আস-সালাতু খাইরুম মিনান-নাউম

পঠিত ... ১ ঘন্টা ৪৩ মিনিট আগে

বিশ্বের সবচেয়ে দামি বস্তু কোনটা? সোনা? হিরে? শেয়ারবাজারের ইনডেক্স? না। সকাল সাড়ে পাঁচটায় নরম তোশকের ওপরে হালকা-পাতলা চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে থাকা মানুষের কাছে দুনিয়ার সবচেয়ে মূল্যবান এবং স্বর্গীয় বস্তুটার নাম হলো; আর পাঁচ মিনিট।

ঠিক ওই সময়টাতেই এক সুর এসে বাতাসের আরামটাকে চুরমার করে দেয়; আস-সালাতু খাইরুম মিনান-নাউম!

ঘুমের চেয়ে নামাজ ভালো!

যে লোকটা সারারাত মশার সঙ্গে যুদ্ধ করে শেষ রাতের দিকে একটু চোখ বুজেছিল, তার যুক্তিবাদী মন তৎক্ষণাৎ বিদ্রোহ করে ওঠার কথা। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, আজ থেকে ১৪০০ বছর আগেও মানুষ এই ভোরেই উঠত, আজও উঠছে, আর আগামীতেও উঠবে। কোনো অদৃশ্য টানে লাখ লাখ মানুষ কাঁথা ঠেলে উঠে দাঁড়ায়। ঈশ্বর আছেন কি নেই, তিনি মহাবিশ্বের কোনো কোণে বসে আমাদের সিজদা গুনছেন কি না; সেসব জটিল তর্ক সরিয়ে রেখে যদি ঠান্ডা মাথায় ভাবেন, তাহলে এই ভোরবেলা জেগে ওঠার ইতিহাসটা কিন্তু বেশ চমৎকার।

গল্পের শুরুটা মরুর দেশে। তখন ঘড়ি ছিল না, অ্যালার্ম টোন ছিল না। মানুষের সময় মাপার একটাই স্কেল, সূর্য। আলো ফুটছে ফুটছে, রাতের কালচে ভাবটা কেটে গিয়ে দিগন্তে একটা ফিনফিনে সাদা আলোর রেখা দেখা যাচ্ছে, যাকে বলা হয় সুবহে সাদিক। ঠিক এই আলো-আঁধারির সন্ধিক্ষণে মানুষের চেতনার সঙ্গে ব্রহ্মাণ্ডের একটা অদ্ভুত লেনদেন ঘটে।

ইতিহাস বলছে, মক্কার এক পর্বতগুহায় বসে এক লোক যখন ধ্যান করতেন, তখনও এই ভোরের নিস্তব্ধতাই ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় সঙ্গী। পরে যখন ইসলামের সূচনা হলো, তখন পাঁচ ওয়াক্ত প্রার্থনার ছক আঁকা হলো। রাতের গহ্বর থেকে দিন যখন জন্ম নিচ্ছে, ঠিক সেই মুহূর্তটাকেই বেছে নেওয়া হলো দিনের প্রথম হাজিরা জানানোর জন্য।

মিরাজের ঘটনায় পাওয়া যায়, প্রথমে নাকি নামাজ ছিল পঞ্চাশ ওয়াক্ত। হিসাবটা ভেবে দেখুন! দিনে চব্বিশ ঘণ্টা, তার মানে প্রতি আধা ঘণ্টায় একবার করে হাত-মুখ ধুয়ে দাঁড়াতে হতো। মানুষের আলসেমির কথা বিবেচনা করে কাটছাঁট হতে হতে সেটা এসে ঠেকল পাঁচে। আর তার ঠিক মাথার ওপর বসে রইল ভোরের এই দুই রাকাত।

কিন্তু ব্যাপার হলো অন্য জায়গায়। পরবর্তী সময়ে যখন দুপুরের, বিকালের কিংবা রাতের প্রার্থনার পরিধি বাড়িয়ে দুই থেকে চার রাকাত করা হলো, তখন এই ভোরের ওপর কোনো হাত দেওয়া হলো না। একে রাখা হলো সেই আদি রূপেই; সংক্ষিপ্ত, মাত্র দুই রাকাত। কারণ? সহজ হিসাব। সূর্য ওঠার আগে মানুষের আলসেমি আর ভোরের স্নিগ্ধতা; দুটোকেই মান দিতে চেয়েছিল এই প্রাচীন ব্যবস্থা। বড় কোনো দীর্ঘ জটিলতা নয়, খালি দুটো সিজদা, আর নীরবতার মধ্যে সুর করে কিছু পঙক্তি ও বাণী উচ্চারণ।

যে জামানায় বিদ্যুৎ ছিল না, কোলাহল ছিল না, সেই যুগে ভোরের ওই নীরবতায় লম্বা সুরে যখন কেউ মন্দ্রকণ্ঠে কিছু আবৃত্তি করত, তখন প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্কটা অন্য মাত্রা পেত।

তবে আসল গল্প তো শুধু নিয়মাবলিতে আটকে নেই। আসল গল্প হলো মনস্তত্ত্বে। মানুষ কেন নিজের সবচেয়ে প্রিয় জিনিস, অর্থাৎ ঘুমকে বিসর্জন দিতে রাজি হলো?

