বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের হৃদস্পন্দনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে যে খেলাটি–ফুটবল। ফুটবলকে কেন্দ্র করে নির্মিত হয়েছে অসংখ্য চলচ্চিত্র, যেখানে কখনো উঠে এসেছে একজন খেলোয়াড়ের স্বপ্নপূরণের গল্প, কখনো ফুটবলকে ঘিরে মানুষের হাসি-কান্না ও জীবনের নানা রঙ। এমন কিছু সিনেমার আলাপ করা যেতেই পারে:
শাওলিন সকার: ফুটবলের সাথে শাওলিন কুংফুর চমৎকার মিশেল—সেটা এই ছবি না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন! 'সিং' নামের এক কুংফুপ্রেমী যুবক আর ক্যারিয়ার ধ্বংস হওয়া সাবেক ফুটবলার 'ফাং' মিলে বানালেন ফুটবল দল। আর তারপর? মাঠে উড়াধুড়া শট, বাতাসে ভেসে থাকা আর অবিশ্বাস্য সব স্টান্ট, জলে-স্থলে ফুটবলের কারসাজিতে দর্শকদের চোখ ছানাবড়া করে কুংফুর জোরে ট্রফি জিতে তারা তাক লাগিয়ে দেয়। ফুটবলের এই সিনেমা তৎকালীন সময়ে কোটি কোটি ফুটবল প্রেমীদের মনে আলোড়ন তুলেছিল।
এস্কেপ টু ভিক্টরি: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পটভূমিতে ফুটবল খেলা এবং বন্দিদশা থেকে পালানোর এক রোমাঞ্চকর কাহিনীর আদলে নির্মিত এ সিনেমাটি।। মজার ব্যাপার হচ্ছে, সিলভেস্টার স্ট্যালন ও মাইকেল কেইনের সাথে ফুটবল কিংবদন্তি পেলে এই সিনেমায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় অভিনয় করেছেন। বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানির একটি নাৎসি বন্দিশিবিরে মিত্রবাহিনীর যুদ্ধবন্দিদের রাখা হয় যেখানে নাৎসি বন্দিশিবিরের কয়েদিরা ফুটবল খেলে খোদ জার্মানির সেরা দলের সাথে! হাফ-টাইমে সুড়ঙ্গ খুঁড়ে পালিয়ে যাওয়ার দারুণ সুযোগ থাকলেও বন্দীরা না পালিয়ে মর্যাদা রক্ষার লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত লড়ে যায়। রেফারি নাৎসিদের পক্ষে দালালি করলেও ম্যাচ ড্র হয় এবং শেষে দর্শকদের হুলস্থুল বিশৃঙ্খলার সুযোগে খেলোয়াড়রা ছদ্মবেশে পগারপার হয়ে যায়!
পেলে: দ্য বার্থ অব আ লিজেন্ড: ফুটবল ঈশ্বর বলে আমরা যাকে মানি;পেলে, তাঁর জুতো পালিশ থেকে শুরু করে মাত্র ১৭ বছর বয়সে বিশ্ব কাঁপানোর এক দুর্দান্ত গল্প এটি। ১৯৫০-এর বিশ্বকাপে ব্রাজিলের হার দেখে ছোট্ট ডিকো (পেলে) কসম খেয়েছিল বাবাকে বিশ্বকাপ এনে দেওয়ার। দারিদ্র্য আর লড়াইকে ড্রিবলিং করে পেলের সেই অসম্ভবকে সম্ভব করার জার্নি সেলুলয়েডের পর্দায় ফুটিয়ে তুলেছেন কেভিন ডি পাওলা। পরিচালনা ও লেখনীতে ছিলেন জেফ জিম্বালিস্ট এবং মাইকেল জিম্বালিস্ট।
ডিয়াগো ম্যারাডোনা
ম্যারাডোনা মানেই তো একটা চমৎকার, একটা জাদু। ড্রামা, বিতর্ক আর পেশাগত জীবনের এ ডকুমেন্টারিতে আর্জেন্টিনার বস্তি থেকে উঠে আসা, ইতালির নাপোলিকে জেতানো আর ১৯৮৬-এর সেই বিখ্যাত 'হ্যান্ড অব গড' ও 'গোল অব দ্য সেঞ্চুরি'র পাশাপাশি তার জীবনের অন্ধকার ও মাদকাসক্তির গল্পটাও চড়া আলোয় দেখানো হয়েছে
মেসি
এটা একটা ডকুড্রামা। আর্জেন্টিনার রোজারিও শহরের এক পুচকে ছেলে, যার শরীরে গ্রোথ হরমোনের সমস্যা। কিন্তু পায়ে রয়েছে সৃষ্টিকর্তার নিজের দেয়া আশীর্বাদ! বার্সেলোনার লা মাসিয়া একাডেমিতে যোগ দেওয়া থেকে শুরু করে ২০১৪ বিশ্বকাপের আগে পর্যন্ত মেসির তীব্র মানসিক জেদ আর সংগ্রামের এক দারুণ সমন্বয় এটি।
গোল! দ্য ড্রিম বিগিনস: ফুটবলপ্রেমীদের কাছে ‘গোল! দ্য ড্রিম বিগিনস’ একটি আবেগের নাম। ২০০৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত এই সিনেমার কেন্দ্রীয় চরিত্র সান্তিয়াগো মুনিয়েজ, যে দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে এসে লস অ্যাঞ্জেলেসে টুকটাক কাজ করে আর ইংল্যান্ডের শীর্ষ পর্যায়ের ফুটবলে জায়গা করে নেওয়ার স্বপ্ন দেখে। হঠাৎ এক স্কাউটের নজরে পড়ে সোজা চলে গেল ইংল্যান্ডের নিউক্যাসল ইউনাইটেডে ট্রায়াল দিতে। লাখো তরুণের ফুটবলার হওয়ার আবেগের পারফেক্ট রিফ্লেকশন এই ছবি।
