বাংলা সাহিত্যের কালজয়ী সব মা

৫৮ পঠিত ... ২ ঘন্টা ৩১ মিনিট আগে



বাংলা সাহিত্যে রাজনীতি, বিপ্লব, জমিদারি, প্রেম, মনস্তত্ত্ব, দারিদ্র্য এইসব কঠিন খটোমটো বিষয়ের লেখাগুলোর চেহারা-ভাষা কত আনকোরা, কত অভিনব। কিন্তু এইসব দুর্দান্ত লেখনীগুলোই বদলে সোঁদা মাটির গন্ধের মতো নরম হয়ে এসেছে, যখন তা মায়ের কাছে ফিরেছে। তখন সাহিত্য আর সাহিত্য নেই যেন, সেটা হয়ে গেছে ঘরের ঘ্রাণ। বাংলা সাহিত্যের মা চরিত্রদের নিয়ে ভাবলেই যেন কিছুর ঘ্রাণ আসে- গরম ভাতের, পুরোনো শাড়ির, ভেজা আঁচলের, আর অপেক্ষার। কারণ এই মায়েরা কখনও কেবল চরিত্র নন; তারা একটা সময়ের আবহ। বড় বেশি জীবন্ত, বাস্তব। 

এমনই কিছু মা নিয়ে চলেন আজকে কথা বলি।

 

আনন্দময়ী (গোরা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)

 

 

সমাজ মেনে, বুঝে চলতে হবে বলায় যিনি বলেছিলেন, 

 

আমার বুঝে কাজ নেই। আমি এই বুঝি যে, গোরাকে আমি যখন ছেলে বলে মানুষ করেছি তখন আচারবিচারের ভড়ং করতে গেলে সমাজ থাক্ আর না থাক্ ধর্ম থাকবে না। আমি কেবল সেই ধর্মের ভয়েই কোনোদিন কিছু লুকোই নে- আমি যে কিছু মানছি নে, সে সকলকেই জানতে দিই আর সকলেরই ঘৃণা কুড়িয়ে চুপ করে পড়ে থাকি। 

এক সময় ছিলেন শাস্ত্রিক আচারনিষ্ঠ হিন্দুর মেয়ে কিন্তু একইসাথে  সাক্ষাৎ মানবতার মুর্তি যেন। অসাধারণ মমতাময়ী অথচ গভীর ব্যক্তিত্বসম্পন্ন এবং সংস্কারবিহীন এক নারী। নিজের যত আচার-বিচার, আজীবনকালের ধ্যান-ধ্যারনাকে ছুড়ে ফেলে দিয়ে কোলে তুলে নিয়েছিলেন আইরিশ এক দম্পতির শিশুপুত্রকে। মানবতা ছিল তার ধর্ম, তাই সমাজের চোখ রাঙানিকে দুচ্ছাই বলে দূরে ছুড়ে ফেলতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা হয়নি তাঁর। তাঁর পালক সন্তান গোরা নিজেই বাড়াবাড়ি রকমের হিন্দুয়ানি মেনে চলেছে- তিনি বাধাও দেননি, বাহবাও দেন নি; কখনো কখনো মৃদু অনুযোগ করেছেন। তাই যখন গোরা নিজের সত্যিকার পরিচয় জেনে যায় তখন সত্যিকার অর্থেই তিনি হয়ে উঠতে পারেন তার মা, তার মাতৃভূমি।বাংলাসাহিত্যের সবচাইতে উদার মা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'গোরা'-র মা আনন্দময়ী দেবীই হবেন বোধহয়। 

দরিয়াবিবি, (জননী, শওকত ওসমান)

 

