১২ বার প্রত্যাখানের পর যেভাবে প্রকাশিত হলো হ্যারি পটার

২২৯ পঠিত ... ৪ ঘন্টা ৫২ মিনিট আগে

WhatsApp Image 2026-07-31 at 3.24.43 PM

ট্রেনে বসে আছে জোয়ান রাউলিং। ট্রেনের মেশিনপাতিতে ঝামেলা হওয়ায় লেট ৪ ঘন্টা। লন্ডনে বিসিএস সিস্টেম না থাকায় সে আসলে সাধারণ না অসাধারণ মানুষ তা জিজ্ঞেস করার কেউ নাই! কাজেই নিজের মনের ভাবনার জগৎ মেলে দিলেন রাউলিং।

হুমমম… কী ভাবা যায়? একটা ছেলে… কেমন ছেলে? ছোট ছেলে, গোল গোল চশমা পরা… কপালে দাগ… কীসের দাগ? ও জাদুকর… কিন্তু জানে না যে ও জাদুকর…

এভাবে রাউলিং গল্পের জাল বুনতে থাকেন। অনেক্ষন পর খেয়াল হয় আরে! গল্প লিখে রাখার মতো তো এখন হাতে কিছু নাই! ঘটনাও ১৯৯০ সালের, তখন হাতে হাতে ফোন ছিল না, থাকলেও এত ফিচার ছিল না! কী করা যায়? রাউলিং মাথায় গল্পের প্লট নিয়ে ঘুরতে থাকেন। বারবার মনে করতে থাকেন ডিটেলস যেন ভুলে না যান। বাসায় ফিরেই কাগজ কলম নিয়ে বসে পড়েন। আর সেটা যেন ছিল আরেকটা জগতে যাওয়ার পোর্টাল!

কী ভাবছেন? একটা ট্রেন লেট হওয়ায় বসে বসে গল্প লিখে ফেললেন রাউলিং হুদাই? আসলে না। এই গল্প ফাঁদার ব্যাপারটা রাউলিং এর বহুদিনের প্র্যাক্টিস! আরে তার ছোটোবোন ডিয়ানা রাউলিং, ছোটো থাকতে গল্প না শুনলে ঘুমাতেই চাইতেন না! প্রতি রাতে তাই বড়বোন জোয়ান ছোটোবোনকে শোনাতেন গল্প। কী নেই সেসব গল্পে! জাদুকর, ড্রাগন, অ্যাডভেঞ্চার, বন-জঙ্গল, ডাইনি… আর ছোটোবোন ডিয়ানা সেসব গল্প গোগ্রাসে গিলতেন যেন! 

জোয়ানের প্রথম লেখা গল্পের নাম র‍্যাবিট, তখন তার বয়স ছয়। কাজেই বুঝতে পারছেন হ্যারি পটার দিয়েই যে তার গল্প লেখার হাতেখড়ি- ব্যাপারটা একদমই তা না!

ফিরে যাই ছোটো ছেলেটির গল্পে। জোয়ান একদমই সোজাসাপটা একটা নাম রাখলেন, হ্যারি পটার। তখনও তিনি জানতেন না, এই নামটিই একটা সময় সারাবিশ্বে শিশু থেকে বৃদ্ধ-হাজার মানুষের হৃদয়ে গেঁথে যাবে, গড়ে উঠবে এক আলাদা জগত! যাক খসড়া তৈরী করতে শুরু করলেন হ্যারি পটারের একদম প্রথম গল্প হ্যারি পটার অ্যান্ড দ্যা সোরসারাস স্টোন (যেটা পরবর্তীতে ফিলোসফার্স স্টোন নামে পরিচিতি পায়)। কিন্তু জীবন তার জন্য সোজা ছিল না। গল্পের বইয়ের কাজে হাত দেওয়ার কিছুদিন পরই মারা যান তার মা। রাউলিং তার মাকে ভীষণ ভালোবাসতেন। মায়ের মৃত্যু তাকে গভীর আঘাত করে। এই শোকের ছোঁয়া লাগে হ্যারি পটার বইয়ে…হ্যারি পটারের বাবা-মাকে হারানোর বেদনা,  'মিরর অব এরিসেড' -এ নিজের মা-বাবাকে দেখার যে তীব্র ব্যাকুলতা, তা মূলত রাউলিংয়ের নিজস্ব শোকেরই প্রতিফলন ছিল।

