রোম সাম্রাজ্য একবার নিলামে উঠেছিল।
কোনো অঙ্গরাজ্য নয়, কোনো খনি নয়, কোনো বাণিজ্যতরী নয়—খোদ সিংহাসনটাকেই নিলামে তোলা হয়েছিল। আর সেই নিলাম ডেকেছিল রাজপ্রাসাদে রাজার সবচেয়ে বিশ্বস্ত প্রহরীরাই।
এই গল্পটা প্রেটোরিয়ান গার্ডের। রোম যাদের তৈরি করেছিল নিজেকে রক্ষা করার জন্য, আর যারা একদিন আবিষ্কার করল, রক্ষা করার চেয়ে বিক্রি করে দেওয়াটাই অনেক বেশি লাভজনক।
অগাস্টাস যখন প্রজাতন্ত্রের ছাই থেকে সাম্রাজ্যের স্থাপত্য গড়ছেন, তখন তাঁর একটি বেড়া দরকার হলো।
প্রজাতন্ত্রে ক্ষমতা ছিল ছড়ানো-ছিটানো, সবার চোখের সামনে। সাম্রাজ্যে ক্ষমতা একজন ব্যক্তির ভেতরে কেন্দ্রীভূত। সেই ব্যক্তিকে ঘিরে রাখতে হবে—তাই জন্ম হলো প্রেটোরিয়ানদের।
নামে তারা প্রহরী, কাজে তারা প্রতীক। সীমান্তের লিজিয়নরা যখন রাইন নদীর কুয়াশায়, সিরিয়ার রোদে, দানিয়ুবের বরফে যুদ্ধ করছে, তখন এরা রোমে। এদের বেতন ছিল তুলনামূলক বেশি, চাকরির মেয়াদ ছিল কম, আর বাসস্থান ছিল রাজধানীতে। ক্ষমতা মানুষকে নষ্ট করে, আর ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা মানুষকে নষ্ট করে আরও দ্রুত।
অগাস্টাস 'বেড়া' দিয়েছিলেন ক্ষেত রক্ষা করতে। কিন্তু বাংলার প্রবাদটি তিনি জানতেন না—বেড়ায় যখন ক্ষেত খায়, তখন কৃষকের আর কিছুই করার থাকে না।
টাইবেরিয়াস সেই বেড়াকে আরও শক্ত করলেন। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা প্রেটোরিয়ানদের একত্রিত করে রোমের উপকণ্ঠে বানালেন তাদের স্থায়ী শিবির—কাস্ট্রা প্রেটোরিয়া। তিনি ভেবেছিলেন, এতে করে এদের নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হবে।
কিন্তু তিনি বোঝেননি, বিক্ষিপ্ত প্রহরীরা যদি 'উপদ্রব' হয়, তাহলে সংঘবদ্ধ প্রহরীরা একেকটি 'সরকার'। রোম নিজের হৃৎপিণ্ডের পাশে আরেকটি সশস্ত্র হৃৎপিণ্ড বসাল, এবং সেটিকে নিজের গলার ওপর তলোয়ার ধরে রাখতে বলল।
এর পরীক্ষা এলো ৪১ খ্রিস্টাব্দে, সম্রাট ক্যালিগুলার আমলে। ক্ষমতা যখন কোনো মানুষকে পুরোপুরি উন্মাদ করে দেয়, তার নিখুঁত উদাহরণ ছিলেন ক্যালিগুলা।
তাকে হত্যা করল প্রেটোরিয়ান অফিসাররাই, প্রাসাদের অলিন্দে। হত্যা করার হয়তো প্রয়োজন ছিল। কিন্তু তার পরের ঘটনাটিই ছিল ইতিহাসের মোড় ঘোরানো।
সিনেট তখনও আলোচনা করছে, রোমে প্রজাতন্ত্র ফিরিয়ে আনা যায় কি না। আর প্রাসাদের ভেতরে একটি পর্দার আড়ালে কাঁপছিলেন ক্যালিগুলার খোঁড়া, তোতলা চাচা ক্লডিয়াস।
তিনি প্রাণভয়ে লুকিয়ে ছিলেন। এক সৈন্য তাকে খুঁজে পেল। টেনে বের করে তাঁকে কাঁধে তুলে চিৎকার করে বলল, "ইনিই আমাদের সম্রাট!"
