ফিলিস্তিনি শিল্প, সংস্কৃতি আর স্বাধিকার আন্দোলনের ইতিহাসে আজ একটা বড় শূন্যতা তৈরি হলো। ৭৯ বছর বয়সে মারা গেলেন কিংবদন্তি ফিলিস্তিনি শিল্পী স্লিমান মানসুর। মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) দখলকৃত পূর্ব জেরুজালেমের আল-মাকাসেদ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
১৯৪৭ সালে রামাল্লার কাছে বিরজেইত শহরে জন্ম নেওয়া মানসুর পড়াশোনা করেন জেরুজালেমের বিখ্যাত বেজালেল একাডেমি অব আর্টস অ্যান্ড ডিজাইনে। পরে চিত্রকর, ভাস্কর, লেখক ও কার্টুনিস্ট হিসেবে কয়েক দশক ধরে ফিলিস্তিনি শিল্প ও সংস্কৃতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুখ হয়ে ওঠেন তিনি। তার কাছে ছবি আঁকা শুধু সৌন্দর্য দেখানোর বিষয় ছিল না। শিল্প ছিল ফিলিস্তিনের গল্প বলার, নিজের মাটির প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের এবং দখলদারিত্বের মধ্যেও নিজেদের পরিচয় ধরে রাখার একটা ভাষা।
স্লিমান মানসুরের বিখ্যাত চিত্রকর্ম ‘দ্য ক্যামেল অব হার্ডশিপস’—ফিলিস্তিনি মানুষের সংগ্রাম, বেঁচে থাকা আর প্রতিরোধের এক শক্তিশালী প্রতীক
১৯৭৩ সালে আঁকা তাঁর বিখ্যাত ‘দ্য ক্যামেল অব হার্ডশিপস’ ছবিটিই এর বড় উদাহরণ। ছবিতে দেখা যায়, বিশাল এক ভার কাঁধে নিয়ে নুয়ে থাকা এক বৃদ্ধ ফিলিস্তিনিকে। সেই ভারের আকৃতির ভেতরে দেখা যায় জেরুজালেমের ডোম অব দ্য রক। সময়ের সঙ্গে ছবিটি ফিলিস্তিনি জাতীয় পরিচয় ও প্রতিরোধের অন্যতম প্রতীকে পরিণত হয়।
মানসুরের শিল্পে কমলাগাছ ও কমলাবাগান ছিল ফিলিস্তিনের মাটি, কৃষিজীবন এবং হারিয়ে যাওয়া ঘরের এক শক্তিশালী প্রতীক। তার ‘অরেঞ্জ ফিল্ডস’ ছবিতে সেই কমলার মাঠের মধ্য দিয়ে ফিলিস্তিনের গ্রামীণ জীবন, উর্বর ভূমি এবং মানুষের সঙ্গে মাটির সম্পর্ককে তুলে ধরা হয়েছে। একই সঙ্গে কমলাগাছ তাঁর শিল্পে ১৯৪৮ সালের নাকবার স্মৃতিকেও মনে করিয়ে দেয়। নাকবার সময় অসংখ্য ফিলিস্তিনি নিজেদের বাড়িঘর ও জমি হারিয়ে বাস্তুচ্যুত হন। ফলে কমলার বাগান শুধু সুন্দর কোনো দৃশ্য নয়, এটি হয়ে ওঠে হারানো ঘর, ভূমি আর ফিরে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষারও প্রতীক।
স্লিমান মানসুরের ‘অরেঞ্জ ফিল্ডস’—কমলাবাগানের আড়ালে ফিলিস্তিনের মাটি, স্মৃতি আর হারিয়ে যাওয়া ঘরের গল্প
‘চিলড্রেন অব প্যালেস্টাইন’ ছবিতেও মানসুরের শিল্পের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক দেখা যায়। এখানে ফিলিস্তিনি শিশুদের মাধ্যমে তিনি একটি জাতির ভবিষ্যৎ, পরিচয় এবং শৈশবের গল্প তুলে ধরেছেন। সংঘাত আর দখলদারিত্বের মধ্যে বেড়ে ওঠা এসব শিশুর উপস্থিতি যেন মনে করিয়ে দেয়, ফিলিস্তিনের গল্প শুধু অতীতের নয়, নতুন প্রজন্মের সঙ্গেও জড়িয়ে আছে। তাঁর শিশুদের ছবিতে তাই একই সঙ্গে অসহায়ত্ব, পরিচয়ের টান এবং ভবিষ্যতের আশা, সবকিছুই ধরা পড়ে।
স্লিমান মানসুরের ‘চিলড্রেন অব প্যালেস্টাইন’—ফিলিস্তিনি শিশুদের জীবন, পরিচয়, শৈশব আর ভবিষ্যতের গল্প যেন এক ছবিতেই
মানসুরের ছবিতে শুধু যুদ্ধ বা দুঃখ ছিল না। ছিল ফিলিস্তিনি নারী, ঐতিহ্যবাহী পোশাক ও সূচিকর্ম, গ্রামীণ জীবন, জলপাইগাছ, কৃষক, শিশু; অর্থাৎ ফিলিস্তিনের মানুষ ও সংস্কৃতির প্রায় পুরো একটা জীবনই তাঁর ক্যানভাসে জায়গা পেয়েছে। শিল্পী হিসেবে নিজের কাজের পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের শিল্পী তৈরিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন মানসুর। ফিলিস্তিনের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ও আল-কুদস বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করেছেন তিনি।
দীর্ঘ কর্মজীবনে রোম প্রাইজ, ইউনেসকো পুরস্কার, নাইল অ্যাওয়ার্ড ফর আরব ক্রিয়েটরস এবং প্যালেস্টাইন প্রাইজ ফর প্লাস্টিক আর্টসসহ বিভিন্ন সম্মান পেয়েছেন।
স্লিমান মানসুরের মৃত্যু শুধু একজন শিল্পীর মৃত্যু নয়। তাঁর আঁকা ছবিগুলো ফিলিস্তিনের ইতিহাস, পরিচয়, সংস্কৃতি, বেদনা আর প্রতিরোধের একেকটি দলিল।
মানুষটা চলে গেলেন, কিন্তু তার ক্যানভাসে আঁকা ফিলিস্তিন থেকে যাবে।






পাঠকের মন্তব্য