মায়ের মৃত্যুর পর ১৯৯১ সালে রাউলিং পর্তুগালে চলে যান ইংরেজির টিচার হিসেবে কাজ করতে। সেখানে গিয়ে তার পরিচয় হয় পর্তুগিজ সাংবাদিক জর্জ আরান্তেসের সাথে। ১৯৯২ সালে তারা বিয়ে করেন। ১৯৯৩ সালে তাদের কন্যাসন্তান জেসিকার জন্ম হয়। কিন্তু এই সংসার টেকেনি। পারিবারিক ঝামেলা ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়ে ১৯৯৩ সালের শেষের দিকে রাউলিং জেসিকাকে কোলে নিয়ে মাত্র একটি সুটকেস নিয়ে স্কটল্যান্ডের এডিনবার্গে চলে যান। সাথে ছিল হ্যারি পটারের প্রথম তিন অধ্যায়ের খসড়া পাণ্ডুলিপি। 

কিন্তু এডিনবার্গে পৌঁছানোর পর রাউলিংয়ের জীবনে ভালো কিছু হয় এমন না। বরং চরম অর্থনৈতিক সংকট শুরু হয়।। কোনো চাকরি ছিল না, কোলে ছোটো বাচ্চা, থাকার মতো কোনো জায়গা ছিল না। সরকারি ভাতাই ছিল জীবনে চলার একমাত্র উপায়। রাউলিং নিজেই বলেছেন, আমি ছিলাম আধুনিক ব্রিটেনে রাস্তায় না থেকে যতটা গরীব হওয়া সম্ভব, ঠিক ততটাই গরীব।

কিন্তু এত কষ্টের মধ্যেও তিনি তার গল্পের স্বপ্নকে মরে যেতে দেননি। ঘরে হিটিং সিস্টেম না থাকায় জেসিকাকে নিয়ে তিনি এডিনবার্গের রাস্তায় রাস্তায় হাঁটতেন। জেসিকা যখন ঘুমে ঢলে পড়ত, রাউলিং তখন লোকাল ক্যাফেগুলোতে গিয়ে বসতেন। বিশেষ করে নিকলসনস ক্যাফে এবং দ্য এলিফ্যান্ট হাউজ ক্যাফেতে বসে তিনি এক কাপ কফি কিনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা হ্যারি পটারের খসড়া লিখতেন।

শুধু ক্যাফেই নয়, বহু সময় তিনি কাটিয়েছেন এডিনবার্গের ওয়েভারলি রেলস্টেশনের বেঞ্চে বসে। ট্রেনের চাকার খটখট শব্দের মাঝে, প্ল্যাটফর্মের কোলাহলের মধ্যে একটি পুরানো ম্যানুয়াল টাইপরাইটারে তিনি হ্যারি পটার অ্যান্ড দ্য সোরসার্স স্টোনের খসড়া সাজাতেন। ঠান্ডা থেকে বাঁচতে আর ঘরের দমবন্ধ পরিবেশ এড়াতে স্টেশনের ওয়েটিং রুম বা ক্যাফেগুলোই ছিল তার আশ্রয়। নিজের নোটবুক, জ্যাকেটের পকেটে গুঁজে রাখা কাগজের টুকরো, কিংবা ক্যাফের টিস্যু পেপারে পর্যন্ত তিনি গল্পের প্লট ও চরিত্রের সবকিছু লিখে রাখতেন। 

১৯৯৫ সালে দীর্ঘ সংগ্রাম ও শ্রমের পর রাউলিং একটি পুরানো ম্যানুয়াল টাইপরাইটারে টাইপ করে হ্যারি পটার অ্যান্ড দ্য ফিলোসফার্স স্টোন (Harry Potter and the Philosopher's Stone)-এর প্রথম পাণ্ডুলিপি শেষ করেন। 

এরপর শুরু হলো আরেক সংগ্রাম। কোনো প্রকাশক এই বই পাবলিশ করতে রাজী না। বই পড়ে আমতা আমতা করে বলে, ইয়ে… বইটা বাচ্চাদের জন্য একটু কঠিন। আর এখনকার বাচ্চারা ওসব যাদু-ফাদু রূপকথার বই পড়ে না! তাছাড়া এই লেখিকাকেও কেউ চেনে না, বই পাবলিশ করলে কেউ কেন কিনবে?

রাউলিং আশা ছাড়েননা। একে একে রিজেক্ট করেন ১২জন প্রকাশক। কোনো কোনো প্রকাশক রাউলিং দেউলিয়া হয়ে যাচ্ছেন দেখে তাকে পরামর্শও দিয়েছিলেন, শিশুদের বই লিখে জীবন চালানো সম্ভব না আপনি বরং গিয়ে একটা চাকরি খুঁজুন। 

