মোদি অ্যান্ড দ্য ককরোচেস, ফ্রম বিগিনিং টু এন্ড

১৯ পঠিত ... ২ ঘন্টা ৫৬ মিনিট আগে

২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক অভূতপূর্ব ও নজিরবিহীন ঘটনা ঘটলো। একটি ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম পেজ কীভাবে মাত্র কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে দেশের কোটি কোটি তরুণের কণ্ঠস্বরে পরিণত হতে পারে এবং একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় সরকারকে কাঁপিয়ে দিতে পারে, তার জলজ্যান্ত প্রমাণ ‘ককরোচ জনতা পার্টি’(CJP)। ভারতের মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা (NEET-UG 2026) এবং সিবিএসই (CBSE) বোর্ডের প্রশ্নপত্র ফাঁস, দুর্নীতি, এবং ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সির (NTA) চরম উদাসীনতার বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা এই আন্দোলনটি কেবল একটি ছাত্র আন্দোলন ছিল না; এটি ছিল তরুণদের আত্মমর্যাদা রক্ষার লড়াই।

২০২৬ সালের মে মাসের শুরুতে ভারতের ন্যাশনাল এলিজিবিলিটি কাম এন্ট্রান্স টেস্ট (NEET-UG) এর ফলাফল প্রকাশিত হওয়ার পর দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। পরীক্ষায় অভূতপূর্ব সংখ্যক শিক্ষার্থী পূর্ণ নম্বর (৭২০ এর মধ্যে ৭২০) পায়, যা গাণিতিকভাবে এবং ঐতিহাসিকভাবে অসম্ভব বলে দাবি করেন বিশেষজ্ঞরা। বিহার, গুজরাট এবং উত্তরপ্রদেশে একের পর এক প্রশ্নপত্র ফাঁসের চক্র ধরা পড়তে থাকে। কোটি কোটি টাকার বিনিময়ে পরীক্ষার আগের রাতেই প্রশ্ন বিক্রি হওয়ার অকাট্য প্রমাণ সামনে আসে। একই সময়ে সিবিএসই পরীক্ষার ফলাফল নিয়েও ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ ওঠে।

পরীক্ষা বাতিল বা পুনঃপরীক্ষার দাবিতে শিক্ষার্থীরা যখন আদালতের দ্বারস্থ হতে শুরু করে, তখন সরকার এবং এনটিএ (NTA) বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করে। এই চরম অনিশ্চয়তা এবং হতাশার মুখে মধ্যেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে প্রায় এক ডজন মেধাবী শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করে। এই আত্মাহুতিগুলো ভারতের সাধারণ ছাত্রসমাজ এবং অভিভাবকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের আগুন জ্বালিয়ে দেয়।

সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির বিতর্কিত মন্তব্য এবং সিজেপি তৈরি 

মে ২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে নিট পরীক্ষা সংক্রান্ত একটি মামলার শুনানির সময় ভারতের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত এক বিতর্কিত মন্তব্য করে বসেন। আন্দোলনরত এবং পরীক্ষা বাতিলের দাবি তোলা বেকার তরুণদের সমাজের আরশোলা (Cockroach) হিসেবে  ইঙ্গিত করে একটি কথা বলেন। এর মাধ্যমেই মূলত আত্মপ্রকাশ ঘটে  অভিজিৎ দীপকে এবং সিজেপির দেশের সর্বোচ্চ আদালতের প্রধান বিচারপতির মুখ থেকে তরুণ সমাজকে 'আরশোলা' বলে সম্বোধন করার এই চরম অপমান মেনে নিতে পারেননি বোস্টন ইউনিভার্সিটির ছাত্র এবং আম আদমি পার্টির (AAP) সাবেক সোশ্যাল মিডিয়া কৌশলবিদ অভিজিৎ দীপকে। ১৬ মে ২০২৬ তারিখে তিনি এই অপমানের জবাব দিতে সম্পূর্ণ ব্যঙ্গাত্মক (satirical) উপায়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ককরোচ জনতা পার্টি নামে একটি পেজ খোলেন।  সেখান থেকেই সরকারের সমালোচনামূলক নানাবিধ রিল বানানো শুরু করেন তিনি। সিজেপির এই ব্যঙ্গাত্মক ও তীব্র আক্রমণাত্মক রাজনৈতিক কন্টেন্ট ভারতের তরুণদের মন জয় করে নেয়। দাবানলের মতো মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে রিলগুলো, পেজটি খোলার মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যে সিজেপির ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট ১৭ মিলিয়নের বেশি ফলোয়ার অর্জন করে। এটি ভারতের বর্তমান শাসক দল বিজেপি এবং প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের অফিশিয়াল ফলোয়ার সংখ্যাকেও ছাড়িয়ে যায়, যা বিশ্ব রাজনৈতিক ইতিহাসে সোশ্যাল মিডিয়া প্রবৃদ্ধির অন্যতম বড় রেকর্ড।

