দেওয়ালভাঙার গান ও এক অসমাপ্ত গল্প

৪২ পঠিত ... ১৬ ঘন্টা ১২ মিনিট আগে

হিন্দুদের বাসা ভাড়া না দেয়া, হিন্দু শিশুদের খেলতে না নেয়ার মতো কিছু ঘটনা চোখে পড়েছে। এটা অনেক বড় মনস্তাত্বিক রোগ। সমাজ থেকে এ রোগ নির্মূল না করলে; সমাজ কখনোই পুরোপুরি বসবাসের উপযোগী হবে না।

এই যে বাংলাদেশ; এখানে সুলতানি, মুঘল ও নবাবী আমলে হিন্দুদের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ছিলো। বৃটিশ আমলের ডিভাইড এন্ড রুল পলিসি অনুযায়ী হিন্দু-মুসলমান কৃত্রিম বিভাজন তৈরি করে; ঘৃণা ও বিদ্বেষের নীল চাষবাস করা হয়।

মানুষের সঙ্গে মানুষের আসল পার্থক্য অর্থবিত্তে; শ্রেণী আসলে দুটি; ধনী ও দরিদ্র; এই বাস্তবতা লুকাতেই শাসক গোষ্ঠীর হিন্দু-মুসলমানের কৃত্রিম বিভাজনটি তৈরি করে রেখেছে।

যেসব রাষ্ট্র এই ধর্ম-গোত্রের কাল্পনিক বিভাজন অগ্রাহ্য করে ধনী-দরিদ্রের আসল বিভাজন কমাতে কাজ করেছে; সেগুলোই কল্যাণ রাষ্ট্র হয়েছে।

একটু মনে করে দেখুন, ইন্ডিয়ার শিক্ষা-শিল্প-সাহিত্য-বিজ্ঞান গবেষণা নিয়ে গোটা বিশ্বে সুনাম ছড়িয়ে পড়েছিলো। কিন্তু ২০১৪ সাল থেকে ইন্ডিয়ায় যখন থেকে মুসলমানদের বাসাভাড়া দেয়া বন্ধ হলো, মুসলমান শিশুদের খেলতে নেয়া বন্ধ হলো; ধনী-দরিদ্রের পার্থক্যে ধুঁকতে থাকা ইন্ডিয়ার প্রধান বৈষম্য হিসেবে হাজির হলো হিন্দু-মুসলমান কৃত্রিম বিভাজন; ঠিক তখন থেকেই ইন্ডিয়ার দুর্নাম ছড়িয়ে পড়লো সারাবিশ্বে। স্ক্যান্ডিনেভিয়ান একটি দেশের রাজনীতিক ইন্ডিয়ানদের সাপের সঙ্গে তুলনা করতে বাধ্য হলেন।

আজকের পৃথিবী পরষ্পর এত সম্পর্কিত যে, একটি রাষ্ট্রের বৈশ্বিক ইমেজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তার অর্থনৈতিক উন্নতির জন্য। ইন্ডিয়ার রাষ্ট্র হিসেবে সুনাম ম্লান হতে শুরু করার পর থেকে এর যে ইমেজ সংকট তৈরি হয়েছে; তা এর অর্থনীতির অপূরণীয় ক্ষতি করেছে। অর্থনীতিবিদ ড মনমোহন সিং-এর অর্থনৈতিক সংস্কার ও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে যে ইন্ডিয়া অর্থনৈতিক সুপার পাওয়ার হয়ে ওঠার স্বপ্ন দেখছিলো; সেই ইন্ডিয়া আজ স্বপ্ন দেখছে কোন মসজিদের নীচে অতীতে মন্দির ছিলো। তারপর সেই মসজিদ ভাঙ্গছে। যে ইন্ডিয়া সিলিকন ভ্যালির আউটসোর্সিং-এর প্রধান গন্তব্য হয়েছিলো; সেই ইন্ডিয়া আজ গোরক্ষকদের গো মূত্র সংগ্রহের আদিম গন্তব্য হয়েছে।

