১
মেডেলিন শহরের আকাশটা সেদিন বিকেলের দিকে কেমন যেন তামাটে রঙ ধারণ করেছিল। চেনা চেনা রাস্তাগুলো ধরে যখন মৃদু বাতাস বইছিল, তখনো কেউ জানত না এই বাতাস কতটা ভারী হয়ে উঠতে পারে।
সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয় হলো, ঘটনার কয়েক মাস আগে থেকেই একটা তীব্র উত্তেজনা চারপাশের বাতাসে ভাসছিল। একটা দেশের একঝাঁক তরুণ যখন সবুজ ঘাসের মাঠে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, তখন পর্দার আড়ালে বসে থাকা কিছু অন্ধকার জগতের মানুষ হিসাব কষছিল অন্য কিছুর। তাদের কাছে খেলাটা স্রেফ বিনোদন ছিল না, ছিল কোটি কোটি টাকার জুয়া।
পুরো দেশের মানুষের আকাশচুম্বী প্রত্যাশার পারদটা চড়ছিল প্রতিদিন। তারা দক্ষিণ আমেরিকার পরাশক্তিদের হারিয়ে মূল মঞ্চে এসেছিল বুকভরা আশা নিয়ে। কিন্তু প্রথম ম্যাচেই যখন রোমানিয়ার কাছে ধাক্কাটা এলো, তখনই যেন একটা অদৃশ্য ফাটল দেখা দিল সেই সাজানো স্বপ্নে।
এরপর এলো সেই ২২ জুনের দুপুর। ক্যালিফোর্নিয়ার রোজ বোল স্টেডিয়ামে তখন তিল ধারণের জায়গা নেই। মাঠের ভেতরে এগারো জন তরুণ লড়ছে, আর মাঠের বাইরে কোটি মানুষের চোখ আটকে আছে টেলিভিশনের পর্দায়। প্রতিপক্ষ আমেরিকার চেয়েও বড় প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছিল জেতার তীব্র মানসিক চাপ।
খেলার বয়স তখন মাত্র পঁয়ত্রিশ মিনিট। আমেরিকার এক মিডফিল্ডার ডান প্রান্ত দিয়ে একটা তীব্র গতিতে ক্রস বাড়ালেন। বলটা বাতাসে ভাসতে ভাসতে পেনাল্টি বক্সের দিকে ধেয়ে আসছিল। রক্ষণভাগের সেই দীর্ঘদেহী, শান্ত স্বভাবের তরুণটি, আন্দ্রেস এস্কোবার, যাকে সবাই মাঠের ‘ভদ্রলোক’ বলে চিনত, সে স্লাইড করল বলটা ক্লিয়ার করার জন্য। ঠিক যেভাবে সে তার ক্যারিয়ারে হাজারবার করেছে।
কিন্তু নিয়তি হয়তো অন্য এক স্ক্রিপ্ট লিখে রেখেছিল।
তরুণটির বুটের ডগায় লেগে বলটা কেমন যেন অদ্ভুতভাবে দিক পরিবর্তন করল। নিজের দেশের গোলরক্ষক ডানদিকে ঝাঁপিয়েও সেই বলের নাগাল পেলেন না। বলটা অলস ভঙ্গিতে জড়িয়ে গেল নিজেদের জালে।
স্টেডিয়ামের একটা বড় অংশ তখন উল্লাসে ফেটে পড়েছে, আর আন্দ্রেস মাঠের সবুজ ঘাসের ওপর উপুড় হয়ে পড়ে রইল। তার চোখ-মুখের অভিব্যক্তি বলছিল, সে যেন ঠিক সেই মুহূর্তেই বুঝতে পেরেছিল, এই গোল শুধু একটা ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করেনি, তার জীবনের চেনা রোদ-ছায়ার গল্পটাকেও চিরতরে ওলটপালট করে দিয়েছে।
ম্যাচটা তারা ২-১ ব্যবধানে হেরে গেল। পরের ম্যাচে সুইজারল্যান্ডকে হারিয়েও আর শেষ রক্ষা হলো না। এক বুক হতাশা আর গ্লানি নিয়ে দলটা যখন বিদায় নিল, তখন দেশের ভেতরের অন্ধকার গলিগুলোতে ক্ষোভের আগুন জ্বলতে শুরু করেছে। জুয়ার বোর্ডে বিপুল পরিমাণ অর্থ হারানো কিছু মানুষ তখন হন্যে হয়ে খুঁজছিল, এই হারের দায় কার ওপর চাপানো যায়।
