শীত বা রোদে কেন শুধু কালো রঙের বোরখা? একটি ঐতিহাসিক পাঠ

২৪৮ পঠিত ... ১৫ ঘন্টা ৫১ মিনিট আগে

তাপজনিত ঝুঁকির দিক থেকে বাঙলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় অবস্থানে আছে। গত বছরের মে থেকে এ বছরের মে পর্যন্ত বাঙলাদেশে মোট ৯৪ দিন বিপজ্জনক গরম ছিল। এর মধ্যে ৪৪ দিন সরাসরি মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হয়েছে। আর, এই গরমে নারীরা সাধারণত পুরুষদের চেয়ে বেশি শারীরিক কষ্টের মুখোমুখি হন।

এই পরিস্থিতিতে কালো জর্জেটের বোরকা পরে রাস্তায় বের হওয়া নিয়ে একটু কথা বলা দরকার।

কালো রঙ সূর্যের আলো ও তাপের প্রায় ৯০ শতাংশ পর্যন্ত শোষণ করতে পারে। অন্যদিকে সাদা রঙ শোষণ করে মাত্র ১০ থেকে ২০ শতাংশ। ‘জার্নাল অব থার্মাল বায়োলজি’তে প্রকাশিত গবেষণায় দেখা গেছে, সরাসরি রোদের মধ্যে কালো পোশাকের বাইরের তাপমাত্রা সাদা পোশাকের তুলনায় ৫ থেকে ১০ ডিগ্রি বেশি হতে পারে। এই গরমে শুধু পাঞ্জাবি পরেই যখন হাঁসফাঁস লাগে, তখন কালো জর্জেটের বোরকা কতটা অস্বস্তি তৈরি করতে পারে, তা অনুমান করা কঠিন নয়। ইন্দোনেশিয়া ইউনিভার্সিটি অব এডুকেশনের একটি গবেষণায় আরও ইন্টারেস্টিং একটা তথ্য পাওয়া গেছে। পরীক্ষাগারে দেখানো হয়েছিল যে কালো পোশাক বেশি তাপ ধরে রাখে। তারপরও জরিপে অংশ নেওয়া মানুষের বড় একটা অংশ সৌন্দর্যগত কারণে কালো পোশাকই বেছে নিয়েছেন। বাঙলাদেশে যেটা ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে বেছে নেওয়া হয়।

এই পরিচয়ের প্রশ্নে যাওয়ার আগে ইতিহাসের ভেতর দিয়ে একটু হেঁটে আসা দরকার।

কালো বোরকা ইসলামের শুরুর দিকের কোনো নির্দিষ্ট পোশাক না। আজ আমরা যেভাবে কালো বোরকাকে দেখি, সেই ধারণা বহু শতাব্দীর রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে তৈরি হয়েছে।

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাদা পোশাক পছন্দ করতেন। শুধু ছেলেদের ক্ষেত্রেই না। ছেলে মেয়ে নির্বিশেষে। তিনি বলেন, ‘তোমরা সাদা পোশাক পরো, কারণ তা শ্রেষ্ঠ পোশাক।’ আরেক হাদীসে বলেন, ‘সাদা অধিক পবিত্র ও অধিক পরিচ্ছন্ন।’

ইসলামের পরবর্তী যুগে, অর্থাৎ প্রথম পাঁচ খলিফার সময়ে, পোশাকের কোনো নির্দিষ্ট রঙের বাধ্যবাধকতা ছিল না। সেই সময়ে নারীদের জন্য মূল নির্দেশ ছিল 'শালীন আবরণ' ও 'ঢিলেঢালা পোশাক'। কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট রঙের কথা বলা হয়নি। পুরুষদের ক্ষেত্রে নবীজি সাদা রঙকে সবচেয়ে পছন্দের বলে উল্লেখ করতেন। নারীদের ক্ষেত্রে এই ধরনের রঙসংক্রান্ত বিধিনিষেধ ছিল না, তবে 'শালীনতার' বিষয়টি ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

উমাইয়া যুগে, ৬৬১ থেকে ৭৪৯ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে, পোশাকের রঙ রাজনৈতিক পরিচয়ের অংশ হয়ে ওঠে। উমাইয়াদের নিজস্ব রঙ ছিল সাদা। ‘ক্লোদিং অ্যান্ড কালার্স ইন আর্লি ইসলাম’ শিরোনামে Anthropology of the Middle East জার্নালে প্রকাশিত গবেষণায় বলা হয়েছে, সেই সময়ে ইহুদিদের হলুদ পোশাক পরতে হতো, খ্রিস্টানদের নীল।

