ঢাকার রাস্তায় প্রতিদিন আমরা কতটা জীবন হারাচ্ছি?

পঠিত ... ৪ ঘন্টা ৩৯ মিনিট আগে

মানুষ আদিমকালে গুহা থেকে বেরিয়েছিল হেঁটে হেঁটে পৃথিবীর মানচিত্র বড় করার জন্য। আর একুশ শতকের ঢাকায় মানুষ সকালে ঘর থেকে বের হয় চাকার ওপর বসে নিজের আয়ু ছোট করার জন্য।

ঢাকার রাস্তার তালিকা তৈরি করতে যাওয়া আর বঙ্গোপসাগরের ঢেউ গুণে শেষ করার চেষ্টা—দুটোই সমান বাতুলতা। অবশ্য পণ্ডিতেরা খাতা-কলম নিয়ে বসে এন-৩ এয়ারপোর্ট রোড, প্রগতি সরণি, বেগম রোকেয়া সরণি কিংবা সাতমসজিদ রোডের মতো কতকগুলো রাজকীয় নাম উচ্চারণ করে নিজেদের ভূগোলচর্চাকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু সাধারণ নাগরিক ভালো করেই জানে, এই প্রতিটি ‘সরণি’ আসলে একেকটি সুবিন্যস্ত, পিচঢালা ও এয়ার-কন্ডিশন্ড নরককুণ্ড। যেখানে পৌঁছানোর নির্দিষ্ট সময় আছে, কিন্তু বেরোনোর কোনো গ্যারান্টি ঈশ্বরও দেবেন কি না সন্দেহ।

যানজটকে যদি আমরা স্রেফ গাড়ির লাইন বলে চালিয়ে দিই, তবে ঢাকার মহান ট্রাফিক-সংস্কৃতিকে চরম অপমান করা হবে। এটা কোনো সাধারণ ভিড় নয়, এটা হলো স্থবিরতার এক মহান যৌথ প্রযোজনা।

ধরা যাক, এক হতভাগ্য প্রাণী খিলক্ষেত থেকে ধানমন্ডি যাওয়ার দুঃসাহস দেখাল। মানচিত্র বা জিপিএস নামক পশ্চিমা চক্রান্ত বলবে—দূরত্ব মাত্র ১৩ কিলোমিটার, পৌঁছাতে হয়তো মিনিট চল্লিশের ব্যাপার। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আপনি প্রগতি সরণি আর মহাখালীর জাঁতাকলে পড়ে যখন গাড়ির সিটে বসা অবস্থাতেই প্রথম দাড়ি পাকার লক্ষণ আবিষ্কার করবেন, তখন বুঝবেন যে সময়ের ধারণা কতটা আপেক্ষিক। আলবার্ট আইনস্টাইন যদি আপেক্ষিকতার তত্ত্ব আবিষ্কারের আগে একবার পিক-আওয়ারে বিজয়নগর থেকে ফার্মগেট বাস জার্নি করতেন, তবে তিনি বিজ্ঞানের বই না লিখে নিশ্চিতভাবেই আধ্যাত্মিক সন্ন্যাস গ্রহণ করতেন।

ঘণ্টায় পাঁচ কিলোমিটার গতিবেগ নিয়ে আমরা যে বেঁচে থাকার অভিনয় করি, সেটা আধুনিক সভ্যতার এক অভূতপূর্ব তামাশা। বাসের জানলা দিয়ে তাকিয়ে দেখলে মনে হবে, পুরো শহরটা আসলে এক বিরাট প্রদর্শনী। যেখানে হাজার হাজার মানুষ ইঞ্জিন চালু রেখে স্তব্ধ হয়ে বসে আছে আর ভাবছে—জীবনের অর্থ ঠিক কী? আমরা যে প্রতিদিন আড়াই-তিন ঘণ্টা করে জীবনের মহার্ঘ আয়ুষ্কাল ধোঁয়া আর হর্নের অর্কেস্ট্রায় বিসর্জন দিই, তার বিনিময়ে এই মেট্রোপলিস আমাদের কী দেয়?

