কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিতে নতুন উপার্জনের উপাদান যুক্ত করতে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বিদেশে শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিতে কাজ করেছেন। বাংলাদেশের শ্রমিকেরা মধ্যপ্রাচ্যে ও আরববিশ্বে কাজ করতে যাওয়ার মাঝ দিয়ে; রেমিটেন্স হয়ে দাঁড়ায় গুরুত্বপূর্ণ উপার্জন খাত। বাংলাদেশের গ্রামগুলোতে প্রাচুর্য আসতে শুরু করে।
জিয়া এর পাশাপাশি কৃষিখাতকে শক্তিশালী করে তুলতে খাল খননের মাধ্যমে সারাবছর কৃষিজমিতে সেচ নিশ্চিত করতে শুরু করেন। বাংলাদেশের কৃষিবিদদের উচ্চ শিক্ষার্থে বিদেশে পাঠানোর সুযোগ সৃষ্টি করেন। এই কৃষিবিদেরা ফিরে এসে উল্লেখযোগ্য কৃষি গবেষণা কাজ করেন। সেই গবেষণা ফলাফল কৃষকের কাছে পৌঁছে দিতে কৃষি বিভাগ আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করে। ফলে কৃষি উতপাদন বৃদ্ধি পায়।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী ১৯৯১ সালে দায়িত্ব পাওয়ার পরেই কৃষি ও বিদেশে শ্রমিক পাঠানোর পাশাপাশি আরেকটি উপার্জন খাত সৃষ্টির চেষ্টা করেন। বিকশিত হয় গার্মেন্টস শিল্প। গার্মেন্টসে নারীর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে আর কৃষক-শ্রমিক-মেহনতী মানুষের কন্যা শিশুদের জন্য শিক্ষা বৃত্তি চালু করে; নারীকে ক্ষমতায়িত করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেন খালেদা জিয়া। জিয়া ও খালেদার বিদেশ নীতি আবর্তিত হয়েছে বিদেশে বাংলাদেশের মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি এবং গার্মেন্টস পণ্য রপ্তানীর নতুন বাজার খোঁজাকে ঘিরে।
বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিদেশ নীতি একুশ শতকে বাংলাদেশের প্রশিক্ষিত কর্মীদের জন্য বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে নিবেদিত। এ কারণে তিনি মালয়েশিয়া ও চীনে প্রথম রাষ্ট্রীয় সফরে গেছেন। সরকারের ব্যয় সংকোচন নীতিতে তারেকের সরকার শখের বিদেশ ভ্রমণ নিরুতসাহিত করেছে। ফলে তারেকের প্রতিটি বিদেশ সফর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের লক্ষ্যে এটা ইতোমধ্যেই স্পষ্ট।
বাংলাদেশের আরেকটি রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) ইতিহাস, দেশপ্রেম, ধর্মপ্রেম, রবীন্দ্র সংগীত চর্চা আর 'অখণ্ড ভারত'-এ বিলীন বিদেশ নীতিতে অত্যন্ত ব্যস্ত থাকায়; জিয়া ও খালেদার বিদেশ নীতিতে সৃষ্ট রেমিট্যান্স খাতের অর্জিত অর্থ ও সম্পদ লুন্ঠন করে ভারত-দুবাই-ইংল্যান্ড-এমেরিকা-ক্যানাডা-মালয়েশিয়ায় পাচারে বিশেষ দক্ষতা প্রদর্শন করেছে। ২০০৯ থেকে ২০২৪-এর জুলাই পর্যন্ত হাসিনার দোসরেরা যে পরিমাণ অর্থ-সম্পদ পাচার করেছে; ঔপনিবেশিক বৃটেন ও পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী সে পরিমাণ অর্থ পাচার করতে পারেনি।
জিয়া ও খালেদা জিয়া ভিক্ষুকের হাতকে কর্মীর হাতিয়ার করেছেন; আর হাসিনা দলীয় ভিক্ষুকের হাতে ডাকাতি করা টাকায় রোলেক্স ঘড়ি পরিয়েছেন।
জিয়া ও খালেদা জিয়া যে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে নিরাপোষ থেকেছেন; হাসিনা সেই বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব দিল্লির প্রণব মুখার্জি, সুজাতা সিং ও নরেন্দ্র মোদিদের হাতে তুলে দিয়েছেন। ১৭৫৬ সালের ২৩ জুন পলাশীর প্রান্তরে বৃটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অর্পণ করেছিলেন মীরজাফর, জগতশেঠ, ঘষেটি বেগম ; ১৯৪৮ সালের ২৩ জুন প্রতিষ্ঠিত আওয়ামী লীগ ২০০৯ সালে এসে একইভাবে ভারতের কাছে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অর্পণ করে। সংখ্যাতত্ত্বের এই কাকতালীয় মিল; বাংলাদেশের মানুষের জীবনে দুটি একই রকমের ট্র্যাজেডি তৈরি করে।
বাংলাদেশের কৃষক প্রজা স্বাধীন চিন্তার মানুষ। তারা বৃটিশ উপনিবেশ-পাকিস্তান উপনিবেশের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে। একইভাবে ভারতের ছায়া উপনিবেশের বিরুদ্ধে লড়াই করছে। বাংলাদেশের জনমানুষ পৃথিবীর কোন দেশের বিরোধী নয়। কিন্তু কোন দেশ এর সার্বভৌমত্বে হস্তক্ষেপ করলে; সেই দেশের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানায় ও প্রতিরোধ গড়ে তোলে।
