লেখা: এপি তালুকদার
কোনো ভ্রমণের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি কী? নতুন কোনো দেশ দেখা, পাহাড়-সমুদ্রের সৌন্দর্য উপভোগ করা, নাকি দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার তৃপ্তি? শ্রীলঙ্কায় প্রায় দুই সপ্তাহের সাইকেলযাত্রা শেষে ফিরে এসে আমার মনে হয়েছে, একটি ভ্রমণের সবচেয়ে বড় অর্জন আসলে মানুষ। পথ, প্রকৃতি আর মানুষের মমতা মিলেই একটি দেশকে সত্যিকারের সুন্দর করে তোলে।
বহুদিন ধরেই শ্রীলঙ্কায় সাইকেল চালানোর স্বপ্ন দেখছিলাম। ভারত মহাসাগরের তীরঘেঁষা রাস্তা, সবুজ পাহাড়, প্রাচীন নগরী আর প্রকৃতির নিবিড় সৌন্দর্যের দেশটিকে কাছ থেকে দেখার ইচ্ছা ছিল অনেক দিনের। অবশেষে সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নিল। জুলাই মাস, বর্ষার মৌসুম। অনেকে নিরুৎসাহিত করেছিলেন। ভ্রমণেরও তো নিজস্ব সময় থাকে। তাই সব হিসাব-নিকাশ ছাপিয়ে সঙ্গী হলো সাইকেল আর অদম্য ইচ্ছাশক্তি।
যাত্রার শুরুটা সহজ ছিল না। বিমানবন্দরে সাইকেল পরিবহনের অতিরিক্ত খরচ, লাগেজ হারিয়ে যাওয়ার উৎকণ্ঠা, ট্রানজিটের দীর্ঘ অপেক্ষা... সব মিলিয়ে মনে হচ্ছিল, ভ্রমণের প্রথম দিনটিই যেন ধৈর্যের পরীক্ষা। কিন্তু এখন মনে হয়, সেই ছোট ছোট প্রতিবন্ধকতাই পরের দিনগুলোর আনন্দকে আরও গভীর করে তুলেছিল।
নিগম্বো থেকে সাইকেলের প্রথম প্যাডেলে চাপ দিতেই যেন এক নতুন পৃথিবীর দরজা খুলে গেল। ব্যস্ত নগরী ছেড়ে যখন উপকূলীয় রাস্তায় উঠলাম, তখন এক পাশে ভারত মহাসাগরের নীল জলরাশি, অন্য পাশে সারি সারি নারিকেলগাছ। কোথাও রেললাইন সমুদ্রের একেবারে গা ঘেঁষে চলে গেছে, কিছুক্ষণ পরপর ট্রেন ছুটে যাচ্ছে আর তার বাতাস এসে ছুঁয়ে দিচ্ছে পথিককে। সেই মুহূর্তগুলোতে মনে হয়েছে, পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর ভ্রমণ হয়তো খুব দ্রুত নয়, খুব ধীরগতিতেই হয়। যেখানে প্রতিটি দৃশ্যকে সময় নিয়ে অনুভব করা যায়।
এই যাত্রায় প্রতিদিনই প্রায় একশ কিলোমিটারের বেশি সাইকেল চালাতে হয়েছে। কখনও পাহাড়ি পথ, কখনও দীর্ঘ উপকূল, কখনও তীব্র রোদ, কখনও মুখোমুখি বাতাস। শরীর ক্লান্ত হয়েছে, পা ব্যথায় অবশ হয়েছে, কখনও সাইকেলের টায়ার পাংচার হয়েছে, কখনও রাস্তার কুকুর তাড়া করেছে। তবু প্রতিটি কষ্টকে ছাপিয়ে গেছে পথের সৌন্দর্য।
শ্রীলঙ্কার দক্ষিণ উপকূলের সৌন্দর্য ছিল অভূতপূর্ব। গল, উনাওয়াতুনা, মাতারা, টাঙ্গেলে—প্রতিটি পথ যেন আলাদা এক গল্প।
গলের রাস্তা আজও চোখে ভাসে। দুই পাশে ফুটে থাকা কাঠগোলাপ, সাগরের গর্জন, আর ঢেউয়ের ছন্দ যেন এক অদৃশ্য সঙ্গীত সৃষ্টি করেছিল। মাঝেমধ্যে সাইকেল থামিয়ে শুধু বসে থেকেছি। কোনো বিশেষ কারণ ছিল না, শুধু প্রকৃতিকে একটু বেশি সময় ধরে দেখতে ইচ্ছে করছিল।
হাম্বানটোটার বিস্তীর্ণ সবুজ ধানক্ষেত, অনুরাধাপুরার শান্ত বৃক্ষশোভিত পথ, ট্রিনকোমালির সমুদ্রতীর কিংবা পুত্তালামের বিস্তৃত প্রান্তর- প্রতিটি অঞ্চল যেন শ্রীলঙ্কার ভিন্ন ভিন্ন চিত্র তুলে ধরেছে। একই দেশের মধ্যে এত বৈচিত্র্য সত্যিই বিস্ময়কর।
তবে প্রকৃতির চেয়েও বেশি বিস্মিত করেছে সেখানকার মানুষ।
ভাষা ছিল সবচেয়ে বড় বাধা। আমি ইংরেজি বলি, তারা সিংহলি বা তামিল। ইংরেজিও অনেকের অজানা। কিন্তু কোথাও যোগাযোগে সমস্যা হয়নি। কারণ আন্তরিকতার কোনো অভিধান লাগে না।