 

৭৫০ খ্রিস্টাব্দে উমাইয়াদের বিরুদ্ধে আব্বাসীয় বিপ্লব শুরু হয় খোরাসান থেকে, কালো পতাকা নিয়ে। সাদা উমাইয়াদের বিপরীতে কালো বেছে নেওয়া হয়েছিল সচেতন রাজনৈতিক সংকেত হিসেবে। ক্ষমতায় আসার পর খলিফা আল-মানসুর, ৭৫৪ থেকে ৭৭৫ খ্রিস্টাব্দ, কালোকে রাষ্ট্রীয় রঙ ঘোষণা করেন। আব্বাসীয় স্টাডিজের গবেষণায় দেখা যায়, সেই দরবারে কর্মকর্তা থেকে সৈন্য, সবার পোশাক কালো ছিল। পতাকা কালো, এমনকি ফরমান রাখার বাক্সও কালো রেশমে মোড়া থাকত। চীন ও বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যে আব্বাসীয়দের পরিচয় ছিল ‘কালো পোশাকের মানুষ’ হিসেবে। আব্বাসীয় যুগ টিকেছিল ৭৫০ থেকে ১২৫৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত, প্রায় পাঁচ শতাব্দী। পাঁচশ বছরের ব্যবহার কালো রঙকে ক্ষমতা, মর্যাদা আর রিফাইনমেন্টের প্রতীক বানিয়ে ফেলেছিল।

 

এর বিপরীতে ফাতেমীয় খিলাফত, যারা ছিল শিয়া এবং আব্বাসীয়দের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী, তাদের প্রতীকী রঙ ছিল সবুজ ও সাদা। সাদা তখন বিরোধিতার এবং বিকল্প রাজনৈতিক অবস্থানের রঙ হয়ে ওঠে। আব্বাসীয় খলিফা আল-মামুন রাজনৈতিক মিত্রতার কারণে একসময় কালোর বদলে সবুজ গ্রহণ করেছিলেন। তখন বাগদাদের মানুষ রাস্তায় নেমে বিদ্রোহ করেছিল। কারণ তাদের কাছে কালোই ছিল 'বৈধ শাসনের' রঙ।

মুসলিম স্পেন, অর্থাৎ আন্দালুসে, চিত্রটা ছিল একেবারেই আলাদা। সেখানে নারীদের পোশাক ছিল নানা রঙের, নানা ধরনের কাপড়ের, এবং সামাজিক অবস্থান অনুযায়ী ভিন্ন। কর্দোবা ও গ্রানাডার দরবারি নারীদের পোশাকের বর্ণনা সমসাময়িক আরবি সাহিত্যেও পাওয়া যায়। সেখানে কালো কোনো বাধ্যতামূলক রঙ ছিল না।

 

ভারতবর্ষে ইসলাম আসার পর পর্দার ধারণা এসে মিশল এক ভিন্ন সাংস্কৃতিক পরিবেশে। দিল্লি সালতানাতের সময়ে আমির খুসরু তাঁর লেখায় বারবার ‘বোরকা’ ও পর্দার কথা উল্লেখ করেছেন, কিন্তু রঙ নিয়ে খুব স্পষ্ট কিছু বলেননি। সেই সময়ের বোরকা মূলত ছিল বাইরে বের হওয়ার আবরণ এবং সম্ভ্রমের চিহ্ন। পরে ফিরোজ শাহ তুঘলুক মুসলিম নারীদের মাজারে যাওয়া নিষিদ্ধ করেন। সুলতান সিকান্দার লোদিও একই ধরনের বিধিনিষেধ আরোপ করেছিলেন। তার মানে, পর্দা তখন ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণের অস্ত্রও হয়ে উঠছিল।