তারেক রহমানের বিদেশ নীতি, সবার আগে বাংলাদেশ। তিনি আওয়ামী লীগের লুন্ঠনে রিক্ত অর্থনীতি পুনর্গঠনে বাংলাদেশের কর্মীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ দিতে আগ্রহী ও এদেশে বিনিয়োগ ইচ্ছুক দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের চেষ্টা করছেন।
কিন্তু বাংলাদেশে 'অখণ্ড ভারত' চিন্তার সৈনিকেরা ফেসবুকে বিক্ষোভ প্রদর্শন করছেন এই বলে যে, কেন তারেক ভারতে প্রথমে না গিয়ে মালয়েশিয়া ও চীনে গেলেন।
ভারতের অর্থনীতি ভালো অবস্থানে আছে; কিন্তু নিজদেশেই ধনী-দরিদ্র্যের এতো ব্যবধান, কৃষক-শ্রমিকের এতো দুর্গতি আর কর্মসংস্থানহীন তরুণদের এতো হাহাকার যে; তাদের পক্ষে বাংলাদেশের কর্মীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি সম্ভব নয়।
প্রতিবেশী দেশের মিডিয়া ও বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়ের নিরন্তর বাংলাদেশ বিদ্বেষ প্রদর্শন, বাংলাদেশ বিদ্বেষকে নির্বাচনে জেতার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার; মুসলিম বিদ্বেষের কারণে বাংলাভাষী মুসলমান মানেই বাংলাদেশী এমন তকমার রাজনীতি, আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের ধার না ধেরে বে-আইনিভাবে আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা মুসলমানদের বাংলাদেশে পুশ ইনের চেষ্টা; ২০০৯-২৪-এর জুলাই পর্যন্ত বাংলাদেশে গণহত্যা পরিচালনাকারী দল আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেত্রী শেখ হাসিনা ও তার মানবতা বিরোধী অপরাধের দোসরদের ভারতে আশ্রয় দেয়া; এতোসব নেতিবাচকতার মাঝেও বাংলাদেশ প্রতিবেশীর সঙ্গে ওয়ার্কিং রিলেশন ধরে রাখতে সচেষ্ট।
ভারতের সঙ্গে অভিন্ন নদীসহ প্রয়োজনীয় বিষয়ে বাংলাদেশ আলোচনার মাধ্যমে জমে থাকা সমস্যাগুলো সমাধান করতে আগ্রহী। দুই দেশের নাগরিকদের যাতায়াত ও সুসম্পর্ক ধরে রাখতে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে কোন কার্পণ্য নেই।
কিন্তু ভারতের কোন কোন মহল ও বাংলাদেশে তাদের অকৃত্রিম বন্ধুরা যেভাবে চায় যে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র নীতি দেখবে ভারত; তাদের সমর্থিত হাসিনা সরকারের শাসনামলের মতো করে; সেটা আধুনিক বিশ্বে স্বাধীন কোন রাষ্ট্রের কাছে অত্যন্ত অযৌক্তিক এক চাওয়া।
যে কোন দুটি রাষ্ট্রের দ্বি-পাক্ষিক সম্পর্ককে দেখতে হয় বাস্তবতার নিরিখে। তারেক রহমান তার বিদেশ নীতি সাজিয়েছেন সেই বাস্তবতার নিরিখে। সুতরাং তার মালয়েশিয়া ও চীন সফরকে কেন্দ্র করে সোশ্যাল মিডিয়ায় বিজেপি-আওয়ামী লীগ ও কালচারাল উইং যে তিক্ত প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছে; তা বাস্তবতা বিবর্জিত ও অশালীন।
২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট যে নতুন বাংলাদেশ যাত্রা শুরু করেছে; তা বাংলাদেশী জাতির এক সামষ্টিক সার্বভৌম উত্থান। অর্থনৈতিক আত্মনির্ভর কৌশল অর্জন, অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ বিকাশ, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের চর্চা, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে প্রতিটি নাগরিকের জীবনে অনুবাদ; এরকম কল্যাণরাষ্ট্রমুখী রাষ্ট্রকল্প নিয়ে সরকারি দল-বিরোধী দল ও প্রতিটি নাগরিক কাজ করছে।
আজকের দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতে কনস্টিটিউশনাল হিন্দুইজম, পাকিস্তানে কনস্টিটিউশনাল মিলিট্রিইজমের সঙ্গে তুলনা করলে বাংলাদেশ সাংবিধানিক গণতন্ত্রের অত্যন্ত শুভ চর্চায় রয়েছে। তারেক রহমানের সরকার বিরোধী দল ও জনগণের সহযোগিতায় এই পাঁচ বছর নিরলস কাজ করতে পারলে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার উজ্জ্বল এক রাষ্ট্র হিসেবে প্রশংসিত হবে; এ প্রত্যাশা আমরা রাখতেই পারি।



পাঠকের মন্তব্য