এক মায়ের মাতৃত্ব আর নারীত্ব এই দুইয়ের সমানতালে বহমানতার গল্পের প্রধান চরিত্র দরিয়াবিবি। দ্বিতীয় স্বামীর সংসারে অভাব-অনটন থাকলেও শান্তি ছিল তার। কোলভরা সন্তান ছিল, সেই সাথে প্রথম পক্ষের ছেলেটিকে পালার শান্তিময় অনুমতি। কিন্তু ভাগ্যে সইল না দরিয়ার। স্বামী মারা গেলেন আর তার কামুক চাচাতো ভাই ইয়াকুব দরিয়ার সংসারের হাল ধরল। সন্তানদের মুখের দিকে তাকিয়ে লম্পটের সামনেই হাত পাততে হল তাকে। এর সুযোগও নিলো এই কামুক শয়তান। আবার মাতৃত্বের স্বাদ দরিয়ার শরীরে।  কিন্তু জানতে পেলো না কেউই। যথাসময়ে প্রসুতি মা নিজের ধাইয়ের কাজ একাই সারল। নবপ্রাণটিকে কিছুক্ষণ বুকে চেপে বসে রইল মা। নিজের মাতৃত্বের মমতাকে অক্ষুণ্ণ রেখে নারীত্বকে নিষ্কলুষ রাখতে সেই মুহূর্তে আত্মহত্যা করে দরিয়া। তার দিকে তাকালে অবাক হয়ে ভাবতে হয় সে পূর্নাঙ্গ ছিল। পূর্নাঙ্গ নারী, পূর্নাঙ্গ মা। 

 

শ্যামা (জননী, মানিক বন্দোপাধ্যায়)

 

বাংলার সহজ-সরল বধূ চরিত্র এই শ্যামা, সংসারটাই ছিল যার পৃথিবী। যার চাওয়া-পাওয়া আবর্তিত হত সন্তানদের চাওয়া-পাওয়া, ভালো-মন্দকে ঘিরে।

পনেরো বছরে বিপত্নীক স্বামীর ঘরে এসেছিলো সে। কিন্তু তার কপালে স্বামী বস্তুটি পরম নির্ভরতার স্থান হয়ে উঠে নি কখনোই। একাকী, নিঃসঙ্গ এক কিশোরী বধূ কখন যে তরুণী, যুবতী কিংবা মধ্যবয়স্ক নারী হয়ে উঠলো, তার ভাগগুলো টের পাওয়া যায় না যেন। আবার বধূ থেকে জননী হতে না হতেই তার সন্তান ছেড়ে যায় তাকে। কিন্তু ভাগ্য তার চিকন সুঁচের মত কলমের কালিতে তাকে পুরোদস্তুর জননী হয়ে উঠবার বিধিলিপিই দিয়েছিল। 

 

তাই অভাব-অনটনের সাথে নিত্য লড়াই করা তাকে ফেলে যখন স্বামী পালিয়ে যায় তখন সে দিশেহারা হয়ে গেলেও সামলে ওঠে। সে যে জননী,  তাকে যে পারতেই হবে।

শ্যামা দেবী নয়, ক্ষুধার্ত মানুষ। রাগ, বিরক্তি, সন্তানদের প্রতি বিতৃষ্ণা থাকা সত্ত্বেও সে তাদের পাতেই তুলে দেয় ভাতের শেষ লোকমাটুকু। মানিক দেখিয়েছেন মাতৃত্ব শুধু আদর-ভালোবাসা নয়, কখনো কখনো নিঃশব্দ যুদ্ধ।

একদিন সে পেরেও যায়। তার পুত্রবধূ সুবর্ণের কোলে সন্তান আসার মাধ্যমে পরিতৃপ্ত হয় এক জননীর আত্মা, শুধু নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে শ্যামার একাকীত্ব আর নিঃসঙ্গতা। 

সর্বজয়া (পথের পাঁচালি, বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়) 

 

এই মা চরিত্রটির কথা চিন্তা করলেই মনের পর্দায় ভেসে ওঠে এক অসহায় ক্লান্ত মুখ! পথের পাঁচালী–র সেই ক্লান্ত মা, যার সারাজীবন কেটে গেল অভাবের হাঁড়িতে ভাত নেড়ে। জীবনটা যার ভয়ংকর টানাটানি। মেয়ে দুর্গা আর ছেলে অপুর মুখের খাবারটা দিতে না পারার দুশ্চিন্তায় যার সবসময় শুকিয়ে থাকা বুক। তিনি রাগ করেন, চিৎকার করেন, প্রতিবেশীর সঙ্গে ঝগড়া করেন, মেয়েকে বকেন, ছেলেকে ধমক দেন। কিন্তু সেই কঠোরতার নিচে জমে থাকে ভয়- অভাবের ভয়, হারিয়ে ফেলার ভয়। জীবনের শেষ দিনটি পর্যন্ত  সংসারের একটু স্বাচ্ছন্দ্য, স্বামী-সন্তানের মুখের একটু হাসিই ছিলো তাঁর জীবনের একমাত্র লক্ষ্য। বিভূতিভূষণের এই মা যেন আবহমানকালের গ্রামীণ  দরিদ্র পরিবারের সবচেয়ে পরিচিত মুখ। 

