লেখা: আবু বকর সিদ্দীক যাবের
মাদ্রাসা কেন, কোথাও শিশুদের প্রহার করার সুযোগ নাই। না শরীয়তে, না রাষ্ট্রীয় আইনে। এসব বন্ধ হতেই হবে।
হযরত আয়েশা (রা.) বলেছেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) কখনও তার কোনো স্ত্রী, সেবক বা কোনো শিশুকে নিজের হাত দিয়ে আঘাত করেননি। (সহীহ মুসলিম)
আমি জীবনে হেফজ পড়তে গিয়ে প্রহৃত হয়েছি ৩ বছর আর বাকি ১০-১৫ বছর মনে পড়ে না ৫-১০টার বেশি বেত বা স্কেলের বাড়ি পেয়েছি। মাদ্রাসায় একবার তো চোখটাও যেতে নিছিল কারণ বেত লেগেছে চোখের নিচে। আরামের শরীরে অন্য কোথাও বেত নিতে পারতাম না। একবার দুই হাতে ৪০০+ বেতের বাড়ি নিতে হইছিল। একবার তো মায়ের সামনেই পেটালো। মা তখন বলে নাই, পরে হুজুরের বাসায় গিয়ে তার ওয়াইফকে ঝেড়েছিল আর বাসায় এসে কান্না করেছিল। জানলাম সেদিন।
বিএনপি আমলে না জানি তত্ত্বাবধায়ক আমলে এটা আইন করে নিষিদ্ধ করা হইছিল। তারপর আমাদের বেশ কিছু উস্তাদকেও দেখেছি অব্যাহতি পেয়েছেন।
মাদ্রাসার যারা ছাত্রদের পেটান তাদের জন্য আল্লাহ যথেষ্ট কারণ এই শিশু তো নাবালক আর তাই তার হকের পক্ষে আল্লাহ নিজেই থাকবেন। সাবালক হলে সেটা হক্কুল ইবাদ। নাবালকের জিম্মা আল্লাহর।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তোমাদের প্রত্যেকেই রাখাল (দায়িত্বশীল) এবং প্রত্যেকেই তার অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। (সহীহ বুখারী)।
এই হুকুম যদি কেউ বোঝেন তাহলে-ইসলামের এসেন্সটা বুঝতে পারবেন যে, শিশু প্রহার বা নির্যাতনের কারণে দুনিয়া ও আখিরাত দুইটাই যাবে।
যে শিশুদের স্নেহ করে না সে তো মুমিনদের দলভুক্ত না। এখন সে মাওলানা হোক চাই হাফেজ হোক। কিছু আসে যায় না। নবীজি (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি আমাদের ছোটোদের স্নেহ করে না এবং আমাদের বড়দের সম্মান প্রদর্শন করে না, সে আমাদের দলভুক্ত নয়। (সুনান আত-তিরমিজি)
এক বেদুইন এসে রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে বাচ্চাদের চুমু খেতে দেখে বলল, আপনারা সন্তানদের চুমু খান? আমরা তো খাই না।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, আল্লাহ যদি তোমার অন্তর থেকে দয়া ছিনিয়ে নেন, তবে আমার কী করার আছে? (সহীহ বুখারী)
আমাদের এক স্যার বলেছিলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বা জামিয়ার মুহাদ্দিস হিসেবে নিয়োগ পায় সবচেয়ে শিক্ষিত লোকটা পিএইচডিধারী কিন্তু শিশুর মতো সেনসিটিভ স্টেজে শিক্ষক নিয়োগ হয় আধা শিক্ষিত আর স্বল্প বয়সী যে নিজেও তার জীবনে স্টেবল না। কারণ আমাদের ধারণা শিশুদের পড়ানো তো এটা সহজ। অথচ ভুলে যাই শিশুদের সাবজেক্ট হয়তো সহজ, কিন্তু শিশু মোটেই সহজ না। এটা মানবের এমন একটা স্টেজ যেটার ভিত্তিতে সেই মানবের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে। শিশু শিক্ষায় তাই শিক্ষিত ও সেন্সিবল লোক দরকার।
উচ্চশিক্ষিত আর ভদ্র-মার্জিত পরিবারের মানুষদের শিশুশিক্ষায় দায়িত্ব দিন। বেতন সুবিধা বাড়িয়ে দিন। আর সরকার এটা কমপ্লায়েন্সে আনেন, যার সামর্থ্য নাই তার শিশুদের পড়ায়ে বাণিজ্য করার দরকার নাই।
শিক্ষা বাণিজ্য করতে হলে ঠিকঠাক করেন আর সেবা দিলে উচ্চশিক্ষিত মানুষ এগিয়ে আসেন। যার বৈষয়িক দক্ষতার সাথে মানবিক মূল্যবোধ, পারিবারিক দীক্ষা এবং সহনশীলতার সাথে মেন্টাল হেলথ সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। দ্বীনের জ্ঞান তো লাগবেই। হযরত আনাস (রা.) ১০ বছর বয়স থেকে নবীজী (সা.)-এর খিদমত করেছেন। তিনি বলেছেন, আমি দীর্ঘ ১০ বছর নবীজী (সা.)-এর সেবা করেছি। তিনি কখনও আমার ওপর বিরক্ত হয়ে 'উফ' শব্দটিও করেননি। আমি কোনো কাজ করলে তিনি কখনও বলেননি, 'কেন এটা করলে?' আমি কোনো কাজ না করলে তিনি কখনও বলেননি, 'কেন এটা করলে না?' (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)
মাদ্রাসার হুজুররা প্রহার করে বলে তাকে ছাইড়েন না। আবার স্কুলের প্রহারের কথা ভুইলেন না। এই ব্যাধি সব জায়গায়। যান মফস্বলে বা অনুন্নত স্কুলে। দেখবেন, এসবের রকমফের। অপরাধীর কোনো জাতি গোষ্ঠী বানায়েন না।
খতিব আব্দুল মালেক সাহেব ও মুফতি দেলোয়ার সাহেবকে ডেকে জিজ্ঞেস করেন তারা বলবে আপনাকে একশ একটা দলিল দিয়ে, যাতে আপনি কোনো উপায়েই এই প্রহারকে জায়েজ করতে পারবেন না।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আল্লাহ তাআলা অত্যন্ত কোমল এবং তিনি সব বিষয়ে কোমলতা পছন্দ করেন। (সহীহ বুখারী)। শিশুদের ভুলের ক্ষেত্রে মারধর না করে বুঝিয়ে বলাই ইসলামের শিক্ষা।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, সেই ব্যক্তি শক্তিশালী নয় যে কুস্তিতে অন্যকে হারিয়ে দেয়, বরং প্রকৃত শক্তিশালী সেই ব্যক্তি যে রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। (সহীহ বুখারী)
আল্লাহ আমাদের বোঝার তাওফিক দিক!



পাঠকের মন্তব্য