সৌদি আরবে নারীরা যৌন নির্যাতনের শিকার হন কি না, এ বিষয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেক লেখালেখি হচ্ছে দেখছি। এই প্রেক্ষিতে আমার কিছু বাস্তব অভিজ্ঞতা শেয়ার করছি। প্রথমেই বলে রাখি, এই লেখার উদ্দেশ্য সৌদি আরবের পারিবারিক, সামাজিক ও শরীয়াহ ব্যবস্থার সমালোচনা করা নয়, কিংবা তাদের ধর্মবিশ্বাসেরও সমালোচনা করা নয়। এ বিষয়ে কোনো বিতর্কেও আমি যেতে চাই না। সেটা ধর্ম ও আইন বিষয়ে যারা বিশেষজ্ঞ, তাদের আলোচনার বিষয়।
পৃথিবীর সব দেশেই কিছু অসুস্থ মানসিকতার মানুষ বাস করে। বাংলাদেশ হোক বা সৌদি আরব; এখানে ঢালাওভাবে কাউকে কিছু বলা হচ্ছে না। তবে সৌদি আরবের আইনি ব্যবস্থায় ধর্ষণের শিকার নারীদের অধিকার কতখানি এবং কেন সৌদি আরব বা আরব দেশগুলোতে নারী নির্যাতন ও ধর্ষণের প্রকৃত চিত্র সবসময় সামনে আসে না, সে বিষয়ে এই আলোচনায় কিছুটা ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
২০১৪ থেকে ২০১৬ সালে একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার অনুরোধে সৌদি আরব এবং আরবের অন্যান্য দেশ থেকে ফেরত আসা নারী শ্রমিকদের মনোসামাজিক সহায়তা নিয়ে কিছু কাজ করার অভিজ্ঞতা আমার হয়েছিল। সে অভিজ্ঞতার আলোকে যা জেনেছি, তার কিছু অংশ এখানে তুলে ধরছি।
আমার সুযোগ হয়েছিল বেশ কয়েকজন নারী শ্রমিকের সঙ্গে কাজ করার, যারা সৌদি আরবে গিয়েছিলেন এবং বিভিন্ন ধরনের নির্যাতন ও তিক্ত অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিরে এসেছিলেন। আমরা গ্রুপভিত্তিক কাজ করেছিলাম। সেখানে বেশ কয়েকটি গ্রুপে আট থেকে দশজন নারী ছিলেন, যারা গৃহপরিচারিকার কাজে গিয়েছিলেন এবং পরে বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফেরত এসেছিলেন বা আসতে বাধ্য হয়েছিলেন।
সেশনের এক পর্যায়ে যখন তারা নিরাপদ বোধ করলেন এবং গোপনীয়তা বজায় থাকবে, এই আশ্বাস পেলেন, তখন ধীরে ধীরে তারা নিজেদের অভিজ্ঞতাগুলো খুলে বলতে শুরু করলেন। আমি তাদের কাছ থেকে যা শুনেছি, তার কিছু অংশ পয়েন্ট আকারে তুলে ধরছি।
১. প্রায় প্রতিটি নারী তাদের সঙ্গে ঘটে যাওয়া যৌন হয়রানি, ভয়াবহ যৌন নির্যাতন থেকে শুরু করে ধর্ষণের শিকার হওয়ার অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছিলেন।
২. তারা যে পরিবারে কাজ করেছিলেন, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সেই পরিবারের পুরুষ কর্তার দ্বারাই যৌন নির্যাতন ও ধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন। কিছু ক্ষেত্রে শুধু পরিবারের কর্তা নন, তাঁর ছেলে বা অন্য পুরুষ কর্মচারীদের দ্বারাও তারা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন।
আমরা এমন ঘটনাও পেয়েছি, যেখানে পরিবারের মালিকের স্ত্রী ঘটনাটি জানতেন এবং অনেক ক্ষেত্রে তা প্রতিহত করার ক্ষেত্রে কোনো ভূমিকা রাখেননি। একজন তাঁর অভিজ্ঞতা বলতে গিয়ে জানান, তিনি পরিবারের নারী কর্তার কাছে অভিযোগ করেছিলেন, কিন্তু মালিকের স্ত্রী বিষয়টি হেসে উড়িয়ে দিয়েছিলেন কিংবা গুরুত্বই দেননি; বরং তাঁকে বিষয়টি স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নিতে বলেছিলেন।