১৩ বারে এসে পাণ্ডুলিপিটি যায় একটা নতুন, ছোটো প্রকাশনা সংস্থা ব্লুমসবেরির হাতে। ব্লুমসবারির প্রধান সম্পাদক নাইজেল নিউটন পাণডুলিপিটা নিয়ে পড়তে দেয় তার আট বছরের মেয়ে অ্যালাইস নিউটনকে। অ্যালাইস প্রথম অধ্যায়টি পড়েই এতটাই মুগ্ধ হয়ে যায় যে, সে বাবার কাছে পরের অধ্যায়গুলোর জন্য বায়না ধরে। নাইজেল যখন দোটানায় ভুগছিলেন যে এই তিনি প্রকাশ করবেন কি না, তখন অ্যালাইস রীতিমতো জেদ ধরে বসে যেন এই বই ছাপা হয়। 

১৯৯৬ সালের আগস্টে ব্লুমসবারি রাউলিং এর সাথে মাত্র ১৫০০ পাউন্ডের এক অগ্রিম চুক্তি করে। তবে ব্লুমসবেরী রাউলিংকে একটি অদ্ভুত পরামর্শ দেয়। তাঁরা মনে করেছিলেন, একজন নারীর লেখা বই ছেলেরা পড়তে নাও চাইতে পারে। তাই লেখিকার আসল নাম 'জোয়ান রাউলিং' ব্যবহার না করে ছদ্মনাম ব্যবহারের পরামর্শ দেন। রাউলিং তার দাদীর নাম 'কেথলিন' থেকে 'K' অক্ষরটি নিয়ে নিজের নামের সাথে যোগ করেন। তৈরি হয় ঐতিহাসিক ছদ্মনাম 'জে কে রাউলিং' (J. K. Rowling)। 

১৯৯৭ সালের ২৬ জুন, মাত্র ৫০০ কপি ছাপিয়ে বাজারে আসে 'হ্যারি পটার অ্যান্ড দ্য ফিলোসফার্স স্টোন'। যার মধ্যে ৩০০ কপি পাঠানো হয়েছিল বিভিন্ন লাইব্রেরিতে। কিন্তু প্রকাশের পরপরই মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়তে থাকে এই বইয়ের গল্প। সমালোচকদের প্রশংসায় বইটি হু হু করে বিক্রি হতে শুরু করে। আজ পর্যন্ত হ্যারি পটার সিরিজের সাতটি বই বিশ্বের ৮০টিরও বেশি ভাষায় অনুবাদ হয়েছে। বিক্রি হয়েছে ৫০০ মিলিয়নেরও বেশি কপি। এটি ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া বইয়ের ফ্র্যাঞ্চাইজ। 

রাউলিং পরবর্তীকালে বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে বলেছেন, তিনি জীবনের অন্য কোনো সময় কোনো ভাবনার প্রতি এত দ্রুত ও তীব্র রোমাঞ্চ অনুভব করেননি। কিন্তু সেই মুহূর্তে তাঁর কাছে কোনো কলম বা কাগজ ছিল না, আর লাজুক স্বভাবের কারণে ট্রেনের সহযাত্রীদের কাছে কলম চাইতেও তিনি দ্বিধা করছিলেন। ফলে পরবর্তী চার ঘণ্টা ধরে তিনি নিজের মাথার ভেতরেই চরিত্রটি এবং তার চারপাশের বিশ্বকে গড়ে তুলতে থাকেন।

তিনি কল্পনা করতে শুরু করেন হগওয়ার্টস স্কুল অব উইচক্রাফট অ্যান্ড উইজার্ডরি, তার চারপাশের জাদু, ভূত, উড়ন্ত ঝাড়ু এবং প্রধান চরিত্র হ্যারি, রন ও হারমায়োনিকে। যখন তিনি লন্ডনের কিংস ক্রস স্টেশনে নামলেন, ততক্ষণে গল্পের মূল কাঠামোটি তাঁর মাথায় পুরোপুরি তৈরি হয়ে গিয়েছিল। আর সেই থেকেই 'কিংস ক্রস স্টেশন' এবং বিখ্যাত 'প্ল্যাটফর্ম ৯¾' হ্যারি পটার সিরিজের এক অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়।

ভাগ্যিস সেদিন ট্রেন লেট ছিল। ভাগ্যিস ১২ বার ব্যর্থতার পরও রাউলিং ১৩তম বার চেষ্টা করেছিলেন। সেজন্যই আজ এক জাদুর দুনিয়ার জন্ম হয়েছে, যা মুগ্ধ করে রাখছে কোটি কোটি মানুষকে। নিষ্ঠুর বাস্তব দুনিয়া থেকে স্বস্তি দিচ্ছে, হারিয়ে যেতে দিচ্ছে এক জাদুর দুনিয়ায়!

শুভ জন্মদিন জোয়ান রাউলিং!

তথ্যসূত্র: লেখিকার নিজস্ব ওয়েবসাইট। 

২২৯ পঠিত ... ৪ ঘন্টা ৫২ মিনিট আগে

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top