একসময় রাজনৈতিক স্যাটায়ারের প্রধান মাধ্যম ছিল সংবাদপত্রের কার্টুন। তারপর এই জায়গা দখল করে টেলিভিশনের স্যাটায়ারিকাল শো, কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে সেই জায়গা দখল করেছে স্ট্যাটিক কিংবা ভিডিও মিম কিংবা ফটোকার্ড । আজকের রাজনৈতিক আন্দোলন কেবল রাজপথে সীমাবদ্ধ নয়, তা একইসঙ্গে টাইমলাইন, নিউজফিড, কমেন্ট সেকশন এবং রিলসের মাধ্যমেও করছে এখনকার প্রজন্ম। আমাদের জুলাইয়ের পর ভারতের Cockroach Janata Party (CJP)র আন্দোলনেও এবার আমরা দেখতে পেলাম স্যাটায়ারের সেই শক্তি।
প্রতিটি যুগেই ক্ষমতার বিরুদ্ধে স্যাটায়ার একটি কার্যকর অস্ত্র হিসেবে কাজ করেছে। কারণ ভয় যেখানে মানুষের কণ্ঠ রুদ্ধ করে, ব্যঙ্গ সেখানে শাসকের গাম্ভীর্যকে ভেঙে দেয়। CJP আন্দোলনে ঠিক সেটাই ঘটেছে। মানুষ স্লোগানের পাশাপাশি মিম বানিয়েছে, বক্তৃতার পাশাপাশি কার্টুন এঁকেছে, আর রাজনৈতিক ভাষণের পাশাপাশি ব্যঙ্গাত্মক প্ল্যাকার্ড হাতে রাস্তায় নেমেছে। ফলে আন্দোলনটি শুধু কোনো সাধারণ রাজনৈতিক কর্মসূচি হয়ে থাকেনি, হয়ে উঠেছিল আত্মঅহংকারে ডুবে থাকা সরকারের বিরুদ্ধে একটি কালচালার ওয়ার।
CJP আন্দোলনের অন্যতম শক্তি ছিল সোশ্যাল মিডিয়ায় এর দ্রুততা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অসংখ্য ব্যবহারকারী একই ঘটনার ভিন্ন ভিন্ন সংস্করণ তৈরি করেছেন। একটি ছবি, একটি সংলাপ, একটি সিনেমার দৃশ্য বা জনপ্রিয় মিম টেমপ্লেটকে নতুন অর্থে ব্যবহার করে রাজনৈতিক মন্তব্য করা হয়েছে। এর ফলে আন্দোলনের বার্তা সংগঠনের কেন্দ্র থেকে নয়, বরং হাজার হাজার সাধারণ মানুষের হাত ধরে ছড়িয়ে পড়েছে। মিমের একটি বড় শক্তি হলো এর সহজবোধ্যতা এবং সহজলভ্যতা। অনেকে না মানলেও এ যুগের নব্য এই আর্ট ফর্মের আর্টিস্ট হতে হলে গান, নাচ কিংবা ছবি আঁকার মতো আলাদা করে স্কিল ডেভেলপ করতে হয় না। শুধু আপনাকে সোশ্যাল মিডিয়ায় থাকতে হবে অ্যাক্টিভ আর থাকতে হবে একটু হিউমার। যার ফলে এই ধরনের আন্দোলনগুলোতে মানুষ অন্যের মিম দেখেই থেমে থাকেনি । সেটিকে নিজের মতো করে নতুনভাবে সম্পাদনা করেছে, নিজের ভাষায় লিখেছে, নতুন প্রসঙ্গে ব্যবহার করেছে। ফলে প্রতিবাদ একটি ‘শেয়ারযোগ্য’ সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে।
ককরোচ পার্টির আন্দোলনে মিম রেখেছে একটা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা
CJP আন্দোলনে স্যাটায়ারের ব্যবহার ছিল বহুমাত্রিক। আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে সরকারি প্রোপাগান্ডা, রাজনৈতিক প্রচারণা, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত কিংবা অতিরঞ্জিত জাতীয়তাবাদ, সবকিছুই ব্যঙ্গের উপাদানে পরিণত হয়েছিল। এখানে লক্ষ্য ছিল কাউকে ব্যক্তিগতভাবে অপমান করা নয়, বরং ক্ষমতার দম্ভকে পাল্টা জবাব দেওয়া। রাজনৈতিক স্যাটায়ারের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো এটি দর্শককে একইসঙ্গে হাসায় এবং ভাবায়। একজন মানুষ হয়তো প্রথমে একটি মিম দেখে হাসলেন, কিন্তু কিছুক্ষণ পর বুঝলেন সেটি আসলে একটি গভীর রাজনৈতিক সমালোচনা। এই দ্বৈত প্রভাবই স্যাটায়ারকে কার্যকর করে তোলে। আর এটিই ঘটেছে এই আন্দোলনে।
অন্যদিকে, রাজনৈতিক কার্টুনের ইতিহাস শত বছরেরও বেশি পুরোনো হলেও CJP আন্দোলনে সেই ঐতিহ্য নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে মিলিত হয়েছে। ডিজিটাল ইলাস্ট্রেশন, কমিক স্ট্রিপ এবং এক ফ্রেমের ব্যঙ্গচিত্র আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ ভিজ্যুয়াল উপাদানে পরিণত হয়। অনেক কার্টুনে ককরোচকে সাধারণ মানুষের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। কারণ সাধারণ মানুষরা সরকারের চোখে ছোট, উপেক্ষিত, কিন্তু টিকে থাকার ক্ষমতায় অসাধারণ, যেটি অবশ্য বেশিরভাগ সরকারই আবার জানেন না। আবার কোথাও ককরোচ ক্ষমতার ভয়কে ব্যঙ্গ করার রূপক হিসেবে এসেছে। একটি ভালো রাজনৈতিক কার্টুনের সবচেয়ে বড় গুণ হলো সেটি ভাষা ছাড়াও কথা বলতে পারে। যে ছবি দিল্লিতে মানুষ বুঝেছে, একই ছবি ঢাকা, কলকাতা কিংবা লন্ডনের দর্শকও ভিন্ন প্রেক্ষাপটে উপলব্ধি করতে পারে।
