১
পাহাড়ের রাতের একটা নিজস্ব শব্দ আছে। শহরের মানুষ মনে করে পাহাড় বুঝি নিঝুম, কোনো শব্দ নেই। ভুল কথা। পাহাড়ি বাতাসে পাইন গাছের পাতার ঘষা খাওয়ার একধরনের একটানা 'শুষ' শব্দ হয়। তার সঙ্গে যদি জুড়ে যায় খরস্রোতা নদীর তীব্র গর্জন, তবে রাতের অন্ধকারটা কেবল ভারীই হয় না, বুকের ভেতরে এক অদ্ভুত ভয় চেপে বসে।
আফজাল কোহিস্তানি সে রাতে ঘুমাতে পারছিল না।
সে তার ছোট্ট ঘরটার কাঠের জানালায় হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। বাইরে কুচকুচে অন্ধকার। কোহিস্তানের শীত এই মে মাসেও হাড়ে গিয়ে বিধে। আফজালের হাতে ধরা একটা সস্তা দামের চীন দেশের তৈরি মোবাইল ফোন। সেই ফোনের ছোট পর্দায় আলো জ্বলছে আর নিভছে।
ফোনের স্ক্রিনে একটা ঝাপসা ভিডিও চলছে।
ভিডিওর গুণগত মান এতোই খারাপ যে মানুষের মুখ ভালো করে বোঝা যায় না। কিন্তু শব্দটা পরিষ্কার। গুটিকয়েক মেয়ে হাততালি দিচ্ছে। পাহাড়ি সুরের গান গাইছে। অন্য একটা শটে দুই-একজন তরুণ নাচছে। কোনো আধুনিক আলো নেই, চকমকে ব্যাপার নেই—একেবারে সাধারণ এক পাহাড়ি বিয়ের আনন্দ। কোনো অপরাধ নেই, কোনো পাপ নেই।
কিন্তু কোহিস্তানের পাহাড়ি উপজাতীয় সংস্কৃতিতে এই সাধারণ হাসি-গানই এক মহা পাপ। একে বলা হয় 'রিওয়াজ' বা রীতির লঙ্ঘন। আর এই রীতির লঙ্ঘনের একটিই শাস্তি—রক্ত।
আফজালের ভাইদের নাম জড়িয়ে গেছে এই ভিডিওর সঙ্গে। বলা হচ্ছে, যারা নাচছিল তারা আফজালের রক্তের সম্পর্কিত ভাই। অথচ আফজালের মন বলছিল, এ এক বিরাট ভুল বা হয়তো গভীর চক্রান্ত।
হঠাৎ দরজায় হালকা টোকা পড়ল।
আফজাল ঘুরে তাকাল। ঘরের কোণে জ্বালানো কুপির মৃদু আলোয় তার ছায়া দেয়ালে বিশাল হয়ে ফুটে উঠেছে। দরজা খুলতেই ভেতরে ঢুকলেন প্রবীণ এক গ্রামবাসী। তাঁর পরনে মোটা উলের চাদর, দাড়ি সাদা ধবধবে। মুখমণ্ডল চিন্তার ভাঁজে কুঁচকে আছে।
বৃদ্ধ নিচু গলায় বললেন, তুমি এখনও জেগে আছ?
কাকা, ঘুম আসছে না। বাতাসে কীসের যেন একটা গন্ধ পাচ্ছি।
বৃদ্ধ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। ঘরের কোণে বসে কাঠের লাঠিটা পাশে রাখলেন। আজ সন্ধ্যায় পাহাড়ের ওপারে আজাদখেল গোত্রের লোকেরা জিরগা ডেকেছিল।
'জিরগা' শব্দটা শোনামাত্র আফজালের বুকের ভিতরটা ছাঁৎ করে উঠল।
পাহাড়ের জিরগা মানেই বিচারের নামে বয়স্ক কয়েকজন মোড়ল আর মাওলানার বন্ধ ঘরের সিদ্ধান্ত। সেখানে দেশের আইন পৌঁছায় না, পুলিশের গাড়ি পৌঁছায় না। সেখানে এক একটি রায় মানেই কারোর জীবনপ্রদীপ নিভে যাওয়া।
কী হয়েছে জিরগায়?
