ঋতুপর্ণ ঘোষকে সবাই চেনেন তার সিনেমার জন্য। এর পাশাপাশি তিনি কিন্তু দারুণ সব গানও লিখেছেন। তার ছন্দও ছিল সুন্দর। অপর্ণা সেনের মেয়ে ডোনার বিয়ের তত্ত্বের ডালাগুলোয় ছোটো ছোটো অনেকগুলো ছড়া লিখেছিলেন তিনি।
ঋতুপর্ণ ঘোষ মারা যাওয়ার পরে প্রখ্যাত অভিনেত্রী ও বিশিষ্ট নাগরিক অপর্ণা সেন, তার সম্পাদিত প্রথমা মাসিক পত্রিকার ১৫ জুলাই ২০১৩ সংখ্যায় প্রকাশিত আমাদের ঋতু প্রবন্ধে লিখেছেন:
আমার বড় মেয়ে ডোনার বিয়ের তত্ত্ব সাজানোর সময়ে প্রত্যেকটা ডালার উপরে ছড়া লিখে দিয়েছিল ঋতু। ডোনার শ্বশুরমশাই আর শাশুড়িমার জন্যে আমার নাম করে ছড়ায় চিঠিও লিখে দিয়েছিল। ওর হাতের লেখায় সেসব ছড়া যত্ন করে রাখা ছিল আমার দেরাজে। আজ ঋতু চলে যাওয়ার পর পাঠকদের হাতে তুলে দিলাম বাছাই করা অনবদ্য কিছু ছড়া।
eআরকির পাঠকদের জন্য রইল সেগুলো।
১.
পাল্কি ক'রে বৌ এল রে, পাড়াপড়শি কৈ?
পাল্কি ক'রে বৌ এল রে, পাড়াপড়শি কৈ?
অঙ্গে শাড়ী বালুচরী, রূপ করে থৈ থৈ।
কল্কা করা নক্সা আঁচল, জামরঙা তার খোল,
ছোট্ট রুপোর পাল্কি সাথে—সাবধানেতে তোল।
২.
তুঁতে রঙের বেনারসী, সাদা রঙের পাড়ে
তুঁতে রঙের বেনারসী, সাদা রঙের পাড়ে,
সোনার বরণ কল্কা করা—অপূর্ব বাহারে!
তিনকোণা এক রুমাল আছে, শাড়ির ভাঁজে রাখা,
সাদা সুতীর রুমাল, তার এককোণে ফুল আঁকা।
৩.
তুঁতে রঙের রাজকোট, তার গোলাপ রঙের পাড়
তুঁতে রঙের রাজকোট, তার গোলাপ রঙের পাড়,
রঙ মেলানো ব্লাউজ সাথে, কেমন চমৎকার!
টিপের পাতা সাজিয়ে দিলাম তুঁতে শাড়ীর ভাঁজে,
সারাজীবন করবে আলো দুটি ভুরুর মাঝে।
৪.
ঘিয়ে রঙা ঢাকাই শাড়ী, লাল রঙা তার পাড়
ঘিয়ে রঙা ঢাকাই শাড়ী, লাল রঙা তার পাড়।
জরির ছোঁয়ায় সাজটি যেন লক্ষ্মী প্রতিমার।
টুকটুকে লাল ব্লাউজ আছে, রং মিলিয়ে কেমন!
লক্ষ্মী সাথে আপনি এলেন মা লক্ষ্মীর বাহন।
৫.
বাদলা কাজের শিফন শাড়ী, পীচফলের রঙ
বাদলা কাজের শিফন শাড়ী, পীচফলের রঙ।
ব্লাউজ আছে পাড়বসানো, ভিন্নরকম ঢং।
সাদা রুমালটিতে কেমন গোলাপী রঙের কাজ।
সব মিলিয়ে দারুণ হবে নতুন কনের সাজ।
৬.
