১
মানুষের মাথার ভেতরটা নাকি একটা আশ্চর্য কারখানা। সেই কারখানায় কী তৈরি হচ্ছে, তা জানার জন্য বড় বড় পণ্ডিতরা একখানা কাঠি বের করেছেন। নাম দিয়েছেন আইকিউ। অনেকটা জ্বরের থার্মোমিটারের মতো। বগলে চেপে ধরলেই হলো না, মস্তিস্কে চেপে ধরে দেখতে হয় বুদ্ধি কতখানি টগবগ করে ফুটছে। অথচ কী অদ্ভুত ব্যাপার দেখুন, যে জংলি ছেলেটা বনের হাজারটা গাছ চেনে, কোন লতা দিয়ে ক্ষত সারবে আর কোন ফল খেলে প্রাণ যাবে তা জানে, তাকে যদি ওই থার্মোমিটার দিয়ে মাপা হয়, দেখা যাবে তার বুদ্ধির পারদ একদম তলানিতে। কারণ সে বড় বড় দালানের মার্বেল পাথরে বসে জটিল অংকের গোলকধাঁধায় কখনো পড়েনি।
শুনলাম, সারা পৃথিবীর মানুষের বুদ্ধির একটা গড় নম্বর আছে। একশ। আমাদের এই কদম ফুলের দেশে সেই নম্বর নাকি বেশ কম। কেউ বলছেন বাহাত্তর, কেউ আবার দয়া করে বলছেন পঁচানব্বই। এই সংখ্যার লড়াই দেখলে আমার খুব হাসি পায়। অনেকটা এমন, একজনের খুব ক্ষিদে পেয়েছে, আর আপনি তাকে এক বাটি অংক আর দুই চামচ লজিক দিয়ে বললেন, খাও, খেয়ে তোমার মগজের বাতি জ্বালাও।
আরে ভাই, পেটে যদি ভাত না থাকে, তবে কি আর মাথার নিউরনগুলো কাজ করে? শৈশবে যে ছেলেটা ঠিকমতো দুধ পেল না, মাছের মুড়োটা যার কপালে জুটল না, তার মগজের কোষগুলো তো অযত্নে পড়ে থাকা পুরোনো দালানের শেওলা ধরা ইটের মতো। তারা ডুকরে কাঁদে। অথচ আমরা ভাবছি, আমাদের বুঝি জন্মগতভাবেই বুদ্ধিতে টান আছে।
মাঝে মাঝে মধ্যরাতে জোছনা বিলাস করতে করতে মনে হয়, বুদ্ধির আবার ভাগাভাগি কীসের? কেউ অংক মেলাতে পারে না, কিন্তু সে চমৎকার একটা কবিতা লিখে ফেলে। কেউ কম্পিউটারের কোডিং বোঝে না, কিন্তু সে মানুষের চোখের দিকে তাকিয়ে মনের না বলা দুঃখটা ঠিকই বুঝে ফেলে। এই যে দরদ, এই যে মায়া, এই মায়া মাপার কি কোনো আইকিউ টেস্ট আছে? পৃথিবীর কোনো যন্ত্র আজ পর্যন্ত এক ফোঁটা চোখের জলের ওজন ঠিকঠাক করতে পারেনি, আর তারা এসেছে মগজের ওজন মাপতে!
২
মাঝে মাঝে রাতে যখন লোডশেডিং হয়, আর বারান্দায় বসে তামাকের ধোঁয়া ওড়ানো যায়, তখন চারপাশের জগৎটাকে একটা মস্ত বড় নাট্যমঞ্চ মনে হয়। এই মঞ্চে আমরা সবাই খুব গম্ভীর মুখে ভুল নাটক করে যাচ্ছি। যেমন ধরুন, আমাদের চারপাশের বিজ্ঞ মানুষজন খুব সাবধানে একটা সত্য এড়িয়ে চলেন। পাছে সমাজ সংসার ক্ষুব্ধ হয়!