আফজাল জিজ্ঞেস করল। তার গলা শুকিয়ে গেছে।
বৃদ্ধ চারপাশটা একবার দেখে নিলেন, যেন ঘরের দেয়ালেরও কান আছে। তারপর ফিসফিস করে বললেন, মাওলানা জাভেদ সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। ওই ভিডিওতে যেসব মেয়েদের দেখা গেছে—সিরিন, বেগম, বাজিঘা... সবাইকে শেষ করে দিতে হবে। তাদের শরীরের দাগ নাকি এই উপজাতির মুখে কালি ছিটিয়ে দিয়েছে। আর...
বৃদ্ধ থেমে গেলেন।
আর কী কাকা?
ভিডিওর ছেলেগুলোকেও ছাড় দেওয়া হবে না। জিরগার আদেশ—রক্ত দিয়ে এই অসম্মান ধুতে হবে।
আফজাল স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। বাইরে নদীর গর্জনটা যেন এক মুহূর্তের জন্য আরো বেড়ে গেল। তার চোখের সামনে ভেসে উঠল সেই মেয়েগুলোর মুখ। পাহাড়ি ঝরনার মতো চঞ্চল কয়েকটা প্রাণ। তারা অপরাধ কী করেছে? একটা বিয়েবাড়িতে গান গেয়েছে! হাততালি দিয়েছে!
তারা কি মেয়েগুলোকে সত্যি সত্যি মেরে ফেলবে? আফজাল বিড়বিড় করে বলল।
পাহাড়ের নিয়ম তুমি জানো না আফজাল?
বৃদ্ধ উঠে দাঁড়ালেন। জিরগা যখন রায় দেয়, তখন মৃত্যু খুব নীরবে আসে। কেউ জানতেও পারে না লাশ কোথায় গেল। আমি তোমাকে সাবধান করতে এসেছি। তুমি আর তোমার ভাইয়েরা এই গ্রাম ছাড়ো। কাল সূর্য ওঠার আগেই।
বৃদ্ধ চলে গেলেন। ঘরের কাঠের দরজাটা বাতাসের তোড়ে একটু কেঁপে উঠল।
আফজাল জানালার বাইরে তাকাল। দূরে অন্ধকার পাহাড়ের সারির দিকে চেয়ে তার মনে হলো, এই সুবিশাল পাহাড়গুলো আসলে কোনো প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নয়—এগুলো বিশাল বিশাল এক একটা কারাগারের দেয়াল। এই দেয়ালের ভেতরে মানুষের জীবনের দাম পশুর চেয়েও কম।
সেদিন রাতেই প্রথম আফজাল একটা অদ্ভুত সিদ্ধান্ত নিল। পাহাড়ি সমাজের যে অন্ধ রীতির সামনে পুরো উপত্যকা হাঁটু গেড়ে বসে থাকে, সে তার সামনে হাঁটু গাড়বে না। সে লড়াই করবে। কেবল নিজের ভাইদের বাঁচাতে নয়, ওই অচেনা, গুমরে কাঁদা মেয়েগুলোর বিচার চাইতে।
সে জানত না, এই একটা সিদ্ধান্ত তাকে এক দীর্ঘ, রক্তক্ষয়ী এবং নির্জন পথের দিকে ঠেলে দিচ্ছে—যে পথের শেষ মাথায় দাঁড়িয়ে আছে নিশ্চিত মৃত্যু।
২
পাহাড়ের বিচার শেষ হতে বেশি সময় লাগে না। সেখানে কোনো সাক্ষীর জবানবন্দি নেওয়া হয় না, কোনো ওকিল দাঁড়ায় না। বিচারকের রায়ের পর সিদ্ধান্ত কার্যকর হতে সময় লাগে বড়জোর কয়েক ঘণ্টা।
পরদিন সকালেই কুয়াশা কাটার আগে বাতাসে এক বিষাদময় নীরবতা নেমে এল।
আফজাল খবর পেল, মেয়েগুলোকে আর দেখা যাচ্ছে না। রাতারাতি তাদের ঘরগুলো ফাঁকা হয়ে গেছে। লোকমুখে ফিসফিসানি—মেয়েগুলোর গায়ে গরম পানি আর জ্বলন্ত কয়লা ঢেলে নির্মম অত্যাচার করা হয়েছে, তারপর চিরতরে চুপ করিয়ে দেওয়া হয়েছে। লাশ কোথায় গুম করা হলো? কেউ জানে না। গভীর পাহাড়ের কোথায় যেন মাটির নিচে চাপা পড়ে গেছে কয়েকটা নিষ্পাপ দীর্ঘশ্বাস। পাহাড়ি উপজাতীয় পুরুষদের অহংকার রক্ষা পেয়েছে, কিন্তু পাহাড়ের বুক চিরে বয়ে যাওয়া বাতাস যেন রক্তে ভারী হয়ে উঠল।
গ্রামের মানুষ চোখ নিচু করে হাঁটে। কেউ কোনো কথা বলে না। 'রিওয়াজ' রক্ষায় রক্তের খেলা দেখে সবাই অভ্যস্ত, কিন্তু প্রকাশ্যে মুখ খোলার সাহস কারও নেই।
সবাই যখন চুপ, তখন আফজাল কোহিস্তানি গর্জে উঠল।
সে কেবল গ্রামে চিৎকার করে ক্ষান্ত হলো না, সোজা চলে গেল শহরের থানা-পুলিশ আর গণমাধ্যমের কাছে। পাহাড়ি জিরগার বিরুদ্ধে কথা বলা আর নিজের বুকে পিস্তল তাক করা একই কথা। কিন্তু আফজালের চোখে তখন এক অদ্ভুত উন্মাদনা। যে মেয়েগুলো কেবল গান গাওয়ার অপরাধে প্রাণ দিল, তাদের তো অন্তত একটা পরিচয় পাওয়া উচিত! তাদের মৃত্যুর খবর অন্তত দুনিয়ার মানুষ জানুক!