মোঘল যুগে উপমহাদেশের পোশাক সংস্কৃতি অনেক বেশি সমৃদ্ধ হলো। ঐতিহাসিক নথি এবং গ্রকিপিডিয়ার মোঘল পোশাকের বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, হেরেমের নারীরা পেশওয়াজ পরতেন, যেটা ঢাকার মসলিন দিয়ে তৈরি হতো। মাথা ঢাকা থাকত ওড়না বা চাদরে। রঙিন, বহুমূল্য কাপড়ের পোশাক ছিল প্রতিপত্তির প্রমাণ। গুলবদন বেগমের ‘হুমায়ুননামা’য় নবরত্নখচিত জ্যাকেটের উল্লেখ আছে। একটি বিষয় লক্ষণীয়, মোঘল আমলে বোরকা ব্যবহার হতো, কিন্তু সেটা কালো ছিল, এমন কোনো প্রামাণিক তথ্য নেই। উপরন্তু দরিদ্র নারীরা এই অতিরিক্ত আবরণ পরতেন না। গ্রামীণ নারীরা শাড়ির আঁচল দিয়েই মাথা ঢাকতেন।

বাঙলায় সুবেদারি ও নবাবি আমলে মুসলিম নারীদের পর্দা পালনের ধারণা ছিল। কিন্তু বাঙলার আর্দ্র ও উত্তাপপ্রবণ জলবায়ুতে পুরো শরীর ঢাকার পোশাক মূলত উচ্চবিত্তের বিলাস ছিল। নবাব পরিবারের মহিলারা পালকিতে বের হতেন, তাই পোশাকের গরম তাদের তুলনামূলক কম সহ্য করতে হতো। নিম্নবর্গের নারীরা মাঠে-ঘাটে কাজ করতেন, তাদের জীবনে কালো বোরকার কোনো বাস্তব জায়গা ছিল না। ব্রিটিশ আমলে পর্দা হয়ে উঠল শ্রেণির চিহ্ন, মধ্যবিত্ত মুসলিম পরিবারের ‘সম্মানের’ পোশাক। আধুনিকতার মুখোমুখি হয়ে মুসলিম সমাজের একাংশ বোরকাকে ‘ইসলামি পরিচয়’ রক্ষার হাতিয়ার হিসেবে দেখতে শুরু করল।

পাকিস্তান আমলে, ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত, দ্বিজাতিতত্ত্বের প্রভাবে পোশাক আরও স্পষ্টভাবে ধর্মীয় পরিচয়ের বাহক হলো। মুসলিম পরিচয়কে হিন্দু পরিচয় থেকে আলাদা দেখানোর সাংস্কৃতিক চাপ ছিল প্রবল। তবু সেই সময়েও বাঙলার গ্রামাঞ্চলে মুসলিম মায়েরা শাড়ির আঁচল বা ওড়না মাথায় দিতেন। কালো বোরকা তখনও ব্যাপক ছিল না।

তাহলে বাঙলাদেশে কালো বোরকা কখন এলো? এর উত্তর লুকিয়ে আছে ১৯৭৯ সালের ইরানে।

১৯৭৯ সালে ইরানের ইসলামি বিপ্লব একটি দেশের রাষ্ট্রব্যবস্থা পরিবর্তনের গণ্ডি পেরিয়ে গোটা মুসলিম বিশ্বের পোশাক রাজনীতিকে নতুন রঙে রাঙিয়ে দিয়েছিল। আয়াতুল্লাহ খোমেইনি ক্ষমতায় এসেই নারীদের জন্য কালো চাদর বা ‘রুপোশ’ বাধ্যতামূলক করলেন। ইরান প্রাইমারের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৯ সালের মার্চে এক লাখেরও বেশি ইরানি নারী রাস্তায় নেমে এই কালো পোশাকের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছিলেন। কিন্তু সেই প্রতিবাদ রোখা যায়নি। টেলিভিশন, সংবাদপত্র ও ছবিতে ইরানের কালো চাদরের নারী হয়ে গেল ‘ইসলামি নারীর’ আন্তর্জাতিক প্রতীক। পশ্চিমা মিডিয়া এই ছবিটাকে সম্পূর্ণ ইসলামের ছবি বলে চালিয়ে দিল।

এদিকে ইরানের শিয়া বিপ্লব সুন্নি সৌদি আরবকে ভড়কে দিল। সৌদি আরব এর জবাবে তাদের ওয়াহাবি ও সালাফি মতাদর্শ রপ্তানিতে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ঢালল, মসজিদ তৈরিতে, মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠায়, স্কলারশিপে। বিশ্ব ইতিহাসের এই ‘ক্রোমাটিক পলিটিক্স’ এ ইরানের কালো এবং সৌদির উপসাগরীয় কালো মিলে একটাই বার্তা দিল, কালো বোরকাই ‘ইসলামি’ পোশাক।

