ব্রাজিল আর হাইতির ম্যাচটা শেষ হলো। এই ম্যাচের ডাইনামিকটা আমার কাছে খুব ইন্টারেস্টিং।
হাইতি রাষ্ট্রের সূচনাই হয়েছিলো একটা দাস বিদ্রোহ থেকে। দুনিয়ার প্রথম দেশ হিসেবে ১৮০৫ সালে হাইতি দাসপ্রথা উচ্ছেদ করে। অন্যদিকে পশ্চিমা বিশ্বের দেশগুলোর মধ্যে ব্রাজিল সবার পরে দাসপ্রথা উচ্ছেদ করে, ১৮৮৮ সালে।
হাইতির ব্যর্থ রাষ্ট্র হবার গল্পটা আমরা অনেকেই জানি।
ব্রাজিলের গল্পটা আরেকটু প্যাঁচানো; এবং আশাদায়ক। একটা শোষিত কলোনি হিসেবে শুরু করেও একটা দেশের পক্ষে যে বিশ্বমঞ্চে প্রকৃত সার্বভৌমত্ব পাওয়া সম্ভব, ব্রাজিল তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ। আর মজার ব্যাপার হলো, ফুটবল এই গল্পের একটা কেন্দ্রীয় চরিত্র।
পর্তুগিজরা ব্রাজিলকে ব্যবহার করেছিলো কফি আর আখ উৎপাদনের জন্য। সেজন্য আফ্রিকা থেকে জাহাজভর্তি ক্রীতদাস আমদানি করা শুরু হয়। উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকায় আফ্রিকা থেকে যত ক্রীতদাস আনা হয়েছিলো, তার প্রায় অর্ধেকের গন্তব্য ছিলো ব্রাজিল।
এই মানুষগুলো দিনে আঠারো ঘণ্টা কাজ করতেন। পরিবার-পরিজন ছেড়ে এই নারকীয় পরিবেশে থাকতে গিয়ে অনেকেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়তেন, খাওয়া বন্ধ করে দিতেন। এই মানসিক রোগের একটা নামও ছিলো ব্রাজিলেঃ বাঞ্জো।
১৮৮৮ সালে ব্রাজিল দাসপ্রথা বাতিল করে। অথচ সাবেক ক্রীতদাসদের ভাগ্যে কোনো পরিবর্তন আসলো না। জমি নেই, ক্ষতিপূরণ নেই, শিক্ষা নেই; এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে খালি হাতে ফি-সাবিলিল্লাহ ছেড়ে দেওয়া হলো।
আর রাষ্ট্রের এই অবহেলা থেকেই জন্ম নিলো ব্রাজিলের বিখ্যাত বস্তিগুলো — ফ্লাভেলা। মুক্তিপ্রাপ্ত ক্রীতদাস আর ভূমিহারা কৃষকরা কাজের খোঁজে শহরে এসে পাহাড়ের ঢালে বসতি গড়তে শুরু করলেন। বর্তমানে ব্রাজিলের মোট জনসংখ্যার ৮% এই ফ্লাভেলাগুলোতে থাকেন।
শুরু থেকেই ফ্লাভেলাগুলো ছিলো সরকারের নজরের বাইরে। চাকরি নেই, শিক্ষা নেই, চিকিৎসা নেই। কিন্তু এই অমানবিক পরিবেশেও একটা জিনিস অক্ষুণ্ণ ছিলো — ফুটবল।
প্রায় প্রতিটা ফ্লাভেলায় পিচ ছিলো। বাচ্চারা জঞ্জাল দিয়ে বানানো বল নিয়ে খালি পায়ে খেলতো। এই রেফারিবিহীন খেলায় গোল দেওয়া একমাত্র উদ্দেশ্য ছিলো না। এটা ছিলো নিজেকে প্রমাণ করার জায়গা, বাইরের দুনিয়ায় স্বীকৃতি পাওয়ার একটা সুযোগ। সেখানে গোল দেওয়া বা খেলা জেতা ছিলো পরের ব্যাপার, মূল আকর্ষণ ছিলো সৌন্দর্য আর বিনোদন।
এই দর্শন থেকেই তৈরি হলো জোগো বোনিতো; নান্দনিক ফুটবল।
ফ্লাভেলা ফুটবলের প্রথম পোস্টারবয় পেলে। মায়ের মোজা দিয়ে তৈরি বল নিয়ে খেলা ছেলেটি প্রমাণ করলেন, ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় সুপারস্টাররা লুকিয়ে আছেন দেশটির সবচেয়ে বঞ্চিত মানুষগুলোর মধ্যেই। পেলের পর রিভালদো, রোনালদো নাজারিও, রোনালদিনহো, আদ্রিয়ানো; কিংবা হালের ভিনিশিয়াস জুনিয়র বা গ্যাব্রিয়েল জেসুস- সবাই ফ্লাভেলার প্রোডাক্ট।
