সদ্য সমাপ্ত বাবা দিবসটি অন্যান্য বছরের চেয়ে একটু ভিন্ন আমেজে কেটেছে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে। তবে এই বিশেষ দিনে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত 'রাজনৈতিক নীরবতা' নিয়ে চরম হতাশা ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে জামায়াতে ইসলামীর ভেতরে। নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, নির্বাচনকালীন জোটের অন্যতম প্রধান শরিক দল ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি)-র কাছ থেকে প্রত্যাশিত ‘ফাদার্স ডে উইশ’ না পেয়ে দলটির নীতিনির্ধারক মহলে এক ধরনের চাপা অভিমান ও মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, এই বছরের জুনের ‘বাবা দিবস’ রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। বিশেষ করে গত বছরের ২০ অক্টোবর সাতক্ষীরার এক জনসভায় জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ারের সেই ঐতিহাসিক ও ক্ল্যাসিক উক্তি, জন্ম নিয়েই বাপের সঙ্গে পাল্লা দিও না... জামায়াতের সঙ্গে পাল্লা দিতে গেলে আরও বহুদূর যেতে হবে।
বক্তব্যটির পর দেশের রাজনীতিতে জামায়াত ও এনসিপির সম্পর্ক কেবল ‘নির্বাচনী জোটভিত্তিক’ থাকেনি, বরং তা এক প্রকার ‘পারিবারিক ও অভিভাবকসুলভ’ সম্পর্কে রূপ নিয়েছিল।
বিশেষ করে এনসিপিকে ছেলে এবং জামায়াতকে বাপ হিসেবে রূপক অর্থে দাঁড় করানোর পর, এবারের বাবা দিবসে জোটের কনিষ্ঠ দলটির কাছ থেকে একটি আনুষ্ঠানিক শুভেচ্ছা বার্তা বা অন্তত ফেসবুকে একটি রিঅ্যাক্ট আশা করেছিল জামায়াত।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জামায়াতের এক সমর্থক গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,
রাজনীতিতে আদর্শিক মতপার্থক্য থাকতেই পারে, নাহিদ ভাই ফেসবুকে আমাদের সংবিধানের সমালোচনা করতেই পারেন, কিন্তু বাঙালি সংস্কৃতির সৌজন্যবোধ কোথায় গেল? ডিসেম্বরে আমরা জোট করে ওদের ৩০টি আসন ছেড়ে দিলাম, অথচ জুন মাসে এসে তারা একটা ‘হ্যাপি ফাদার্স ডে’ স্ট্যাটাসও দিতে পারল না? এটা কি এক ধরনের আদর্শিক বিশ্বাসঘাতকতা নয়?
তিনি আরও যোগ করেন, গোলাম পরওয়ার ভাই যখন খোলা মাঠেই বলে দিয়েছেন কে বাপ আর কে ছেলে, তখন তো প্রতি বছরের জুন মাসের তৃতীয় রবিবারে একটা শুভেচ্ছা কার্ড পাঠানো নৈতিক দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।
এদিকে এনসিপির পক্ষ থেকে বিষয়টিকে সম্পূর্ণ কৌশলগত নীরবতা হিসেবে দেখা হচ্ছে। দলটির ভেতরের এক সূত্র জানিয়েছে, জামায়াতের সাথে জোট করার পর এমনিতেই দলের ভেতর জেন-জি এবং যুব ভোটারদের একাংশের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল। এখন যদি প্রকাশ্যে ফেসবুক পোস্টে জামায়াতকে ‘বাবা দিবসের’ শুভেচ্ছা জানানো হতো, তবে দলের ভেতরে আবারও গণপদত্যাগের ঢল নামতে পারত।
এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের ঘনিষ্ঠ এক নেতা জানান,
আমাদের অবস্থান পরিষ্কার। এটি কেবলই একটি নির্বাচনী ও রাজনৈতিক সমঝোতা ছিল, কোনো পারিবারিক বা জেনেটিক সম্পর্ক নয়। তাছাড়া, আমরা তো বলেই দিয়েছি জন্ম নিলেই বাপের সাথে পাল্লা দেওয়া ঠিক না, তার মানে এই নয় যে আমাদের প্রতি বছর উইশ করতে হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই শুভেচ্ছা-খরার কারণে জামায়াত-নেতৃত্বাধীন জোটের ভেতরের মনস্তাত্ত্বিক ফাটল আরও স্পষ্ট হলো। প্রধান বিরোধী শক্তি হিসেবে সংসদে ভূমিকা রাখলেও, সংসদের বাইরে এই ‘বাপ-বেটার’ শীতল যুদ্ধ কতদূর গড়ায়, সেটাই এখন দেখার বিষয়। রাজনৈতিক পাড়ায় এখন রসালো আলোচনা চলছে—আগামী আগস্টে যুব দিবসে জামায়াত এনসিপিকে ‘পুত্র স্নেহে’ কোনো পাল্টা শুভেচ্ছা পাঠায় কি না!