সৌদি আরবের বৈশ্বিক মসজিদ-মাদ্রাসা অর্থায়নের ফলে নিকাব ও কালো আবরণ বিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে গেছে, যেখানে আগে এগুলো স্থানীয় সংস্কৃতির অংশ ছিল না।

বাঙলাদেশে আগে থেকে সাদা, আকাশীরং এবং কালো বোরকার প্রচলন থাকলেও, কালো বোরকার এই ঢেউ লাগল দুই ভাবে। একটা ছিল মধ্যপ্রাচ্য অভিবাসন। ১৯৮০-এর দশক থেকে লক্ষ লক্ষ বাঙলাদেশি পুরুষ সৌদি আরব ও আমিরাতে কাজ করতে গেলেন। ২০২২ সালের শুমারি অনুযায়ী সৌদি আরবেই আছেন ২১ লক্ষের বেশি বাঙলাদেশি। তাঁরা টাকা পাঠালেন, সঙ্গে ফিরিয়ে আনলেন উপসাগরীয় পোশাক সংস্কৃতি। রিজিয়া রোজারিওর ‘সাইকোলজি অ্যান্ড উইমেনস স্টাডিজ’ এ প্রকাশিত গবেষণা বলছে, মধ্যবিত্ত পরিবারের ‘রেখে যাওয়া’ স্ত্রীরা বোরকা পরতেন সম্ভ্রমের প্রতীক হিসেবে, শ্রমিক শ্রেণির নারীদের থেকে নিজেদের আলাদা রাখার সাংস্কৃতিক কৌশল হিসেবে।

 

কালো বোরকার জনপ্রিয়তা বাড়ার পেছনে মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী বাঙলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনেরও ভূমিকা আছে।

সাইফুর রহমান রোজারিওর ২০০৬ সালের গবেষণা, যা সায়েন্স ডিরেক্টে প্রকাশিত হয়েছে, বলছে যে ১৯৭১ পরবর্তী বাঙলাদেশে ইসলামপন্থী আন্দোলনের বিস্তার ঘটে। যা ছিল আধুনিকতার মুখোমুখি হয়ে পরিচয়ের সংকটে পড়া সমাজের রিয়েকশন। মুক্তিযুদ্ধের পর সেকুলার জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্রের ধারণা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। জিয়া ও এরশাদের সরকার রাজনীতিতে ইসলামকে আনুষ্ঠানিক স্থান দেয়, সংবিধানে যুক্ত হয় ‘বিসমিল্লাহ’। এই পরিবর্তনের ভেতর ‘মুসলিম পরিচয়’ প্রমাণের একটি সাংস্কৃতিক চাপ তৈরি হয়। স্ক্রল ইনের এক প্রতিবেদনে একজন বাঙলাদেশি মহিলার মায়ের কথা উদ্ধৃত হয়েছে। তিনি বলছেন, ঢাকায় বড় হওয়ার সময় ‘হিজাব’ শব্দটাই পরিচিত ছিল না। মানুষ বলত ‘পর্দা’। গ্রামাঞ্চলে দু-একজন কালো বোরকা পরতেন। তবে ঢাকা আবার সেই অর্থে কসমোপলিটন সিটিও না।

১৯৯০ এর দশকে এই চিত্র বদলাতে শুরু করে। গার্মেন্টস কর্মী, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী, মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে, অনেকেই বোরকা পরা শুরু করেন। যা মূলত ‘নতুন পরিচয়ের রাজনীতি’ এবং ‘মডার্ন ইসলামিস্ট আন্দোলনের’ অংশ, যা এর আগে বাঙলাদেশে এত ব্যাপক ছিল না।

