খেলনা চৌধুরীর উচ্চবর্গ কল্পনা

৭৪ পঠিত ... ২৩ ঘন্টা ৪১ মিনিট আগে

 
ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের কর্মকর্তারা একবার সচিবালয়ে ঘুরতে এসে জিজ্ঞেস করেছিলেন, এই যে প্রতিটি কক্ষের সামনে টুলে একজন লোক বসে থাকে; যাকে বার বার উঠে দাঁড়াতে ও বসতে দেখা যায়; তার আসলে কাজ কি!
এই প্রশ্নের যৌক্তিক কোন উত্তর নেই। দক্ষিণ এশিয়ায় অফিসার হলে তার সম্ভ্রম অনুভব করতে চাকর-বাকর লাগে। কল্পিত নিম্নবর্গের লোকের ওপর ছড়ি ঘোরাতে না পারলে কেউ কল্পিত উচ্চবর্গ সাজতে পারে না।
ফেসবুকে আজো রসিকতার বিষয় হচ্ছে, ঈদের ছুটি শেষে কাজের বুয়া ফেরেনি। আপনি ভাবতে পারেন, আধুনিক পোশাক আশাক পরে একবিংশ শতকের একজন তরুণ বা তরুণী দাস প্রথা নিয়ে প্রগলভ হচ্ছে।
আমাদের সমাজে প্রতিদিনের যে তিক্ততা; তা হচ্ছে অন্যদের নিম্নবর্গের প্রমাণ করে; নিজেকে উচ্চবর্গের প্রমাণ করা্র বাতিক।
এই বাংলাদেশেই কয়েক জেনারেশন ধরে শিক্ষিত ও সচ্ছল পরিবার রয়েছে। তাদের গৃহে কর্মীরা পরিবারের সদস্যের মর্যাদা পান। কাউকে চাকুরিচ্যুত করা ওসব পরিবারের কালচারে নেই। বরং দীর্ঘদিন যারা কাজে সাহায্য করে; তাদের নিজের সন্তানের মতো করে দাঁড় করিয়ে দেবার চল রয়েছে। অনেক প্রজন্ম ধরে এফলুয়েন্স থাকায়, এটা তাদের কাছে কোন গর্বের বিষয় নয়। কোন ব্যক্তি রেগে গেলে কিভাবে প্রতিক্রিয়া জানায়; সেটাই তার ডিএনএ-র এক্সরে রিপোর্ট।
সুলতানি, মুঘল ও নবাবী আমল হয়ে; বৃটিশ আমলের প্রতিকূল পরিবেশ হয়ে পাকিস্তান আমলের বিরুপ পরিস্থিতি পার হয়ে; স্বাধীন বাংলাদেশে ভারতীয় আগ্রাসন সয়েও শিষ্টাচার সম্পন্ন মানুষ এ সমাজে টিকে আছে। এরা যেহেতু ক্ষমতা-কাঠামোর লেজুড়বৃত্তি না করে সততার অন্ন গ্রহণ করেন; ফলে তাদের অনেকের এফলুয়েন্স হয়তো ক্ষয়ে গেছে; কিন্তু আভিজাত্য ও মেরুদণ্ড টিকে আছে।
বৃটিশ আমল, পাকিস্তান আমল ও বাংলাদেশ আমলে ভারতীয় ছায়া উপনিবেশের মনপছন্দ ক্ষমতা-কাঠামোর পা-পূজা করে; নব্য ধনিক ও বণিক; নব্য শিক্ষা ও কালচার নিয়ে এরা ফুলে ফেঁপে ওঠে। এদের পেট ভর্তি মানসম্মান; ফলে তাদের অনৈতিক ও অবৈধ সম্পদ কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে কেউ কথা বললেই প্রচন্ড মানসম্মানে লেগে যায়। এ কারণে ২০০১-০৬ রাস্তায় পড়ে মার খাওয়া আওয়ামী লীগ নেতা ও কর্মীরা ২০০৯ সালে ক্ষমতা পেয়েই মানসম্মানের রক্ষাকবচ ও কালো আইন সৃষ্টি করলো। ২০০৯-২০২৪ রাস্তায় পড়ে মার খাওয়া বিএনপি নেতা ও কর্মীরা দেখবেন আজকাল মানসম্মান নিয়ে অত্যন্ত চিন্তিত। তারা কালো আইনের ড্রাফট করছে। এখন যে জামায়াত নেতা কর্মীরা প্রতিদিন অপমানিত তারা যদি কখনো ক্ষমতা হাতে পায়; প্রথম তারা চিন্তা করবে মানসম্মান নিয়ে; কালো আইন নিয়ে আসবে তারা দ্রুততার সঙ্গে। সুতরাং দ্রুত উচ্চবর্গ সেজে মানসম্মানের যে বাতিক তৈরি হয়; তা দলীয় কোন ব্যাপার নয়; এটা হচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার মানসিক রোগ।
