১
সে এক অদ্ভুত দুপুরবেলা। চারদিকে রোদ ঝাঁ ঝাঁ করছে, এমন রোদে কাকেরাও ডাকতে ভুলে যায়। গ্রামের শেষ মাথায়, যেখানে জগতসংসার শেষ হয়ে একটা থমথমে নির্জনতা শুরু হয়েছে, ঠিক সেখানে একটা ঘর। ঘরটা যেন মানুষের তৈরি নয়, মাটির বুক ফুঁড়ে নিজে নিজেই জেগে উঠেছে। সেই ঘরের দাওয়ায় চুপচাপ বসে থাকে লোকটা। তাকে সবাই সাধু বলে ডাকে, কিন্তু তার ভেতরের মানুষটা যে আসলে কতটা অসাধু, কতটা সাধারণ আর জবুথবু—তা কেবল চারপাশের এই স্তব্ধ প্রকৃতিই জানে। তার নিস্তরঙ্গ জীবনে কোনো কোলাহল ছিল না, যতক্ষণ না সেই উদাসীন, খেয়ালি মেয়েটা তার জীবনে এসে জোড় বাঁধল। মেয়েটার কোনো চেনা ভাষা নেই, পৃথিবীর কোনো নিয়মকানুন সে মানে না। সে যেন বুনো বাতাসের মতো, যাকে ঘরে আটকে রাখা যায় কিন্তু কখনো আপন করা যায় না। সাধু তাকে ভালোবেসেছিল নাকি নিজের একাকিত্ব ঢাকতে একটা পুতুল বানিয়ে রাখতে চেয়েছিল, সেই হিসাব মেলাতে মেলাতে রোদের রঙ বদলে যায়।
বাড়ির ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে আছে এক বিশাল তালগাছ। একা, দীর্ঘ এবং রহস্যময়। গাছটা শুধু মাটির ওপর দাঁড়িয়ে নেই, সে যেন সাধু আর তার সেই অদ্ভুতুড়ে স্ত্রীর জীবনের ওপর এক বিশাল ছায়ার মতো চেপে বসে আছে। বাতাস যখন জোরে বয়, তালপাতার খড়খড় শব্দে মনে হয় পুরোনো কোনো আখ্যানের পাতা ওল্টানো হচ্ছে। আদিমকালের সেই গল্প—যেখানে একটা নিষিদ্ধ ফল ছিল, একটা আদি প্রলোভন ছিল। সাধুর ঘরের দিনগুলো শান্ত হতে পারত, কিন্তু মেয়েটার ভেতরের যে অস্থিরতা, যে আদিম অরাজকতা, তা ধীরে ধীরে সাধুর সাজানো সংসারে ফাটল ধরাতে শুরু করে। মেয়েটা দাওয়ায় বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে একা একা হাসে, আবার কখনো গভীর রাতে উঠে অন্ধকারের দিকে হেঁটে যায়। সাধু তাকে ধরে রাখতে চায়, শেকলে বাঁধতে চায়। মানুষের চিরন্তন স্বভাবই তো এই—যা কিছু সুন্দর, যা কিছু তার আয়ত্তের বাইরে, তাকে সে খাঁচায় পুরতে চায়। কিন্তু প্রকৃতিকে কি কখনো খাঁচায় পোরা যায়?
