ক্যারিয়ার নাকি মাতৃত্ব? আজকের দিনে পুরো পৃথিবীতেই প্রাপ্তবয়স্ক কর্মজীবী নারীদের কাছে সম্ভবত সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং প্রশ্ন এটিই। নারীদের প্রায় সকল বিষয় নিয়ে রক্ষণশীল বাংলাদেশের মেয়েদের যেন এই সংকট আরও বেশি উপলব্ধি করতে হয় প্রতিনিয়ত। তার উপর প্রতিনিয়ত সামাজিক, পারিবারিক এবং পারিপার্শ্বিক নানাবিধ চাপ বিষয়টিকে এখনো করে রেখেছে অনেক কঠিন।
আমাদের মতো দেশে কতশত নারী যে মাতৃত্বের জন্য একটা সময় ক্যারিয়ার বিসর্জন দিয়েছেন তার কোন হিসাব করে শেষ করা যাবে না। আবার পাশ্চাত্যের কোথাও কোথাও ক্যারিয়ারটাকে ঠিক রাখতে অনেকেই মাতৃত্বের স্বাদ উপভোগ করতে পারছেন না। তবে প্রায়ই আমরা কোন কোন নারীকে দেখি ক্যারিয়ার আর মাতৃত্বকে পাশাপাশি সফলতার সাথে চালিয়ে নিতে। কিন্তু একেবারে সাম্প্রতিক যে উদাহারণটি স্থাপন করেছেন নিউজিল্যান্ডের এক মা, তার নজির ইতিহাসে বিরল।

গত ২১ জুন তিনি এক কন্যাসন্তানের জন্ম দেন অকল্যান্ডে; এবং তার আগে ২০১৭ সালের অক্টোবরে তিনি নিউজিল্যান্ডের কনিষ্ঠতম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অভিষিক্ত হন মাত্র ৩৭ বছর বয়সে। বলছি জাসিন্ডা আরডার্নের কথা, যার বেশ অনেকগুলো পরিচয়। তিনি নিউজিল্যান্ডের লেবার পার্টির প্রধান, পৃথিবীর ইতিহাসে সর্বকনিষ্ঠ নারী প্রধানমন্ত্রী এবং ইতিহাসের মাত্র দ্বিতীয় প্রধানমন্ত্রী যিনি প্রধানমন্ত্রীত্বে থাকাকালীন অবস্থাতেই সন্তানের মা হয়েছেন। এর আগে ১৯৯০ সালে পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টো সে দেশের প্রধানমন্ত্রী থাকা অবস্থাতেই মা হয়েছিলেন।
জাসিন্ডা আরডার্ন প্রধানমন্ত্রী হবার মাস তিনেক পর এ বছরের জানুয়ারিতে প্রকাশ্যে তার মাতৃত্বের ঘোষণা দেন। জুন মাসে তার সন্তান জন্মদান করে ৬ সপ্তাহের মাঝেই তিনি আবার কর্মক্ষেত্রে ফিরে আসেন। আর গত সেপ্টেম্বরে নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনেও জাসিন্ডা অন্য সব দেশের সরকার প্রধানদের মতো করে অংশ নেন। তবে তার সাথে ছিল তার ছোট্ট মেয়ে ৩ মাস বয়সী নিভ।
জাতিসংঘের ইতিহাসে সাধারণ অধিবেশনে ‘যোগ’ সবচেয়ে কমবয়সী মানুষ হচ্ছে নিভ। জাতিসংঘের অধিবেশনে যোগ দিতে আমেরিকা গিয়ে জাসিন্ডা আরডার্ন এসেছিলেন বেশ কিছু টিভি অনুষ্ঠানেও। জনপ্রিয় টিভি শো ‘দ্য লেট শো উইথ স্টিফেন কোলবার্ট’ এ তিনি কমেডিয়ান স্টিফেন কোলবার্টের সাথে নানা কিছু নিয়েই কথা বলেছেন।
সেই অনুষ্ঠানেই জানা যায় বিখ্যাত মুভি সিরিজ ‘দ্য লর্ড অফ দ্য রিংস’ এর সেই বিখ্যাত শহর হবিটনের খুব কাছেই জাসিন্ডার নিবাস ছিল। একটি প্রচলিত কৌতুক আছে যে, নিউজিল্যান্ডের সব মানুষই এই সিনেমায় অভিনয় করেছে। স্টিফেন জাসিন্ডাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, তিনিও এই সিনেমায় ছিলেন কি না! খানিকটা মন খারাপ করেই জাসিন্ডা জানান, অডিশনে গেলেও অভিনয়ের সুযোগ তিনি পাননি। এছাড়াও জাতিসংঘের অধিবেশন এবং আরও কিছু রাজনৈতিক প্রশ্নের বেশ মজার ও ডিপ্লোমেটিক উত্তর দেন এই রসিক প্রধানমন্ত্রী।
এছাড়াও এসেছিলেন আমেরিকার জনপ্রিয় মর্নিং শো ‘টুডে শো’তে। প্লেনে করে তিন মাস বয়সী বাচ্চাকে নিয়ে আসার ঘটনার বর্ণনা করছিলেন তিনি। জানিয়েছিলেন, বাচ্চার কান্নাকাটিতে সবাই বিরক্ত হতে পারে ভেবে শুরুতেই সবার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে নেন তিনি।
এমনিতে তিনি আর তার সঙ্গী ক্লার্ক গেফোর্ড এখন একসাথে থাকছেন। এই টিভি উপস্থাপকের সাথে জাসিন্ডার পরিচয় হয়েছিল ২০১২ সালে। গত বেশ ক বছর ধরে তারা একসাথে থাকলেও এখনো বিয়ে করেননি। এই জুটির একটি বিড়াল ‘প্যাডেলস’, জাসিন্ডা প্রধানমন্ত্রী হবার পরপরই বেশ জনপ্রিয় হয়ে যায় এবং বিড়ালটির একটি টুইটার একাউন্টও ছিল। অবশ্য প্যাডেলস নভেম্বর মাসেই একটি সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায়।
জাসিন্ডা আরডার্ন একেবারে কোলের শিশুকে নিয়েও বেশ ভালোই কাজ করে চলেছেন। নিউজিল্যান্ডের মাতৃত্বকালীন ছুটি বাড়িয়ে ২৬ সপ্তাহ করার পক্ষে কাজ করছেন। সমকামীদের অধিকার নিয়েও তার পদক্ষেপ সবার দৃষ্টি কেড়েছে। নিউজিল্যান্ডের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হয়ে সমকামীদের আন্দোলন ‘গে প্রাইড প্যারেড’এ অংশ নিয়েছেন তিনি। সব মিলিয়ে সদ্য মা হয়েও প্রধানমন্ত্রীর মতো দায়িত্ব সফলভাবে পালন করে জাসিন্ডা আরডার্ন নিশ্চয়ই পৃথিবীর সকল নারীর জন্য এক চমৎকার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।


পাঠকের মন্তব্য