পেলের দল ১৯৫৮ এবং ১৯৬২ সালে পরপর দুটো বিশ্বকাপ জেতে। ১৯৭০ সালে আবার জেতে — সেই দলটাকে এখনও ইতিহাসের সেরা ফুটবল দল বলা হয়।
দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জেতার কয়েক মাস আগে জোয়াও গুলার্ট ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট হন। তিনি মার্ক্সিস্ট বা কমিউনিস্ট কিছুই ছিলেন না। তিনি শুধু চেয়েছিলেন জমিদারদের হাতে থাকা জমি কৃষকদের মধ্যে বিতরণ করতে।
এই "অপরাধে" ১৯৬৪ সালে সিআইএ-সমর্থিত সামরিক অভ্যুত্থানে গুলার্ট ক্ষমতাচ্যুত হন। নতুন সামরিক সরকার শ্রমিক ইউনিয়ন, বামপন্থী দল, মানবাধিকার সংগঠন এবং ক্যাথলিক চার্চের সদস্যদের ওপর ধরপাকড়, খুন আর নির্যাতন চালানো শুরু করে। এর সরকারি নামটাও ছিলো বেশ ক্লাসিক , অপারেশন ক্লিন-আপ।
গ্লোবাল সাউথের ইতিহাসে এটা সেই মুহূর্ত যখন একটা দেশ ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হয়। কিন্তু ব্রাজিলের মানুষ প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন। আর সেই প্রতিরোধ মূর্ত হয়ে উঠেছিলো সম্পূর্ণ ভিন্ন দুই জগতের দু'জন মানুষের মধ্যে।
ব্রাজিলের সবচেয়ে খরাপ্রবণ ও দরিদ্র অঞ্চলে লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভার জন্ম ১৯৪৫ সালে। সাত বছর বয়সে পরিবার সাও পাওলোতে চলে আসে। পড়াশোনা ছেড়ে শুরু হয় জুতার কাজ, তারপর বাদাম বিক্রি। কারখানায় কাজ করতে গিয়ে ১৪ বছর বয়সে হারান একটি আঙুল।
কিন্তু ধীরে ধীরে তিনি হয়ে উঠলেন শ্রমিক ইউনিয়নের নেতা। সত্তরের দশকে তাঁর ডাকা ধর্মঘটের মাধ্যমে ব্রাজিলে প্রথম সেনাশাসনবিরোধী আন্দোলন শুরু হয়। ১৯৮০ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ব্রাজিলিয়ান ওয়ার্কার্স পার্টি — পিটি।
লুলা যখন রাস্তায় মানুষ সংগঠিত করছিলেন, তখন আরেকজন মানুষ প্রতিরোধের মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন ফুটবল মাঠকে।
সক্রেটিসের জন্ম ১৯৫৪ সালে। তাঁর বাবা ছিলেন একজন স্বশিক্ষিত মানুষ, বাড়িতে গড়েছিলেন বিশাল লাইব্রেরি। ১৯৬৪ সালে সেনাবাহিনী ক্ষমতায় আসলে তিনি সেই "বিপজ্জনক" বইগুলো পুড়িয়ে ফেলেন। দশ বছরের সক্রেটিসের মাথায় সেই দৃশ্য গেঁথে গেলো।
পেশাদার ফুটবল খেলার পাশাপাশি সক্রেটিস সাও পাওলো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মেডিকেল ডিগ্রি নিলেন। ঝাঁকড়া চুল, ঘন দাড়ি, চেইন স্মোকার — অথচ মাঠে সেই লম্বা ছিপছিপে শরীরে যা করতেন তা ছিলো ঈশ্বরীয়।
স্বৈরশাসকরা বলতো ব্রাজিলিয়ানরা গণতন্ত্রের জন্য প্রস্তুত না। সেই ধারণাকে মিথ্যা প্রমাণ করতে সক্রেটিস তাঁর ফুটবল ক্লাব করিন্থিয়াসে চালু করলেন "করিন্থিয়ান ডেমোক্রেসি"। ক্লাবের মালিক থেকে কিটম্যান — সবার ভোটে পরিচালিত হতো ক্লাব। একজন সুইপারের আর দলের সবচেয়ে বিখ্যাত খেলোয়াড়দের ক্ষমতা সমান।
