আজ ভিয়েনার এই নিঝুম রাতে একা বসে পুরোনো দিনগুলোর কথা খুব মনে পড়ছে। লোকে আমাকে চেনে উলফগ্যাং আমাদিউস মোৎজার্টের কঠোর পিতা হিসেবে। কেউ বলে আমি লোভী, কেউ বলে আমি অত্যাচারী। কিন্তু আজ ইতিহাসের পাতা উল্টে যদি আমার বুকের ভেতরটা কেউ দেখত, তবে বুঝতে পারত একজন বাবা তার সন্তানের জন্য নিজের পুরো অস্তিত্ব কীভাবে বিলিয়ে দিতে পারে।
১.
আমি লিওপোল্ড মোৎজার্ট। সালৎসবার্গের রাজদরবারের নামকরা ভায়োলিন বাদক এবং সুরকার ছিলাম। আমার লেখা সংগীত শিক্ষার বই তখন পুরো ইউরোপের পণ্ডিতরা সমীহ করত। ক্যারিয়ারের মধ্যগগনে দাঁড়িয়ে অহংকার করার মতো সব উপাদানই আমার ছিল। কিন্তু অহংকার আমি করছি না, শুধু সত্যি কথা বলছি।
১৭৫৬ সালে আমার ঘরে জন্ম নিল এক অলৌকিক শিশু। আমার পুত্র, আমার সাধের ছেলে, আমাদিউস।
আমি অবাক হয়ে দেখলাম, ওর বড় বোন নানার্ল যখন ক্ল্যাভিসর্ড (এক ধরনের প্রাচীন পিয়ানো) বাজাত, ছোট্টো আমাদিউস মন্ত্রমুগ্ধের মতো তা শুনত এবং বোন উঠে যাওয়ার পর নিজেই নিখুঁতভাবে সেই সুরের নোটগুলো ধরে ফেলত। চার বছর বয়সেই সে ছোট ছোট মিনুয়েট (এক ধরনের সুর) বাজানো শুরু করল আর পাঁচ বছর বয়সে নিজেই সুর তৈরি করতে শুরু করল। আমি সেদিন স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। বুঝতে পেরেছিলাম, ঈশ্বর নিজের হাতে এই সুরের রাজপুত্রকে আমার ঘরে পাঠিয়েছেন।
সেদিন রাতে আমি আমার নিজের বেহালাটা চিরতরে বাক্সে বন্দি করলাম। নিজের সুর তৈরির সব খাতা সরিয়ে ফেললাম। সিদ্ধান্ত নিলাম, আজ থেকে সুরকার লিওপোল্ডের মৃত্যু হলো, জন্ম হলো একজন শিক্ষকের, একজন বাবার, যার একমাত্র সাধনা নিজের সন্তানকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সুরকারে পরিনত করা। তার জিনিয়াসনেস সারা পৃথিবীর বুকে ছড়িয়ে দেয়া।
২.
আমাদিউসের বয়স যখন মাত্র ছয়, আমি ওকে আর নানার্লকে নিয়ে বের হলাম এক দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর ইউরোপ সফরে। ১৭৬২ থেকে ১৭৭৩, এই দীর্ঘ এগারোটি বছর আমরা মিউনিখ, ভিয়েনা, প্যারিস, লন্ডন চষে বেড়িয়েছি।
আজকের মতো আরামদায়ক গাড়ি তো তখন ছিল না। হাড় কাঁপানো শীতে, ভাঙা রাস্তায় কাঠের গাড়িতে করে দিনের পর দিন চলতে হতো। আমি রাজদরবারগুলোতে চিঠি লিখতাম, কনসার্টের টিকিট বিক্রি করতাম, হোটেলের হিসাব রাখতাম।
আমার বাচ্চারা এই যাত্রাজনিত ক্লান্তি সহ্য করতে পারত না। বারবার অসুস্থ হয়ে পড়ত। তবু আমি হাল ছাড়তাম না।
লোকে ভাবত আমি ছেলেকে দেখিয়ে পয়সা কামাচ্ছি, কিন্তু কেউ দেখেনি লন্ডনে যখন আমাদিউস টাইফয়েডে আক্রান্ত হলো, কিংবা নেদারল্যান্ডসে যখন ওর মারাত্মক গুটিবসন্ত হলো,আমি কীভাবে হাহাকার করে ঈশ্বরের কাছে নিজের প্রাণটা দান দিয়েছিলাম ওর সুস্থতার জন্য। নিজের জীবনের তোয়াক্কা না করে রাতের পর রাত জেগে সেবা করে ওকে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে এনেছিলাম। চিকিৎসকরা হাল ছেড়েছিলেন, আমি ছাড়ি নি। আমার সন্তান যে ও, কীভাবে ছাড়ি?
