চারপাশের সিচুয়েশন যাই হোক না কেন, একজন বর্ন রাইটারের লেখা থামবে না। তিনি লিখবেন। তার যদি ব্লক না থেকে থাকে তবে তাকে আটকানো মুশকিল। যার কথা বলছিলাম তিনি তা-ই। ফ্রাঙ্কেস্টাইনের জন্মদাত্রী! মেরি শেলী!
গল্পটা পুরোনো অনেক। প্রায় দু'শ বছর আগের। ষোল বছরের এক কিশোরী; কিন্তু মনের বয়স তার অনেক। শৈশবে মা-হারা, ভালবাসার অভাব তার চিরদিনের। কৈশোরে প্রেমে পড়লেন এক কবির! পার্সি বিসি শেলী। সেখানেও নানান ঝামেলা। কিন্তু মেরি মানলেন না কিছুই। পালিয়ে গেলেন ভালবাসার টানে। বিয়েও করলেন একদিন।
কিন্তু তবুও ভাগ্যের গোমড়া মুখ যেন সহজ হতে চায় না। মেরি মা হলেন একদিন। কিন্তু মাতৃত্ব টিকল না। মেয়েবাবুটা তার কোল খালি করে চলে গেল। কিন্তু তার অভাববোধ গেল না। মেরি প্রায়ই স্বপ্ন দেখা শুরু করলেন যে তার মেয়েটি জীবন ফিরে পেয়েছে। এই স্বপ্নটিই তাকে তৈরি করে দিল ‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইন’। নানান মানসিক চাপ তার লেখাকে এক ডিফারেন্ট ভাইব দিল। ফ্রাঙ্কেনস্টাইন হয়ে গেল বিশ্বের প্রথম সাইন্স ফিকশন!
কিন্তু মনোবিজ্ঞানীরা বললেন নিজের জীবনের অভাববোধ আর সন্তান হারানো মায়ের হাহাকার থেকে জন্ম ফ্রানকেন্সটাইনের। এটি বস্তুত মেরি শেলির সন্তান হারানোর শোক, অপরাধবোধ এবং ‘মৃতকে বাঁচিয়ে তোলার আকুতি’র এক করুণ সাহিত্যিক প্রতিফলন।
বিজ্ঞানী ভিক্টর ফ্রাঙ্কেনস্টাইন ল্যাবরেটরিতে একা একটি প্রাণ সৃষ্টি করেন (যা অনেকটা সন্তান জন্ম দেওয়ার মতো)। কিন্তু শিশুটির চেহারা হল বড় অদ্ভুত ও কদাকার। ভয় পেয়ে ভিক্টর তাকে রেখে পালিয়ে গেলেন। মেরি শেলি এখানে নিজের জীবনের গভীরতম ভয়টি ফুটিয়ে তুলেছেন, আমি কি ভালো মা হতে পারব? আমার শিশুটি যদি অস্বাভাবিক হয়, তাহলেও কি আমি তাকে ভালোবাসতে পারব?
দু'শ বছর আগে একজন মা তার দুশ্চিন্তার প্রকাশ করেছেন তার লেখায়। কিন্ত আমরা যদি আজও আমাদের চারপাশের মায়েদের দিকে তাকাই- তাদের অবস্থার কি আপগ্রেডেশন হয়েছে?
সন্তান পেটে আসা মাত্রই নারী আর সাধারণ কেউ নয় বরং ‘ত্যাগের জীবন্ত প্রতীক’। সমাজ তাঁকে শেখায়- মা হওয়া মানেই তোমাকে নিজের সব ইচ্ছা, ক্লান্তি, ঘুম আর শরীর বিলিয়ে দিতে হবে। আর এই স্যাক্রিফাইসকেই আমরা গ্লোরিফাই করি। বলি ‘মায়ের আনকন্ডিশনাল লাভ’। কিন্তু এই পজিটিভিটির আড়ালেই লুকিয়ে থাকে সবচেয়ে বড় বিষাক্ততা। শুনতে প্রশংসা মনে হলেও আসলে মায়েদের জন্য একটা টর্চারসেল হয়ে যায় এই সুগারকোটেড টক্সিসিটি!