সেই অপ্রিয় সত্যটা লুকিয়ে আছে ঘরের ভেতরেই। আমাদের এই জনপদে খুব কাছাকাছি আত্মীয়দের মধ্যে বিয়ের একটা দারুণ চল আছে। খালাতো বোন, ফুফাতো বোন, এরা তো অন্য কেউ নন, একদম নিজেদের মানুষ! কিন্তু এই যে নিজেদের মানুষ করার চিরন্তন আনন্দ, তার ভেতরে যে একটা গভীর জেনেটিক ফাঁদ পাতা আছে, তা আমরা মুখ ফুটে বলি না। রক্তের ভেতরের যে সূক্ষ্ম নকশা, তা যখন বারবার একই বৃত্তে ঘুরপাক খায়, তখন নাকি মগজের বাতিটা আস্তে আস্তে ম্লান হতে থাকে। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে ইনব্রিডিং ডিপ্রেশন। শুনতে খুব খটমটে লাগে, তাই না? সহজ কথায়, একই রক্তের ভেতরের দুর্বলতাগুলো যখন জোট বাঁধে, তখন নতুন যে শিশুটি পৃথিবীর আলো দেখে, তার মগজের কোষগুলো পূর্ণতা পাওয়ার আগেই কিছুটা ক্লান্ত হয়ে পড়ে।
অথচ আমরা দোষ দিই কার? নিয়তির! বলি, কপালে লিখন ছিল না।
আরেকটা মজার ব্যাপার আছে। একদল মানুষ আছেন, যাঁরা এই বুদ্ধির তফাতটাকে সম্পূর্ণ নাকচ করে দিয়ে বলেন, সবই হলো শিক্ষার অভাব আর পেটের ক্ষুধা। কথাটা আংশিক সত্য। কিন্তু পুরো সত্য নয়। প্রকৃতি বড় অদ্ভুত জিনিস। সে সবাইকে এক ছাঁচে তৈরি করে না। আমরা মুখে যতই সাম্যের গান গাই না কেন, ভেতরের ওই ডিএনএ-র সূক্ষ্ম সুতোগুলো কিন্তু ঠিকই নিজের খেলা খেলে যায়। তবে তার মানে এই নয় যে, আমরা চিরকাল এই অন্ধকারের বৃত্তেই থেকে যাব।
অপুষ্টির কথা তো সবাই বলে। যে ছোট্ট মেয়েটি আজ অপুষ্টিতে ভুগছে, যার রক্তে আয়রনের অভাব, কয়েক বছর পর সে যখন মা হবে, তার কোল আলো করে যে সন্তান আসবে, সে তো শুরুতেই কিছুটা পিছিয়ে গেল। এই যে মায়েরা আর শিশুরা নীরবে ভুগছে, তার প্রভাব পড়ছে আমাদের সবার চিন্তাভাবনায়, আমাদের জাতীয় দক্ষতায়। আমরা বড় বড় মেগা প্রজেক্ট বানাচ্ছি, অথচ মানুষের মাথার ভেতরের যে প্রজেক্ট, তার পুষ্টি আর যত্ন নিয়ে আমাদের কোনো হেলদোল নেই।
৩
পৃথিবীটা আসলে এক অদ্ভুত নিয়মে চলে। এখানে যার কোনো একটা খামতি থাকে, সে সেটা ঢাকতে অন্য কিছুর আশ্রয় নেয়। আমাদের এই যে সংখ্যার খেলায় পিছিয়ে থাকা, তা নিয়ে আমাদের হীনম্মন্যতার শেষ নেই। অথচ দেখুন, আমাদের ঘরের ছেলেরা, এই ধুলোবালি মাখা শহরের অলিগলিতে বড় হওয়া তরুণেরা যখন সাত সমুদ্র তেরো নদী পার হয়ে বিদেশে যায়, তখন কিন্তু তারা ঠিকই বড় বড় বিজ্ঞানীদের সাথে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করে। তখন ওই কাগজের আইকিউ টেস্ট কোথায় গিয়ে লুকায়?
আসলে সমস্যাটা আমাদের জিনে বা আমাদের স্বভাবে নয়। সমস্যাটা আমাদের চারপাশের ওই ময়লা বাতাস, পানিতে মিশে থাকা আর্সেনিক আর আমাদের অবহেলার ভেতরে। আমরা এখনো আমাদের শিশুদের একটা লিড-মুক্ত সুন্দর পরিবেশ দিতে পারিনি। অথচ আমরা আশা করি, তারা সবাই একেকজন আইনস্টাইন হয়ে জন্মাবে! কী আশ্চর্য জবরদস্তি, ভাবুন একবার।
সবচেয়ে বড় ভুলটা কোথায় হয় জানেন? আমরা ভাবি, যার আইকিউ বেশি, সেই বোধহয় জীবনের শেষ পরীক্ষায় প্রথম হবে। কিন্তু মানুষের জীবন তো কোনো খাতা-কলমের পরীক্ষা নয়। একজন মানুষের মগজে হয়তো প্রচুর বুদ্ধি কিলবিল করছে, কিন্তু তার ভেতরে যদি একটুখানি গ্রিট বা জেদ না থাকে, যদি মানুষের জন্য একটু মায়া না থাকে, তবে সেই বুদ্ধি দিয়ে সে বড়জোর একটা রোবট হতে পারে, মানুষ নয়। জীবনযুদ্ধে শেষ পর্যন্ত তারাই টিকে থাকে, যাদের ভেতর একটা অদ্ভুত রকমের সহনশীলতা থাকে। আমাদের এই দেশের মানুষের সেই সহনশীলতা কিন্তু জন্মগত। আমরা ঝড়ের সাথে লড়াই করি, বন্যার সাথে বাস করি, অথচ দিনশেষে হাসিমুখে এক কাপ চা খেয়ে বলতে পারি, আলহামদুলিল্লাহ, বেঁচে তো আছি!
এই যে বেঁচে থাকার আনন্দ, এই যে শত কষ্টের মাঝেও একটুখানি রসিকতা খুঁজে নেওয়া, এই ক্ষমতা পৃথিবীর কোনো স্ট্যান্ডার্ডাইজড টেস্ট দিয়ে মাপা সম্ভব নয়।
তাই ওই সংখ্যার দিকে তাকিয়ে মন খারাপ করার কোনো কারণ আমি দেখি না। ওটা একটা আয়না মাত্র, তবে সেই আয়নাটা কিছুটা ঘোলা। আমাদের কাজ হলো আয়নাটা পরিষ্কার করা, আমাদের শিশুদের ভালো খাবার দেওয়া, ভালো মায়ায় রাখা আর একটুখানি মুক্ত বাতাসে শ্বাস নিতে দেওয়া। বাকিটা প্রকৃতি নিজেই সামলে নেবে। এক বা দুই প্রজন্ম পর দেখা যাবে, এই কদম ফুলের দেশের মগজের বাতিগুলো এমনিতেই চারপাশ আলো করে জ্বলছে। তখন আর কাউকে হিসাব মেলাতে হবে না।



পাঠকের মন্তব্য