১৯৮২ সালে পুরো করিন্থিয়াস দল তাদের জার্সির পেছনে "গণতন্ত্র" লিখে মাঠে নামলো। সেই বছরই সক্রেটিস বিশ্বকাপে ব্রাজিলের অধিনায়কত্ব করলেন। জিকো, সক্রেটিস, ফালকাও, এদেরকে নিয়ে গড়া সেই ১৯৮২-এর ব্রাজিল দলটাকে এখনও বলা হয় "The Greatest Team Never to Win the World Cup"।
সিরিয়াসলি, এই দলটার হাইলাইটস এখনও ইউটিউবে পাওয়া যায়। একবারের জন্য হলেও সবার সেটা দেখা উচিত।
১৯৮৪ সালে সরাসরি নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন শুরু হলে লুলার পিটির এক সভায় বিশ লক্ষ মানুষের সামনে সক্রেটিস ঘোষণা দিলেন — সামরিক জান্তা নির্বাচন না দিলে তিনি ব্রাজিল ছেড়ে ইতালিতে খেলবেন।
জান্তা নির্বাচন দিলো না। সক্রেটিস ফিওরেন্তিনায় চলে গেলেন। ইতালিতে পৌঁছে সাংবাদিকরা জিজ্ঞেস করলেন, ইতালিয়ান ফুটবলের কোন কিংবদন্তিকে পছন্দ করেন? উত্তর দিলেন — "আন্তোনিও গ্রামসি"।
পরের বছর ব্রাজিলে গণতন্ত্র ফিরলো।
২০০২ সালে লুলা প্রেসিডেন্ট হলেন। ২০০৩ থেকে ২০১২-র মধ্যে তাঁর নেতৃত্বে ব্রাজিলের দারিদ্র্যের হার কমলো প্রায় অর্ধেক।
কিন্তু নিজেদের স্বার্থের বিপরীতে এক বামপন্থীর শাসন মার্কিনিরা মেনে নেবে কেন? বিচারক সার্জিও মোরো, যিনি পরে বলসেনারোর মন্ত্রী হয়েছিলেন, দুর্নীতির এমন একটি মামলায় লুলাকে কারাবন্দি করলেন যেখানে প্রমাণ হয়েছে বিচারক নিজেই পক্ষপাতদুষ্ট ছিলেন। ২০১৮-এর নির্বাচনের আগে ৫৮০ দিন জেলে থেকেও লুলা জনমত জরিপে এগিয়ে ছিলেন। কিন্তু তাকে নির্বাচন করতে দেওয়া হলো না।
২০২১ সালে সুপ্রিম কোর্ট তাঁর সব শাস্তি বাতিল করে দিলো। ২০২২ সালে বলসেনারোকে হারিয়ে আবার ক্ষমতায় এলো পিটি। বলসেনারো অভ্যুত্থানের চেষ্টা করলো, ব্যর্থ হলো এবং গ্রেফতার হলো।
নিজেদের দালাল গ্রেফতার হওয়ায় ট্রাম্প ব্রাজিলের উপর ৫০% শুল্ক আরোপ করলো। ব্রাজিল কর্ণপাত করলো না। দেশটা এখন উচ্চ মধ্যবিত্ত আয়ের দেশ, দুনিয়ার অন্যতম বৃহৎ শিল্পোন্নত অর্থনীতি। লুলার জবাব ছিলো সোজাসাপটা, "ব্রাজিল একটা সার্বভৌম রাষ্ট্র, আমরা কারো অভিভাবকত্ব মানবো না।"
এটা সত্যি যে ফ্লাভেলা এখনও যায়নি। জমিদারদের হাতে এখনও ক্ষমতা আছে। কাঠামোগত সমস্যাগুলো গভীর।
কিন্তু লুলা, সক্রেটিস আর ব্রাজিলের মানুষের প্রতিরোধের ইতিহাস আমাদের শেখায় — আরেকটা দুনিয়া তৈরি করা সত্যিই সম্ভব। তবে তার জন্য দরকার সংগ্রাম আর সংহতি।
আর দরকার স্বপ্ন দেখার সাহস। লুলার রাজনৈতিক প্রচারণার মূল স্লোগান ছিলো — "sem medo de ser feliz" — সুখী হতে ভয় নেই।
যদি আমরা আরেক দুনিয়ার স্বপ্নই দেখতে না পারি, তাহলে এই দুনিয়ায় আমাদের গলা থেকে জালিমের জুতার চাপ কোনোদিন সরবে না।
ছবিঃ বামে বিশ্বকাপ জয়ের পর জনতার ঘাড়ে পেলে, মাঝখানে '৮০ সালে একটি সফল ধর্মঘটের পর একই অবস্থায় লুলা ডি সিলভা, ডানে "গণতন্ত্র" লেখা জার্সি গায়ে সক্রেটিস।



পাঠকের মন্তব্য