চোখের সামনে একটি রাষ্ট্রের এমন বুদ্ধিবৃত্তিক ও সমাজ-রাজনৈতিক ধস দেখার পর; বাংলাদেশকে সাবধান হতে হবে। বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিকের সমান অধিকার, কে হিন্দু কে মুসলমান তা জানার কোন প্রয়োজন নেই; এই সহজ কথাটি বুঝতে না পারলে বাংলাদেশ বৈশ্বিক উন্নয়নের মূলধারায় পৌঁছাতে পারবে না।

বাংলাদেশের যে সংখ্যক হিন্দু হাসিনার ফ্যাসিস্ট শাসন সমর্থন করেছে; তার চেয়ে অনেক বেশি সংখ্যক মুসলমান নাম্নী ভারত ভর্তৃকা আজ অবধি হাসিনাকে ফেরাতে ক্যানিবাল পলিটিকস করে চলেছে।

বাংলাদেশের হিন্দু কৃষক-কারিগর-ব্যবসায়ী গভীর নিষ্ঠার সঙ্গে করে। মেহনতী মুসলমানদের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক শান্তিপূর্ণ। কারণ এদের সবাইকে কিছু করে খেতে হয়।

কর্মহীন দালালি ও বাটপারি জীবন অর্ধ শিক্ষিত সার্টিফিকেটধারী লোকেদের। তারাই হিন্দু-মুসলমান বিভেদ জিইয়ে রেখে ঘৃণা-বিদ্বেষের দোকানদারি করে চকচকে হয়ে ঘোরে। কায়িক পরিশ্রমের অভাবে তাদের ব্রেনে চর্বি জমে। আর চর্বি জমলেই তখন উস্কানিমূলক কথাবার্তা বলে স্থানীয় গদি মিডিয়ার ফটোকার্ড হয়ে ওঠে। ঢাকার প্রাচীন ঐতিহ্য নিয়ে প্রদর্শনীর রং-বেরং-এর ছবির মাঝ থেকে কেবল ঐতিহ্যবাহী পর্দাঘেরা রিকশার ছবি বেছে নিয়ে, দেশটা আফগানিস্তান হয়ে গেলো গো বলে আহাজারি করতে থাকে। এইসব স্থূল গুজব দিয়ে মুসলমান ভারত ভর্তৃকারা গত দুবছর ধরে মিডিয়া ও সোশ্যাল মিডিয়ায় আপা ফেরার স্বপ্ন জাগিয়ে রেখেছে।

পলাশীর প্রান্তরে বৃটিশ পক্ষ অবলম্বন করা মীরজাফর আর ষড়যন্ত্রকারী ঘষেটি বেগমের মতো এই মুসলমান নাম্নী ভারত ভর্তৃকারা। অযথা জগতশেঠকে টানাটানি করে লাভ নেই। দাড়ি টুপি দিয়ে তালেবানপন্থী হয়ে কারা দিল্লি-কাবুল অশুভযোগের অফ স্প্রিং হিসেবে  কনসার্ট বন্ধ করার ফতোয়া দিয়ে বৈশ্বিক পরিসরে বাংলাদেশকে জঙ্গি রাষ্ট্র হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে; সেইসব ইন্ডিয়ার ইঁদুরগুলোকে সামাজিক ও রাষ্ট্রিকভাবে প্রতিহত করতে হবে।