অনলাইনে কোটি কোটি তরুণের সমর্থন পাওয়ার পর অভিজিৎ দীপকে বুঝতে পারেন যে কেবল ডিজিটাল স্পেসে এই ক্ষোভ সীমাবদ্ধ রাখলে দাবি আদায় সম্ভব নয়। তিনি ৬ জুন ২০২৬ তারিখে আমেরিকা থেকে ভারতে ফিরে আসেন। দেশে পা রাখামাত্রই ভারতের বিমানবন্দরে হাজার হাজার শিক্ষার্থী তাকে স্বাগত জানায়। ২০ জুন ২০২৬ থেকে দিল্লির শাহবাগ অর্থাৎ যন্তর মন্তরে সিজেপির ব্যানারে অনির্দিষ্টকালের জন্য অবস্থান কর্মসূচি ও অনশনের ডাক দেওয়া হয়। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার শিক্ষার্থী দিল্লিতে এসে জড়ো হতে থাকে। যন্তর মন্তর পরিণত হয় এক বিশাল ছাত্র-সমুদ্রে, যেখানে সবার গায়ে ছিল আরশোলার কাট-আউট অথবা সরকারের সমালোচনমূলত নানান প্ল্যাকার্ড। মিম ব্যবহার করে তৈরি করা এসব অভিনব প্ল্যাকার্ডগুলোপ নজর কাড়ে মানুষের।  

সোনম ওয়াংচুকের ঐতিহাসিক প্রবেশ অনশন

images

২৮ জুন ২০২৬ তারিখে লাদাখের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, পরিবেশকর্মী এবং বিজ্ঞানী সোনম ওয়াংচুক সিজেপির আন্দোলনের প্রতি পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করে দিল্লির যন্তর মন্তরে এসে অনশনে বসেন। তাঁর এই অন্তর্ভুক্তি আন্দোলনকে কেবল ছাত্রদের গণ্ডি থেকে বের করে সুশীল সমাজ এবং সাধারণ অভিভাবকদের আন্দোলনে রূপ দেয়। ওয়াংচুক টানা ২৬ দিন কেবল পানি ও লবণ খেয়ে অনশন পালন করেন, যা আন্তর্জাতিক মিডিয়ার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। আন্দোলন দমনের অংশ হিসেবে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে ২০ জুলাই থেকে দিল্লির যন্তর মন্তর এলাকায় দফায় দফায় মোবাইল ইন্টারনেট পরিষেবা সম্পূর্ণ বন্ধ (Internet Shutdown) করে দেওয়া হয় এবং সোশ্যাল মিডিয়ার বিভিন্ন পোস্ট ও অ্যাকাউন্টের ওপর কড়া নজরদারি ও সেন্সরশিপ চালানো হয়, সরকার দাবি করে, এই আন্দোলন দেশের অভ্যন্তরে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে। 