২
পরাজয়ের সেই তীব্র গ্লানি মাথায় নিয়ে যখন দলটা দেশে ফিরল, মেডেলিন শহরের বাতাস তখন সাধারণ মানুষের দীর্ঘশ্বাস আর পর্দার আড়ালের মানুষদের হিংস্র আক্রোশে ভারী হয়ে আছে।
বন্ধুদের অনেকেই আন্দ্রেসকে বলেছিল, কিছুদিন বাইরে কোথাও কাটিয়ে আসো, এখন শহরে ফেরাটা ঠিক হবে না। কিন্তু শান্ত স্বভাবের তরুণটি মৃদু হেসে বলেছিল, মানুষের সামনে মুখ দেখাতে আমার ভয় কিসের? ওটা তো স্রেফ একটা অনিচ্ছাকৃত ভুল ছিল। জীবন তো আর এখানে থেমে থাকে না, আমাদের সামনে এগিয়ে যেতে হবে।
সে জানত না, কিছু মানুষের জীবনের খাতায় ‘ভুল’ শব্দের কোনো ক্ষমা থাকে না। বিশেষ করে যারা অন্ধকারের কারবারি, যাদের কাছে মানুষের জীবনের চেয়ে জুয়ার বোর্ডের কাগজের নোটগুলোর মূল্য অনেক বেশি।
দিন দশেক পরের কথা, ২ জুলাইয়ের সেই অভিশপ্ত রাত।
শহরের কোলাহল তখন থিতিয়ে এসেছে, কিন্তু ‘এল ইন্দিও’ নামের নাইটক্লাবটার ভেতরে তখনো আলো-আঁধারির খেলা। আন্দ্রেস তার বন্ধুদের সঙ্গে সেখানে গিয়েছিল, হয়তো মনের ভেতরের জমে থাকা মেঘগুলো একটু হালকা করার আশায়। কিন্তু নিয়তি তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল এক অনিবার্য পরিণতির দিকে।
রাত তখন আনুমানিক তিনটা। ক্লাব থেকে বের হয়ে আন্দ্রেস একাই গিয়ে বসল তার টয়োটা গাড়ির চালকের আসনে। চারপাশটা বড্ড বেশি নিঝুম। পার্কিং লটের সোডিয়াম আলোয় ছায়াগুলো কেমন যেন দীর্ঘ দেখাচ্ছিল।
ঠিক তখনই অন্ধকারের বুক চিরে তিনটি অবয়ব তার গাড়ির দিকে এগিয়ে এলো। তারা সাধারণ কোনো পথচারী ছিল না; ছিল শহরের এক ক্ষমতাধর ড্রাগ কার্টেলের বেতনভুক্ত লোক।
গাড়ির জানালার পাশে দাঁড়িয়ে তারা ওন গোলের সেই ঘটনাটা তুলে আন্দ্রেসকে লক্ষ্য করে নোংরা গালাগালি শুরু করল। আন্দ্রেস তখনও তার স্বভাবজাত ভদ্রতা হারায়নি। সে গাড়ি থেকে নেমে শান্ত গলায় বোঝানোর চেষ্টা করল,
ভাই, ওটা একটা দুর্ঘটনা ছিল; আমি ইচ্ছে করে করিনি।
কিন্তু যুক্তি শোনার মতো মানসিকতা বা বিবেক, কোনোটাই সেই খুনিদের ছিল না।
তর্কাতর্কির এক পর্যায়ে আচমকা অন্ধকারের মাঝে ধাতব অস্ত্রের শীতল চকমকানি দেখা গেল। দুজন লোক পকেট থেকে .৩৮ ক্যালিবারের পিস্তল বের করে সরাসরি আন্দ্রেসের বুক লক্ষ্য করে ধরল।
পরপর ছয়বার রাতের নীরবতা ফালি ফালি করে কেঁপে উঠল গুলির শব্দে।
আর সবচেয়ে ভয়ানক ব্যাপার হলো, প্রতিবার যখন তপ্ত সিসা আন্দ্রেসের শরীর ভেদ করে চলে যাচ্ছিল, সেই খুনিরা উন্মত্তের মতো চিৎকার করে উঠছিল, গোল! গোল!