বরাবরের মতো, জেন-জিদের আন্দোলনের একতা বড় হাতিয়ার ছিল কার্টুন
এবার আসি একটু প্ল্যাকার্ডের আলাপে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বের বিভিন্ন আন্দোলনে প্ল্যাকার্ডের ভাষা বদলে গেছে। একসময় সেখানে থাকত কেবল নিরস স্লোগান, এখন সেখানে থাকে রসিকতা, সিনেমার সংলাপ, ইন্টারনেট মিম, জনপ্রিয় গান কিংবা শব্দের খেলা। CJP আন্দোলনেও এই প্রবণতা স্পষ্ট। অনেক প্ল্যাকার্ড দেখে মনে হয়েছে যেন সেগুলো সরাসরি টুইটার বা রেডিট থেকে বেরিয়ে এসেছে। আবার অনেক অনলাইন মিম কয়েক দিনের মধ্যেই বাস্তব প্ল্যাকার্ডে রূপ নিয়েছে। অনলাইন থেকে অফলাইন এবং অফলাইন থেকে আবার ছবির মাধ্যমে অনলাইনে ফিরে আসার এই বিনিময় আন্দোলনের বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। একটি প্ল্যাকার্ডের ছবি হাজারো বার শেয়ার হয়েছে, আবার সেই ভাইরাল ছবিকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে নতুন মিম।
এবারের আন্দোলনের একটা ভিন্ন বৈশিষ্ট্য ছিল স্যাটায়ারিস্টিক বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড
অনেকে মনে করেন অতিরিক্ত স্যাটায়ার আন্দোলনের গুরুত্ব কমিয়ে দেয়। কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা প্রায়ই তার উল্টো কথা বলে, অন্তত সম্প্রতি দক্ষিণ এশিয়াতে হওয়া দুটো আন্দোলন আমাদের সেটিই বলে। স্যাটায়ার মানুষকে ভয় কাটাতে সাহায্য করে এবং যেটা আগেও বললাম এই সংস্কৃতি একইসঙ্গে অংশগ্রহণের বাধাও কমায়। যে ব্যক্তি হয়তো রাজনৈতিক বক্তৃতা দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না, তিনিও একটি মিম বানিয়ে একাত্মতা প্রকাশ করতে পারেন যেকোনো আন্দোলনে। ফলে আন্দোলনের সাংস্কৃতিক পরিসর বড় হয় এবং নতুন মানুষ যুক্ত হওয়ার সুযোগ পায়। একইসাথে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদমের এই এক খেল, এই প্ল্যাটফর্ম সাধারণত এমন কনটেন্টকে ছড়িয়ে দেয়, যেগুলো মানুষ বেশি শেয়ার করে। রাজনৈতিক বিশ্লেষণের তুলনায় এসব কন্টেন্ট অনেক দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এই বাস্তবতাকে CJP আন্দোলনের অংশগ্রহণকারীরা দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করেছেন। দীর্ঘ বিবৃতির বদলে ছোট, বুদ্ধিদীপ্ত এবং শেয়ারযোগ্য কনটেন্ট তৈরি হয়েছে। এতে আন্দোলনের বার্তা এমন অনেক মানুষের কাছেও পৌঁছেছে, যারা সাধারণত রাজনৈতিক আলোচনায় অংশ নেন না।
Cockroach Janata Party আন্দোলনের সবচেয়ে বড় সাফল্য হয়তো কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ফল নয়; বরং প্রতিবাদের ভাষাকে নতুনভাবে কল্পনা করা। এই আন্দোলন দেখিয়েছে যে রাজনৈতিক যোগাযোগ এখন আর একমুখী নয়। প্রত্যেক অংশগ্রহণকারী একই সঙ্গে দর্শক, নির্মাতা এবং প্রচারক। একটি ছবি, একটি ব্যঙ্গচিত্র বা একটি মিম কখনও কখনও দীর্ঘ বক্তৃতার চেয়েও বেশি মানুষকে ভাবাতে পারে। হয়তো এ কারণেই CJP আন্দোলনের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র ছিল না কোনো মঞ্চ, মাইক বা স্লোগান। বরং ছিল মানুষের সম্মিলিত কল্পনাশক্তি, যেখানে হাসি প্রতিবাদের ভাষা হয়েছে, ব্যঙ্গ রাজনৈতিক সমালোচনায় পরিণত হয়েছে, আর একটি ছোট্ট ককরোচ ক্ষমতার বিশাল বয়ানকে চ্যালেঞ্জ জানানোর প্রতীকে রূপ নিয়েছে।






পাঠকের মন্তব্য