পেশোয়ার এবং ইসলামাবাদের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কোর্ট রুমে আফজালের এই ভাঙা গলার চিৎকার পৌঁছাল। বড় বড় সাংবাদিকরা প্রথম দিকে বিশ্বাস করতে চাননি।
আপনি নিশ্চিত?
সাংবাদিকেরা শুধাতেন।
আফজাল সোজা চোখে তাকিয়ে বলত, আমি পাহাড়ের ছেলে। রক্তের গন্ধ আমি চিনি। মেয়েগুলোকে মেরে ফেলা হয়েছে। আর এখন তারা আমার ভাইদের মারতে খুঁজছে।
সুপ্রিম কোর্টে মামলা গেল। দেশের সব বিচারক, নামীদামি আইনজীবীরা নড়েচড়ে বসলেন। পাকিস্তান জুড়ে শোরগোল পড়ে গেল—এক সাধারণ পাহাড়ি যুবক চ্যালেঞ্জ করে বসেছে শত বছরের অন্ধ জিরগা প্রথাকে!
কিন্তু অন্ধকার শক্তি কখনো বসে থাকে না। আফজাল যখন আদালতের বারান্দায় বারান্দায় ঘুরে বেড়াচ্ছে, তখন তার নিজের গ্রামে নেমে এল বিভীষিকা।
২০১৩ সালের এক থমথমে বিকেলে আফজালের তিন ভাইকে ঘিরে ধরল সশস্ত্র কিছু লোক। কোনো কথা হলো না। কেবল বন্দুকের গর্জন।
আফজালের তিন ভাই ধুলোয় লুটিয়ে পড়ল। তারা ভিডিওতে ছিল না, তাদের কোনো অপরাধ ছিল না। অপরাধ কেবল একটাই—তারা আফজালের ভাই। রক্তের বদলা রক্ত দিয়ে নেওয়ার আদিম নেশায় তিনটে তাজা প্রাণ নিভে গেল এক নিমেষে।
খবরটা যখন আফজালের কাছে পৌঁছাল, সে তখন শহরের এক সস্তা হোটেলে বসে চা খাচ্ছিল। খবর শুনে তার হাতের চায়ের কাপটা হাত থেকে খসে পড়ল। সিরামিকের ভাঙা টুকরো আর গরম চা ছড়িয়ে পড়ল মেঝেতে।
তার চোখ দিয়ে পানি পড়ল না। ঘরের কোণে দাঁড়িয়ে আফজাল কেবল আকাশের দিকে তাকাল। তার বুকের ভেতরটা এক মুহূর্তে মরুভূমি হয়ে গেছে। কিন্তু সে ভাঙল না, বরং শক্ত পাথরে পরিণত হলো।
ভাতিজা ফয়েজ-উর-রহমান তার পাশে এসে দাঁড়াল।চাচা, আর কত? আমাদের পুরো পরিবার শেষ হয়ে যাচ্ছে। আমরা কোথাও নিরাপদ নই। এবার থামো।
আফজাল ভাতিজার কাঁধে হাত রাখল। আফজালের চোখ দুটো অন্ধকার রাতের চিতার মতো জ্বলছিল।
ফয়েজ, আফজাল নিচু আর গম্ভীর গলায় বলল, যদি আজ আমি থেমে যাই, তবে আমার ওই তিন ভাইয়ের রক্ত বৃথা যাবে। ওই মেয়েগুলোর চিৎকার চিরতরে চাপা পড়ে যাবে। লড়াই যখন শুরু করেছি, শেষ পর্যন্ত যাব। হয়তো জীবন থাকবে না, কিন্তু অন্যায়ের সামনে মাথা নোয়াব না।
শুরু হলো আফজালের যাযাবর জীবন। মাথার ওপর প্রতিনিয়ত ঝুলছে মৃত্যুর পরোয়ানা। শহর থেকে শহরে, আস্তানা থেকে আস্তানায় লুকিয়ে বেড়ানো। নিজের ছায়াকেও আর বিশ্বাস করা যায় না। আফজাল জানত, শত্রুরা তার পিছু ছাড়েনি। তারা ওত পেতে আছে উপযুক্ত সময়ের জন্য।
৩