দেয় কিছু ধাতব আর অ্যাসফল্টের মিথ্যে প্রতিশ্রুতি।

বলা হয়, ফ্লাইওভার হয়েছে, এক্সপ্রেসওয়ে এসেছে, মাথার ওপর দিয়ে লাল-রূপালি রঙের ঝকঝকে মেট্রো ট্রেনও ছুটে চলেছে। কিন্তু রহস্যটা তো অন্য জায়গায়। ঢাকার ট্রাফিক হলো এক অনন্ত ও ক্ষুধার্ত অজগর, snakes-and-ladders খেলা। আপনি ওপর দিয়ে তিন কিলোমিটার সাঁ করে পেরিয়ে যাবেন, তারপর যেই নিচের মোড়ে নামবেন, অমনি আপনাকে গিলে খাওয়ার জন্য প্রস্তুত বসে আছে শত বছরের প্রাচীন, অবিনশ্বর কোনো সিগন্যাল আর বেপরোয়া বাস রুট। আধুনিক প্রযুক্তি এখানে এসেই হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে মাথা নোয়ায় আমলাতান্ত্রিক অপরিকল্পনা আর রিকশার সার্বভৌমত্বের কাছে।

আসলে, এই ট্রাফিক কেবল চাকা থমকে দেওয়ার গল্প নয়। এটি হলো মানুষের মেরুদণ্ড আর মেজাজকে একসঙ্গে দুমড়ে-মুচড়ে দেওয়ার এক মহাযজ্ঞ। কিন্তু সেই মনস্তাত্ত্বিক কসাইখানার গল্পে যাওয়ার আগে একটু দম নেওয়া যাক। কারণ, ঢাকা শহরে যেকোনো কিছুতেই তাড়াহুড়ো করা চরম বেয়াদবি—এমনকি পরের পর্বে যাওয়ার ক্ষেত্রেও।

সভ্যতার ইতিহাস মূলত মিথ্যে আশ্বাসের ইতিহাস। আর ঢাকা শহরের ইতিহাস হলো মেগা-প্রকল্পের নাম দিয়ে সাধারণ মানুষের চোখে ধুলো ছিটিয়ে সেই ধুলোতেই ট্রাফিক জ্যাম বানানোর ইতিহাস।

আমরা ভেবেছিলাম ওপর দিয়ে পিচ ঢেলে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে বানিয়ে দিলেই বুঝি মুক্তির আনন্দগান বাজবে। প্রাইভেট কারের মালিকেরা বেশ কিছুদিন বেশ একটা বিজয়ীর হাসি হেসে উড়ালসড়কে উঠল। কিন্তু নিচে নেমে ফার্মগেট বা মহাখালীর এক্সিট পয়েন্টে পৌঁছাতেই সেই হাসি শুকিয়ে আমসির মতো হয়ে গেল। কারণ উড়ালসড়ক আপনাকে দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছে দেয় না, সে কেবল আপনাকে চার মিনিট দ্রুত এনে একটা বিশাল জ্যামের মুখে দাঁড় করিয়ে দেয়। যে জ্যামে আপনি আগে পনেরো মিনিট পর পৌঁছাতেন, এখন পনেরো মিনিট আগেই পৌঁছাবেন—তফাৎ শুধু এটুকু। প্রযুক্তি আপনাকে সময় বাঁচিয়ে দিল, যাতে আপনি সেই সংরক্ষিত সময়টুকু নতুন কোনো সিগন্যালে বসে দক্ষতার সঙ্গে নষ্ট করতে পারেন।

তারপর এলো বহুল চর্চিত ও পূজিত মেট্রোরেল। উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত ঝকঝকে কামরায় চড়ে মানুষ ভাবল—এই বুঝি স্বর্গলাভ হলো! কিন্তু ঐ যে, ট্রাফিক স্বর্গের দরজায় দাঁড়িয়ে থাকেন মর্ত্যের দারোয়ান। মেট্রোরেল আপনাকে পনেরো মিনিটে স্টেশন পর্যন্ত পৌঁছে দেবে ঠিকই, কিন্তু স্টেশন থেকে নেমে আপনার গন্তব্য যদি চারশো গজ দূরেও হয়, তবে সেই চারশো গজ পেরোতে আপনার লাগবে পঁয়তাল্লিশ মিনিট। যাকে সুশীল ভাষায় বলা হয় ‘লাস্ট-মাইল কানেক্টিভিটি’-র দুর্বলতা, আর চলতি ভাষায় বলা হয় কপাল!