তবে দমে না গিয়ে আন্দোলনকারীরা এর বিরুদ্ধে আইনি লড়াই শুরু করে। দিল্লি হাইকোর্ট ২২ জুলাই এক আদেশে পুলিশি অ্যাকশনের সমস্ত সিসিটিভি ফুটেজ ও রেকর্ড সংরক্ষণের নির্দেশ দেয় এবং পরবর্তীতে ২৪ জুলাই মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধের সরকারি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে দায়ের করা একটি জরুরি পিটিশন শুনানির জন্য গ্রহণ করে । দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী আন্দোলন ও সরকারের সাথে আলোচনার পর, ছাত্র ও বিক্ষোভকারীদের ওপর কোনো পুলিশি হয়রানি বা বলপ্রয়োগ করা হবে না, সরকারের পক্ষ থেকে এমন লিখিত আশ্বাস পাওয়ার পর ২৩ জুলাই ২০২৬ তারিখে সোনম ওয়াংচুক তাঁর ২৬ দিনের অনশন ভঙ্গ করেন 

যেহেতু আমাদের আপা এখন দিল্লীতে হয়তো তাকে ট্রিবিউট দিয়ে ছাত্রদের পেটানো, ইন্টারনেট বন্দ করে দেওয়া সবই করে মোদী সরকার, তবে হেলিকপ্টারে তেল কম থাকায় হয়তো ছাত্রদের নির্বিচারে গুলি করে মারার সাহস হয়নি সরকারের।  এই আন্দোলনের অন্যতম প্রাণবন্ত এবং স্মরণীয় অংশটি ঘটেছিল বিহারের রাজধানী পাটনায়। বিহারের ছাত্ররা বরাবরই তাদের রাজনৈতিক সচেতনতা এবং রসোদ্দীপক স্বভাবের জন্য পরিচিত। রাজপথে হাজার হাজার ছাত্র সিজেপির সমর্থনে মিছিল বের করে, তখন পুলিশ তাদের ছত্রভঙ্গ করতে জলকামান (Water Cannon) এবং টিয়ার সেল (টিয়ার গ্যাস) ব্যবহার করে। কিন্তু ছাত্ররা এটিকে যেভাবে মোকাবেলা করেছিল, তা সারা ভারতের গণমাধ্যমে হাসির রোল ফেলে দেয় এবং আন্দোলনের মোমেন্টাম বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। সোস্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায় ছাত্ররা পুলিশকে জিজ্ঞেস করছেন টিয়ার গ্যাসের ব্যবস্থা আছে কিনা, টিয়ার গ্যাস ছাড়া আন্দোলন জমছে না, সেই ভিডিওরই আরেক অংশে দেখা যায় জলকামানকে রীতিমতো শাওয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে তারা। 

 
 
 
 
 
View this post on Instagram
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 

A post shared by TV1 INDIA खबरों का नया अड्डा* (@tv1indialive)

পুলিশের দমনপীড়নকে ট্রোলে পরিণত করার এই দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মুহূর্তের মধ্যে ভাইরাল হয়ে যায়।

১৮ জুলাই তারিখে অনশনরত সোনম ওয়াংচুকের শারীরিক অবস্থার চরম অবণতি হলে দিল্লি পুলিশ তাকে জোরপূর্বক যন্তর মন্তর থেকে তুলে নিয়ে সফদারজং হাসপাতালে ভর্তি করায়। এই ঘটনায় ক্ষোভে ফেটে পড়ে শিক্ষার্থীরা। ২০ জুলাই সিজেপি 'চলো সংসদ' (March to Parliament) এর ডাক দেয়। দিল্লির সংসদ মার্গে পুলিশ ব্যারিকেড দিলে হাজার হাজার শিক্ষার্থী তা ভেঙে ফেলার চেষ্টা করে। পুলিশ ব্যাপক লাঠিচার্জ, টিয়ার গ্যাস এবং কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে। এতে শতাধিক ছাত্র আহত হলেও তারা রাজপথ ছাড়েনি।

 

 