বৃটিশ আমলে মুন্সী, সেরেস্তাদার থেকে নব্য জমিদার হয়ে ওঠা লোকের ছেলেরা যেহেতু বাম দল করতো; পাকিস্তান আমলে গেদু মিয়া ও লেবু মিয়া থেকে নব্য সম্ভ্রান্ত হয়ে ওঠা লোকের ছেলেরা বাম দল করেছে। ফলে বাম দল করলে বাবা নব্য জমিদার কিংবা নব্য সম্ভ্রান্ত না হলেও পোশাকে-চলনে বলনে ডামি জমিদার ও ডামি সম্ভ্রান্ত হয়ে ওঠার বাতিক আছে। এদের মানসম্মান জ্ঞান অত্যন্ত টনটনে। পাঁড় হিন্দু ও পাঁড় মুসলমানের ছেলে কয়েকদিন রবীন্দ্রনাথ, কার্ল মার্কস, গায়ত্রী স্পিভাকের বই নিয়ে ঘোরাঘুরি করে; কল্পনায় নিজেদের জোড়া সাঁকোর ঠাকুর পরিবারের কিংবা ট্রিয়ারের মার্কস পরিবারের সদস্য ভাবতে শেখে। পৃথিবীর অন্য কোন দেশে এমন স্বঘোষিত লিবেরেল পাবেন না।
লিবেরেলের তো নিজেকে লিবেরেল আর অন্যদের কনজারভেটিভ বলার দরকার নাই। জীবন চর্যা, শিষ্টাচার, ভিন্নমতের প্রতি সহিষ্ণুতা, নতুন চিন্তাকে গ্রহণ করতে পারা, ম্যাগালোম্যানিয়া না থাকা দেখে লোকে অনায়াসে বুঝতে পারে লোকটা উদারপন্থী।
একজন কট্টর হিন্দুত্ববাদী বা কট্টর ইসলামপন্থী যেমন চট করে রেগে গিয়ে খেঁকিয়ে ওঠে; একজন বামপন্থী ঠিক তেমনি চট করে খেঁকিয়ে উঠলে; তাকেও তো কট্টর বলবে সমাজের মানুষ।
এই যে সর্বদলীয় ঐক্যজোট জুলাই বিপ্লবে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ভীত নড়ে যাওয়ায় ২০২৪ সালে ৫ অগাস্ট সন্ধ্যা থেকে জুলাই তারুণ্যকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে চলেছেন; এর মাঝ দিয়ে তারা কি প্রমাণ করতে চান, তারা বড্ড মুখে উপটান মেখে টানটান; আর জুলাই তারুণ্য সাব অল্টার্ন।
নেহেরুর পরিবার কাশ্মীর নহর থেকে কলসীতে করে পানি সরবরাহ করতো; সেই নহর থেকে নেহেরু শব্দটি এসেছে। জিন্নার পূর্ব পুরুষ সমুদ্রে মাছ ধরতো। রুপার্ট মারডকের বাবা বিলবোর্ড শ্রমিক ছিলেন, ফর্মুলা ওয়ান -এর রেসিং তারকা সুমাখারের পূর্ব পুরুষ জুতা সেলাই করতো। আর সেইখানে কলকাতায় পোস্ত ভর্তা খেয়ে ডিরোজিও-র সঙ্গে মেলামেশা করে কল্পনায় বিরাট উচ্চবর্গ হয়ে ওঠা কিংবা ঢাকায় আজকের কাগজে পেটে-ভাতে কাজ করে ভাবে ভঙ্গিতে বিরাট চৌধুরী হয়ে পড়া; আর বাকি মানুষকে নিম্নবর্গ বলে দাগিয়ে দেয়া; এসবই হচ্ছে নিজের ইনফেরিওরিটি ঢাকতে সুপিরিয়রিটি প্রদর্শনের ডামাডোল। বৃটিশের পালকির চার ধার বহন করে চৌধারি থেকে চৌধুরি খেতাব পাওয়া লোকজনের যে বাগাড়ম্বর; ঐটাই অনন্তকাল ধরে আমাদের সমাজে চলছে।
মানুষের কোন শ্রেণী বা বর্গ নেই; এই সাম্যবোধ ডিএনএ ট্রেনিং-এর মধ্যে দিয়ে যেদিন কোন পরিবারের চিন্তা ও অনুশীলনে প্রতিফলিত হয়; তখন নিজে থেকে আর ফেসবুকে এসে এফলুয়েন্সের আনসফিস্টিকেটেড ফ্যাশন প্যারেড করতে হয়না। তখন লোকে নিজে থেকেই বলে, ঐ লোকটা সফিস্টিকেটেড।
 
৭৪ পঠিত ... ২৩ ঘন্টা ৪১ মিনিট আগে

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top