ক্লডিয়াস সম্রাট হলেন না, তাঁকে সম্রাট বানানো হলো। আর বানাল তারাই, যাদের কাজ ছিল তাঁকে পাহারা দেওয়া।
রোম সেদিন একটি অলঙ্ঘনীয় সীমা অতিক্রম করল। এতদিন ধারণা ছিল, সম্রাট গার্ডকে নিয়ন্ত্রণ করেন। সেদিন প্রমাণ হলো, গার্ড চাইলে সম্রাটকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, তৈরি-ও করতে পারে।
একবার এই সত্য জানাজানি হয়ে গেলে, তা আর বোতলে ফেরে না।
এর চূড়ান্ত, প্রায় স্যুররিয়াল প্রদর্শনী হলো ১৯৩ খ্রিস্টাব্দে। ইতিহাসে বছরটি 'পাঁচ সম্রাটের বছর' নামে পরিচিত। কমোডাসের মৃত্যুর পর পার্টিন্যাক্স সম্রাট হলেন। সৎ, কঠোর, সংস্কারপন্থী একজন মানুষ। তিনি প্রেটোরিয়ানদের শৃঙ্খলায় ফেরাতে চাইলেন, ভাতা কমাতে চাইলেন।
প্রেটোরিয়ানদের এটি পছন্দ হলো না। যে হাতে খায়, সেই হাতে কামড় দেওয়া যায়; কিন্তু যে হাত খাওয়া কমিয়ে দেয়, তাকে কেটে ফেলতে হয়। তারা পার্টিন্যাক্সকে হত্যা করল, মাত্র সাতাশি দিনের মাথায়।
তারপর তারা যা করল, তার কোনো রাজনৈতিক প্রতিশব্দ নেই। তারা শিবিরে ফিরে গেল এবং ঘোষণা দিল—সাম্রাজ্য নিলামে উঠবে। যে বেশি সোনা দেবে, বেগুনি চাদর তার।
এটি কোনো গোপন দর-কষাকষি ছিল না। ছিল প্রকাশ্য নিলাম। রোমের ফোরামে দাঁড়িয়ে একজন ধনী সিনেটর, ডিডিয়াস জুলিয়ানাস, দাম হাঁকলেন। প্রতিটি প্রহরীকে পঁচিশ হাজার করে সেসটার্স।
ভেবে দেখুন, যে সিংহাসনের জন্য অগাস্টাস গৃহযুদ্ধ করেছেন, যে সিংহাসনের জন্য সৈন্যরা পার্থিয়ার মরুভূমিতে প্রাণ দিয়েছে, সেই সিংহাসন এখন ব্যারাকের ভেতর দর হাঁকাহাঁকির বস্তু। রোমান মুদ্রায় সাম্রাজ্যের দাম নির্ধারণ হচ্ছে।
জুলিয়ানাস জিতলেন। সম্রাট হলেন। কিন্তু রোম তাকে গ্রহণ করল না। রাস্তায় মানুষ তাঁকে দেখে মুখ ফিরিয়ে নিল। প্রদেশের সেনাপতিরা এই প্রহসনকে বিদ্রোহ হিসেবে দেখল। সবচেয়ে শক্তিশালী সেনাপতি সেপ্টিমিয়াস সেভেরাস তাঁর বাহিনী নিয়ে রোমের দিকে অগ্রসর হলেন।
যে প্রেটোরিয়ানরা প্রাসাদের করিডোরে এত সাহসী, তারা সীমান্তের কাদা-মাখা, যুদ্ধপোড়া লিজিয়নের সামনে দাঁড়াতে পারল না। তারা জুলিয়ানাসকে পরিত্যাগ করল।
জুলিয়ানাস টিকলেন মোটে ছেষট্টি দিন। মৃত্যুর আগে তার শেষ কথা ছিল, আমি কী করেছি? আমি কাকে খুন করেছি?
তিনি বোঝেননি, তিনি সাম্রাজ্য কেনেননি; তিনি একটি ভ্রম কিনেছিলেন।
সেভেরাস এসে পুরোনো গার্ড বাহিনীকে ভেঙে দিলেন। তাদের নিরস্ত্র করে নগ্ন অবস্থায় রোম থেকে বের করে দিলেন। নিজের অনুগত সৈন্যদের দিয়ে নতুন বাহিনী গড়লেন।
কিন্তু দাগটা রয়ে গেল। সেভেরাস প্রমাণ করলেন যে প্রেটোরিয়ানদের পরাজিত করা যায়, কিন্তু তিনি তাদের আবিষ্কৃত সূত্রটিকে মুছে দিতে পারলেন না।
সূত্রটি ছিল সহজ—যে তলোয়ার সম্রাটকে রক্ষা করে, সেই তলোয়ারই সম্রাটকে সবচেয়ে ভালোভাবে হত্যা করতে পারে।
এই ভয় নিয়েই সাম্রাজ্য চলল আরও একশো বছর, যতক্ষণ না ৩১২ সালে মিলভিয়ান ব্রিজের যুদ্ধে কনস্ট্যানটাইন চূড়ান্তভাবে এই বাহিনীকে বিলুপ্ত করেন।
প্রেটোরিয়ানদের গল্প তাই কোনো সামরিক ইতিহাস নয়। এটি ক্ষমতার এক চিরন্তন প্যারাডক্সের গল্প। প্রতিটি ক্ষমতাই নিজের চারপাশে একটি বেড়া তৈরি করে। সেই বেড়া ছাড়া ক্ষেত টেকে না।
কিন্তু বেড়াকে যদি ক্ষেতের চেয়ে বেশি পুষ্টি দেওয়া হয়, যদি বেড়া নিজেকে ভাবতে শুরু করে যে ক্ষেতের মালিক সে-ই, তখনই সাম্রাজ্য নিলামে ওঠে।
হাস্যকর মনে হতে পারে, একটি সভ্যতা কীভাবে তার সিংহাসন বিক্রি করতে পারে? কিন্তু বাস্তবতা আদতে গোলাপগাছের কাঁটার মতোই তীক্ষ্ণ।
কারণ এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মুকুট কখনোই মাথায় নিরাপদ নয়। সেটা নিরাপদ থাকে কেবল ততক্ষণ, যতক্ষণ দরজার বাইরের প্রহরীটি আপনার অনুগত থাকে।



পাঠকের মন্তব্য