বাংলাদেশের হিন্দুদের সঙ্গে সবচেয়ে বড় প্রতারণা করেছে  আওয়ামী লীগ আর দিল্লির সাউথ ব্লক। আওয়ামী লীগের ফ্যাসিস্ট সরকার পুলিশ ও প্রশাসন-এর হিন্দু অফিসারদের ঘাড়ে বন্দুক রেখে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমন করে; হিন্দু-মুসলমান সম্পর্কের অবনতি ঘটিয়েছে। আবার সবচেয়ে বেশি হিন্দু সম্পত্তি দখল করেছে আওয়ামী লীগ নেতারা। দিল্লির সাউথ ব্লক কথিত 'অখণ্ড ভারত'-এর স্বপ্ন জারিত করে; বয়ান নির্মাণের কাজে লাগিয়ে দিয়েছে সহজ সরল চৈতালিদের। তাই তো রংপুরে একটি হিন্দু পরিবার নির্মমভাবে নিহত হবার ঘটনায় প্রতিবাদ সমাবেশের ব্যানারে উগ্রপন্থা (যাকে ইন্ডিয়া ইসলামের প্রতিশব্দ হিসেবে হাজির করে) বিরোধী শ্লোগান লিখে ধান ভানতে শিবের গীত গেয়ে; দশ চক্রে ভগবান ভূত প্রমাণের ক্লিশে ইন্ডিয়ান প্রোপাগান্ডার পুতুল নাচের ইতিকথা হয়েছে  আওয়ামী লীগ সন্নিবর্তী কিছু হিন্দু। কিন্তু স্থানীয় মিডিয়ায় রংপুর ট্র্যাজেডি দশটি প্রশ্ন নিয়ে হাজির হচ্ছে যে ভারত ভর্তৃকা মিডিয়ার কতিপয় মুসলমান নাম্নী 'আপা ফেরানো'-র মজদুর। এরা বীণা সিক্রি ও জয়সওয়ালের মুখে দশটি সওয়াল তুলে দিচ্ছে।

সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান সমাজে সংখ্যায় কম হিন্দুদের বাসা ভাড়া না দিলে, হিন্দু শিশুকে খেলতে না নিলে, হিন্দু নারীর দিকে লোভের চোখে তাকালে, হিন্দু দেব দেবী নিয়ে অশালীন মন্তব্য করলে, হিন্দু দেখলেই তাকে গরুর গোশত খাওয়ার প্রস্তাব দিলে, ঐ মালোয়ান বলে গালি দিলে, কথায় কথায় ভারত চলে যেতে বললে হিন্দু সমাজের মাঝে গভীর অভিমান তৈরি হয়। তখন হিন্দু ছেলেরাও মুসলমান ছেলেদের 'রাজাকার', পাকি বীর্য ডেকে, নবীজীর চরিত্র নিয়ে গল্প ফেঁদে; মোদির ভক্ত হয়ে ওঠে।

বাংলাদেশে কিছু মুসলমান পরিবারে অত্যন্ত গোঁড়া বাপ-দাদা থাকে; যারা গান শোনা হারাম বলে ফতোয়া দিয়ে ছেলেমেয়ের জীবন বিষাক্ত করে তোলে। তখন ঐ পরিবারের ছেলেমেয়ে বিদ্রোহী হয়ে ইসলামবিরোধী হয়ে যায়। অভিমানী হিন্দু দাদার সঙ্গে মিলে হিন্দুত্ববাদী প্রগতিশীলতা চর্চা করে নিজেকে অত্যন্ত আধুনিক দাবী করে। আর আওয়ামী লীগকে একমাত্র ত্রাতা হিসেবে গ্রহণ করে। এরা মুসলমান মানেই ডানপন্থী তকমা দিয়ে নিজেকে বড্ড বামপন্থী বলে দাবী করলেও বুঝতে চায়না; তালগাছপন্থী হওয়াটাই তাদের নিয়তি।

আমাদের সমাজে ব্রাহ্মণ্যবাদ ও আশরাফিয়া অত্যন্ত ক্ষতিকর একটি রোগ। বৃটিশ আমলে পূর্ব বঙ্গের সম্পন্ন কৃষক ও কারিগর দুঃস্থ হয়ে পড়লে;  চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের জমিদার বাবু হয়ে ওঠে সাফল্যের সূচক। বাংলাদেশের হিন্দুত্ববাদী প্রগতিশীলেরা সেই জমিদার বাবুর মতো সেজে ধর্ম ও সংস্কৃতি করে। আর ইসলামপন্থীরা অটোমান এম্পায়ারের বেশভূষা নিয়ে অনেক করে খেলাফত কালচার করে।