৩.
আমদিউস বড় হতে লাগল, আর ওর চঞ্চলতা আরও বাড়তে লাগল। সে কারণে আমি আরও কঠোর হতে বাধ্য হলাম। ও ছিল জন্মগত জিনিয়াস, কিন্তু দুনিয়াদারির কিচ্ছু বুঝত না। ও যেন সাধারণ সস্তা আনন্দের মোহে ওর ঈশ্বরদত্ত প্রতিভা হারিয়ে না ফেলে, সেজন্য আমি ওকে কড়া শাসনে রাখতাম। দিনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা রেওয়াজ করাতাম। কোনো শৈশব আমি ওকে দিতে পারিনি, এই দুঃখ আমারও ছিল। সারাজীবন ছিল, সারাজীবন থাকবে। কিন্তু ওর সুরকে অমর করতে আমাকে এই কঠোরতার মুখোশটা পরতেই হতো।
কিন্তু ও আমাকে ভুল বুঝতে শুরু করল। ও যখন আমাকে ছেড়ে ভিয়েনায় চলে গেল স্বাধীনভাবে বাঁচবে বলে, আমার বুকটা ভেঙে গিয়েছিল।
১৭৭৭ সালে প্যারিসে ওর অবহেলার কারণে যখন আমার স্ত্রী, ওর মা মারা গেল, আমি নিজেকে সামলাতে পারিনি। আমি ওকে দোষ দিয়েছিলাম কারন আমি আমার সব কিছুই ওর জন্য বাজি রেখেছিলাম আর আস্তে আস্তে আমি বাজি হেরে যাচ্ছিলাম বলে মনে হচ্ছিল। তবুও.. আমি দূর থেকে শুধু ওর মঙ্গলটাই চেয়েছিলাম।
৪.
সবচেয়ে বড় আঘাতটা ও দিল যখন আমার অমতে কনস্টানজা ওয়েবারকে বিয়ে করল। আমি জানতাম ওই মেয়েটা ওর যোগ্য নয়, ও শুধু আমার আমাদিউসের টাকার লোভে এসেছে। আমি চিঠি লিখে বারণ করেছিলাম, কিন্তু ও আমার কথা শোনেনি। আমাদের মাঝে তৈরি হলো এক বিশাল, দুর্ভেদ্য দেয়াল।
১৭৮৫ সালে আমি শেষবারের মতো ভিয়েনায় ওর বাড়িতে গিয়েছিলাম। তখন ও মস্ত বড় সুরকার। বিখ্যাত সুরকার জোসেফ হাইডন সেদিন আমার হাত ধরে বলেছিলেন, লিওপোল্ড, আপনার ছেলে আমার দেখা ইতিহাসের সবচেয়ে মহান সুরকার।
সেদিন বৃদ্ধ বয়সে আমার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়েছিল। মনে হয়েছিল, আমার জীবনের সমস্ত ত্যাগ, সমস্ত কষ্ট আজ স্বার্থক হল।
৫.
১৭৮৭ সাল। আমার শেষ সময় ঘনিয়ে এসেছে। আমাদিউস এখন আমার কাছ থেকে আরও অনেক দূরে। ও হয়তো এখনও আমাকে একজন রাগী, নিয়ন্ত্রণপ্রবণ বাবা বলেই মনে করে। কিন্তু আমি জানি ও আমার কোন যত্নের ধন। ও আমার বড় আশার, আকাঙ্খার, বড় গর্বের!
ও তো জানে যে, ও যা সৃষ্টি করেছে তার প্রতিটা নোটের আড়ালে আমার যৌবন, আমার ক্যারিয়ার আর আমার চোখের জল, আমার বুকের রক্ত মিশে আছে। একদিন ও বুঝবে ওর বাবাকে। এটা আমি বিশ্বাস করি। আমি জানি ও বুঝবেই।
আমি চলে যাব, কিন্তু পৃথিবী যতদিন থাকবে, আমার আমাদিউসের সুরের মাঝেই তার ত্যাগী বাবাটাও বেঁচে থাকবে।
যেখানেই থাকো, ঈশ্বর তোমার মঙ্গল করবেন। আর....
আমি তোমাকে ভালবাসি।



পাঠকের মন্তব্য