একটি ছোট্ট খাবারের দোকানে গরম পানি চেয়েছিলাম, শুধু সকালের ওটস বানানোর জন্য। দোকানদার শুধু গরম পানিই দেননি, হাসিমুখে একটি জগও এগিয়ে দিয়েছিলেন। অন্য একদিন প্রচণ্ড গরমে জুস খেতে থেমেছিলাম। বিল দিতে গিয়ে দেখলাম দোকানদার দাম কম নিয়েছেন। আরেক জায়গায় এক বৃদ্ধ নিজের গাছের কাঁচা আম পেড়ে হাতে তুলে দিলেন। বিল দিতে চাইলে শুধু হেসে বললেন, ‘নো, নো।’
আরেকটি ঘটনা তো আরও একধাপ এগিয়ে গেল। দুপুরে খাবার না পেয়ে ফল কিনে হোটেলে ফিরেছিলাম। হোটেলের গৃহকর্ত্রী বিষয়টি জানতে পেরে একটু বকুনির সুরেই বললেন, ‘এভাবে থাকা যায়?’ কিছুক্ষণ পর নিজের রান্না করা ভাত, মুরগির ঝোল আর সবজি এনে সামনে রাখলেন। আমি তখন অতিথি নই, যেন পরিবারেরই একজন।
পুত্তালামের এক পরিবারের সঙ্গে কাটানো শেষ রাতটি আজও মনে দাগ কেটে আছে। ভাষা বুঝতাম না, তারাও আমার ভাষা জানতেন না। তবু ইশারা, হাসি আর চোখের ভাষায় জমে উঠেছিল আড্ডা। তারা নিজের পরিবারের সঙ্গে বসিয়ে রাতের খাবার খাইয়েছিলেন। সেদিন উপলব্ধি করেছিলাম, পৃথিবীর সবচেয়ে উষ্ণ আতিথেয়তা হয়তো বিলাসবহুল হোটেলে নয়, সাধারণ মানুষের ঘরেই লুকিয়ে থাকে।
এই ভ্রমণে আরেকটি বিষয় আমাকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছে আর তা হলো শৃঙ্খলা। একদিন একটি স্কুলের সামনে দেখলাম, স্কুল ইউনিফর্ম পরা এক শিক্ষার্থী হাতে ‘Stop’ ও ‘Go’ লেখা প্ল্যাকার্ড নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বাস থেকে শিক্ষার্থীরা নামলে সে প্ল্যাকার্ড তুলে ধরে গাড়ি থামিয়ে দিচ্ছে। আশ্চর্যের বিষয়, প্রতিটি চালক কোনো বিরক্তি ছাড়াই নির্দেশ মেনে অপেক্ষা করছেন। একটি ছোট্ট দৃশ্য, অথচ একটি সমাজের নাগরিক সচেতনতার বড় প্রতিচ্ছবি।
সাইকেল ভ্রমণের একটি বড় সৌন্দর্য হলো, এটি আপনাকে ধীর হতে শেখায়। গাড়ির জানালা দিয়ে যে দৃশ্য মুহূর্তেই হারিয়ে যায়, সাইকেলের গতিতে তা ধীরে ধীরে মনের ভেতর জায়গা করে নেয়। পথের ধারের চায়ের দোকান, গাছের ছায়া, মাঠে কাজ করা কৃষক, স্কুলফেরত শিশুর হাসি- সবই তখন ভ্রমণের অংশ হয়ে ওঠে।
শ্রীলঙ্কা আমাকে শিখিয়েছে, ভ্রমণের সাফল্য কেবল কত কিলোমিটার পথ পাড়ি দিলাম, তার ওপর নির্ভর করে না। বরং নির্ভর করে কতগুলো মানুষের হাসি সঙ্গে নিয়ে ফিরলাম, কতগুলো গল্প হৃদয়ে জমা হলো, আর কতবার মনে হলো- পৃথিবী এখনো সুন্দর।
ফিরতি বিমানে বসে জানালার বাইরে তাকিয়ে মনে হচ্ছিল, আমার সাইকেলের চাকা হয়তো থেমে গেছে, কিন্তু পথ শেষ হয়নি। কারণ কিছু ভ্রমণ গন্তব্যে গিয়ে শেষ হয় না, তা মানুষের ভেতরে নতুন এক যাত্রার শুরু করে।
এই কারণেই ভ্রমণ আমার কাছে শুধু পথচলা নয়, এটি নিজেকে নতুন করে আবিষ্কারের আরেকটি নাম।
আর তাই এবার শ্রীলঙ্কায় ১০ দিনে ১০৮০ কিলোমিটার সাইক্লিং এবং ২ দিনে অ্যাডামস পিক ট্রেকিং করে মনে হয়েছে নিজেকে নতুনভাবে আবিষ্কার করেছি।
প্রতিটি প্যাডেলে ছিল সাহস, প্রতিটি পথে ছিল নতুন গল্প।
সীমান্ত পেরিয়ে শুধু পথ নয়, ছুঁয়ে দেখেছি মানুষ, সংস্কৃতি আর অসংখ্য ভালোবাসা।
এই যাত্রা শেষ, কিন্তু স্বপ্নের পথচলা এখনও বাকি।



পাঠকের মন্তব্য