বেগুনী রঙের রেশম শাড়ী, সম্বলপুর থেকে
বেগুনী রঙের রেশম শাড়ী, সম্বলপুর থেকে,
টুকটুকে লাল রঙ রয়েছে, আঁচল-পাড়ে ঢেকে।
ব্লাউজ আছে, সঙ্গে আছে চুড়ির গোছা ষোল,
রং মিলিয়ে পরবে বলে সঙ্গে দেওয়া হল।
৭.
টুকটুকে রং চিকন শাড়ী পড়বে মোদের মেয়ে
টুকটুকে রং চিকন শাড়ী পড়বে মোদের মেয়ে,
গোলাপী রং ফুলে ফুলে থাকবে শরীর ছেয়ে।
সেই রঙেরই চোলি, মেয়ের রূপ করে ঝলমল,
কাঠের সিঁদুর কৌটো দিলাম, কপালে জ্বলজ্বল।
৮.
জোব্বা পরা ফ্যাশন এখন, কাফতান তার নাম
জোব্বা পরা ফ্যাশন এখন, কাফতান তার নাম,
আগাগোড়া আরশি ঢাকা তিনটে পাঠালাম।
দু'খানি তার কলমকারি রঙবাহারি কাজে,
অন্যটিতে আয়না দেওয়া, সাদা বুকের মাঝে।
৯.
হালকা সবুজ রাতপোশাকে সাদা রঙের লেস
হালকা সবুজ রাতপোশাকে সাদা রঙের লেস,
গৌরবরণ কনের দেহে স্নিগ্ধ লাগে বেশ।
সারা শরীর স্নিগ্ধ হবে লোশনে-পাউডারে,
সাবান এবং গন্ধপাতা দিলাম প্যাকেট ভ'রে।
১০.
শুভ্র লেসের কাজ করা এই রাতপোশাকটি সাদা
শুভ্র লেসের কাজ করা এই রাতপোশাকটি সাদা,
নিনা রিচির বোতল সাথে সাদা ফিতেয় বাঁধা।
জুতোজোড়া, ব্যাগটি ঘন রাতের মতো কালো,
এককোণেতে ভাঁজ করা শ্বেত রুমালটিও ভালো।
১১.
এই ডালাতে রয়েছে যত স্নানের সরঞ্জাম
এই ডালাতে রয়েছে যত স্নানের সরঞ্জাম,
তিনকোণা এক বাক্স ভরা সুগন্ধি হামাম।
নক্সা করা স্নান তোয়ালে ভিজে শরীর মোছে,
স্নানের পরে নরম দেহে বুলিও আলগোছে।
১২.
ঝকঝকে রঙ সোনার বরণ সাজের উপাচার
ঝকঝকে রঙ, সোনার বরণ সাজের উপাচার।
হাত আয়না, চিরুণি আর ব্রাশটি চমৎকার।
সাজিয়ে দেওয়া হ'ল সে সব আয়না দেওয়া ট্রেতে,
সোনার বরণ উজ্জ্বল রং ট্রের হাতলেতে।
১৩.
গা ভরা কাজ রেশমী পিরাণ, রয়েছে ডালাজুড়ে
গা ভরা কাজ রেশমী পিরাণ—রয়েছে ডালাজুড়ে,
ধুতির পাড়ে খয়েরি রঙে সোনার ডুরে ডুরে।
‘D’ লেখা শ্বেত রুমাল কাছে পিরাণ-ধুতির সাথে,
স্বর্ণজরির কাজ রয়েছে খয়েরী নাগরাতে।
১৪.
তসর রঙের পাঞ্জাবী, তার গলার কাছে কাজ
তসর রঙের পাঞ্জাবী, তার গলার কাছে কাজ।
এই না হ'লে মানায় নাকি নতুন বরের সাজ!
রঙ মেলানো নক্সা করা জহর কোটের গায়ে,
ফুলতোলা এক নাগরাজোড়া, পরবে বলে পায়ে।
১৫.