দ্য কিপার
ষাটের দশকের জার্মান ফুটবল ইতিহাসের বাস্তব একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে নির্মিত হয়েছে ‘দ্য কিপার’ সিনেমা। সিনেমাটির মূল চরিত্র বার্ট ট্রাউটম্যান, তিনি ছিলেন সাবেক জার্মান সেনা সদস্য, পরবর্তীতে হন ইংলিশ ক্লাব ম্যানচেস্টার সিটির কিংবদন্তি গোলরক্ষক। স্থানীয় দর্শকদের প্রতিবাদ, সামাজিক বিরোধিতা এবং ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডির মধ্যেও ট্রাউটম্যান কীভাবে নিজেকে প্রমাণ করেন, সেটাই সিনেমাটির মূল গল্প।
দ্য ড্যামড ইউনাইটেড
মাঠে খেলোয়াড়রা কী করে তা তো সবাই দেখে, কিন্তু মাঠের বাইরে কোচের চেয়ারে বসে যে কী পরিমাণ কুটনামি, রাজনীতি আর ব্যক্তিত্বের সংঘাত চলতে পারে তার প্রাকৃতিক উদাহরণ এই সিনেমা। ইংল্যান্ডের বিখ্যাত কোচ ব্রায়ান ক্লাফের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায় নিয়ে নির্মিত এ চলচ্চিত্রে ফুটবলের ক্ষমতার লড়াই, নেতৃত্ব এবং ব্যক্তিত্বের সংঘাত ফুটে উঠেছে। খেলোয়াড়দের বাইরেও যে কোচরা ফুটবলের ইতিহাস বদলে দেন, এই সিনেমা তার অনন্য এক উদাহরণ।
নেক্সট গোল উইন্স (২০২৩)
২০০১ সালে অস্ট্রেলিয়ার কাছে ৩১-০ গোলে হেরে বিশ্বরেকর্ড করা আমেরিকান সামোয়া দলের গল্প এটি! এই মহা-ব্যর্থ দলকে লাইনে আনতে এলেন বদমেজাজি কোচ থমাস রোঙ্গেন। ট্রফি জেতা দূর অস্ত, তাদের লক্ষ্য ছিল বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে অন্তত একটা গোল বা একটা ম্যাচ জিতে নিজেদের ইজ্জত বাঁচানো। স্পোর্টস-কমেডির এক দারুণ প্যাকেজ!
দ্য কাপ (১৯৯৯)
এটি একটি বিখ্যাত ভুটানিজ-তিব্বতি স্পোর্টস কমেডি। ফুটবলের প্রতি তীব্র উন্মাদনা এই সিনেমার মূল উপাদান। ১৯৯৮ সালের ফ্রান্স বিশ্বকাপ ফুটবল নিয়ে ভারতের হিমাচল প্রদেশের এক প্রত্যন্ত অঞ্চলে অবস্থিত একটি তিব্বতি বৌদ্ধ মঠের তরুণ সন্ন্যাসীদের মধ্যে ব্যাপক উত্তেজনা তৈরি হয়। খেলা দেখার সামগ্রীর অর্থাভাবে নিজেদের ব্যক্তিগত জিনিসপত্র বন্ধক রেখে তারা শেষ পর্যন্ত মঠে টিভি ও স্যাটেলাইটের ব্যবস্থা করে। এটি পরিচালনা করেছেন খিয়েনসে নরবু।
ধন ধনা ধন গোল
লন্ডনের সাউথল এলাকার একটা এশীয় ফুটবল ক্লাবের মাঠ বাঁচানোর লড়াই। ক্লাবে টাকা নেই, চারদিকে বর্ণবাদের শিকার জন আব্রাহাম (সানি)। শেষমেশ আরশাদ ওয়ার্সির ক্যাপ্টেনসি আর কোচের জুটিতে বর্ণবৈষম্যের মুখে লাথি মেরে চ্যাম্পিয়ন হয়ে মাঠ রক্ষার পাশাপাশি নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখে তাঁরা।
দামাল (২০২২)
বাংলাদেশের স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস নিয়ে তৈরি রায়হান রাফীর সিনেমা। ফুটবল মাঠ কীভাবে মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশপ্রেম আর জনমত গঠনের অস্ত্র হয়ে উঠেছিল, সিয়াম-রাজ-মিমেরা সেটা পর্দায় দারুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। যেমন আবেগ, তেমনি অ্যাকশন! আর সাথে অভিনয় শিল্পীদের দুর্দান্ত ফুটবল শট মুগ্ধ করেছে সিনেমাপ্রেমীদের।
জাগো (২০১০)
এদেশের ফুটবল নিয়ে নির্মিত প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য ছবি। ভারতের শক্তিশালী 'ত্রিপুরা ডায়নামো ক্লাব'-এর কাছে প্রতি বছর হারতে হারতে ক্লান্ত কুমিল্লা একাদশকে জাগিয়ে তুলেছিল ভাত নয়, ফুটবল পাগল শামীম। স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের সাবেক খেলোয়াড় সাফুর কোচিংয়ে ফেরদৌস, বিন্দু, আরিফিন শুভরা মাঠে যে ঝড় তুললেন, তাতেই উড়েছিল বিজয়ের লাল-সবুজ পতাকা- এমন গল্পের চমৎকার সংমিশ্রণের এই সিনেমা সাড়া ফেলে দিয়েছিল দেশে।



পাঠকের মন্তব্য