এবারের ২০২৬ বিশ্বকাপ দেখে মনে হচ্ছে, মাঠটা ফুটবল গ্রাউন্ড নয়, বরং ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে হাই-প্রোফাইল ‘সিনিয়র সিটিজেন ক্লাব’! নইলে একপাশে ৪১ বছরের রোনালদোর গতকালের হতাশাজনক পারফরম্যান্স, আর অন্যপাশে ৩৮-এর মেসির সেই চেনা দুর্দান্ত ম্যাজিক, সব মিলিয়ে সিনিয়র এই গ্যাংটাকে দেখে মনে হচ্ছে, বয়স বা ফর্ম যাই হোক না কেন, বিশ্বমঞ্চের লাইমলাইটটা এরা সহজে ছাড়ছেন না!
মাঠের একপাশে তরুণরা যখন উসাইন বোল্টের গতিতে ছুটছে, অন্যপাশে এই কিংবদন্তিরা তখন অভিজ্ঞতার জোরে দাঁড়া ব্যাটা, দেখাচ্ছি বুড়ো হাড়ের ম্যাজিক বলে টেক্কা দিচ্ছেন। ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে দামি এই 'ফেয়ারওয়েল পার্টিতে' কাপ কার ঘরে যাবে জানি না, তবে দর্শকদের যে খেলা দেখতে দেখতে মাঝে মাঝেই আহারে আর এমন খেলা দেখব না- এমন চিন্তা মাথায় আসবে, তা নিশ্চিত!
ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো, পর্তুগাল
৪১ বছর বয়সে মানুষ যেখানে সকালে ঘুম থেকে উঠে কোমরের ব্যথায় ‘আহ্-উহ্’ করে, ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো সেখানে এখনো বিশ্বকাপের মাঠে গোলের জন্য লড়ে যাচ্ছেন। তবে এবারের পারফরম্যান্স যেন বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছে—সময় কত নির্মম! মাঠের সেই চেনা ছন্দহীনতা, চোট আর বলের পেছনে তার ক্লান্ত ছুটে চলা দেখে বুকটা ভেঙে যায় সেই ভক্তদের, যারা তাঁকে চিতার গতিতে বক্সে ঢুকতে দেখে বড় হয়েছে। ডন নিজেই এবার সোজা সাপ্টা জানিয়ে দিয়েছেন, “বস, এটাই শেষ।” ৪১ বছর বয়সে তার অতিমানবীয় ফিটনেস হয়তো এখনো আছে, কিন্তু সোনালী সময়টা যে ফুরিয়ে এসেছে, তা গতকালের ম্যাচটাই বলে দেয়। বিশ্বমঞ্চে সেই বিখ্যাত ‘Siuuuu’ উদযাপন দেখার সুযোগ আর মাত্র কয়েকটা ম্যাচেরই, এরপর কেবলই থেকে যাবে এক মহাসমুদ্র নস্টালজিয়া।
তথ্যসূত্র: ফিফা
গুইলারমো ওচোয়া, মেক্সিকো
ফুটবলপ্রেমীদের কাছে ওচোয়া মানেই এক অদ্ভুত নস্টালজিয়া। সারা বছর ওচোয়া ক্লাবে কেমন খেললেন তা কেউ না জানলেও, ঠিক প্রতি চার বছর পর পর বিশ্বকাপ আসলেই মেক্সিকোর গোলপোস্টের নিচে এই কোঁকড়া চুলের মানুষটা অতিমানব হয়ে যেতেন। এবার ৪০ বছর বয়সে ওচোয়া নিজেই নিশ্চিত করেছেন যে, মেক্সিকোর দেয়াল এবার স্থায়ীভাবে ভেঙে ফেলা হচ্ছে। ফুটবলপ্রেমীদের জন্য এটা একটা বড় ধাক্কা—এরপর বিশ্বকাপ আসবে, কিন্তু গোলপোস্টে ওচোয়ার সেই অতিপ্রাকৃতিক সেভগুলো আর দেখা যাবে না!
তথ্যসূত্র: ESPN
লিওনেল মেসি, আর্জেন্টিনা
৩৮ বছর বয়সে এসে LM10 এবার খেলছেন তার ছয় নম্বর বিশ্বকাপ। যেখানে এই বয়সে সাধারণ ফুটবলাররা টিভিতে খেলা দেখতে দেখতে পপকর্ন খান, সেখানে মেসি এখনো মাঠের তরুণ ডিফেন্ডারদের কোমর বাঁকা করে ড্রিবলিং শেখাচ্ছেন! ভেঙে দিচ্ছেন নানান রেকর্ড! অবশ্য তিনি নিজে মুখে এখনও 'অবসর' শব্দটা উচ্চারণ করেননি। তবে ২০৩০ বিশ্বকাপে তার বয়স যখন ৪৩ হবে, তখন কি তিনি সত্যিই মাঠে দৌড়াবেন, নাকি ইজিচেয়ারে বসে ডাগআউটে চা খেতে খেতে সতীর্থদের বলবেন, আমাদের সময়ে একটা ওয়ান-টু-ওয়ান পাস খেলতাম না?