হায়রে এলিট হবার আকাংক্ষা; বাংলাদেশের লব্ধ প্রতিষ্ঠিত লোকের মতো এমন চোখ ধাঁধানো পোশাক দুনিয়ার আর কেউ পরে না। বিয়ের অনুষ্ঠানে কেউ বলিউডের সাজ পোশাকে হাজির হয়। কেউবা তুরস্কের মেরা সুলতানের সাজ পোশাকে হাজির হয়। এই যে ইমিটেশন শো; তা বাংলাদেশের স্বকীয়তা নষ্ট করে।

ছেলে-মেয়েকে ইংলিশ মিডিয়ামে পড়িয়ে, পিয়ানো বাজানো শিখিয়ে আর ইংরেজি গল্প-কবিতা লিখতে প্রলুব্ধ করে 'অনেক ঢাকা কাঁপানো হলো, এবার নিউইয়র্ক কাঁপাবো' বলে নেবে পড়েছে অনেকে। 'আমার সিনথিয়া বাংলা কইতে পারে না' এই গর্বিত উচ্চারণে ললিতা ও রাবেয়া ফেসবুকে হাজির হয় জোড়াসাঁকো ও অটোমান দুহিতার ময়ূরপুচ্ছ নিয়ে।

ইউরোপে শিল্প বিপ্লবের পরে এরকম খেলনা সমাজ তৈরি হয়েছিলো। তাদের লেখক কবিরা ব্যাঙ্গ-বিদ্রুপে জর্জরিত করে কথিত এলিট শ্রেণীকে মাটিতে নামিয়ে এনেছে। আর আমাদের লেখক-কবিও এলিট হতে চায়; ফলে প্রতিদিন সকাল বিকাল অধিকার বঞ্চিত মানুষকে নিয়ে হাসাহাসি করে 'জাতে উঠতে চায়'। আজ বুয়া কাজে আসেনি বলেই কি হাহা হাসি শেফালি-রুপালি-কল্পনা-আল্পনা'র।

বাংলাদেশের ভবিষ্যত যাত্রার পেছনে অনেক চ্যালেঞ্জ আছে। কিন্তু বিমূর্ত মানসিক রোগ, মেগালোম্যানিয়া, মিছে ধর্মীয় শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই, ব্যর্থ কালচার করার গর্ব, যতসব অপ্রয়োজনীয় বিষয় নিয়ে কলতলার ক্যাচক্যাচানিতে সময় নষ্ট হয়।

যতক্ষণ সাম্যচিন্তার চর্চা করতে না শিখছি আমরা, দেশের প্রতিটি নাগরিকের অধিকার নিশ্চিত করতে না পারছি; সমাজ ও রাষ্ট্রর ঘুরে দাঁড়ানোর সামর্থ্য ফিরে আসবে না।

ইনফেরিয়রিটি কমপ্লেক্স জাত সুপিরিয়রিটির রোগে বয়েসীরা তো পচেই গেছে; অন্তত শিশুদের রেহাই দিতে হবে। খেলার মাঠে ধনী-দরিদ্র, হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খৃস্টান ও অন্যান্য বিশ্বাসের পরিবার থেকে আসা শিশুরা যখন একসঙ্গে খেলতে পারবে; হিন্দু-মুসলমান প্রতিবেশী যেদিন সুখে-দুঃখে আত্মীয় হয়ে বাঁচতে শিখবে; কেবল সেদিনই সভ্য বাংলাদেশের উন্মেষ ঘটবে। সংঘর্ষ নয়, সংলাপেই রয়েছে সমুদয় ভুল বোঝাবুঝির সমাধান।

৪২ পঠিত ... ১৬ ঘন্টা ১২ মিনিট আগে

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top