রেজা বাস করে ইরানের ছোট্ট একটি অখ্যাত গ্রামে যেটার নাম এখন আর কেউ খুব একটা উচ্চারণ করে না। সংবাদে হয়ত নামটি ঠিকই আসে, কিন্তু তা নিয়ে উচ্চবাচ্য বড় সীমাবদ্ধ।
বছর ছয়েকের ছোট্ট রেজা সেখানেই থাকত।
তার সবচেয়ে বড় সম্পদ ছিল একজোড়া জুতা। নতুন নয়। আরও দু-তিন বছর আগে যখন মুস্তফা চাচা এখানে বেড়াতে এসেছিলেন, তখন উপহারস্বরুপ তাকে একজোড়া সফেদ জুতা কিনে দিয়েছিলেন। বড় সুন্দর জুতোখানি।
এরপর কতদিন গেল। জুতোয় বারবার সেলাই পড়ল। সামনের অংশে চামড়া উঠে গেছে। তবুও সেটাই তার সবচেয়ে প্রিয়। ওই জুতা পরে সে স্কুলে যাওয়া শুরু করেছে।
একদিন সকালে জুতাটাকে চকচকে করে পলিশ করতে করতে রেজা মাকে বলল,
- মা, যুদ্ধ শেষ হলে আমায় একটা সাদা জুতো কিনে দেবে?
মা হেসে বললেন,
- সে নয় দেয়া যাবে কিন্তু যুদ্ধ শেষ হলে কেন বাবা?
- তখন তো বাবার দোকান আবার খুলবে।
মা আর কিছু বললেন না। দোকানটা যে আর কোনোদিন খুলবে না, সেটা তিনি জানতেন। কিন্তু রেজা জানত না।
শিশুরা অনেক কিছু জানে না। তাই তারা পৃথিবীটাকে এখনও সুন্দর মনে করতে পারে।
সেদিন বিকেলে স্কুল থেকে ফেরার পথে রেজা রাস্তার পাশে একটা পাখিছানা খুঁজে পেল। কি পাখি, কি সমাচার, অতশত রেজার জানা নেই। সে দেখল পাখিটার একটা ডানা আহত। সে সেটাকে কোলে তুলে বাড়ি নিয়ে এল।
মা বললেন,
- এটাকে কোথায় পেলি বাবা? করবিটা কি এটাকে নিয়ে?
- ভালো করে দেব।
- তারপর?
- উড়িয়ে দেব।
- যদি আবার আঘাত পায়?
রেজা অবাক হয়ে মায়ের দিকে তাকাল।
- পাখিদের আবার আঘাত করবে কে মা?
মা হঠাৎ মুখ ঘুরিয়ে ফেললেন। কিছু প্রশ্নের উত্তর পৃথিবীর কোনো মায়ের কাছেই নেই।
সেই রাতে ছোট্ট গ্রামটিতে আবার সাইরেন বেজে উঠল।
লোকজন দৌড়াতে লাগল। জানালা বন্ধ হলো। বাতি নিভে গেল।
রেজা তার পাখিটাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বসে রইল। এতদিন এটাই ছিলো তার ধ্যান-জ্ঞান! সাথে নিয়ে খেতে বসেছে, শুয়েছে বুকের ভেতর রেখে। বুকের সাথে মিশে থেকে কেমন কাঁপছে দেখো!
-মা, ও কি ভয় পাচ্ছে?
- হয়তো।
- আমি আছি তো, ভয় পাবে না।
মা ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলেন। বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
কত অদ্ভুত!