বয়স তার গতি কেড়ে নিয়েছে একটু, কিন্তু মাথার ভেতরের জিপিএস আর পায়ের জাদুটা এখনো নিখুঁত রয়ে গেছে। মাঠে তিনি যেভাবে পুরো খেলা টেনে নিয়ে গেলেন, তা দেখে মনে হয় তিনি ফুটবল খেলছেন না, বরং দাবার বোর্ডে খুব বুঝে চাল চালছেন। তবে বয়সের হিসাবটা ধরলে আমরা ভাবতেই পারি, হয়তো এটাই মেসির শেষ বিশ্বকাপ।
তথ্যসূত্র: FIFA
লুকা মদ্রিচ, ক্রোয়েশিয়া
ক্রোয়েশিয়ার মাঝমাঠের আসল ইঞ্জিন লুকা মদ্রিচের বয়স এখন ৪০। যেখানে এই বয়সে মানুষের ডাল-ভাত হজম করতে কষ্ট হয়, সেখানে মদ্রিচ এখনো মাঝমাঠে বিশ বছরের তরুণদের পেছনে ফেলে বল কেড়ে নিচ্ছেন! মাঠে তার ফুসফুসের দম দেখে মনে হয়, তিনি হয়তো সাইবারনেটিক কোনো রোবট, যার ব্যাটারি কখনো শেষ হয় না। ২০৩০ বিশ্বকাপে তার বয়স হবে ৪৪, তখন কি তিনি মাঠের মাঝখানে লাঠি ভর দিয়ে খেলবেন? বলাই বাহুল্য, ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে ফিট এই ‘তরুণ’ হয়তো এবারই তার শেষ জাদুর বাক্সটা বিশ্বমঞ্চে উপুড় করে দিচ্ছেন।
তথ্যসূত্র: FIFA
ইউতো নাগাতোমো, জাপান
৩৯ বছর বয়সী এই জাপানি ডিফেন্ডার ইউতো নাগাতোমোকে দেখে মনে হয়, তিনি বুঝি কোনো অ্যানিমে সিরিজ থেকে সোজা বিশ্বকাপের মাঠে চলে এসেছেন! ২০২২ কাতার বিশ্বকাপের পরেই এই সামুরাই বুট জোড়া তুলে রাখার কথা ভেবেছিলেন, কিন্তু দেশের টানে মন বদলে ২০২৬ বিশ্বকাপে আবারও মাঠে নেমে পড়েছেন। ৩৯ বছর বয়সে যেখানে উইঙ্গারদের পেছনে দৌড়ানো অলৌকিক ব্যাপার, নাগাতোমো সেখানে এখনো জাপানিজ নিনজাদের মতো মাঠ দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। তবে পরবর্তী বিশ্বকাপে তার বয়স ৪৩ পার হবে, তাই বলা যেতেই পারে, এটি এই এনার্জি বাঙ্কারের শেষ বিশ্বকাপ যাত্রা।
এরপর হয়তো জাপানের ডাগআউটে তার সেই চেনা নীল চুল আর হুঙ্কার দেখা যাবে না!
তথ্যসূত্র: FIFA
ম্যানুয়েল নয়ার, জার্মানি
৪০ বছর বয়সে মানুষ যেখানে বিকেলে একটু হাঁটতে বের হলেই হাঁপিয়ে ওঠে, জার্মানির এই গোলরক্ষক কিংবদন্তি ৪০ বছর বয়সে এসেও গোলপোস্টের নিচে যেন আস্ত একটা প্রাচীর! ফুটবল ইতিহাসে গোলকিপিংয়ের সংজ্ঞা বদলে দেওয়া এই ‘সুইপার-কিপার’ এখনো যেভাবে বক্সের বাইরে এসে ডিফেন্ডারের মতো বল ক্লিয়ার করেন, তা দেখে তরুণ স্ট্রাইকারদেরও বুক কাঁপে। তবে বয়স আর ফিটনেসের নির্মম বাস্তবতার পাশাপাশি জার্মানির পরবর্তী প্রজন্মের গোলরক্ষকদের জায়গা ছেড়ে দিতে এই আসরের পরেই তিনি গ্লাভস জোড়া তুলে রাখবেন—তা প্রায় নিশ্চিত।
এরপর জার্মানির গোলপোস্ট হয়তো সুরক্ষিত থাকবে, কিন্তু বক্স ছেড়ে মাঝমাঠের কাছাকাছি এসে নয়ারের সেই অতিমানবীয় ও ঝুঁকিপূর্ণ ড্যাশিং আর কখনো না-ও দেখা যেতে পারে!
তথ্যসূত্র: WTHR









পাঠকের মন্তব্য