৯ লাখ টাকায় মেহেদীর জীবনের দাম মিটে গেল?

১৫২ পঠিত ০ ... ১০ ঘন্টা ৬ মিনিট আগে

 

মেহেদী হাসান কনস্ট্রাকশন কোম্পানিতে কাজ করতেন। বারিধারায়। খুব পশ এলাকার, যেখানে প্যান্ট পরে রিকশা চালাতে হয়!

মেহেদী শ্রবণ ও বাক্‌প্রতিবন্ধী। মানে কথা বলতে পারতেন না, কানেও শুনতে পেতেন না। তো কানে না শুনলেও মানুষের ভুখা লাগে। পেটে খাবার দিতে হয়।

তাই ঢাকায় এসেছিলেন পেট চালাতে। না, ২৪ বছর বয়সী বাকি তরুণদের মতো লুটপাটে মন দেন নাই। কনস্ট্রাকশন সাইটে কাজ করতেন। কাজের ফাঁকে ফুটপাতে বসে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন।

বিমান বাহিনীর পাইলটের কিশোর ছেলে শরীফ, ওর ইচ্ছা হয়েছে তাই প্রচণ্ড গতিতে এসে ফুটপাতে গাড়ি তুলে দিয়েছে। মেহেদী হাসান তার অভুক্ত পেট নিয়ে সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন। স্পট ডেড।

লোকজন এসে এই দুজনকে ধরে পুলিশে দিয়েছে। মানে শরীফ আর পাশে থাকা তাদের ড্রাইভার। কিন্তু পুলিশ এজাহারে লিখেছে, গাড়ি চালাচ্ছিল মূলত শরীফের বাবার অফিসের ড্রাইভার আকাশ মারক। সেখানে শরীফ নামের কারও নামগন্ধও নেই!

লোকজন আপত্তি জানানোর পর পুলিশ ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ দেখল। পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে, এক্সিডেন্টের পর গাড়ির ড্রাইভারের আসন থেকে বেরিয়ে আসছে বড়লোকের বখে যাওয়া কিশোর পুত্র শরীফ। এরপর পুলিশ শরীফকে আটক করেছে!

এসব ঘটেছে ৩৬ ঘণ্টা আগে!

কিন্তু মালদার পার্টির ছেলে ৩৬ ঘণ্টা আটক ছিল জেলে, এ অনেক বেশি না? খুব কষ্ট হলো না বলুন?

আসামি যেহেতু শিশু, তাকে আজ সকালে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে হাজির করার পর জানা গেল, ঘটনাটা মিটমাট হয়ে গেছে। ফিনিশ। খাতাম। টাটা...

আসামির আইনজীবী জানালো, মিটমাটের জন্য মেহেদী হাসানের পরিবারকে ৯ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। টাকা এর মধ্যে পরিশোধও করে দেওয়া হয়েছে।

এরপর আদালতে আসামির আইনজীবী, যার নাম আলমগীর, সে জানিয়েছে বেশ অবাক করা তথ্য।

চলেন, তার মুখে শুনি -

”যে ছেলেটা, উনি ছিলেন বাক্‌প্রতিবন্ধী। উনি কানেও শুনতেন না এবং কথাও বলতে পারতেন না। আর যে অ্যাক্সিডেন্টটা হয়েছে, অ্যাক্সিডেন্ট হওয়ার পরে ওরাও কোনো আপত্তি করেনি, তাদের কোনো অভিযোগ নেই। আমাদেরও কোনো অভিযোগ নেই। আমরা উভয়ে মিলেমিশে, ওদের মা-বাবা বুড়ো, তাদের দেখাশোনার ভারের জন্য মধ্যস্থতার মাধ্যমে ৯ লাখ টাকা ওদের হিসাব করে দিয়ে দিয়েছি। আপসনামায় সই করে দিয়ে গেছে। এই মামলায় আসামি যদি জামিন পায়, খালাস পায়, তাহলে কোনো আপত্তি নেই।”

তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, এই আপসনামাটা কে করেছে? এই অ্যাক্সিডেন্টটা তো ড্রাইভারের, উনি তো আন্ডারএজ?