বছর গড়ায়। বর্ষার পাহাড় যেমন ধীরে ধীরে ধসে পড়ে, তেমনি আফজালের জীবনটাও একটু একটু করে ভেঙে পড়তে লাগল। কিন্তু তার জেদ কমেনি।
সাতটি দীর্ঘ বছর। সাত বছর ধরে আফজাল হেঁটেছে আদালতের বারান্দায় বারান্দায়, টেলিভিশনের টকশোতে, আর আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দরজায়। তার পরনের চাদরটা পুরোনো হয়েছে, মাথার চুলগুলোতে সামান্য পশমি শুভ্রতা এসেছে, চোখের নিচে জমেছে ক্লান্তি আর আতঙ্কের গভীর কালি।
আফজাল জানত, সে কেবল একটি জিরগার বিরুদ্ধে লড়ছে না; সে লড়ছে শত বছরের শিকড় গেড়ে বসা এক অন্ধকার মনস্তত্ত্বের বিরুদ্ধে।
২০১৯ সালের মার্চ মাস। শীতে জমে থাকা অ্যাবোটাবাদ শহরটা তখন কেবল বসন্তের মুখ দেখছে। আকাশে ধূসর মেঘের আনাগোনা।
৬ মার্চ, সন্ধ্যা নামার মুখে মুখে। অ্যাবোটাবাদের গামি আদ্দা এলাকাটা বেশ জমজমাট। ছোট ছোট দোকান, স্টেশনের শোরগোল, আর ধোঁয়া ওঠা গরম চায়ের আড্ডা। জীবনের এত কোলাহলের মাঝেও আফজাল এক নিঃসঙ্গ দ্বীপের মতো।
সে একটি স্টেশনারি দোকানের কাছে একটা পিকআপ ভ্যানের পেছনে বসে ছিল। পাশে অনুগত ভাতিজা ফয়েজ-উর-রহমান। ফয়েজের চোখে সর্বক্ষণ এক অদ্ভুত সংশয়—সে চাচার চারপাশে সতর্ক পাহারা রেখে চলেছে। ফয়েজের কোটে লুকানো একটি লাইসেন্সপ্রাপ্ত পিস্তল।
চাচা, জায়গাটা বড্ড বেশি খোলা। চা খেয়েই আমাদের উঠে পড়তে হবে, ফয়েজ নিচু গলায় বলল।
আফজাল একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে দূরে সারবান পাহাড়ের দিকে তাকাল। ফয়েজ, পালিয়ে বেড়াতে বেড়াতে আমি ক্লান্ত। কখনো কখনো মনে হয়, এই চাদরটার চেয়ে মৃত্যুর অন্ধকার অনেক বেশি শান্ত।
এসব কী বলছ, ৩ ভাই হারিয়েছ, আর নিজেকে হারিয়ো না, ফয়েজের গলায় আতঙ্ক।
আফজাল মৃদু হাসল। আমি হারিনি ফয়েজ। সুপ্রিম কোর্ট এফআইআর করার নির্দেশ দিয়েছে। তদন্তে বেরিয়ে এসেছে মেয়েগুলোকে কীভাবে হত্যা করা হয়েছিল। পৃথিবী আজ জানে, সেই রাতে তারা অপরাধী ছিল না—অপরাধী ছিল ওই জিরগার বিচারকেরা। আমার কাজ তো শেষ হয়ে গেছে।
ঠিক তখনই শহরের সন্ধ্যার ব্যস্ত কোলাহলের ভেতর এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে এল।
ভিড়ের ভেতর থেকে তিনজন লোক ধীরে ধীরে এগিয়ে এল। তাদের চোখ দুটো স্থির, ঠান্ডা। হাতগুলো জ্যাকেটের পকেটে লুকানো। আফজাল তাদের চিনতে পারল কি না তা বোঝা গেল না, কিন্তু তাদের হাঁটার ধরণ বলে দিচ্ছিল—তারা কোনো কথা বলতে আসেনি।
হঠাৎ, জ্যাকেটের ভেতর থেকে বেরিয়ে এল চকচকে ধাতব পিস্তল।
কোনো হুংকার নয়, কোনো নাটকীয়তা নয়। কেবল ঠাণ্ডা মাথার এক নির্মম বধ।
ঠাস! ঠাস! ঠাস!