স্টেশনের নিচে নামলেই চোখে পড়ে ব্যাটারিচালিত রিকশার স্বাধীন সাম্রাজ্য, যত্রতত্র দাঁড়িয়ে থাকা বাস, আর ফুটপাত দখল করে চলা ফুটপাতে হেঁটে যাওয়ার নিরন্তর সংগ্রাম। ফলে, ওপর দিয়ে সাঁ সাঁ করে বুলেট ট্রেন চলে গেলেও নিচে ফুটপাতে দাঁড়িয়ে থাকা আমজনতার জীবনে স্থবিরতার বিন্দুমাত্র হ্রাস ঘটে না। বিজ্ঞান একটা পথ বের করে, আর নগর-পরিকল্পনাবিদেরা তার চারপাশে দশটা নতুন জট তৈরি করে দেন।

আসলে, সমস্যাটা কোথায়? সমস্যাটা ওই মনস্তাত্ত্বিক আর গাণিতিক গ্যাঁড়াকলে—যাকে বিজ্ঞজনেরা বলেন ‘ইনডিউসড ডিমান্ড’। রাস্তা বাড়ালে নাকি জ্যাম কমে—এ এক অসামান্য অলীক ধারণা। নতুন রাস্তা হওয়া মাত্রই মানুষের মনে হয়, আহা! এবার তো নতুন একটা গাড়ি কেনাই যায়!

ফলে, চার লেনের রাস্তা আট লেন হয়, আর সেই আট লেনে আগের চেয়ে দ্বিগুণ গাড়ি এসে আবার সর্বজনীন স্থবিরতার উৎসব শুরু করে।

আমরা ভেবেছিলাম শহর নাকি আমাদের চলাচলের জন্য। কিন্তু বাস্তব বলছে, শহর এখন দাঁড়িয়ে থাকার এক বিরাট মুক্তাঙ্গন। যেখানে রাজপথগুলো আসলে কোনো গন্তব্যে পৌঁছানোর মাধ্যম নয়, বরং ওগুলো হলো ধাতব বাক্সে বন্দি মানুষের মানসিক ধৈর্য পরীক্ষার একেকটি স্থায়ী ল্যাবরেটরি।

ফ্লাইওভার, এক্সপ্রেসওয়ে আর মেট্রোর এই জমকালো ধাঁধায় আসল রহস্যটা আড়ালেই থেকে যায়—আমরা আদৌ কি কোথাও যাচ্ছি, নাকি একই বৃত্তে ঘুরে মরছি?

প্রযুক্তি আর কাঠামোর এই চোখধাঁধানো তামাশা শেষ হলে যা পড়ে থাকে, তা হলো নিঃসঙ্গ এক মানুষের চূর্ণ-বিচূর্ণ মনস্তত্ত্ব। পরের পর্বে আমরা সেই ভেঙে পড়া মানসিক আর শারীরিক ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়েই বাকি হিসাব-নিকাশ করব।

ধাতব বাক্সের ভেতর শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত যন্ত্রটি ঘ্যানঘ্যান করে চলতে থাকে, আর বাইরে থমকে থাকা কালো পিচঢালা রাস্তা থেকে বাষ্প হয়ে উঠতে থাকে এক কোটি মানুষের সম্মিলিত দীর্ঘশ্বাস। আপনি যখন তিন ঘণ্টার জন্য প্রাইভেট কার, বাস কিংবা সিএনজির ঝাঁঝালো খাঁচায় বন্দি, তখন আপনার রক্তপ্রবাহে ধীরলয়ে বেজে ওঠে এক গোপন ধ্বংসাত্মক সুর—বিজ্ঞান যাকে বলে কর্টিসল বা স্ট্রেস হরমোনের নৃত্য।

ঢাকার ট্রাফিক জ্যাম কোনো শারীরিক যাতায়াত নয়, এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি স্নায়ুযুদ্ধ। যুদ্ধটা সরকারের বিরুদ্ধে নয়, কিংবা পাশের লেনের বেপরোয়া বাসচালকের বিরুদ্ধেও নয়; যুদ্ধটা মূলত নিজের ভেতরের অবশিষ্ট ধৈর্য নামক বস্তুটির সঙ্গে।