মানুষ জাতি স্বভাবতই একটু সুবিধাবাদী। লাভ না দেখলে সে কম্বল ছেড়ে ঠান্ডা পানিতে মুখ ধুতে যায় না। তাহলে এই ভোরের বন্দোবস্তের ভেতরের মনস্তত্ত্বটা কী?

ধর্মের লেন্সটা যদি একপাশে সরিয়ে রেখে কেবল সমাজবিজ্ঞান দিয়ে দেখেন, তবে দেখবেন, মানুষ আসলে সব সময় একজন মহাজাগতিক গার্ডিয়ানের খোঁজে থাকে। যে মানুষটা সূর্য ওঠার আগে বিছানা ছাড়ছে, তার মনস্তত্ত্বে একটা প্রচ্ছন্ন অহংকার আর একটা গভীর সমর্পণের অদ্ভুত কেমিস্ট্রি তৈরি হয়। ভোর পাঁচটায় আপনি যখন পৃথিবীর ৯৫ ভাগ মানুষকে ঘুমিয়ে থাকতে দেখছেন, আর আপনি নিজে জেগে উঠে হাত-মুখ ধুয়ে নিচ্ছেন, ঠিক তখনই আপনার অবচেতন মন আপনাকে একটা সাইকোলজিক্যাল সুবিধা পাইয়ে দেয়। মনে হয়, আমি তো অন্যদের চেয়ে একধাপ এগিয়ে গেলাম!

ঠিক এই জায়গাটাতেই আদিম যুগের সেই লাইনটা মাস্টারস্ট্রোক হিসেবে কাজ করে, আস-সালাতু খাইরুম মিনান-নাউম।

আজকে আমরা শতশত টাকার অ্যালার্ম ক্লক কিংবা স্মার্টফোনের কর্কশ টোন শুনে চমকে উঠি, মেজাজ খারাপ করি। কিন্তু আজ থেকে তেরো-চৌদ্দশ বছর আগে, যখন মরুর বুকে বাতাস থামত, তখন বিলাল নামের এক সাবেক দাসের গলার আওয়াজ পুরো মরুশহরে ছড়িয়ে পড়ত। সেটা কোনো ওয়ার্নিং বেল ছিল না, ছিল এক ধরনের আহ্বান। বলা ভালো, ঘুমের লোভের বিরুদ্ধে মানুষের ইচ্ছাশক্তির একটা প্রতিদিনের যুদ্ধ।

মজার বিষয় হলো, ইসলামের ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ফজরের এই পর্বটাকেই সবচেয়ে খাঁটি পরীক্ষার জায়গা বানানো হয়েছিল। কারণ দ্বিপ্রহরের আড্ডা ভেঙে কিংবা সন্ধ্যার অলস সময় কাটাতে প্রার্থনায় বসা যতটা সহজ, শেষ রাতের ওই চরম আরামের ঘুম ভেঙে ওঠা তার চেয়ে হাজার গুণ কঠিন। প্রাচীন টেক্সটগুলোতেও তাই সাফসাফ লেখা হলো, ভোরের এই নামাজটা হলো সবচেয়ে কঠিন। আর যে এটা উতরে গেল, সে সারাদিনের জন্য এক অদৃশ্য নিরাপত্তার ভেতর ঢুকে পড়ল।

বিজ্ঞান বা আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানও অবশ্য এখন ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে একই কথা বলছে। ভোরের বাতাস, মেলাটোনিন হরমোনের খেলা আর স্নায়ুর নিস্তব্ধতা। সব মিলিয়ে সূর্য ওঠার আগের এই সময়টুকু মানবদেহের জন্য এক অলৌকিক ফুয়েল স্টেশনের মতো। প্রাচীনকালের ওই কাঠামোটা হয়তো আধুনিক মেডিক্যাল টার্মগুলো জানত না, কিন্তু তারা মানুষের শরীরের বায়োলজিক্যাল ক্লকটাকে ঠিক চিনেছিল।

ফজরের ইতিহাস তাই কেবল কয়েকটি আরবি পঙক্তি বা দুটো সিজদার ইতিহাস নয়। এটা মূলত মানুষের নিজের অলসতার বিরুদ্ধে, পরম আরামের বিরুদ্ধে প্রতিদিন সকালে বিজয়ী হওয়ার এক সুপ্রাচীন বার্ষিক কিংবা বলা ভালো, দৈনিক মহড়া।

আজও পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে, যখন শহরের ট্রাফিক লাইটগুলো ঝিমায়, ক্যাফেগুলোর ঝাঁপ বন্ধ থাকে, ঠিক তখনই কোনো এক মিনারের স্পিকার ঘেঁষে একটা দীর্ঘশ্বাস আর সুরের বাতাস ভেসে আসে। মানুষ কাঁথা ঠেলে ওঠে। ঈশ্বর আছেন কি নেই, সেই তর্কে না গিয়েও বলা যায়, মানবজাতির এই ঘুম ভাঙার দৃশ্যটা কিন্তু দেখার মতোই এক ট্র্যাডিশন।

পঠিত ... ১ ঘন্টা ৪৩ মিনিট আগে

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top