মিরপুর রূপনগর মোড়ে সকাল সাতটা বাজতেই লম্বা একটা লাইন তৈরি হয়ে গেছে। চাল, ডাল আর ভোজ্যতেলের দাম যেখানে দিন দিন নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে, সেখানে সরকারের টিসিবির ট্রাকই নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের শেষ ভরসা। রোদের তাপ বাড়ার আগেই একটু সস্তায় নিত্যপণ্য কিনতে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছেন রিকশাচালক, গৃহিণী, এমনকি অবসরপ্রাপ্ত বৃদ্ধও।
কিন্তু তারা কেউ জানতেন না, যে দেয়ালটির ছায়ায় দাঁড়িয়ে তারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছেন, সেই দেয়ালটিই আড়ালে তাদের জন্য এক মারণফাঁদ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
হঠাৎ এক বিকট শব্দ। চারপাশের কোলাহল মুহূর্তে বদলে গেল চিৎকার আর আতঙ্কে। ধুলোবালি আর প্লাস্টিকের বস্তার স্তূপের নিচে চাপা পড়লেন লাইনে থাকা মানুষগুলো। চোখের পলকে ঝরে গেল দুটি তাজা প্রাণ, আহত হলেন আরও বেশ কয়েকজন। মিরপুর বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের যে সীমানাপ্রাচীর দীর্ঘদিনের অবহেলায় জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছিল, ঠিক সেই দেয়ালের কোলঘেঁষেই বসানো হয়েছিল টিসিবির ট্রাক।
দৃশ্যত এটি একটি দুর্ঘটনা মনে হলেও এটি আদতে কোনো দুর্ঘটনা নয়। বরং এটাকে বলা যায় কাঠামোবদ্ধ হত্যাকাণ্ড কিংবা অব্যবস্থাপনাজনিত খুন। একটু খতিয়ে দেখলে যে খুনের সাথে সরকারের একাধিক প্রতিষ্ঠানের যোগসূত্র পাওয়া যায়।
১. টিসিবি ও ডিলার
একটি পণ্য বিক্রির স্পট নির্ধারণ করা মোটেও কেবল ট্রাক এনে দাঁড় করিয়ে দেওয়ার বিষয় নয়। সেখানে আসা শত শত মানুষের নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করা টিসিবি ও তাদের নিয়োজিত ডিলারের প্রথম দায়িত্ব ছিল। কোনো ধরনের ঝুঁকি পর্যালোচনা না করে, জরাজীর্ণ দেয়ালের পাশে সাধারণ মানুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড় করিয়ে রাখা এবং ভিড় সামলানোর মতো কোনো কর্মী না রাখা ছিল অবহেলার এক চরম নমুনা।
২. কলেজ কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট বিভাগ
ধসে পড়া দেয়ালটি ছিল মিরপুর বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের। নিজের প্রতিষ্ঠানের সীমানাপ্রাচীরটি সুরক্ষিত আছে কি না, বা তা চলাচলের পথ কিংবা পথচারীদের জন্য বিপদ ডেকে আনছে কি না—তা তদারকি করা কলেজের পরিচালনা পর্ষদের আইনি ও নৈতিক দায়িত্ব। জরাজীর্ণ দেয়ালটি সংস্কার না করা, কিংবা সেখানে অন্তত একটি ঝুঁকিপূর্ণ সাইনবোর্ড না ঝুলিয়ে নীরব থাকা এই করুণ পরিণতির মূল অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে।
৩. ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন
একটি নগরের ফুটপাত বা সড়কের পাশের অবকাঠামো কতটা নিরাপদ, তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা সিটি কর্পোরেশনের কাজ। শহরের যত্রতত্র ছড়িয়ে থাকা ঝুঁকিপূর্ণ দেয়াল বা স্থাপনা চিহ্নিত করে নোটিশ দেওয়া কিংবা অপসারণের যে সার্বিক দায়িত্ব থাকে, ডিএনসিসি তা পালন করতে ব্যর্থ হয়েছে।
৪. রাজউক
রাজধানীর ছোট-বড় সব ধরনের স্থায়ী বা অস্থায়ী কাঠামোর মান ও স্থায়িত্ব নিশ্চিতের অভিভাবক রাজউক। নগরজুড়ে জরাজীর্ণ সীমানাপ্রাচীরগুলো যে বছরের পর বছর হেলে পড়ে থাকে, সেখানে রাজউকের তদারকি ও পরিদর্শন ব্যবস্থা ঠিক কতটা ভঙ্গুর—এই দুর্ঘটনা সেটিই আবার আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল।
৫. পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসন
টিসিবির ট্রাক ঘিরে যখনই শত শত মানুষের ভিড় জমে, তখন সেখানে শৃঙ্খলা রক্ষা করা এবং বিপজ্জনক স্থানে জনসমাগম এড়াতে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা থাকা আবশ্যক ছিল। অনিরাপদ স্থানে মানুষ যেন ভিড় না জমায়, সে বিষয়ে পুলিশ ও প্রশাসনের সতর্ক দৃষ্টি থাকলে হয়তো এত বড় মূল্য দিতে হতো না।
দুটো তাজা প্রাণের বিদায় দুর্ঘটনা নয়। দিনের পর দিন এই দেয়ালটিকে মানুষ খুন করার জন্যই এভাবেই অরক্ষিত রাখা হয়েছে। খুনের পর সবাই ভাবছে, দায়টা হয়তো তাদের না। কিন্তু দায়টা আসলে সংশ্লিষ্ট প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের।



পাঠকের মন্তব্য