রাত তখন প্রায় তিনটা। পুরো স্প্রিংফিল্ড শহর নিঝুম। রাস্তার বাতিগুলো জ্বলছে, কিন্তু রাস্তায় কোনো মানুষ নেই। শুধু একটা বাড়ির জানালা দিয়ে নীলচে টেলিভিশনের আলো বেরিয়ে আসছে।ভেতরে হোমার সিম্পসন সোফায় লুটিয়ে পড়ে আছে। ওর এক হাতে ডোনাট, অন্য হাতে টিভির রিমোট। টেলিভিশনে খবর দেখছে। পৃথিবীর কোথাও যুদ্ধ চলছে, কোথাও নির্বাচন, কোথাও শেয়ারবাজারে ধস নেমেছে। হোমারের তাতে বিশেষ আগ্রহ নেই। সে ডোনাটে কামড় বসায়। ঠিক তখনই টিভির পর্দায় ভেসে ওঠে ভবিষ্যতের একটা দৃশ্য।
লিসা সিম্পসন—চুলে মুক্তার মালা জড়িয়ে, গায়ে প্রেসিডেন্টের পোশাকে—হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে বসে আছেন। ওর সামনে দেশের অর্থনৈতিক সংকটের ফাইল। লিসা বলছেন, তার পূর্বসূরি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দেশের জন্য ভয়াবহ বাজেট ঘাটতি রেখে গেছেন। The Simpsons কার্টুনের এই দৃশ্যটি তৈরি হয়েছিল ২০০০ সালে। তখন ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নন। প্রেসিডেন্ট হওয়ার সম্ভাবনাও তখনকার মূলধারার আমেরিকান রাজনীতিতে খুব একটা গুরুত্ব পাওয়ার মতো ছিলো না।
এর ঠিক ষোল বছর পরে, ২০১৬ সালে, ট্রাম্প সত্যিই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হলেন।
তারপরই শুরু হল কাণ্ড। ইন্টারনেটে পুরোনো সেই দৃশ্যের ছবি ছড়িয়ে পড়ল। কেউ বলল, সিম্পসনরা ভবিষ্যৎ জানত। কেউ বলল, লেখকদের কাছে নিশ্চয়ই কোনো গোপন তথ্য ছিল। কেউ আবার আরও এক ধাপ এগিয়ে বলল—এই কার্টুনে পৃথিবীর ভবিষ্যৎ লুকিয়ে আছে। সত্যিই কি তাই? নাকি রহস্যটা আরও সাধারণ? হয়তো সিম্পসনরা ভবিষ্যৎ দেখতে পায় না। তারা শুধু বর্তমান পৃথিবীটাকে খুব মন দিয়ে দেখে। আর সেই কাজটা তারা করে আসছে প্রায় চার দশক ধরে। কার্টুনের এই হলুদ পরিবারের পেছনের মানুষগুলো কারা? আমরা পর্দায় হোমার, মার্জ, বার্ট, লিসা আর ম্যাগিকে দেখি। কিন্তু এই পরিবারের সদাহাস্যজ্বল পৃথিবীটা তৈরি হয় পর্দার আড়ালে বসে থাকা একদল লেখকের হাতে।
The Simpsons–এর স্রষ্টা ম্যাট গ্রোনিং। এর সঙ্গে শুরু থেকেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল প্রযোজক ও নির্মাতা জেমস এল. ব্রুকস এবং লেখক স্যাম সাইমনের। প্রথম যুগে লেখকদের দলে ছিলেন আল জিন, মাইক রেইস, জর্জ মেয়ার, জন সোয়ার্টজওয়েলডার, জন ভিটি, জেফ মার্টিন, কনান ও'ব্রায়েনসহ অনেকে। কনান ও'ব্রায়েন পরে টেলিভিশনের বিখ্যাত প্রেজেন্টার হয়েছেন। কিন্তু তাঁর ক্যারিয়ারের একসময় তিনি বসে বসে হোমার সিম্পসনের মুখে কথা বসাতেন।
