কারিনা কায়সার কি তথাকথিত জুলাই যোদ্ধা ছিলেন? আমি যদি বলি তিনি ছিলেন না, তাহলে পাল্টা প্রশ্ন আসবে, তাহলে তিনি ৫ আগস্ট গণভবনে গেলেন কেন? কেন তিনি তখনকার সরকারের বিরুদ্ধে রাস্তায় নামলেন? কেন তাকে বিভিন্ন কূটনীতিকের সঙ্গে দেখা যায়?
এরপরও আমার দৃঢ় উত্তর হলো, না, কারিনা কায়সার জুলাই যোদ্ধা ছিলেন না। এমনকি তিনি এনসিপি বা জামাত-শিবিরের রাজনৈতিক মতাদর্শের কাছাকাছি কেউ ছিলেন না। হওয়াও সম্ভব নয়। লজিক সেটা সমর্থন করে না। চলুন লজিকের দিকে তাকাই।
আপনি যদি কারিনার বানানো বিভিন্ন কনটেন্ট দেখেন, তাহলে বুঝবেন যে এই মেয়ের পক্ষে এনসিপি, জামাত-শিবির বা ডানপন্থী রাজনীতি করা সম্ভব না। অত্যন্ত আধুনিক একজন মেয়ে, মিডিয়ায় কাজ করেন, এক্সট্রা লার্জ সাইজের শরীর নিয়ে তার কোনো লজ্জাবোধ নেই, পোশাক-আশাকেও আধুনিকতা আছে।
শুধু তাই নয়, তার বানানো একটি কনটেন্টের নাম ৩৬-২৪-৩৬, যেখানে আমাদের প্রচলিত সমাজে মোটা গড়নের মানুষদের যেভাবে অনবরত বডি শেমিংয়ের মধ্য দিয়ে যেতে হয়, তার বিরুদ্ধে কারিনার অবস্থান দেখা যায়। সেই কনটেন্টে কারিনা কিন্তু সমাজের কাছে নতি স্বীকার করে বোরকা পরার সিদ্ধান্ত নেয় না, বরং ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যয় জানায়।
কারিনা যদি জুলাই যোদ্ধা হতেন কিংবা শিবির বা এনসিপির সমর্থক হতেন, তাহলে কারিনাকে পোশাক পাল্টাতে হতো, এমনটা আমি মনে করি। জুলাইয়ের পর কোনো প্রগতিশীল মেয়ে এনসিপির সঙ্গে থাকতে পারেনি, এমন দাবিও করা হয়। কারও পোশাক বদলাতে হয়েছে, না হয় দল ছাড়তে হয়েছে। তাজনূভা, জারা, নীলার দিকে তাকালে বিষয়টি বোঝা যেতে পারে। আমি আবারও বলি, এনসিপি বলে কিছু নেই, ওটা জামাতের আরেকটি টিম, এটাই আমার মতামত।
আগস্টের ৫ তারিখের পর কারিনাকে আর কখনো জুলাইয়ের পক্ষে কিছু বলতে দেখেছেন? এনসিপির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে চলতে দেখেছেন? ওসব নিয়ে আর কোনো কথা বলতে দেখেছেন? উত্তর হলো, না।
আগস্টে বাংলাদেশের যে বিশাল সংখ্যক মানুষ রাস্তায় নেমেছিল, কারিনা তাদের একজন। সময়টাই এমন ছিল যে মানুষ রাস্তায় নামতে বাধ্য হয়েছিল। একটা গুমোট পরিবেশ, মানুষ হত্যা, ইন্টারনেট বন্ধ, ছাত্র-পুলিশ মুখোমুখি অবস্থান, কী ছিল না তখন? হয়তো খুব পরিকল্পিতভাবে পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছিল, হয়তো এর পেছনে দীর্ঘদিনের ষড়যন্ত্র ছিল। কিন্তু চোখের সামনে আমরা একটি ভয়াবহ পরিস্থিতি দেখেছি এবং মানুষ হিসেবে সেই পরিস্থিতিতে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছি। ওই পরিস্থিতির জন্য সরকারি দলটিই দায়ী, এমন মতও ছিল।