পিস্তলের গর্জন শহরের ব্যস্ত বাজারটাকে এক মুহূর্তে স্তব্ধ করে দিল। আফজালের শরীরটা কেঁপে উঠল। একাধিক গুলি এসে বিঁধল তার বুকে ও পেটে। যে বুকের ভেতর সাত বছর ধরে এক একাকী আগ্নেয়গিরি জ্বলছিল, সেই বুক চিরে রক্ত ফিনকি দিয়ে বের হয়ে এল।
আফজাল ঢলে পড়ল পিকআপ ভ্যানের ভেজা কাঠের ওপর। তার হাত থেকে মাটির কাপটা খসে পড়ে গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে গেল—ঠিক যেমন সাত বছর আগে চায়ের কাপ ভেঙেছিল।
চাচা!
ফয়েজের চিৎকার বা বাতাসের গর্জনকে ছাড়িয়ে গেল।
ফয়েজ এক মুহূর্ত দেরি না করে নিজের কোট থেকে পিস্তল বের করে পাল্টা গুলি চালাল। আততায়ী তিনজন ভিড়ের মধ্যে মিশে যেতে চাইছে। ফয়েজ অন্ধের মতো গুলি চালাতে চালাতে তাদের পেছনে ধাওয়া করল। কিন্তু বাজারের ভিড়, মানুষের ছোটাছুটি আর সন্ধ্যার অন্ধকারের সুবিধা নিয়ে খুনির দলটি হাওয়া হয়ে গেল।
কয়েক মিনিটের মধ্যে পুলিশ এসে পুরো এলাকা ঘিরে ফেলল।
আফজাল তখনো নিঃশ্বাস নিচ্ছিল। তার চোখের সামনে অ্যাবোটাবাদের আকাশটা আস্তে আস্তে কালো হয়ে আসছে। তার ঠোঁটের কোণে নাকি তখনো এক চিলতে ভাঙা হাসি ছিল। যে মৃত্যুর ছায়াকে সে সাতটি বছর ধরে সঙ্গে নিয়ে ঘুরেছে, সেই মৃত্যু আজ তাকে স্পর্শ করেছে। কিন্তু সে বিজয়ী—কারণ সে অন্ধকারের রীতির সামনে হাঁটু গাড়েনি।
মেঝেতে রক্তের দাগ ছড়িয়ে পড়েছিল। দূর থেকে ভেসে আসছিল পুলিশের গাড়ির সাইরেনের শব্দ।
৪
আফজাল কোহিস্তানি শেষ নিঃশ্বাস ফেলেছিলেন সেই রক্তভেজা পিস্তলের শব্দ আর মানুষের আর্তচিৎকারের মাঝে। কিন্তু একটি গল্প কি কেবল একজনের মৃত্যুতেই শেষ হয়ে যায়? নাকি কোনো কোনো মৃত্যু আসলে নতুন এক অধ্যায়ের জন্ম দেয়?