 চূড়ান্ত বিজয় এবং আন্দোলনের সফল সমাপ্তি (২৪ - ২৬ জুলাই ২০২৬)

টানা ৩৬ দিনের তীব্র রাজপথের আন্দোলন, ছাত্রদের অভিনব প্রতিরোধ এবং দেশজুড়ে সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থনের মুখে কেন্দ্রীয় সরকার বুঝতে পারে যে এই আন্দোলন আর দমানো সম্ভব নয়। ২৪ জুলাই ২০২৬ তারিখ রাতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি জাতির উদ্দেশ্যে এক জরুরি ভিডিও বার্তা দেন। সেখানে তিনি ছাত্রদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেন এবং প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধে একটি ঐতিহাসিক কঠোর বিলের ঘোষণা দেন। এই নতুন আইনে:

  • প্রশ্ন ফাঁসের সাথে জড়িত থাকলে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড
  • অপরাধী সংস্থা বা ব্যক্তির জন্য ১০ কোটি টাকা জরিমানার বিধান।
  • ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সির (NTA) শীর্ষ প্রধানসহ ৪৭ জন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে তাৎক্ষণিক বরখাস্ত।

সোস্যাল মিডিয়ায় মিলিয়নের উপর ভিউ পাওয়া এই ভিডিও নিয়েও শুরু হয় ট্রোলিং এবং মিম। 

প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার পরদিন, অর্থাৎ ২৫ জুলাই ২০২৬ তারিখে ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান নৈতিক দায় স্বীকার করে প্রধানমন্ত্রীর কাছে তার পদত্যাগপত্র জমা দেন। একই দিনে বিজেপি সভাপতি জেপি নাড্ডা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেন যে, আন্দোলনরত কোনো শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে পুলিশ কোনো আইনি ব্যবস্থা বা মামলা দায়ের করবে না এবং আন্দোলনে ক্ষতিগ্রস্ত বা নিহতদের পরিবারকে উপযুক্ত সরকারি ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে। নিজেদের সব দাবি পূরণ হওয়ার পর ২৫ জুলাই বিকেলে দিল্লির কনস্টিটিউশন ক্লাবে এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে সিজেপি। সেখানে প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে এবং হাসপাতাল থেকে মুক্ত হয়ে আসা সোনম ওয়াংচুক আনুষ্ঠানিকভাবে ৩৬ দিনের এই রাজপথের আন্দোলন প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন। ২৬ জুলাই সকালে অভিজিৎ দীপকে তাঁর শেষ অফিশিয়াল ভিডিও বার্তায় বলেন, আমরা প্রমাণ করেছি যে, তরুণ সমাজকে আরশোলা ভেবে পিষে ফেলা যায় না। আমরা আমাদের অধিকার ছিনিয়ে নিয়েছি। আজ থেকে আমাদের রাজপথের ধর্না শেষ হলো, কিন্তু ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থাকে স্বচ্ছ রাখার লড়াইটা কেবল শুরু হলো। 

ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) আন্দোলন ভারতের ইতিহাসে একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে। এটি প্রমাণ করেছে যে, আধুনিক যুগে কেবল প্রথাগত রাজনৈতিক দলই পরিবর্তন আনতে পারে না; সোশ্যাল মিডিয়ার সঠিক ব্যবহার এবং ব্যঙ্গাত্মক (satire) প্রতিবাদের মাধ্যমেও একটি বিশাল জনগোষ্ঠীকে একত্রিত করা সম্ভব। ছাত্রদের রসাত্মক প্রতিরোধ থেকে শুরু করে সোনম ওয়াংচুকের অহিংস অনশন সব মিলিয়ে সিজেপি আন্দোলন দেখিয়েছে যে, শাসকের লাঠি ও জলকামানের চেয়ে শোষিতের ঐক্য ও রসবোধ অনেক বেশি শক্তিশালী হতে পারে। 

১৯ পঠিত ... ২ ঘন্টা ৫৬ মিনিট আগে

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top