আমি বাংলাদেশের আজম খান

৭২ পঠিত ... ১৫:৩৯, জুন ০৪, ২০২৬


জগন্নাথ কলেজের করিডোরটায় তখন দুপুরের রোদ এসে পড়েছে। চারদিকে তরুণদের তুমুল আড্ডা, চা-এর কাপের ঠুনঠুন শব্দ আর রাজনীতির গরম হাওয়া। কিন্তু আমার মাথায় তখন অন্য এক ভূত চেপে বসেছে। রাজনীতি নয়, স্লোগান নয়, আমার মগজের ভেতর তখন কিলবিল করছে কিছু অদ্ভুত সুর। সুরগুলো চেনা নয়, কেমন যেন খ্যাপাটে, ঠিক যেন খাঁচায় বন্দি কোনো বুনো পাখি ডানার ঝাপটা মারছে। আমার এক বন্ধু, নাম তার পপ (আমরা তাকে পপ বলেই ডাকতাম, যদিও তার আসল নাম অন্য কিছু), সে একদিন আমার সামনে এসে দাঁড়াল। তার হাতে একটা ভাঙা গিটার। গিটারটার অবস্থা এতটাই করুণ যে, দেখলে মনে হবে ওটা কোনো মিউজিয়াম থেকে চুরি করে আনা হয়েছে। পপ বলল, আজম, এটা রাখ। সুর তুলতে পারিস কি না দেখ।

আমি গিটারটা হাতে নিলাম। কাঠের গায়ে আঙুল ছোঁয়াতেই একটা অদ্ভুত শিরশিরানি অনুভূতি হলো। ঠিক যেমনটা হয় প্রথমবার কোনো রূপবতী মেয়ের হাত ছুঁলে। রূপবতী মেয়েদের প্রতি আমার কোনোদিনই তেমন তীব্র আকর্ষণ ছিল না, আমার সমস্ত প্রেম লুকিয়ে ছিল ওই ছ’টা তারের ভেতর। আমি গিটারটা নিয়ে আমাদের বাড়ির ছাদে গিয়ে বসলাম। তখন ঢাকার আকাশটা অন্যরকম ছিল। এত ধোঁয়া ছিল না, এত বহুতল ভবন ছিল না। নীল আকাশে ডানা মেলে চিল উড়ে যেত, আর আমি তারের ওপর আঙুল ঘষতাম। খটখট শব্দ হতো, কোনো সুর হতো না। মা একদিন ছাদ থেকে নিচে নেমে এসে বললেন, আজম, তুই কি কাঠমিস্ত্রির কাজ শিখছিস? সারাদিন খটখট করিস কেন?

আমি হেসে বললাম, মা, এটা কাঠমিস্ত্রির কাজ না। এটা হলো মানুষের বুকের ভেতরের আওয়াজ।

মা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চলে গেলেন। মায়েরা বোধহয় ছেলেদের পাগলামি খুব দ্রুত টের পেয়ে যান।

তারপর একদিন সেই ঐতিহাসিক ঘটনাটা ঘটল। ১৯৭১ সাল। দেশটা কেমন যেন থমথম করছে। বাতাসে বারুদের গন্ধ, আর মানুষের চোখে এক অদ্ভুত প্রতীক্ষা। আমরা কয়েকজন তরুণ মিলে সিদ্ধান্ত নিলাম, এভাবে বসে থাকা যায় না। অস্ত্র হাতে তুলে নিতে হবে। কিন্তু অস্ত্রের আগে আমার হাতে তো ছিল গিটার! আমি গিটারটা এক কোণে রেখে ক্র্যাক প্লাটুনে যোগ দিলাম। সেক্টর ২, খালেদ মোশাররফের অধীনে। যুদ্ধটা কেমন ছিল? ওটা কোনো সিনেমা ছিল না। ওটা ছিল রক্ত, কাদা, আর বেঁচে থাকার এক নির্মম লড়াই। যখন পাকিস্তানি ক্যাম্প লক্ষ্য করে গ্রেনেড ছুড়তাম, তখন আমার কানের পাশে সুর নয়, বাজত তীব্র এক বিস্ফোরণের শব্দ। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার কী জানেন? ওই বিভীষিকার মাঝেও, যখন রাতে আমরা বাঙ্কারে বসে থাকতাম, চারদিক নিঝুম, তখন আমার মনে হতো—যদি বেঁচে ফিরি, তবে এই বোমার আওয়াজগুলোকে আমি সুরে বদলে দেব। চিৎকার করে বিশ্বকে জানাব, আমরা শুধু মরতে জানি না, আমরা বাঁচতেও জানি।

