয়- স্রষ্টা বা পরম সত্যকে সরাসরি খালি চোখে দেখা যায় না, তাকে দেখতে হয় কোনো পূর্ণাঙ্গ মানুষ বা 'আরিফ'-এর মনের আয়নায়।

রুমির কাছে শামস কেবল একজন সাধারণ বন্ধু বা শিক্ষক নয়; শামস ছিলেন এক 'আয়না'। যাতে রুমি দেখেছিলেন তার স্রষ্টার রূপ। সুফিদের মতে, ঈশ্বরকে  জানার ও পাওয়ার একমাত্র উপায় হলো 'প্রেম'। শামসের কথায় তিনি পেয়েছিলেন নিজের হিসাবের মিল। তার মধ্যে তিনি দেখেছিলেন নিজের বিশ্বাস, নিজের আত্মাকে। এর মধ্যেই তিনি খুঁজেছিলেন আল্লাহকে। 

 

৪.

শামস ফিরে আসায় কিছুদিন শান্ত হয়ে রইলেন রুমি। আবারও মিস্টিসিজমে মন দিলেন। কিন্তু ভাগ্য তাকে নিয়ে যাবে আরও বড় হবার রাস্তায়। সেখানে শান্তির সুযোগ কই?

আরেকবার রুমির কাছ থেকে হারালেন তার সোলমেইট! এক রাতের আঁধারে মিশে গেলেন যেন তাব্রিজি! আর ফিরলেন না। আবার পাগল হয়ে গেলেন রুমি। কাঁদেন, হাঁটেন, খোঁজেন তার মুরশিদ তাবরিজিকে। দু' দুবার দামেস্কে গিয়ে খালি হাতে ফিরলেন রুমি!

দিনরাত যেন এক হয়ে গেল তার। দামেস্কে থেকে ফেরার পর একদিন এক গভীর রাতে রুমির মনে এক অলৌকিক ফিলিং এলো। তিনি বুঝতে পারলেন, তিনি ভুল জায়গায় শামসকে খুঁজছেন।

রুমি নিজের বুকের ওপর হাত রেখে কেঁদে উঠলেন, আমি যাকে বাইরে খুঁজে বেড়াচ্ছি, সে তো অন্য কেউ নয়! সে তো আমারই ভেতরে এসে মিশে গেছে। আমিই শামস, আর শামসই আমি!

বাইরের শামস হারিয়ে গেলেও রুমির ভেতরের 'শামস' নতুন করে জেগে উঠলেন। বিরহ আর হাহাকার বদলে গেল এক পরম আধ্যাত্মিক উন্মাদনায়।

 

৫.

শামসের সাথে সেপারেশনই রুমিকে আগুনে পুড়িয়ে যেন নতুন করে তৈরি করল।  তার ভেতর থেকে কাব্যের ঝরনাধারা বের হতে শুরু করল। রুমি যখন কোনিয়ার বাজারে হাঁটতেন, কামারের দোকানে হাতুড়ির ঠুকঠাক শব্দ বা আটার কলের ঘুরন্ত চাকার ছন্দ শুনলেই তিনি সুফি নৃত্য 'সামা'  শুরু করে দিতেন। এক পায়ে চক্কর দিয়ে ঘুরতে ঘুরতে তিনি মুখে মুখে ফার্সি ভাষায় গজল বলতেন।

তার শিষ্য এবং ফলোয়াররা চারপাশে খাতা-কলম নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকত। রুমি ঘুরতে ঘুরতে যে তুলনাহীন লাইনগুলোর ডিক্টেশন দিতেন, শিষ্যেরা তা সাথে সাথে লিখে রাখত। এভাবেই বছরের পর বছর ধরে হাজার হাজার লাইনের জন্ম হতে থাকে। লেখা হয় ‘দিওয়ান-ই-শামস-ই-তাবরিজি’!

দিওয়ান-ই শামস'-এর সবচেয়ে সুন্দর এবং ইন্টারেসটিং দিক হলো এর রচয়িতার নাম। রুমি এই বইয়ে লিখেছিলেন প্রায় ৪০,০০০ লাইন! প্রায় ৩,৫০০টি গজল। বেশিরভাগ লাইনের শেষেই নিজের নাম লেখেননি রুমি। লিখেছেন 'শামস-ই তাবরিজি'!

ভক্তরা যখন জিজ্ঞেস করত, হুজুর, কবিতা লিখছেন আপনি, অথচ নাম দিচ্ছেন শামসের, কেন?

রুমি উত্তর দিতেন, এই কবিতা তো জালালউদ্দিনের নয়। এই বিচ্ছেদ আর প্রেমের আগুন শামস জ্বালিয়েছে, তাই এই কণ্ঠ ও শব্দও তাঁরই।

দিওয়ান-ই শামস-ই তাবরিজি আসলে স্পিরিচুয়াল ভালোবাসায় ডুবে থাকা এক শিষ্যের হাহাকার ও উল্লাসের ছবি। এতে একদিকে যেমন আছে প্রিয়তমকে হারানোর কঠিন যন্ত্রণা, অন্যদিকে রয়েছে ঈশ্বরের সাথে এক হয়ে যাওয়ার পরম আনন্দ।

বিশ্বসাহিত্যে আজ পর্যন্ত কোনো মানুষের স্মরণে এত বড়, এত তীব্র এবং এত গভীর প্রেমের কাব্যগ্রন্থ দ্বিতীয়টি রচিত হয়নি।

৬৭ পঠিত ০ ... ১১ ঘন্টা ৩১ মিনিট আগে

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top ​