”আন্ডারএজ গাড়ি চালিয়েছে? না, না, সে গাড়ি চালায়নি। গাড়ি যখন উল্টে গেছে, তখন সে ওইদিক দিয়ে বের হয়েছে।”

আমি জানি না আদালত সিসিটিভি ফুটেজ দেখেছে কিনা, এই আইনজীবীকে পাল্টা কোনো প্রশ্ন করেছে কি না।

কিন্তু বাঞ্চোত আইনজীবী, শুয়োরের বাচ্চা মনে করতেছে যে বাক্‌প্রতিবন্ধী, তার বাঁচার কোনো রাইট নাই। সে বলতে চাইতেছে, যেহেতু কানে শোনে না, ফলে মরার দায় ওই মেহেদী হাসানের। কিন্তু মাদারফাকারকে কেউ মনে করিয়ে দেন যে, মেহেদী ফুটপাতে বসে ছিল শুয়োরের বাচ্চা। রাস্তার মাঝখান দিয়া হাঁটে নাই। তার মক্কেল ওই ফুটপাতে গাড়ি তুলে দিয়ে মেহেদীকে হত্যা করছে।

স্যরি ফর মাই ল্যাংগুয়েজ।

কিন্তু আমার শুধু জলি এলএলবির কথা মনে পড়ছে। ওই যে প্রথমটা।

ফুটপাতে গাড়ি চাপা দিয়ে মেরে ফেলা নির্মাণ শ্রমিকদের কথা। বখে যাওয়া বড়লোকের পুত্রটির দাদা বলেছিল, কয়েকজন ছোট লোক শ্রমিকের জন্য আমার বংশের একমাত্র প্রদীপ তো নিভে যেতে পারে না।

কিশোর শরীফ দেখছে, তার বড়লোক বাবা আছে। মা আছে, যার নামে এই গাড়ি রেজিস্ট্রেশন করা। যারা সব করতে পারে। দিনকে রাত। যাদের কাছে আস্ত একটা মানুষের জীবনের দাম ৯ লাখ টাকা।

শরীফ বড় হবে। নিউ জার্সিতে বসে বন্ধুদের সাথে তার একদিনের কথোপকথন অ্যাক্টিভিস্ট ইরফান শেখের লেখা থেকে দেই-

"ভাই আর কইস না! আমি তো ডিরেক্ট এক কামলার উপ্রে গাড়ি উঠায়া দিসিলাম। শালায় লগে লগে স্পট ডেড। আমার তো ভাই বিচি মিচি কান্ধে! হাহাহাহা।"

"সিরিয়াসলি? ডেড্ড?"

"হ সিরিয়াস! তুই গুগোল কর। আমার গাড়ির নাম্বার প্লেটের ফুটেজসহ পাবি। দেখ খালি।"

"ড্যাম! ভাই আসলেই। করসস কী! কাম্লার উপ্রে ডিরেক্ট ল্যান্ডিং! তুই তো একটা মাল!"

নিউ জার্সির বাসিন্দা আক্কাস আলী কুদ্দুছের একমাত্র কন্যা সিলভিয়া সামিনের এই গল্প শুনে ছেলেটাকে একটু একটু ভালো লাগবে! ছেলের রিজ আছে।

এই ৯ লাখ টাকার কিছু অংশ দিয়ে মেহেদী হাসানের বৃদ্ধ বাবা-মা নিশ্চয় কুলখানির আয়োজন করবে। ছেলের আত্মার মাগফেরাতের জন্য।

সেই কুলখানিতে গরুর বুকের হাড্ডি কামড়াতে কামড়াতে গ্রামের লোকজন রান্নার প্রশংসা করবে।

মেহেদীর বড় বড় চোখ! চশমার ভেতর থেকে হাসি হাসি মুখ করে মানুষের রূঢ়তার দিকে তাকিয়ে থাকবে! সেদিন মেহেদী হাসানের অভুক্ত পেট ভরবে কিনা কে জানে!

ওর অতৃপ্ত আত্মা নিশ্চয়ই হাহাকার করবে এই বলে যে, সাক্ষী দেওয়ার মতো একজন সদাকান্ত মিশ্রও এই পৃথিবীতে অবশিষ্ট নাই? জলি এলএলবির মতো উকিল এখন আর হয় না বুঝি?

সব পাওয়ারকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানোর মতো জাস্টিস সুন্দরলাল ত্রিপাঠী বোধহয় এই দেশে আর জন্ম নেয় না!

তাহলে কি আর করা।

১৫২ পঠিত ০ ... ১০ ঘন্টা ৬ মিনিট আগে

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top ​