এই পুরো যাত্রার সবচেয়ে লক্ষণীয় দিক হলো, হাদিসের কিতাব যা বলছে, রঙের এই ইতিহাস অনেক ক্ষেত্রে তার উল্টো পথে গিয়েছে। ইবনে আব্বাস রা. বর্ণনা করেছেন, রাসূল সা. বলেছেন, ‘সাদা পোশাক পরো, কারণ এটাই সর্বোত্তম পোশাক, এবং তোমাদের মৃতদের সাদাতেই কাফন দাও।’ নাসাঈ ও হাকিমের রেওয়ায়েতে আরও বলা হয়েছে, ‘সাদা পোশাক পরো, কারণ এটা সবচেয়ে পবিত্র এবং বিনয়ের সবচেয়ে কাছের।’ উম্মে সালামা রা. এর বর্ণনায় কালো আবরণের কথাও আছে। তবে সেটা তাঁর নিজের পোশাক না, আনসার নারী সাহাবীদের পোশাকের কথার উল্লেখ আছে সেখানে।

তবে আরও কিছু বিষয় আছে। আরবে সাদা কাপড় মেন্টেইন করা ছিল বড্ড মুশকিল এবং প্রায় অসম্ভব রকমের কাজ। একে তো কাপড়ের অভাব। টাকার অভাব না কিন্তু। কাপড়ের। টাকা থাকলেও কাপড়ের সাপ্লাই এত ছিল না। তার উপর পানির অভাব। সাদা কাপড় যেহেতু দ্রুত ময়লা হয়ে যায়, তাই ঘনঘন ধোয়ারও একটা বিষয় আছে, সেটা কালো কাপড়ের ক্ষেত্রে নেই। এটাই বাস্তব।

আসলে, নারীদের জন্য কালো পোশাক বাধ্যতামূলক, এমন কোনো বিশুদ্ধ হাদিস বা প্রামাণিক ফিকহি মত নেই।

চৌদ্দ শতকে ইবনে আল-উখুওয়া লিখেছেন, মসজিদের ইমামের জন্য কালো পোশাকের বদলে সাদা পোশাক পরাই বেশি বাঞ্ছনীয়। অর্থাৎ সেই সময়েও পণ্ডিতমহলের কাছে কালো কোনো আবশ্যিক ‘ইসলামি’ রঙ ছিল না।

উত্তর আফ্রিকার মরক্কো ও তিউনিশিয়ায় ঐতিহ্যবাহী বাইরের পোশাক সাধারণত সাদা বা হালকা রঙের। সেখানকার ভূমধ্যসাগরীয় জলবায়ুর সঙ্গে সেটার সম্পর্ক আছে। আরব আমিরাতেও এখন ক্রেপ, শিফন এবং হালকা কাপড়ের সাদা ও বেজ আবায়া জনপ্রিয় হচ্ছে, কারণ উপসাগরীয় তাপেও শরীরকে বাঁচাতে হয়। অর্থাৎ যে উপসাগর থেকে কালো আবায়ার সংস্কৃতি আমাদের কাছে এসেছে, সেখানেও সচেতন মানুষ এখন সাদার দিকে সরছেন।

অনেক মানুষের কাছে কালো বোরকা পোশাক তো বটেই, একইসঙ্গে ধর্মীয় বিশ্বাস, পারিবারিক অভ্যাস, সামাজিক পরিচয় এবং নিজের সম্পর্কে একটি নির্দিষ্ট ধারণা। তাই রঙ বদলানোর কথা উঠলে অনেকের অস্বস্তি হওয়াটা অস্বাভাবিক না।

রঙের সাইকোলজি নিয়ে গবেষণা করা গবেষকেরাও একই কথা বলেন, কালো পোশাক অনেকের কাছে এক ধরনের মানসিক সুরক্ষাবলয়ের অনুভূতি তৈরি করে। এতে দৃষ্টি এড়িয়ে থাকার বা আড়ালে থাকার অনুভূতি পাওয়া যায়। আম্মু বা খালামণিদের ক্ষেত্রে বিষয়টা আরও গভীর হতে পারে। তাঁদের কাছে কালো বোরকা একটা ধর্মীয় ট্রেডিশনের অংশ। তাই সেটা বদলানো মানে শুধু পোশাক বদলানো তো না-ই পাশাপাশি, আরও অনেক অভ্যাস ও পরিচয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি পরিবর্তন। কাজটা সহজ নয়।

তবে, পোশাকের মানদণ্ড সাধারণত সমাজের ওপরের স্তর থেকে নিচের দিকে নামে। এক শ্রেণি মানদণ্ড ঠিক করে, বাকিরা সেটা অনুসরণ করে। সবসময় এসির মধ্যে জীবনযাপনে অভ্যস্ত নারীরা যদি সাদা বা হালকা রঙের বোরকাকে স্বাভাবিক করে তোলেন, সেই মানদণ্ড ছড়াতে খুব বেশি সময় লাগে না। প্রায় সব যুগেই পোশাকের পরিবর্তন এভাবেই এসেছে।