এই যে ৮০-৯০ শতাংশ মানুষ কথা বলেছে, সম্ভবত ৯৫ শতাংশ প্রবাসীও সে সময় বিদেশে বসে উদ্বেগে দিন কাটিয়েছে। কারিনা তাদেরই একজন। আমি-আপনি কি কথা বলিনি? এই ৮০-৯০ শতাংশের অন্তত কিছু অংশ আওয়ামী লীগের সমর্থকও ছিল, যারা সে সময় সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল। যারা চেয়েছিল খুনাখুনি, মানুষ হত্যা বন্ধ হোক। আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের মানুষও রাস্তায় নেমেছিল বলেই আওয়ামী লীগের পতন হয়েছে, এমন বিশ্লেষণও রয়েছে।
কারিনাকে বরং লীগের সমর্থক বলা যায়। শেখ হাসিনার পাশে দাঁড়ানো ছবি আছে কারিনার। অনেক ভিডিও আছে, যেখানে কারিনা বলেছেন নারী জাগরণের গুরুত্বপূর্ণ মানুষ হলেন শেখ হাসিনা।
এখন এত দিন পর নিজেদের ভুলত্রুটির দিকে না তাকিয়ে, সেগুলো সংশোধনের চেষ্টা না করে আওয়ামী লীগের কিছু মানুষ সিদ্ধান্ত নিয়েছে, কেউ মারা গেলে তারা তার প্রোফাইল ছবি ঘাঁটবে। এরপর যদি ৫ আগস্ট সেটি লাল পাওয়া যায়, তাহলে তাকে যতটা সম্ভব আক্রমণ করা হবে। যদি সেলিব্রেটি কেউ হয়, তাহলে তো কথাই নেই।
গত ১০ বছর ধরে এই গালিগালাজের সংস্কৃতি আমরা জাশির মধ্যে দেখতাম। অপছন্দের কেউ মারা গেলে তারা আলহামদুলিল্লাহ বলত। ভয়ংকর দিক হলো, এখন লীগের কিছু মানুষও সেটা অনুসরণ করার চেষ্টা করছে। তারা কি ভাবছে, জাশি এসব করত বলে মানুষ তাদের বাহবা দিত? তা না হলে এই সংস্কৃতি নিজেদের মধ্যে নেওয়ার কারণ কী?
কারিনা মারা যাওয়ার পর ঠিক এই কাজটাই করা হয়েছে। ফলে গত দেড় বছরে ইউনূস সরকারের শাসন, মব সহিংসতা, হামে শিশু মৃত্যু, আইনশৃঙ্খলার অবনতির কারণে শেখ হাসিনার প্রতি মানুষের যে সহানুভূতি তৈরি হয়েছিল, তার একটা অংশ ক্ষয় হয়েছে। আমাদের দেশে মৃত মানুষকে নিয়ে নোংরামি কেউ পছন্দ করে না। প্রচণ্ড অপছন্দের মানুষটিও মারা গেলে আমাদের মন খারাপ হয়, এটাই আমাদের সংস্কৃতি।
আর ঠিক এই দিনটার অপেক্ষায় ছিল জাশি। আজ তারা কারিনার লাশ শহীদ মিনারে নিয়ে গেছে। এনসিপি ও জাশি সামনের কাতারে দাঁড়িয়ে জানাজা পড়েছে। গত দুই বছরে পাঁচটি গান না গাওয়া সায়ান গত দুই দিনে ১০টি গান বেঁধেছে, সেখানে রাজাকারদের গুণগানও আছে। আসমান কাঁপানো আপার আসমান আবার কেঁপে উঠেছে এবং এনসিপি-জাশি জানাজার পর মিছিলও করেছে।
কী অসাধারণ লাশের রাজনীতি! কারিনার মতো একজন প্রগ্রেসিভ, নিজের মতো করে জীবনযাপন করা মেয়েকে প্রায় হাদী বানিয়ে ফেলা হয়েছে। আর গোটা প্লটটা তৈরি করেছে আওয়ামী লীগের কিছু অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট, যাদের জনমানুষের সঙ্গে সম্পৃক্ততা প্রায় শূন্য, রাজনৈতিক জ্ঞানও সীমিত।
এই ভূখণ্ডে লাশের রাজনীতি বরাবরই ফলদায়ক। চোখ মেলে দেখুন। শিখবেন কি না, সেটা আপনার ইচ্ছা।
কারিনার আত্মার শান্তি কামনা করি।



পাঠকের মন্তব্য