এই দলটির আসল শক্তি কোনো একজন লেখকের প্রতিভা ছিলো না। আসল শক্তি, একসঙ্গে বসে পৃথিবীকে হাস্যকরভাবে দেখার ক্ষমতা। এদের একটা গল্প কীভাবে তৈরি হয়? সিম্পসনের লেখার ঘরে (Writer's Room) কোনো একজন লেখক বসে পুরো গল্প লিখে ফেলেন না।
প্রথমে আসে একটা ধারণা। যেটা হতে পারে এক লাইনের কোনো Pitch - যা আসতে পারে চলমান কোনো সংবাদ থেকে। কখনো রাজনীতি থেকে। কখনো বিজ্ঞান বা প্রযুক্তি থেকে। কখনো স্রেফ মানুষের অদ্ভুত আচরণ দেখে।
ধরা যাক, একজন লেখক খবরের কাগজে পড়লেন—একটি বড় কোম্পানি অন্য ছোট কোম্পানিগুলোকে কিনতে চাইছে। কর্পোরেট মনোপলি যাকে বলে। তিনি বললেন, একদিন হয়তো সব কোম্পানিই একটা কোম্পানির একক মালিকানায় চলে যাবে। আরেকজন বললেন, তাহলে সেই কোম্পানির মালিক কে? তৃতীয়জন হয়তো বললেন, ডিজনি।
সবাই হাসল।
সেখান থেকে একটা দৃশ্য কল্পনা করা হলো। তারপর লেখা তৈরি হলো। তারপর সবাই মিলে পড়ে দেখলেন। যেখানে হাসি আসছে না, সেটা বাদ দিলেন। যেখানে হাসি আসছে, সেটাকে আরও ধারালো করা হলো। তারপর আবার লেখো। আবার পড়ো। আবার কাটাছেঁড়া করো।
ম্যাট গ্রোনিং ও আল জিনের বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে এই দীর্ঘ দলগত লেখার প্রক্রিয়ার কথা। একটি পর্বের গল্প তৈরি থেকে চূড়ান্ত রূপ পাওয়া পর্যন্ত বহুবার পরিবর্তন হয়। পর্দায় দেখানো একটা কৌতুকের পেছনে সেই কৌতুকের চেয়েও বহুগুণ বেশি পরিশ্রম থাকে। তাহলে তারা কি ভবিষ্যৎ নিয়ে গবেষণা করেন? না—অন্তত সেই অর্থে নয়, যেভাবে ভবিষ্যৎবক্তারা করেন। তাদের বড় গবেষণাগার হলো চারপাশের পৃথিবী। সংবাদপত্র। টেলিভিশন। রাজনীতি। ব্যবসা।বিজ্ঞান। প্রযুক্তি। জনপ্রিয় সংস্কৃতি।
আর সবচেয়ে বড় বিষয়—মানুষের স্বভাব। কারণ প্রযুক্তি বদলায়, কিন্তু মানুষের কিছু আচরণ প্রায় একই থাকে। ক্ষমতা পেলে ক্ষমতা আরও বাড়াতে ইচ্ছে করে। টাকা পেলে আরও টাকা চায়। খ্যাতি পেলে আরও বেশি করে ক্যামেরায় মুখ দেখায়।
রাজনীতিবিদ নির্বাচনের আগে একরকম কথা বলেন, পরে আরেকরকম। বড় প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের স্বার্থকে জনস্বার্থের ভাষায় বলতে ভালোবাসে। সিম্পসনের লেখকেরা এই পরিচিত আচরণগুলোকেই আরেকটু বাড়িয়ে দেন। আর সেখানেই অনেক সময় ভবিষ্যৎ এসে তাদের সঙ্গে মিলে যায়।
