এই যে রাত ১০টার মাঝে নারী শিক্ষার্থীদের হল বন্ধ হয়ে যায়; এটা নিরাপত্তা নাকি প্রতারণা?

পঠিত ... ২ ঘন্টা ৩৪ মিনিট আগে

লেখা: নিকি জামান 

আমার একবার অন্য একটা জেলা থেকে ঢাকা ফিরতে ফিরতে রাত এগারোটা বেজে যায়। অত রাতে একা ক্যাম্পাসে বাসে যাওয়া একটু কঠিন, তাই আমি ঢাবিতে চলে আসি—এখানে কোনো বান্ধবীর হলে থাকব। ওমা! শুনি, কোনো অবস্থাতেই রাত ১০টার পরে হলে প্রবেশ নিষেধ। ঢাবির মেয়েরাই ঢুকতে পারে না। আমাদের ক্যাম্পাসের বাস্তবতা এমন নয়, তাই আমি বিষয়টা এভাবে ভাবিনি।

তখন বাধ্য হয়ে আমার সারারাত বাইরে বসে কাটাতে হয়। ক্যাম্পাসে রাতের বেলা কোনো ওয়াশরুম খোলা থাকে না। ৬-৭ ঘণ্টা জার্নি করে আমার এমনিতেই অবস্থা খারাপ! পরে আমার এক বন্ধু টিএসসির ওয়াশরুমে নিয়ে যায়। সেখানেও ফ্রেশ হওয়ার ব্যবস্থা নেই। একটাই ওয়াশরুম খোলা থাকে বিধায় সব মানুষ ওই এলাকার ওইটাই ব্যবহার করে। বাথরুমটা এত এত ময়লা—বলার অপেক্ষা রাখে না।

ওই রাতে মাশা আমানির গ্রাফিতিটা হচ্ছিল। তাই বেশ কিছু মানুষ ছিল। আমার একটা বন্ধু গান গাচ্ছিল। এর মাঝে কোথা থেকে এসে একটা লোক আমার আমাদের ছবি তোলা শুরু করে! আমি চূড়ান্ত অবাক হই—ভাই, এখানে আমি এভাবে বসা, আমার ছবি কেন তুলবে! এটা তো আমার প্রাইভেসির চূড়ান্ত লঙ্ঘন। আমার ঢাবির বন্ধুরা জানালেন, এটা খুবই নরমাল। কিছু বলা যাবে না, কারণ এটা পাবলিক প্লেস। আমার যে পাবলিক প্লেসে কেউ ছবি তুলতে পারে না, এটা আমার প্রাইভেসির চূড়ান্ত লঙ্ঘন কেন ও কীভাবে—আমি বললাম না।

কারণ আমি জানি, ঢাবির মেয়েদের প্রতিনিয়ত কতটা ছবি, ভিডিও, মোবাইল সাংবাদিকদের সার্ভেইল্যান্সের মধ্যে থাকতে হয়। নজরদারি ছাড়া ক্যাম্পাসে তাদের বিচরণের কোনোই সুযোগ নেই। তাই এটাই নরমাল।

তবে এটা ভেবে ভাগ্যকে ধন্যবাদ দিলাম যে আজ আমার বন্ধুরা আছেন। নাইলে আজ এই কাজটা না হলে একা একা ক্যাম্পাসে আমাকে ঘুরতে হতো। তখন এই ক্রিপি ফটোগ্রাফারকে দেখলে আমি কী করতাম!

এইটা গেল আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা। ঢাবির মেয়েদের না জানি কতটা ভোগান্তি হয়, আমি কল্পনা করতে পারি না। জাবিতে তো জ্যাম নেই, ভেতরে বিচরণ। তাতেই কত কাজে দেরি হয়ে যায়!

ঢাকা শহরে সব জায়গায় যাইতে এত সময় লাগে, এত জ্যাম, এত আনপ্রেডিক্টেবল সময়ে পৌঁছানো। তাতে বলে আমি হলে এসে ঢুকতে পারব না! নিরাপত্তাই যদি অজুহাত হয়, তাইলে আমাকে সারারাত বাইরে রেখে ঠিক কী নিরাপত্তা দেওয়া হচ্ছে?

এত গেল হলে ঢোকা সংক্রান্ত সমস্যা।

আমার খালা, চাচা অসুস্থ হয়েছেন। বন্ধু অসুস্থ হয়েছে। নানা বাস্তবতায় আমাকে গভীর রাতে জাহাঙ্গীরনগর থেকে ঢাকায় রওনা হতে হয়েছে। এখন যেকোনো পারিবারিক ইমার্জেন্সিতে আমাদের মেয়েদের বের হইতে হয়। সরি, ঢাকার শহরে আমরা সেই উনিশশো কটকটি সালের মতো থাকি না যে আমাদের বাপ, চাচা, ভাইয়েরা আছে, ভুরি ভুরি—তারা সব ক্রাইসিস সামলাবেন।

সবার শেষে প্রশ্ন রাখতে চাই, সারা বাংলাদেশের কাছে। আমরা মেয়েরা যদি রাতের বেলা হল ভেঙে বের না হইতাম, ’২৪ হইতো এই দেশে?

আন্দোলনের চূড়ান্ত দুইটা পয়েন্টে ঢাবির ও জাবির মেয়েরা হলের তালা ভেঙে বের হয়েছেন। ১৪ জুলাই রোকেয়া হলসহ অন্যান্য হলের মেয়েরা বের হয়ে আসেন। মেয়েদের হলগুলোই প্রথম ছাত্রলীগমুক্ত হয়। শেখ হাসিনার নামে হল বর্জন করে।

১৫ তারিখ গভীর রাতে ভিসির বাসায় অবরুদ্ধ শিক্ষার্থীদের বের করতে জাবির হলের মেয়েরা হল থেকে বের হয়ে আসেন। তারা খন্তা, লাকড়ি নিয়ে মিছিল করে ছাত্রলীগ ও পুলিশি আক্রমণের মাঝে ভিসির বাসার উঠানে আটকা পড়া মেয়েদের উদ্ধার করেন।

এছাড়া পুরো ’২৪-এ মেয়েরা বিভিন্ন প্রয়োজনে রাতে হল থেকে বের হয়েছেন। ক্যাম্পাসে খাবার-দোকান বন্ধ ছিল, তখন তাদের পুরুষ বন্ধুদের খাবার, চিকিৎসা সরঞ্জাম দিয়েছেন। আন্দোলনের নেতৃত্ব, পরিকল্পনা করেছেন।

আন্দোলন যখন স্তব্ধ ছিল, তখন ’২৪-এ নারীরা পথ দেখিয়েছেন। তখন নারীদের ‘শিল্ড’ হিসেবে ব্যবহার করতে ভালো লাগেনি? আর এখন আমাদের হল খোলা রাখার আন্দোলন করতে হচ্ছে।

অদ্ভুত লাগে, ’২৪-এর পরেও কীভাবে হল খোলা রাখার প্রয়োজনীয়তা লিখে, প্রতিবাদ করে, মিছিল করে জানাতে হয়।

এতটা নির্লজ্জ, প্রতারণামূলক আচরণ করতে আপনাদের লজ্জা হয় না?

পঠিত ... ২ ঘন্টা ৩৪ মিনিট আগে

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top