জর্জেট কাপড়ের কথাও বলা দরকার। গরমে আরামদায়ক কাপড় মানে এমন কাপড়, যেটা বাতাস চলাচল করতে দেয় এবং ঘাম সহজে বের হতে দেয়। তুলা বা লিনেনজাতীয় কাপড়ে তৈরি সাদা বা হালকা রঙের বোরকা শরীরকে অনেক বেশি স্বস্তি দিতে পারে।

কালো রঙ বেশি তাপ শোষণ করে, সাদা কম শোষণ করে। এটা ফিজিক্সের সাধারণ নিয়ম। আর ইতিহাস বলছে, কালো বোরকার এই নির্দিষ্ট রঙ ইসলামের শুরু থেকে আসেনি। আর এর পেছনে রাজবংশ, বিপ্লব, ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার মতো কিছু খন্ড খন্ড বিষয়ের ইতিহাস তো আছেই।

১৯৭৯ সালে তেহরানের রাস্তায় যে কালো চাদর দেখে পশ্চিমা বিশ্ব সেটাকেই ইসলামের মুখ হিসেবে দেখতে শুরু করল, একই সময়ে সৌদি আরবও তাদের পাল্টা বার্তায় কালো রঙকেই ব্যবহার করল। দুই পক্ষের উদ্দেশ্য আলাদা ছিল, কিন্তু রঙ ছিল এক। বাঙলাদেশের মতো দেশগুলো পরে এই দুই প্রভাবের মাঝখানে এসে পড়ল। মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে যাওয়া বাঙলাদেশিরা দেশে ফিরলেন উপসাগরীয় পোশাক সংস্কৃতির প্রভাব নিয়ে। সমাজবিজ্ঞানীরা এই প্রক্রিয়াকে ‘গ্লোবাল পলিটিক্স অব ইসলাম’ বলেছেন। তাদের মতে, এর ফলে অনেক জায়গায় স্থানীয় পর্দার সংস্কৃতির জায়গা নিতে শুরু করে বাইরে থেকে আসা একটি নতুন পরিচয়।

এই ইতিহাস জানার পর কেউ যদি মনে করেন, এই গরমে সাদা বা হালকা রঙের বোরকা বেছে নেওয়ার মধ্যে তাপ থেকে বাঁচার যুক্তি আছে, হাদিসে উৎসাহিত রঙের দিকে যাওয়ার যুক্তি আছে এবং দীর্ঘদিনের একটি ঐতিহাসিক বিভ্রান্তিকে নতুন করে দেখার সুযোগও আছে, তাহলে সেই ভাবনাকে আর একেবারে ছোট মনে হয় না।

বাঙলাদেশে এখন বছরে ৯৪ দিন বিপজ্জনক গরম পড়ে। এই মাটির জলবায়ু আর যে অঞ্চল থেকে কালো পোশাকের এই রেওয়াজ এসেছে, সেই মরুভূমির জলবায়ু এক নয়। তবে ওয়ার্কিং ক্লাসের জন্য সাদা বা হাল্কা রঙের পোশাক মেন্টেইন করা মুশকিল। তবুও, আরামের কথা চিন্তা করে হাল্কা পোশাকের প্রচলন শুরু করা যেতেই পারে।

বোরকা পর্দার অংশ কি-না, সেই ফিকহি আলোচনা এখানে করিনি।

আর, ২০২৪ সালে শুধু গরমের কারণে প্রায় ২৫ কোটি কর্মদিবস নষ্ট হয়েছে, আর অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৭৮ কোটি ডলারের হিসাব নাহয় বাদই রাখলাম। টাকার হিসাবই তো সব না।

এইযে এতকিছু বললাম, আম্মু, খালামণিরা তা-ও শুনবে না। তবুও, যারা তরুণ আছেন, তারা ভেবে দেখতে পারেন। এমনকি কালো হলেও অন্তত ফেব্রিকটা যদি জর্জেট না হয়ে আরামদায়ক কিছু হয়।

 

২৪৮ পঠিত ... ১৫ ঘন্টা ৫১ মিনিট আগে

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top