ট্রাম্পের কাহিনিটা কি আসলেই ছিল? হ্যাঁ, ছিল। ২০০০ সালের Bart to the Future–পর্বের ঘটনাটি তাই এত বিখ্যাত। সেখানে ভবিষ্যতের প্রেসিডেন্ট লিসা বলছেন, আমার আগের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দেশের অর্থনীতিতে বড় সংকট রেখে গেছেন। তখন এটা ছিল পলিটিক্যাল স্যাটায়ার।
সেই এপিসোডে ট্রাম্পের নাম অবশ্য একেবারে আকাশ থেকে আসেনি। ২০০০ সালেই তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে ভাবছিলেন। কিন্তু একজন ব্যবসায়ী ও টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব একদিন সত্যিই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হবেন—এটা তখন এমন একটি ধারণা ছিল যা দিয়ে চমৎকার কৌতুক করা যায়। সিম্পসনের লেখক ড্যান গ্রেনি পরে জানিয়েছেন, ট্রাম্পকে ব্যবহার করে তারা আমেরিকার সম্ভাব্য এক চরম রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে ব্যঙ্গ করতে চেয়েছিলেন। ব্যঙ্গটা এতটাই বাড়াবাড়ি ছিল যে ইতিহাস পরে এসে সেটাকে বাস্তব করে দিল।
ইন্টারনেটে ট্রাম্পকে নিয়ে যে হোমার সিম্পসনের যেই বিখ্যাত এস্কেলেটর সিঁড়ি দিয়ে নামার দৃশ্য দেখা যায়, সেটি ২০০০ সালের নয়। ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে নামার পর ২০১৫ সালে সিম্পসনের পক্ষ থেকে আলাদাভাবে তৈরি করা হয়েছিল। অর্থাৎ সিম্পসনকে ঘিরে যত ভবিষ্যদ্বাণীর গল্প আছে, তার সবগুলো সত্যি নয়।
ফক্সকে ডিজনি কিনে ফেলবে—এটা আগে থেকে জানলো কীভাবে?
১৯৯৮ সালের একটি পর্বে ২০th Century Fox-এর বিল্ডিংয়ের গায়ে দেখা যায়—প্রতিষ্ঠানটি ওয়াল্ট ডিজনি কোম্পানির অংশ। অথচ সেই সময় ফক্স আর ডিজনি আলাদা প্রতিষ্ঠান। এর প্রায় দুই দশক পরে ডিজনি ফক্সের বড় অংশ কিনে নেয়।
তখন পুরোনো প্রশ্ন আবার সামনে আসে, আবারও ভবিষ্যদ্বাণী! কিন্তু একজন ব্যঙ্গকারের চোখ দিয়ে দেখলে ঘটনাটা এত রহস্যময় নয়। হলিউডে অনেক বড় প্রতিষ্ঠানই ছোট প্রতিষ্ঠানকে কিনছে প্রতিদিন—এটা নতুন কোনো প্রবণতা ছিল না। লেখকেরা সেই প্রবণতাকে একেবারে শেষ সীমায় নিয়ে গিয়ে কৌতুক করেছিলেন। তারপর রিয়্যালিটি সেই কৌতুকের এতটা কাছাকাছি চলে এল যে, বাস্তব ঘটনা পরে সেই কৌতুকটাকে অস্বস্তিকর করে ফেলল।
আন্তর্জাতিক ফুটবল সংস্থা, ফিফাকে নিয়েও সিম্পসনরা ব্যঙ্গ করেছে। পরে ফিফাকে ঘিরে দুর্নীতির তদন্ত, অভিযোগ ও গ্রেপ্তারের ঘটনা বিশ্বজুড়ে বড় খবর হয়। এখানেও একই প্রশ্ন। সিম্পসনরা কি জানত? নাকি লেখকেরা জানতেন—যেখানে প্রচুর অর্থ, ক্ষমতা এবং অস্বচ্ছতা আছে, সেখানে কেলেঙ্কারি অসম্ভব নয়? দ্বিতীয় ব্যাখ্যাটা অনেক বেশি বাস্তব। ভালো স্যাটায়ারিস্ট রা ভবিষ্যৎ জানেন না। তারা মানুষের পুরোনো অভ্যাসগুলো চিনতে পারেন।