দেশ স্বাধীন হলো। ১৬ই ডিসেম্বর ঢাকার রাস্তায় যখন মানুষ আবির খেলছে, আমি তখন আমার সেই ভাঙা গিটারটার খোঁজে বাড়ি ফিরলাম। গিটারটা ধুলোবালি মেখে ঘরের কোণায় পড়ে ছিল। আমি ওটাকে বুকে জড়িয়ে ধরলাম। আমার মনে হলো, আমার যুদ্ধ কেবল শেষ হলো, আর একটা নতুন যুদ্ধ শুরু হতে যাচ্ছে। যে যুদ্ধের নাম, বাংলা পপ গান। মানুষ তখন রবীন্দ্রসংগীত আর নজরুলগীতি শুনত, সুফি গান শুনত। কিন্তু তরুণদের বুকের ভেতর যে একটা তীব্র হাহাকার আর চিৎকার জমে আছে, সেটা প্রকাশ করার কোনো ভাষা ছিল না। আমি সেই ভাষাটা তৈরি করার দায়িত্ব নিলাম। আমার চুলগুলো ততদিনে কাঁধ অব্দি নেমে এসেছে, দাড়িগুলো উশকোখুশকো। আয়নায় নিজেকে দেখে মনে হতো, এ কোনো গায়ক নয়, এ যেন এক যাযাবর। আর সেই যাযাবরের হাত ধরেই জন্ম নিতে যাচ্ছিল 'উচ্চারণ' ব্যান্ড।

দেশ স্বাধীনের পর ঢাকা শহরটা কেমন যেন এক ঘোরলাগা রূপ নিল। চারদিকে ভাঙা ঘরবাড়ি, মানুষের চোখে একাধারে স্বস্তি আর হারানোর তীব্র বেদনা। এই দোলাচলের ভেতর আমি আর আমার বন্ধুরা মিলে 'উচ্চারণ' ব্যান্ডটা দাঁড় করিয়ে ফেললাম। ব্যান্ডের নামটা রেখেছিলেন আমার বড় ভাই সাজেদ ভাই। উচ্চারণ—অর্থটা সোজা, আমরা আমাদের মনের কথাগুলো সোজা ভাষায় উচ্চারণ করতে চাই। তখন আমাদের থাকার জায়গা বলতে কমলাপুরের আমাদের বাড়িটা। ওটাই স্টুডিও, ওটাই আড্ডার জায়গা। পাড়ার মানুষ ভাবত, এই উশকোখুশকো চুলের পোলাপানগুলো দিনরাত এত চেঁচামেচি কেন করে! কিন্তু ওই চেঁচামেচির ভেতরই যে এক নতুন যুগের জন্ম হচ্ছিল, তা কেউ টের পায়নি।

আমাদের প্রথম বড় পরীক্ষাটা হলো ১৯৭২ সালে। বাংলাদেশ টেলিভিশনে (বিটিভি) একটা লাইভ অনুষ্ঠান হবে। তখন বিটিভিতে গান গাওয়া মানেই ধুতি কিংবা পাজামা-পাঞ্জাবি পরে, শান্তশিষ্ট ভদ্রলোকের মতো হারমোনিয়ামের সামনে বসে পড়া। আর আমরা সেখানে হাজির হলাম বেলবটম প্যান্ট, কাঁধ পর্যন্ত লম্বা চুল আর হাতে ইলেকট্রিক গিটার নিয়ে। বিটিভির প্রযোজক তো আমাদের দেখে মাথায় হাত দিয়ে বসলেন। উনি বললেন, এদের টেলিভিশন স্ক্রিনে দেখানো যাবে না! এরা তো দেখতে ডাকাতদের মতো!
পরে অনেক বুঝিয়ে-সুঝিয়ে আমরা যখন ক্যামেরার সামনে দাঁড়ালাম, আমি মাইক্রোফোনটা হাতে নিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালাম না। শরীরটা একটু বাঁকিয়ে, পা দুটো দুদিকে ছড়িয়ে দিয়ে গিটারে একটা তীব্র ঝংকার তুললাম। গাইলাম, 'আলাল ও দুলাল'। ব্যাস, পরদিন পুরো ঢাকা শহর তোলপাড়। তরুণরা যেন তাদের মনের ভেতরের অবাধ্য রূপটাকে খুঁজে পেল। রাস্তায় বের হলে মানুষ আঙুল উঁচিয়ে বলত, ওই যে দেখ, আজম খান যায়!

কিন্তু জনপ্রিয়তার একটা নিজস্ব একাকীত্ব আছে, একটা গভীর বিষাদ আছে। সেই বিষাদটাই আমাকে উপহার দিল আমার জীবনের সবচেয়ে বড় গানটা। ১৯৭৫ সালের দিকের কথা। আমি একদিন কমলাপুর স্টেশনের দিকে হাঁটছি। শীতের রাত, কুয়াশায় চারদিক আবছা। স্টেশনের পাশে যে রেললাইনের বস্তিটা ছিল, সেখানে একটা ল্যাম্পপোস্টের নিচে আমি থমকে দাঁড়ালাম। দেখলাম, একটা ছোট বাচ্চা ছেঁড়া একটা চট গায়ে দিয়ে শুয়ে আছে। শীতে তার শরীরটা কাঁপছে। একটু দূরেই তার মা বোধহয় একটা মাটির চুলোয় ফু দিচ্ছে, ধোঁয়ায় চোখ দিয়ে জল পড়ছে। দৃশ্যটা আমার বুকের ভেতর এমনভাবে বিঁধল যে, আমার মনে হলো আমার চারপাশের সমস্ত আলো, সমস্ত তালি, সমস্ত সাকসেস এক নিমেষে মিথ্যে হয়ে গেছে। আমরা এই স্বাধীন দেশটার জন্য যুদ্ধ করেছিলাম? এই বাচ্চার এই শীতের রাতে না খেয়ে ঘুমানোর জন্য?