যে শিশু নিজের নিরাপত্তার জন্য অন্যের মুখাপেক্ষি, সে-ই আবার অন্য কাউকে নিরাপত্তা দিতে চায়।
কিন্তু তার সেই চাওয়া অপুর্ণই রয়ে গেল। কারন পরদিন সকালে রেজার ঘুম আর ভাঙল না।
গ্রামের আকাশে লাল হয়ে আগুন নেমে এসেছিল।
খুব কাছে।
খুব দ্রুত।
খুব নির্মমভাবে।
কয়েকদিন পরে উদ্ধারকর্মীরা ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে একটি ছোট্ট জিনিস খুঁজে পেল। একজোড়া পুরোনো সফেদ জুতো। জুতার ভেতর একটি কাগজ। স্কুলের খাতা থেকে ছেঁড়া। তাতে শিশুদের হাতের লেখায় লেখা-
-যুদ্ধ শেষ হলে আমি একটা সাদা জুতা কিনব। আর আমার পাখিটাকে উড়িয়ে দেব।
উদ্ধারকর্মী লোকটা অনেকক্ষণ কাগজটার দিকে তাকিয়ে রইল।
পৃথিবীর বড় বড় নেতারা যুদ্ধের কারণ ব্যাখ্যা করতে পারেন। সেনারা যুদ্ধের কৌশল ব্যাখ্যা করতে পারেন। ইতিহাসবিদেরা যুদ্ধের ফলাফল ব্যাখ্যা করতে পারেন।
কিন্তু দশ বছরের একটি শিশুর সাদা জুতা কেনার স্বপ্নটাকে কে ব্যাখ্যা করবে?
আর তার অপরাধটাই বা কী ছিল?
সে তো শুধু একটা পাখিকে উড়তে দেখতে চেয়েছিল।
আজ ৪ জুন, আগ্রাসনের শিকার নিরীহ শিশু দিবস, আমাদের এমন এক বাস্তবতার সামনে দাঁড় করায়, যেখান থেকে চোখ ফিরিয়ে নেওয়া যায় না। এই দিনটি কোনো উৎসবের দিন নয়; এটি পৃথিবীর বিবেককে জাগিয়ে তোলার দিন। এটি সেইসব শিশুদের স্মরণ করার দিন, যাদের শৈশব যুদ্ধের শব্দে ভেঙে গেছে, যাদের স্বপ্ন বারুদের গন্ধে মলিন হয়ে গেছে, যাদের ভবিষ্যৎ ক্ষমতার লড়াইয়ে বন্দী হয়ে পড়েছে।
পৃথিবীর ইতিহাসে রাজাদের নাম লেখা আছে, সেনাপতিদের নাম লেখা আছে, বিজয়ীদের নামও লেখা আছে। কিন্তু ইতিহাসের পাতার ফাঁকে ফাঁকে রয়ে গেছে অসংখ্য নামহীন শিশুর কান্না। তারা কোনো যুদ্ধ ঘোষণা করেনি, কোনো অস্ত্র ধরেনি, কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। তবু যুদ্ধের সবচেয়ে বড় মূল্য তারাই দিয়েছে।
সভ্যতার অগ্রগতির গল্প আমরা অনেক শুনি। প্রযুক্তির বিস্ময়, অর্থনীতির উত্থান, মহাকাশ জয়ের কাহিনি- সবই আমাদের গর্বিত করে। কিন্তু পৃথিবীর কোথাও যদি কোনো শিশু এখনও ভয়ে কুঁকড়ে থাকে, যদি কোনো শিশু এখনও ধ্বংসস্তূপের পাশে বসে তার মাকে খোঁজে, তবে আমাদের সেই গর্ব অসম্পূর্ণ।
আগ্রাসনের শিকার নিরীহ শিশু দিবস তাই কেবল একটি দিবস নয়; এটি মানবতার কাছে একটি প্রশ্ন। আমরা কি এমন একটি পৃথিবী গড়তে পারিনা, যেখানে শিশুরা নিরাপদ? যেকোন ধরনের আগ্রাসন থেকেই তারা মুক্ত,স্বাধীন? আমরা কি তাদের জন্য এমন একটি আকাশ রেখে যেতে পারব, যেখানে যুদ্ধবিমানের শব্দ নয়, ভেসে বেড়াবে পাখির ডানা ঝাপটানোর শব্দ? যেখানে তাদের হতে হবে না শারীরিক বিপর্যয়ের শিকার, মানসিক ভীতির সাক্ষি?
পৃথিবীর সমস্ত শিশু যেন একদিন কেবল শিশুই হয়ে উঠতে পারে- এই কামনাই হোক আগ্রাসনের শিকার নিরীহ শিশু দিবসের সবচেয়ে বড় অঙ্গীকার।



পাঠকের মন্তব্য