মা-কে হতে হবে পার্ফেক্ট। তিনি সব একহাতে সামলাবেন—সংসার, সন্তান, সমাজ! তবু পান থেকে চুন খসল তো- ঐযে মা দেখে রাখেনি! সমাজ মাকে দেবীত্বের আসন দিতে গিয়ে তার মানুষ হয়ে বাঁচার অধিকারটুকু কেড়ে নেয়!
ভিক্টর ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের বানানো সেই নতুন প্রাণটি তাঁর কাছে আশ্রয় আর ভালোবাসা চাইল, তিনি ভয়ে ও ঘৃণায় পালিয়ে গেলেন। আমাদের সমাজও কিন্তু তেমনি। একজন নতুন মাকে সন্তান জন্ম দেওয়ার দায়িত্বটি বুঝিয়ে দেয়া হল তো সমাজের দায় শেষ! জন্মদানের পর একজন মা একদিকে পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশনে ভুগছেন, নতুন জীবন মেনে নিতে পারছেন না, ক্লান্তিতে ভেঙ্গে পড়ছেন,তখন আমাদের সমাজ সান্ত্বনা দেওয়ার বদলে বলছে,
মা হয়েছ, এত কান্নাকাটি কেন? পজিটিভ চিন্তা করো। মা হতে পারা তো ভাগ্যের বিষয়!
মেরি শেলি তার ডায়েরিতে লিখেছিলেন মৃত সন্তানকে আগুনে সেঁক দিয়ে আবার বাঁচিয়ে তোলার সাঁধের কথা। আমাদের দেশের মায়েরা হয়তো ডায়েরি লেখেন না, কিন্তু প্রতিদিন নিজেদের শারীরিক অসুস্থতা, ভালো না-লাগা আর বিষণ্নতাকে লুকিয়ে রেখে হাসিমুখে রান্নাঘরে ঢোকেন। কারণ তাঁদের শেখানো হয়েছে, মায়ের কখনো ক্লান্তি থাকতে নেই। মা মানেই তিনি সবসময় হাসিমুখে সন্তানদের ভালোবাসবেন।
মেরি একে একে তিনটি সন্তান হারিয়েছেন। আমাদের দেশে সন্তান মারা যাবার দোষটি ও কিন্তু মায়ের ঘাড়েই চাপানো হয়! মা সাবধানী নন!
মেরি সন্তান জন্ম, তাদের মৃত্যু- মানসিক চাপ, বিষন্নতা সবকিছু সামলেই নিজের লেখালেখি চালিয়ে গেছেন! আজকের সমাজের চেহারাও সেই দু'শ বছর পুরোনো। আজকেও একজন মাকে নিজের জন্য কিছু করার আগে সবটা সামলে নিতে হয়। জব করেন? তবুও সংসার-সন্তান আগে! এই দায়িত্বে কোন কমতি থাকা যাবে না!
আর সন্তানের ক্ষেত্রে? তার নব্বই ভাগ দায়িত্ব তো মায়েরই। যেদিন থেকে সন্তান তার পেটে আসল সেদিন থেকেই দায়িত্ব সব তার, কিন্তু সন্তান নাম পায় বাবার!
বিলিভ মি অর নট, নতুন মায়েরা প্রচন্ড শারীরিক-মানসিক প্রেসার বহন করেন। সমাজের এই মিষ্টি বিষাক্ততা তাদের জীবনকে আরও দমবন্ধ অবস্থায় ফেলে দেয়। এখন আধুনিকতার সময়- মানসিকতায় আধুনিক হয়ে আমরা নতুন মায়েদের সাপোর্ট হই। তাদের জীবনকে শুধুমাত্র কথা আর সহানুভূতি দিয়েই সহজ করতে পারি।
আজ মেরি শেলীর জন্মবার্ষিকী। তিনি নিজের কঠিন মাতৃত্বকে সাহিত্যের রঙয়ে রাঙিয়ে আমাদের সামনে ধরেছিলেন! বিশ্বের প্রথম সাইন্স ফিকশন লেখিকাকে সালাম!



পাঠকের মন্তব্য