আমি প্রায় দৌড়ে বাড়ি ফিরে এলাম। বুকটা তখন ধকধক করছে। একদম সোজা কিছু লাইন মনের ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো

রেললাইনের ঐ বস্তিতে, জন্মেছিল একটি ছেলে। মা তাঁর কাঁদে। ছেলেটি মরে গেছে...


সুরে কোনো মারপ্যাঁচ রাখলাম না। একদম চড়া গলার এক তীব্র হাহাকার। যখন গানটা স্টেজে গাইতাম, আমি চোখ বন্ধ করে ফেলতাম। আমার চোখের সামনে তখন ভেসে উঠত কমলাপুরের সেই কুয়াশাচ্ছন্ন রাত আর সেই কাঁপতে থাকা শিশুটা। মানুষ যখন এই গানটা শুনে লাফাত, চিৎকার করত, আমি তখন ভেতরে ভেতরে কাঁদতাম। আজম খান তখন কেবল একজন পপ গায়ক নন, আজম খান তখন হয়ে গেছেন এই বাংলার মাটির, এই অবহেলিত মানুষের এক ভাঙা কণ্ঠস্বর।


জীবনটা আসলে একটা বড় উপন্যাসের মতো। অনেকগুলো পরিচ্ছেদ থাকে, অনেকগুলো মোড় থাকে। আমার জীবনের শেষ পরিচ্ছেদটা একটু অন্যরকম ছিল। আশির দশক গেল, নব্বইয়ের দশক এলো। ঢাকার চেহারা বদলে গেল, বদলে গেল মানুষের গান শোনার ধরন। কিন্তু আমার সেই উশকোখুশকো চুল আর খ্যাপাটে স্বভাবটা বদলাল না। লোকে আমাকে 'পপ গুরু' বলে ডাকতে শুরু করল। গুরু! শুনতে ভারী শোনায়। আমি ভাবতাম, আমি তো কেবল সেই ছেলেটি, যে রেললাইনের পাশে শুয়ে থাকা বাচ্চাটার জন্য কাঁদে। গুরু হওয়ার যোগ্যতা কি আমার আছে?

আমি গান গাইতাম, আবার হুট করে উধাও হয়ে যেতাম। কখনো কমলাপুর, কখনো মাদারীপুর। যেখানে মানুষের ভিড় কম, সেখানেই আমাকে পাওয়া যেত। আসলে আমি তো কোনোদিন তারকা হতে চাইনি। আমি চেয়েছিলাম এই মাটির গান গাইতে। আমার গানে কোনো উচ্চাঙ্গ সংগীতের তান ছিল না, ছিল সাধারণ মানুষের বুকফাটা চিৎকার।

২০১১ সালের সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়লে বুকটা এখনো ভারী হয়ে ওঠে। শরীরটা আর সায় দিচ্ছিল না। দুরারোগ্য ব্যাধি যখন আমার শরীরে থাবা বসাল, তখন আমি বুঝতে পারলাম, আমার গিটারের তারগুলো ছিঁড়ে যাওয়ার সময় হয়ে এসেছে। হাসপাতালে শুয়ে শুয়ে যখন জানালার বাইরে আকাশটা দেখতাম, আমার সেই ফেলে আসা যুদ্ধের দিনগুলোর কথা মনে পড়ত। মনে হতো, মৃত্যু তো আসলে একটা দীর্ঘ ঘুম। যুদ্ধের মাঠে কতবার যমদূতকে পাশ কাটিয়ে এসেছি, এবার তাকে আর পাশ কাটানো যাবে না।

৫ই জুন। চারদিকে তখন ভোরের আলো ফুটেছে। আমি চোখ মেললাম, কিন্তু আমার হাত দুটো আর গিটারে সুর তোলার মতো অবস্থায় নেই। আমি জানতাম, মানুষ আমাকে মনে রাখবে। আমার গাওয়া 'বাংলাদেশ', 'ওরে সালেকা ওরে মালেকা' গানগুলো তখনো মানুষের ড্রয়িংরুমে বাজছে। কিন্তু আমার মনে হচ্ছিল, আমি যদি আরও একবার সেই ভাঙা গিটারটা নিয়ে স্টেজে দাঁড়াতে পারতাম! আরও একবার যদি চিৎকার করে বলতে পারতাম, তোমরা ভালো থেকো!

৭২ পঠিত ... ১৫:৩৯, জুন ০৪, ২০২৬

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top