দু'টো টি-শার্ট বেনেটন, আর একটা টি-শার্ট পোলো
দু'টো টি-শার্ট বেনেটন, আর একটা টি-শার্ট পোলো,
সব মিলিয়ে দীপাঞ্জনের তিনটে টি-শার্ট হ'ল।
তিন বোতলে সাজিয়ে দিলাম পোলোর প্রসাধন,
শ্যাম্পু দিলাম, ডিওডোরেন্ট—সঙ্গেতে কোলন।
১৬.
খুকুমণি ননদিনী এই ডালাটা তারই
খুকুমণি ননদিনী, এই ডালাটা তারই,
টুকটুকে পাড় সবুজ রঙের দক্ষিণী সিল্ক শাড়ী।
শাড়ীর সাথে বাক্স ভরে বিবিধ প্রসাধনী,
মেয়েকে মোদের সুখী রেখো, দোহাই ননদিনী।
১৭.
নক্সা করা তোয়ালেটা পাতা ডালার মাঝে
নক্সা করা তোয়ালেটা পাতা ডালার মাঝে,
চুকরি ভরা প্রসাধনী লাগবে কনের সাজে।
নিনা রিচি, ক্লোয়ি—তাদের জগৎজোড়া নাম,
এসব ভেবে সাজিয়ে কনের সঙ্গে পাঠালাম।
১৮.
বেয়াই মশাই শুনেছি মোর মানুষটি গম্ভীর
বেয়াই মশাই, শুনেছি মোর মানুষটি গম্ভীর।
সহজেতে ক'ন না কথা, ভীষণই ধীর-স্থির॥
আমার নিজের অভিজ্ঞতা নয়কো তেমন মোটে।
যতবারই হয়েছে দেখা, খুব অমায়িক বটে॥
রাশভারি সেই বেয়াই আমার চিকণ হবে বলে,
সোনালী-পাড় ধাক্কা-দেওয়া চিকণ ধুতির কোলে।
পাঞ্জাবীটি চোখ-জুড়োনো নকশা তসরেতে,
যত্ন করে পাট করে দিই ডালার বুকে পেতে।
সুগন্ধী তিন সাবান আছে, আছে সোলার পাখা।
‘Cologne’ এবং ‘After-shave’ একটি কোণে রাখা॥
এসব কিছু সাজিয়ে দিয়ে একটিমাত্র আশা,
বেয়াইবাড়ির সঙ্গে হবে গভীর ভালোবাসা॥
ইতি
আপনার বেয়ান ঠাকুরণ
১৯.
ঝগড়া করে মন্দ লোকে ‘কাঁথায় আগুন’ বলে
ঝগড়া করে মন্দ লোকে ‘কাঁথায় আগুন’ বলে।
নতুন বেয়ান হলে কি আর তেমন বলা চলে?
অনেক ধকল গেছে ছেলে মানুষ করতে গিয়ে,
এবার না হয় ঘুমোও বেয়ান, কাঁথা মুড়ি দিয়ে।
কাঁথার কাজের রেশমী শাড়ি পাঠাই তোমার তরে,
সোনায় মোড়া শাঁখা জোড়া দু'হাত আলো ক'রে॥
আলতা-সিঁদুর একটি কোণে রয়েছে পরিপাটি,
রুপোর সিঁদুর কৌটো দিলাম, সঙ্গে সিঁদুর কাঠি॥
শাড়ির কাঁথার লতাপাতা ব্যাগেরও ওপর,
গোলাপী রঙের তিনটি সাবান একসাথে পরপর॥
টুকরি করে ‘Body Shop’-এর বোতল আছে নানা,
তোয়ালে আর গন্ধ হামাম বিদেশ থেকে আনা॥
একটি কথা বলা এবার ভীষণই দরকার—
যে শাড়িটা তত্ত্বে পেলাম, দারুণ চমৎকার!!
ইতি
তোমার বেয়ান ঠাকুরণ


পাঠকের মন্তব্য