আফজালের রক্তের দাগ গামি আদ্দার রাস্তায় শুকিয়ে যাওয়ার আগেই এক অদ্ভুত আইনি তামাশা শুরু হলো।
ঘটনাস্থলে হাতে লাইসেন্সপ্রাপ্ত পিস্তল নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ভাতিজা ফয়েজ-উর-রহমানকে পুলিশ গ্রেপ্তার করল। যে তরুণটি নিজের চাচাকে রক্ষা করতে আততায়ীদের ওপর গুলি চালিয়েছিল, তাকেই প্রথমে সন্দেহের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হলো। পাহাড়ি ক্ষমতার অদৃশ্য হাত নাকি তখনও আইনকে পথ ভুলিয়ে দিতে চাইছিল। কিন্তু পরিবারের স্পষ্ট অভিযোগ আর জনমতের চাপে পুলিশ শেষ পর্যন্ত তদন্তের মুখ ঘোরাতে বাধ্য হয়। গ্রেপ্তার করা হয় হামলার সঙ্গে যুক্ত অন্যতম মূল অভিযুক্ত মাউসাম খানকে।
আফজালের নিথর দেহ যখন শেষবারের মতো পাহাড়ের পথে ফিরে এল, তখন আকাশে কোনো মেঘ ছিল না। তবে বাতাস ছিল অসম্ভব ভারী। যে জিরগার ভয়ে পুরো উপত্যকা কেঁপে উঠত, আফজালের কফিনের সামনে দাঁড়িয়ে সেই উপত্যকা যেন নিজেই অনুশোচনায় মুখ ঢেকেছিল।
আফজালের মৃত্যুর পর যেন পুরো বিচারব্যবস্থা এক ধাক্কায় জেগে উঠল।
যে লড়াই আফজাল সাত বছর ধরে একা চালিয়ে গিয়েছিলেন, মৃত্যুর পর তা দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ল। ২০১৯ সালের শেষদিকে পাকিস্তান সুপ্রিম কোর্ট জিরগার বিচার ব্যবস্থাকে পুরোপুরি অসংবিধানিক, অবৈধ এবং সমান্তরাল বিচার ব্যবস্থা হিসেবে ঘোষণা দিল। আদালত স্পষ্ট জানিয়ে দিল—আইনের ওপরে কারো অবস্থান নেই। কোনো জিরগার অধিকার নেই মানুষের জীবন নেওয়ার রায় দেওয়ার।
একই বছরের সেপ্টেম্বর মাসে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে গঠিত বিশেষ তদন্ত কমিটি অবশেষে স্বীকার করতে বাধ্য হলো—২০১২ সালের সেই অভিশপ্ত রাতে গান গাওয়ার অপরাধে তিনটি মেয়েকে নির্যাতন করে মেরে ফেলা হয়েছিল। তিন খুনি—মোহাম্মদ উমর, সাবীর আর সাইরকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হলো।
এক অর্থে আফজাল জিতে গিয়েছিলেন। আদালত স্বীকার করেছিল—পাহাড়ের সেই মেয়েগুলো কোনো পাপ করেনি, তাদের অনার কিলিংয়ের নামে ঠান্ডা মাথায় খুন করা হয়েছিল। আফজালের সাত বছরের একাকী রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম ইতিহাস পেল।
কিন্তু পাহাড় কি সত্যিই বদলেছে?
২০২৩ সালের অক্টোবরে এক আইনি ফাঁকফোকর আর তথাকথিত প্রমাণের অভাবে আদালত আবার সেই তিন খুনিকে খালাস দিয়ে দেয়। সুপ্রিম কোর্ট জিরগাকে অবৈধ ঘোষণা করলেও, পাহাড়ের আনাচে-কানাচে আর উপজাতি অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে জিরগার প্রভাব আজও ছায়ার মতো টিকে আছে। সেখানে আজও অনেক মেয়ে রাতে ঘুমায় বুকে ভয় নিয়ে, আজও অনেক সত্যবাদী তরুণ কথা বলতে গেলে নিজের ছায়াকেও ভয় পায়।
আজ কোহিস্তানের নদী আগের মতোই বয়ে চলে। পাইন গাছের বনে বাতাস আগের মতোই 'শুষ' শব্দ করে সুর তোলে।
কিন্তু সেই বাতাসে এখন আর শুধু নদীর গর্জন শোনা যায় না। কান পাতলে আজও যেন শোনা যায় হাততালির সঙ্গে মিষ্টি সুরের গান গাওয়া সেই অচেনা মেয়েগুলোর হাসি, আর তার পরপরই ভেসে আসে আদালতের খালি বারান্দায় একা হেঁটে চলা আফজাল কোহিস্তানির নিঃসঙ্গ পায়ের শব্দ।
আফজাল আজ আর নেই। তাকে কবরের নিচে শান্তিতে শুইয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু যে প্রদীপ সে বুকের রক্ত দিয়ে জ্বালিয়ে দিয়ে গেছে, তা প্রমাণ করে দিয়ে গেছে—পাহাড় যত বিশালই হোক না কেন, মানুষের সত্যের লড়াই তারচেয়েও অনেক বেশি উঁচু।



পাঠকের মন্তব্য