বাইরে আন্দোলন চলছে কিসের যেন! আমার বারান্দা থেকে শোনা যায়! আমি সারাদিনের কাজের ফাঁকে ফাঁকে উঁকি মেরে দেখার ট্রাই করি। কিন্তু নাগালে আসে না।
সন্ধ্যায় স্বামী ঘরে ফিরলেন। কাপড় ছাড়তে ছাড়তে খুব বিরক্ত গলায় বললেন,
কি যে একটা অবস্থা দেশের! সারাক্ষন আন্দোলন! আজ হলের মেয়েরা রাস্তায়! কেন? তাদের হলের সান্ধ্য আইন বাতিল করতে হবে! যত্তসব উচ্ছন্নে যাওয়ার দল! তোদের সুরক্ষার জন্যই তো আইন!
আমি কিছু বললাম না। আমার মনে পড়ল ডবির কথা! নিজেকে আমার ডবি মনে হয়! এই সমাজে আমরা মেয়েরা তো ডবি-ই!
ডবি- হ্যারি পটারের জগতের সবচেয়ে অবহেলিত এক জীব। হাউজ-এলফ। সোজা বাংলায়, ঘরের কাজের লোক।
অহংকারী উচ্চবিত্ত জাদুকর পরিবারগুলোতে ডবিরা স্রেফ স্ট্যাটাস সিম্বল। তাদের কোনো স্বাধীনতা ছিল না। ছিল না মনিবের অনুমতি ছাড়া এক পা ফেলার সাধ্য।
কিন্তু আজ যাদুজগতের গল্প নয়। আজ আমাদের অতি পরিচিত ঘরের কথা বলি। পুরুষ ও নারীতে আধাআধি ভাগ আমাদের সমাজে। কিন্তু একদল শাষক, অন্যদল শাষিত। সেটা যেই পার্স্পেক্টিভেই হোক না কেন! সবকিছুতেই যেন একধরনের কাস্ট সিস্টেম বা শ্রেনীবৈষম্য!
ছেলে আর মেয়ে বাচ্চাদের আমরা ছোটবেলা থেকেই আলাদা নিয়ম শেখাই। ছেলেটা কম-বেশি প্রায় সবই করতে পারবে কিন্তু মেয়েটাকে মানতে হবে মানা।
ছেলেটার জন্য পুরো দুনিয়া খোলা আকাশ। আর মেয়েটার জন্য? ঘরের ওই চারদেয়ালের চারটে কোণ!
ছেলেরা যখন খুশি যেখানে যাবে। কিন্তু মেয়েরা? ওরে বাপরে! ছেলেরা নিজেদের হ্যান্ডেল করতে পারে, মেয়েরা কি তাই পারে?
মেয়েদের ওপর চেপে বসবে অদৃশ্য এক সান্ধ্য আইন!
বাপের ভিটেয় পা মেপে মেপে বড় হওয়া। ইচ্ছেগুলোকে মনে চেপে রাখা। তবু দিন গেল। তারপর? নতুন জগত! বিয়ে হয়েছে- যেতে হবে! এইত শুরু হল!
নতুন ঘরে মেয়েটি…না না! মেয়ে তো আর নয়! বউটি! বউটি যেন রূপ নেয় এক জ্যান্ত ডবিতে! কিভাবে, কিভাবে?
ডবিরা প্রাসাদের দায়িত্বে থাকত, কিন্তু ঘুমানোর জন্য পেত কোন আলমারি বা বয়লার রুম! আর ঘরের বউদের বেলায়? তারা যদি কষ্ট পেয়ে কখনো এমন বলে যে- আমি তো ঘরের দাসী! অমনি ওপাশ থেকে জবাব আসে- তবু তো কপাল, রাজার সাথে শুতে পাও!
হাসিমুখের তাচ্ছিল্য, কিন্তু তাচ্ছিল্য তো! ডবিদের ডেইলি পাওনা। ঘরের বউদের কথা না-ই বললাম।
ডবিদের স্বাধীনতার কোনো অধিকার ছিল না। স্বাধীন হতে হলে মনিবের হাত থেকে জামাকাপড় পেতে হতো।
আর আমাদের সমাজের বউদের স্বাধীনতা? সে কী কাপড় পরবে, কত দূর হাঁটাচলা করবে- তা ঠিক করে দেয় সংসারের মালিকপক্ষ!
অভিভাবক মানুষ! খুব গর্ব করে বলা,
আমি আমার বউকে খুব স্বাধীনতা দিয়ে রেখেছি!
যেন বউয়ের স্বাধীনতাটা তাদের হাতের মুঠোয় থাকা কোনো খেলনা! যখন খুশি দেবে, যখন খুশি কেড়ে নেবে!
ডবিদেরও অন্ধভক্তি থাকতে হয়। আমাদের দেখা ঘরের বউদের মতই! স্বামীর প্রতি, শাশুড়ির প্রতি- সংসারের প্রতি! সংসারটাকে দুটো মিনিট হাতের বাইরে রেখে বউটা যদি একটু উপটান মেখে ফেলে- ওমনি ‘গেল গেল' চিৎকার! সংসার গোল্লায় দিয়ে রুপচর্চা! বাপরে! কি দুঃসাহস!
বাকি শারিরীক-মানসিক অত্যাচার, ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স এসব নেগেটিভ দিকে না-ই যাই! কিন্তু একটা নরমাল পরিবেশে একটা মেয়ে কোন কারন ছাড়াই সারাটাজীবন একটা অদেখা ‘সান্ধ্য আইন' পালন করে যায়- আর এটা মানতে গিয়ে ডব্বিদের মতই নিজের ভুলে নিজেকে শাস্তি দিয়ে যায়, এর ফলাফল কি? এই অবমূল্যায়নের শেষ কোথায়?
এই আন্দোলন একদিন শেষ হবে। হয়ত হলের সান্ধ্য আইন মেয়েদের জন্য আর থাকবে না! যেমন ডবি একদিন মোজা পেয়ে মুক্ত হয়েছিল! কিন্তু আমাদের সমাজের ডবিরা? তারা কি কোনদিন মুক্তি পাবে?



পাঠকের মন্তব্য