মেজদিদি (মেজদিদি, শরৎচন্দ্র চট্টপাধ্যায়)

মা তো দূর, রক্তের সম্পর্ক ছাড়াই একজন নারী কিভাবে মা হয়ে উঠতে পারেন তারই এক অনন্য উদাহরন শরৎবাবুর মেজদিদি গল্পের মেজদিদি হেমাঙ্গিনী। বড় জায়ের হঠাৎ মারা যাওয়া সৎ মায়ের ছেলে মানে সৎভাইয়ের প্রতি তাদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে ছেলেটিকে একটু মমতা দেখাবার কারনে ছেলেটি হয়ে পড়ে তার ন্যাওটা। মাত্র মা মরা আদুরে ছেলে, সে খুঁজছিলো তার হারিয়ে যাওয়া মাকে আর হেমাঙ্গিনী তাকে তুলনা করেছিলেন নিজের দুটো সন্তানের সাথে। তাই কেষ্ট তাকে মেজদিদি ডাকলেও অনুচ্চারিত  সম্পর্কটি হয়ে গেল আসলে মা-ছেলের। সৎ বড়বোনের কঠিন আচরণের সামনে মেজদিদির মমতার পরশ কেষ্টকে বাঁচিয়ে রেখেছিল। এই মায়ার জন্যই চুরি করা টাকা দিয়ে মেজদিদির অসুখ ভালো করার জন্য প্রসাদ আনার মত দুঃসাহসিক কাজও সহজে করে ফেলতে পেরেছিলো সে। কেষ্টর অসহায়ত্ব  আর তাঁর প্রতি ভালোবাসা মেজদিদিকে কেষ্টর জন্য নিজ সংসার পর্যন্ত ছাড়তে ইচ্ছুক করে তুলেছিল একজন সত্যিকার মায়ের মতই। ডাকটা মেজদিদি হলেও তিনি হতে পেরেছিলেন কেষ্টর মা। শরৎ বাবু দেখিয়েছেন- মাতৃত্ব রক্তে নয়, হৃদয়ে। 

 

বুড়ি (হাঙর নদী গ্রেনেড, সেলিনা হোসেন)

 

এক দেশমুক্তিকামী মায়ের গল্প হাঙর নদী গ্রেনেড। হলদি গাঁয়ের চঞ্চল কিশোরী বুড়ি। তাকে বিয়ে দেয়া হয় বিপত্নীক চাচাতো ভাই গফুর মিয়ার সঙ্গে। গফুর মিয়ার আগের পক্ষের দুই ছেলেকে নিয়ে সুখেই সংসার পেতে বসে সে। একদিন তার কোল জুড়েও ছেলে আসে, সবাই খুশি। কিন্তু দেখা গেল ছেলেটি শুনতে পারে না, বলতেও পারে না; প্রতিবন্ধী। বুড়ির  সুখস্বপ্ন চুরমার হয়ে যায়, তবুও ভাগ্যকে মেনে নেয় সে। ধীরে ধীরে বাংলার জীবনে  আসে মুক্তিযুদ্ধ। বুড়ির স্বামীর বাবামরা ছেলেদুটো যুদ্ধে যায় বুড়ির উৎসাহে। তার নিজেরও খুব ইচ্ছা দেশকে স্বাধীন দেখার, স্বাধীন করার। কিন্তু তার তো সে উপায় নেই। তার নিজের ছেলেটাও যে যুদ্ধে যেতে পারবে না। কষ্টে কাঁদে বুড়ি, সবাই এগিয়ে যাচ্ছে নিজের দেশকে নিজের করে নিতে সে একাই পিছে পড়ে আছে। কিন্তু একদিন ভাগ্য এই দেশপ্রেমিক মাকে সুযোগ করে দেয় দেশের জন্য কিছু করার। মা দুজন মুক্তিযোদ্ধাকে বাঁচাতে নিজের নাড়িছেড়া ধন প্রতিবন্ধী ছেলেটিকে তুলে দেন পাকিস্তানি হানাদারদের হাতে। হলদি গাঁয়ের চঞ্চল কিশোরী ‘বুড়ি’র মাতৃত্ব এবং দেশের জন্য তার স্বার্থহীন বিসর্জন তাকে এক অনন্য মাত্রার মায়ের কাতারে পৌছে দেয়। 

