মায়ের হাতের রান্না নিয়া আমাগো আবেগের শেষ নাই। গরম ভাতের সাথে মায়ের হাতের একটা ডাল কিংবা ভর্তাও অনেক সময় রাজকীয় ভোজের মতো লাগে। আবার এই রান্না নিয়াই আমরাই সবচেয়ে বেশি নালিশ করি। তরকারিতে লবণ কম হইলে মুখ বাঁকাই, ঝাল বেশি হইলে বিরক্ত হই, পছন্দের মেনু না হইলে রাগটা গিয়া পড়েই মায়ের উপর। কিন্তু কখনো কি ভাবছি, এই এক প্লেট সুস্বাদু খাবারের পেছনে একজন মা নিজের শরীর থাইকা ঠিক কতটুকু শক্তি, স্বস্তি আর স্বাস্থ্য খরচ কইরা দিতেছে? আমাগো পেট ভরানোর এই আয়োজনের পেছনে যে একটা মানুষের নীরব ক্ষয় লুকায়া থাকে, সেই হিসাবটা আমরা কয়জন রাখি?
রান্নাঘরটা হইলো এক আজব জাদুর বাক্স। বাইরে থাইকা দেখা যায় ধোঁয়া উঠতেছে, সুঘ্রাণ আসতেছে, কিন্তু ভেতরে যে মায়েরা আসলে একেকজন যজ্ঞের পুরোহিত হইয়া বইসা আছে, সেই খবর কে রাখে? ওই যে কাঠের চুলা বা কেরোসিনের ধোঁয়া, এইডারে ধোঁয়া কইলে অপমান করা হয়। এইডা হইলো এক বিষাক্ত সাপ, যে কি না নিঃশ্বাসের সাথে ফুসফুসে ঢুইকা বিষ ঢালতেছে। ধোঁয়ার মইদ্যে যে কার্বন মনোক্সাইড আর পিএম ২.৫ নামক উটকো উপদ্রবগুলা থাকে, হেইগুলা সরাসরি গিয়া ফুসফুসের মইদ্যে ঘরবাড়ি বানায়। মাস্কারার কালো রঙের চেয়েও গাঢ় কালি তখন জমে যায় বুকের ভেতর। যে মানুষটা সারা জীবন আমাগো পেট ভইরা খাওয়াইলো, তার নিজের শরীরের হাড়গুলা তখন ভিটামিন ডি-এর অভাবে খড়কুটার মতো ঠুনকো হইয়া যায়। শরীরে ক্যালসিয়ামের আকাল পড়ে, হাড়ের মইদ্যে ঘুণ পোকা ধরে। আমরা ভাবি মা কেন ল্যাংচায়া হাঁটে, কেন কোমরে ব্যথা, আসলে তো সেই মানুষটা সূর্যের আলো থাইকা বঞ্চিত হইয়া অন্ধকারের মইদ্যে একটা অদৃশ্য কারাগার বানায়া রাখছে। এইটা কেবল রান্নাবান্না না, এইটা হইলো একটা নিরব যুদ্ধ, যেই যুদ্ধে মায়েরা প্রতিদিন নিজেরে একটু একটু কইরা পোড়ায়া আমাগো জীবনটারে শীতল রাখে।
রান্নাঘরের সেই ধোঁয়াশা আর ভ্যাপসা গরমের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকাটা কোনো শৌখিন ব্যাপার না, ওটা হইলো এক পশলা আগুনের সাথে বসবাস। যখন তপ্ত কড়াইয়ের ওপর মসলাটা পড়ে, তখন যে সুবাসটা আমাদের নাকে লাগে, সেই সুবাসের আড়ালেই লুকায়া থাকে কার্বন মনোক্সাইডের মতো বিষাক্ত সব কালনাগিনী। মায়েরা চুলার ধারে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটায়, তখন তাদের শরীরের ভেতরটা একটা ছোটখাটো অগ্নিকুণ্ডে পরিণত হয়। শরীরের কলকব্জাগুলো সব বিগড়ায়ে যায়। হিট এক্সহস্টশন আর হিটস্ট্রোক তখন আর শুধু খবরের কাগজের শব্দ থাকে না, ওটা হয়ে যায় প্রতিদিনের রক্তমাংসের যন্ত্রণা। শরীরটা যখন ৪০ ডিগ্রির উপরে টগবগ কইরা ফুটতে থাকে, তখন সেটা থেকে মুক্তি পাওয়ার আকুতিটা শোনার মতো কান আমাদের কয়জনের আছে?
রান্নাঘরের অন্ধকূপে একজন মা নিজের ইমিউনিটি আর আয়ু বিসর্জন দিয়া আমাদের পাত সাজায়। এই যে নীরব ত্যাগ, এর চেয়ে বড় মহাকাব্য আর কী হইতে পারে? দিনশেষে মায়েদের এই স্বাস্থ্যঝুঁকি কেবল ডাক্তারী রিপোর্ট না, এটা আমাদের অকৃতজ্ঞতার একটা দলিল।



পাঠকের মন্তব্য