সাধুর মনে তখন লোভ আর সন্দেহের বীজ বুনে দিচ্ছে চারপাশের চেনা জগৎ। একটা জমি, দুটো গরু, একটুখানি বৈষয়িক স্বস্তি—এইসবের লোভ মানুষকে কেমন করে যেন আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলে। তার চেয়েও বড় অন্ধকার নেমে আসে যখন সে মেয়েটার গর্ভের অনাগত সন্তানের দিকে তাকায়। একটা তীব্র অহংকার আর সংশয় তার বুকটাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খেতে থাকে—এই সন্তান কি তার? নাকি এই বিশ্বচরাচরের অন্য কোনো শক্তির? যে সাধু নিজেকে মহৎ ভাবত, শান্ত ভাবত, সে আবিষ্কার করে তার নিজের ভেতরেই লুকিয়ে আছে এক ভয়ানক ক্রোধ আর হিংস্রতা। তালের ফল পেড়ে যখন খাওয়া হয়, সেই প্রতিটি কামড়ে যেন লুকিয়ে থাকে এক আদিম অপরাধবোধ। জ্ঞান আসার পর মানুষের যেমন প্রথম লজ্জা আর পতন হয়েছিল, এই নির্জন প্রান্তরে সাধুরও ঠিক তেমন একটা পতন ঘটতে শুরু করে। অথচ বাইরে তখনো তীব্র রইদ, চড়া আলোয় সবকিছু ঝলসে যাচ্ছে, কিন্তু ঘরের ভেতরের অন্ধকারটা কেউ দেখতে পাচ্ছে না।
২
ঘরের ভেতরের সেই অন্ধকার একদিন আর চেপে রাখা গেল না। মানুষ যখন কোনো কিছুকে পুরোপুরি নিজের করে পায় না, তখন সে সেটাকে ধ্বংস করে দিতে চায়। সাধুও তার সেই আদিম, হিংস্র অহংকার নিয়ে একদিন আগুন জ্বালিয়ে দিল। সেই আগুন শুধু খড়ের চালে লাগেনি, লেগেছিল এতদিনের চেনা বিশ্বাসে, নিজের সাজানো সংসারে। দাউদাউ করে জ্বলে ওঠা আগুনের লেলিহান শিখা যখন অন্ধকার আকাশটাকে গ্রাস করছিল, তখন তীব্র আলোয় সাধুর নিজের মুখটাই চেনা যাচ্ছিল না। সে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখল, তার চিরকালের চেনা আশ্রয়, মানুষের তৈরি অহংকারের দেয়ালগুলো কেমন অবলীলায় ছাই হয়ে যাচ্ছে। সে ভেবেছিল, এই সর্বগ্রাসী আগুনে বোধ হয় সব শেষ হয়ে যাবে—শেকলে বেঁধে রাখা সেই অবাধ্য প্রকৃতি, সেই তীব্র সংশয় আর তার নিজের ভেতরের অপরাধবোধ, সবকিছু একবারে পুড়ে খাক হয়ে যাবে। কিন্তু সৃষ্টির আদি নিয়ম তো এত সহজে মুছে ফেলা যায় না।
আগুন যখন নিভে এলো, চারপাশটা যখন কয়লা আর ছাইয়ের এক শ্মশানপুরীতে পরিণত হলো, তখন দেখা গেল এক অলৌকিক দৃশ্য। সেই ছাইভস্মের মাঝখান থেকে, যেন এক অনন্ত জীবনশক্তি নিয়ে, আবার হেঁটে ফিরে এলো সেই চেনা মেয়েটা। তার গায়ে আগুনের আঁচ লাগেনি, তার চোখে কোনো ভয়ের লেশমাত্র নেই। সে যেন ঠিক আগের মতোই উদাসীন, অপ্রতিরোধ্য। মানুষ তার ক্ষুদ্র ক্ষমতা দিয়ে প্রকৃতিকে, কিংবা জীবনের অমোঘ বিধানকে কতবার পুড়িয়ে মারতে চায়, কিন্তু শেষ পর্যন্ত জীবন তার নিজের নিয়মেই ফিরে আসে। সাধু স্তম্ভিত হয়ে আবিষ্কার করল, সে আসলে কাউকে মুক্ত করতে পারেনি, কাউকেই ধ্বংস করতে পারেনি; বরং নিজের তৈরি নরকের আগুনে সে নিজেই দগ্ধ হয়েছে। তার সেই মস্ত অহংকার, সেই ‘সাধু’ সাজার মুখোশ এক লহমায় খসে পড়ে তাকে এক অতি সাধারণ, নিঃস্ব মানুষে পরিণত করেছে।
চারিদিকে আবার সকালের চড়া রইদ উঠল। সেই সোনালী, নিষ্ঠুর আলোয় দাঁড়িয়ে রইল নিঃসঙ্গ তালগাছটা, যার পাতাগুলো বাতাসে মৃদু কাঁপছে—যেন এক নীরব সাক্ষী। জীবনের এই চাকা ঘুরতেই থাকবে; প্রলোভন আসবে, মানুষের পতন হবে, আবার সেই পতনের ছাই থেকে নতুন করে জীবন জেগে উঠবে। সাধু আর তার সেই রহস্যময়ী স্ত্রী এখন এক অনন্ত টানাপোড়েনের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে, যার কোনো সোজা উত্তর নেই। প্রকৃতি তার আপন খেয়ালে বহমান রইল, আর মানুষ তার চিরন্তন একাকিত্ব আর অতৃপ্তি নিয়ে সেই রইদের দিকে তাকিয়ে রইল, যেখানে প্রতিটি ধূলিকণায় মিশে আছে এক একটি না বলা দর্শনের গল্প।



পাঠকের মন্তব্য