 

জয়িতা (গর্ভধারিনী, সমরেশ মজুমদার)

 

একটি নতুন সমাজব্যবস্থা তৈরি করার মানসিকতা নিয়ে চারবন্ধুর এক আপ্রাণ প্রচেষ্টার গল্প গর্ভধারিনী। এই চারবন্ধুর একজন নারী, নাম জয়িতা। চরম উচ্চবিত্ত ভোগ বিলাসে মত্ত পরিবার থেকে আগত মেয়েটি স্বপ্ন দেখে এক নতুন সমাজব্যবস্থার,  যেখানে ভেদাভেদ নেই- মানবিকতাই সবচেয়ে বড় বোধ। সেখান থেকেই তার বিপ্লবের পথে আগমন। নিজের ভেতর পরিবার, বাবা-মা বা আর যেকোন সম্পর্ক নিয়ে প্রচন্ড বিতৃষ্ণা নিয়ে বেঁচে থাকা এই মেয়েটি এক সময় একটি সুন্দর সমাজ, সুন্দর পরিবেশ আর শক্তিশালী গর্ভধারিনীর হাত ধরে নিজের অনাগত সন্তানকে এই ধরণীর বুকে মানুষ হিসেবে বাঁচিয়ে রাকাহ্র সপ্ন নিয়ে এগিয়ে চলে সামনে। 

 

সুজাতা (হাজার চুরাশির মা, মহাশ্বেতা দেবী)

 

 

এক হারিয়ে যাওয়া বিপ্লবী ছেলের খোঁজে পথে নামা এক বিপ্লবী মায়ের গল্প। সুজাতার ছেলে ব্রতী মারা গেছে। যে ছেলেটা তাঁকে তাঁরই পরিবার মানে স্বামী, শাশুড়ি আর অন্যদের থাবা থেকে দূরে সরিয়ে রাখত সেই ছেলেটি তাঁর আজ আর নেই। তার লাশের নম্বর ছিলো এক হাজার চুরাশি। সুজাতার নতুন নাম হয়ে গেল হাজার চুরাশির মা। দিনরাত ছেলেকে খুঁজে ফেরেন ছেলের সত্যকে জানার পাগল প্রচেষ্টা চালান মা। হয়ে ওঠেন এক নতুন চরিত্র। 

 

মা (আগুনপাখি, হাসান আজিজুল হক)

 

অবিভক্ত ভারতের এক মুসলিম নারীর গল্প, যিনি ছিলেন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাহীন। বিয়ের পর ধীরে ধীরে তিনি সংসারকে সাজিয়ে তোলেন নিজের মত করে। কিন্তু সংসারে নিজের তথা নারীর অবস্থান দেখে ইনি স্বামীর সহায়তায় পড়াশুনা শুরু করেন। ধীরে ধীরে তার মধ্যে উন্মোচিত হয় রাজনৈতিক ও সামাজিক সচেতনতা। কিন্তু গল্পের শেষে অপার বিস্ময়ের সাথে দেখা যায়, তিনি নিজের দেশ ছাড়তে রাজি নন। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা তাকে বাকহীন করে। কিন্তু তবুও দেশত্যাগের ব্যাপারে তার উপলব্ধি, 

চারাগাছ এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় লাগাইলে হয়, এক দ্যাশ থেকে আরেক দ্যাশে লাগাইলেও বোধায় হয়, কিন্তুক গাছ বুড়িয়ে গেলে আর কিছুতেই ভিন মাটিতে বাঁচে না। 

বাংলা সাহিত্যের এই মায়েরা কেউ নিখুঁত নন। কেউ রাগী, কেউ কঠোর, কেউ অসহায়, কেউ অতিরিক্ত স্নেহময়ী, কেউবা বিপ্লবী। কিন্তু তাঁদের সবার মাঝেই আছে এক অদ্ভুত সত্যতা- যার কারণে তাঁরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বেঁচে আছেন বাস্তব হয়ে, জীবন্ত হয়ে।

আজকের মা দিবসে এই মায়েদের আর তাঁদের স্রষ্টাদের শতকোটি সালাম

 

৫৮ পঠিত ... ২ ঘন্টা ৩১ মিনিট আগে

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top