একজন নারী শ্রমিক এটাও বলেছিলেন যে, এমনও ঘটেছে, মা তাঁর ছেলেকে রাতের বেলা ওই নারীর ঘরে পাঠিয়ে দিতেন। আরেকজন বলেছিলেন যে, একই দিনে তিনি বাবা ও ছেলের মাধ্যমে ধর্ষিত হয়েছিলেন।
৩. তাদের অনেকে এটাও বলেছেন যে, বাড়ির মালিক তাদের সঙ্গে ক্রীতদাসের মতো ব্যবহার করতেন। মালিক বলতেন, তোদের অনেক টাকা দিয়ে কিনে আনা হয়েছে। তোদের সঙ্গে যা খুশি করার অধিকার আছে। চলে যেতে চাইলে যে টাকা খরচ করেছি, সেটা ফেরত দিয়ে যেতে হবে।
অনেক অনুনয়-বিনয়, হাতে-পায়ে ধরে ক্ষমা প্রার্থনা, এমনকি তাদের “বাবা” বলে সম্বোধন করা সত্ত্বেও এসব মালিকের যৌন লালসা থামেনি। দিনের পর দিন তাদেরকে এই নির্যাতন নিয়তির অংশ হিসেবে মেনে নিতে হয়েছে।
তাদের বাড়ির বাইরে যাওয়ার বা পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ ছিল না, কারণ তাদের পাসপোর্ট নিয়ে নেওয়া হয়েছিল। আর সাক্ষী না থাকায় আইনি অভিযোগ করারও কোনো উপায় ছিল না। পুরো ঘটনাগুলো তারা দেশে ফেরার পরই জানানোর সুযোগ পেয়েছেন।
৪. যৌন নির্যাতনের বাইরে তাদের সবাই চরম শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। এর মধ্যে ছিল মারধর, খাবার না দেওয়া, ছোট কক্ষে কাজের সময় ছাড়া তালাবদ্ধ করে রাখা এবং দৈনিক ১৮ থেকে ২০ ঘণ্টা কাজ করানো, যা বেশিরভাগ নারীর অভিযোগে উঠে এসেছিল।
৫. একজন নারীও সৌদি আইন অনুযায়ী কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেননি। সুবিচার তো দূরের কথা, কোনো প্রতিকার বা ক্ষতিপূরণও পাননি।
৬. যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়া নারীরা পুরো বিষয়টি গোপন রাখতে বাধ্য হয়েছেন, নিজেদের সংসার টিকিয়ে রাখা কিংবা পরিবারের সামাজিক মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখার স্বার্থে। কেউ কেউ অবশ্য দেশে ফেরার পর স্বামীর কাছ থেকে তালাক পেয়েছিলেন।
৭. যাদের মনে হচ্ছে ঘটনাগুলো মনগড়া বা ভিত্তিহীন, তাদের বলব ডিনায়ালে না গিয়ে আরবফেরত নারী শ্রমিকদের নিয়ে যারা কাজ করেন, তাদের সঙ্গে কথা বলতে। তাহলে অবশ্যই এসব ঘটনার সত্যতা সম্পর্কে জানতে পারবেন। তবে ইচ্ছাকৃতভাবে কেউ চোখ বন্ধ করে রাখলে সেটা আলাদা বিষয়।
এ ছাড়াও আরও অনেক ঘটনা তারা শেয়ার করেছিলেন, যা এখানে বলতে গেলে লেখাটি আরও বড় হয়ে যাবে।
আমার বক্তব্য হলো, সমাজে পুরুষদের কর্তৃত্বমূলক মানসিকতা এবং নারীদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন না হলে পৃথিবীর কোনো আইনই নারী নির্যাতন বা ধর্ষণ প্রতিরোধ করতে পারবে না, এমনকি ধর্মীয় আইনও নয়।
বিশ্বের যেসব দেশে নারীরা সবচেয়ে নিরাপদ বলে বিবেচিত, সেই দেশগুলোর প্রথম দশটির অধিকাংশই ধর্মীয় বা শরীয়াহ আইন দিয়ে পরিচালিত নয়; বরং তারা সাম্য, মানবাধিকার ও নারী অধিকারের ওপর বেশি গুরুত্ব দিয়ে তাদের সামাজিক ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে।
সবশেষে, আমার অভিজ্ঞতায় যে বিষয়টি সবচেয়ে ভালো লেগেছিল, তা হলো, এই নারীদের প্রায় প্রত্যেকেই দেশে ফিরে এসে নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছেন। বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ও আর্থিক সহায়তা নিয়ে ব্যবসায়িক উদ্যোগ শুরু করেছেন, সফল হয়েছেন; অনেকেই আজ নিজেদের সমাজে সুপ্রতিষ্ঠিত।



পাঠকের মন্তব্য