ঠিক যেভাবে টেলিভিশনের ধারাভাষ্যকারেরা আনন্দের আতিশয্যে চিৎকার করে।
মাঠের সেই নিষ্পাপ ভুলটাকে তারা রূপ দিল এক নির্মম উৎসবে।
রক্তাক্ত অবস্থায় আন্দ্রেস গাড়ির সিটের ওপর ভেঙে পড়ল। খুনিরা দ্রুত তাদের পিক-আপ ট্রাকে উঠে অন্ধকারের মাঝে মিলিয়ে গেল।
৪৫ মিনিট পর যখন হাসপাতালের সাদা বিছানায় মাত্র ২৭ বছর বয়সী আন্দ্রেস এস্কোবারের চোখের পাতা চিরতরে বুজে এলো, তখন কলম্বিয়ার ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায়গুলোর একটি বিষাদের কালো কালিতে ঢেকে গেল।
৩
রক্তাক্ত সেই রাতের পর মেডেলিন শহরের সকালটা যখন ভাঙল, তখন পুরো দেশজুড়ে নেমে এলো এক অদ্ভুত, স্তব্ধ হাহাকার।
যে তরুণের পায়ের জাদুতে কদিন আগেও গ্যালারি করতালিতে মুখর হতো, তার এমন করুণ পরিণতি কেউ মেনে নিতে পারছিল না। তবে অপরাধ জগতের নিয়ম বড় অদ্ভুত; সেখানে রক্তের দাগ শুকাতে না শুকাতেই শুরু হয়ে যায় হিসাব-নিকাশের খেলা।
ঘটনার ঠিক পরের দিনই ধরা পড়ল সেই মূল শুটার। সে আসলে স্বাধীন কোনো খুনি ছিল না; ছিল শহরের এক প্রভাবশালী অপরাধী পরিবারের বডিগার্ড ও ড্রাইভার।
পর্দার আড়ালে থাকা গালোন ভাইয়েরা, যারা জুয়ার বোর্ডে লাখ লাখ টাকা হারিয়ে এই খুনের নীলনকশা সাজিয়েছিল বলে অভিযোগ ছিল, তারা কিন্তু আড়ালেই থেকে গেল।
আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে মূল শুটার নিজের অপরাধ স্বীকার করল। ১৯৯৫ সালের এক দুপুরে যখন তাকে ৪৩ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হলো, তখন সাধারণ মানুষের মনে হয়েছিল—ন্যায়বিচার হয়তো কিছুটা হলেও পাওয়া গেল।
কিন্তু নিয়তির স্ক্রিপ্ট তো মানুষের হাতে লেখা হয় না।
বছর কয়েক যেতে না যেতেই আইনি মারপ্যাঁচ আর ভালো আচরণের অজুহাতে সেই ৪৩ বছরের সাজা নেমে এলো ২৬ বছরে। আর সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, মাত্র ১১ বছর জেল খাটার পর, ২০০৫ সালের এক রোদেলা সকালে সেই খুনি কারাগারের লোহার ফটক গলে মুক্ত বাতাসে বেরিয়ে এলো।
যে তরুণের জীবন ২৭ বছরেই থেমে গিয়েছিল, তার জীবনের মূল্য যেন আদালতের খাতায় মাত্র ১১ বছরের কারাবাস!
এরপর সে হারিয়ে গেল সাধারণ মানুষের ভিড়ে, যেন কিছুই হয়নি।
তবে প্রকৃতির নিজস্ব একটা বিচারব্যবস্থা আছে, যাকে আমরা বলি ‘অদৃশ্য নিয়তি’।
যে গালোন ভাইয়েরা ক্ষমতার দাপটে আর কার্টেলের প্রভাবে সেবার পার পেয়ে গিয়েছিল, শুধু তদন্তে বাধা দেওয়ার অপরাধে সামান্য সাজা খেটে বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিল, তাদের পাপের ঘড়া পূর্ণ হতেও সময় লাগল।
তারা ভেবেছিল অন্ধকার জগতের রাজত্ব চিরকাল একই রকম থাকে। কিন্তু সময়ের চাকা ঘুরতে ঘুরতে পরিস্থিতি বদলে গেল।
সেদিন মেক্সিকোর হুইক্সকিলুকান এলাকার একটি জমকালো রেস্তোরাঁ। চারপাশে মৃদু আলো, মৃদু গুঞ্জন। বড় ভাই সান্তিয়াগো গালোন তখন এক টেবিলে বসে আছেন, হয়তো ভাবছিলেন তার অতীত অপরাধের দিনগুলো অনেক পেছনে ফেলে এসেছেন।
ঠিক তখনই অন্ধকারের আরেক দল হিংস্র শিকারী এসে দাঁড়াল তার সামনে।
কিছু বুঝে ওঠার আগেই তপ্ত সিসা ঝাঁঝরা করে দিল তার বুক।
যে মেডেলিন কার্টেলের অবশিষ্ট প্রভাব আর ড্রাগের সাম্রাজ্য নিয়ে তারা একদিন অহংকার করত, সেই অপরাধের দুনিয়াই শেষ পর্যন্ত তাকে গিলে খেল।
ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, মাঠের সেই শান্ত ‘ভদ্রলোক’ আন্দ্রেস এস্কোবার চিরতরে ঘুমিয়ে আছেন মেডেলিনের মাটিতে, যেখানে আজও হাজারো ফুটবলপ্রেমী শ্রদ্ধাভরে তাকে স্মরণ করে।
আর যারা তার জীবনপ্রদীপ নিভিয়ে দিয়েছিল, তাদের কেউ আইনের ফাঁক গলে বেঁচেও এক অদৃশ্য গ্লানির জীবন কাটিয়েছে, আর কেউবা নিজের তৈরি করা অন্ধকারের বুকেই নির্মমভাবে শেষ হয়ে গেছে।
ফুটবল হয়তো কোটি মানুষকে আনন্দ দেয়, কিন্তু মেডেলিনের এই গল্পটা চিরকাল এক বিষাদের সুর হয়েই বেজে থাকবে।



পাঠকের মন্তব্য