প্রথম আধঘণ্টায় মানুষের মনে থাকে হালকা অস্থিরতা—হাতের ঘড়ির দিকে তাকানো, মোবাইল স্ক্রিনে জিপিএসের লাল দাগ দেখে নিজেকে সান্ত্বনা দেওয়া। কিন্তু এক ঘণ্টা পার হতেই সেই অস্থিরতা রূপ নেয় এক সূক্ষ্ম হিংস্রতায়। যে মানুষটি সকালবেলা সুশীল নাগরিকের মতো শার্টের বোতাম এঁটে বের হয়েছিল, দুই ঘণ্টা পর সিগন্যালে আটকে থেকে সে মনে মনে আশেপাশের দশজন মানুষকে খুন করে ফেলে। রক্তচাপ বাড়ে, ঘাড়ের রগ টানটান হয়, আর চোখের কোণে জমে ওঠে এমন এক বিষণ্নতা, যা কেবল কোনো জন্মদিনের পার্টিতে দেরিতে পৌঁছানো কিংবা কোনো জরুরি মিটিং মিস করা মানুষই বুঝতে পারে।

সবচেয়ে বড় তামাশা হলো, এই মানসিক ক্ষয় কিন্তু কেবল রাস্তায় শেষ হয়ে যায় না। আপনি যখন অবশেষে তিন ঘণ্টা পর অফিসে গিয়ে নিজের চেয়ারে ধসে পড়েন, তখন আপনি আর কর্মক্ষম মানুষ নন—আপনি একটি ক্ষয়ে যাওয়া, নিভে যাওয়া সলতে। যে এনার্জিটা আপনার সৃজনশীল কাজে, ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তে কিংবা গবেষণায় খরচ হওয়ার কথা ছিল, তার পুরোটাই আপনি বিসর্জন দিয়ে এসেছেন খিলক্ষেত বা কারওয়ান বাজারের মোড়ে। ফলে উৎপাদনশীলতা কমে, খিটখিটে মেজাজে সহকর্মীর সঙ্গে তর্ক হয়, আর ঘরে ফিরে সন্তানের নিষ্পাপ প্রশ্নের উত্তরেও বেরিয়ে আসে এক তীব্র বিষাদগ্রস্ত গর্জনের মতো শব্দ।

আর শারীরিক দিক? পিঠের কশেরুকাগুলো যেন চিঁড়ে-চ্যাপ্টা হয়ে যাওয়ার আকুতি জানায়। দীর্ঘ সময় একই অমানবিক ভঙ্গিতে বসে থাকা, শব্দদূষণের নারকীয় চিৎকার আর বাতাসে ভেসে বেড়ানো সীসা-ধূলিকণার ককটেল—সব মিলে আমাদের শরীরের ভেতরের যন্ত্রাংশগুলোকে নীরবে মেয়াদোত্তীর্ণ করে দেয়। ঢাকার মানুষ শুধু বয়সে বুড়ো হয় না, তারা প্রতিটি ট্রাফিক জ্যামের সঙ্গে সঙ্গে একটু একটু করে ক্ষয়ে বুড়ো হয়।

কিন্তু আমরা তো অভ্যস্ত। আমরা হাসিমুখে বলি, আজকে তো জ্যাম একটু কমই ছিল, মাত্র আড়াই ঘণ্টা লেগেছে! এই যে অমানবিককে স্বাভাবিক বলে মেনে নেওয়ার অদ্ভুত ক্ষমতা—এটাই সম্ভবত এই শহরের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি। আমরা মেগা-প্রকল্পের চশমা চোখে দিয়ে নিজেদের বোঝাই যে আমরা নাকি একবিংশ শতাব্দীর এক পরাশক্তি হয়ে উঠছি, অথচ বাস্তবতা হলো আমরা স্থবিরতার এক চিরস্থায়ী নাগরিক হয়ে বেঁচে আছি।

পরিশেষে বলা যায়, সমাধান হয়তো কাগজে-কলমে আছে—বাস রুট র‍্যাশনালাইজেশন, গণপরিবহনের আধুনিকায়ন, বিকেন্দ্রীকরণ কিংবা কার্যকর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা। কিন্তু যতক্ষণ না পর্যন্ত আমরা উপলব্ধি করছি যে মানুষের জীবনের সময়টুকু বাসের চাকার নিচে পিষে ফেলার মতো সস্তা কোনো কাঁচামাল নয়, ততক্ষণ এই শহরটা কেবলই থেকে যাবে এক বিশাল, নিঃশব্দ মানসিক হাসপাতাল—যার ছাদ নেই, কেবল আছে হাজার হাজার আটকে থাকা গাড়ির দীর্ঘ সারি।

পঠিত ... ৪ ঘন্টা ৩৯ মিনিট আগে

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top