সিম্পসনের পুরোনো পর্বগুলোতে কবজিতে পরা কমিউনিকেশন ডিভাইস, ভিডিও কল, নানা ধরনের ভবিষ্যৎ প্রযুক্তির ছবি দেখা গেছে, যা আজকের স্মার্টওয়াচ ও ভিডিও কলের কথা মনে করিয়ে দেয়। কিন্তু এখানেও রহস্যের চেয়ে পর্যবেক্ষণটাই বড় হয়ে যায়। বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তিবিদরা বহু আগেই এসব সম্ভাবনার কথা বলছিলেন। সিম্পসনের লেখকেরা হয়তো সেই সম্ভাবনাকে নিয়ে মানুষের আচরণ কল্পনা করেছেন। আর মানুষ প্রযুক্তি পাওয়ার পর সত্যিই অদ্ভুত আচরণ করেছে।
এই জায়গায় সিম্পসনদের একটা বিশেষ ক্ষমতা আছে। তারা যন্ত্রের ভবিষ্যৎ যতটা বোঝে, মানুষ যন্ত্র নিয়ে কী করবে—সেটা তার চেয়েও ভালো বোঝে। তাহলে এত কিছু মিলে যায় কেন? কারণ সিম্পসনের পর্বের সংখ্যা বিপুল। দশকের পর দশক ধরে লেখা হয়েছে হাজার হাজার স্যাটায়ার এপিসোড। রাজনীতি থেকে বিজ্ঞান, খেলাধুলা থেকে ব্যবসা—কিছুই বাদ যায়নি। এর মধ্যে কিছু ঘটনা ভবিষ্যতের সঙ্গে মিলে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু মানুষের স্মৃতিরও একটা অদ্ভুত স্বভাব আছে। যে একশটা কৌতুক সত্যি হলো না, সেগুলো কেউ মনে রাখে না। কিন্তু যেটা মিলে গেল, সেটার খবর দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে।
তারপর শিরোনাম হয়—সিম্পসনরা আবারও ভবিষ্যৎ বলে দিল! সিম্পসনের লেখকদের কোনো গোপন ভবিষ্যৎ-দর্শনের যন্ত্র থাকার প্রমাণ নেই। তাদের আছে খবর পড়ার অভ্যাস, চারপাশ দেখার চোখ এবং মানুষের দুর্বলতা নিয়ে নির্মম রসবোধ।
তারা বর্তমানের একটা ছোটো ট্রেন্ডকে লুফে নেয়। তারপর সেটাকে বাড়িয়ে দেয়। তারপর তার মধ্যে ঢুকিয়ে দেয় হোমারকে। হোমার ভুল করে। বার্ট দুষ্টুমি করে। লিসা যুক্তি দেখায়। মার্জ সংসার সামলায়। আর বাকী পৃথিবী নিজের গতিতে এগিয়ে যায়। কখনো কখনো সেই পৃথিবী গিয়ে দাঁড়ায় পুরোনো কার্টুনের দৃশ্যের সামনে। তখন আমরা চমকে উঠি। মনে হয়, ওরা বুঝি আগে থেকেই জানত। বা হয়তো জানত না।
হয়তো তারা শুধু মানুষের স্বভাবটা এত ভালো করে চিনেছিল যে ভবিষ্যৎকে আলাদা করে চেনার দরকারই হয়নি।
প্রেসিডেন্ট বদলাবে। কোম্পানি বদলাবে। প্রযুক্তি বদলাবে। কিন্তু মানুষের লোভ, অহংকার, ক্ষমতার ক্ষুধা আর হাস্যকর ভুলগুলো থেকে যাবে। সিম্পসনদের ভবিষ্যৎবাণীর সবচেয়ে বড় রহস্য তাই ভবিষ্যৎ নয়। রহস্য হলো—তিন দশক পরেও পৃথিবী কেন এতটা The Simpsons এর সিচুয়েশনাল কমেডির মতোই রয়ে গেল।



পাঠকের মন্তব্য