লং শটে মৃণাল

১৪ পঠিত ... ২ ঘন্টা ১৯ মিনিট আগে

 

এক.

আজ ১৪ মে। ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টে দেখি আজ আমার জন্মদিন। বয়স কত হলো? থাক, সংখ্যা দিয়ে আর কী হবে। মানুষ যখন বুড়ো হয়, তখন সে স্মৃতির স্তূপ হাতড়ায়। আজ যেমন ফরিদপুরের সেই ধুলো ওড়া দুপুরগুলোর কথা মনে পড়ছে। স্কটিশ চার্চে ফিজিক্স পড়তে এসে যে ছেলেটা ল্যাবরেটরির টেস্টটিউব আর গ্যালভানোমিটার নিয়ে ব্যস্ত থাকার কথা ছিল, সে কিনা ব্যস্ত হয়ে পড়ল লেনিন, মার্কস আর আজব এক নেশায়, সিনেমা।

সেই শুরুর দিনগুলোর কথা ভাবলে এখনো গা শিউরে ওঠে। হাতে টাকা নেই, পেটে খিদে। টিউশনি করে যা পেতাম, তা দিয়ে ট্রাম ভাড়াই ঠিকমতো হতো না। কিন্তু মাথায় ঘুরত রুডলফ আর্নহাইমের Film as Art। ওই সময়টাই এমন ছিল, চারপাশে যুদ্ধের আঁচ, দাঙ্গা, আর দেশভাগ। আমরা বন্ধুরা মিলে আড্ডা দিতাম। ঋত্বিক ঘটক আসত, সলিল চৌধুরী আসত। সে এক উন্মাদনার সময়!

প্রথম ছবি করতে গেলাম, রাত ভোর। কী ভয়ংকর এক বিপর্যয়! ছবিটা যখন ফ্লপ করল, মনে হলো পৃথিবীটা পায়ের নিচ থেকে সরে গেছে। নিজেই নিজেকে বলতাম, মৃণাল, সিনেমা বানানো তোমার কাজ নয়।

ওষুধের দোকানে মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভের চাকরি নিলাম। ঝোলায় স্যাম্পল নিয়ে ডাক্তারদের দরজায় দরজায় ঘুরতাম। রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে বাসে-ট্রামে বাদুড়ঝোলা হয়ে ঘোরার সেই দিনগুলোই আসলে আমাকে শিখিয়েছিল সাধারণ মানুষের সংগ্রাম। সিনেমার ফ্রেমের চেয়ে বাস্তবের ওই ফ্রেমগুলো ছিল অনেক বেশি ধারালো।

একদিন মনে হলো, না, হার মানলে চলবে না। আবার ফিরলাম স্টুডিওর অন্ধকার ঘরে, অডিও টেকনিশিয়ান হিসেবে। মানুষের পায়ের আওয়াজ রেকর্ড করতাম, বাতাসের শব্দ ধরতাম। ওই মেকি শব্দের ভেতরেই আমি খুঁজে পাচ্ছিলাম আমার সত্য।

তারপর এল নীল আকাশের নীচে। রাজনীতি আমাকে ছাড়েনি, আমিও তাকে ছাড়িনি। রাজরোষে পড়ল ছবিটা। নিষিদ্ধ হলো। মনটা খারাপ হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু জেদ চেপে গিয়েছিল। আমি তো নিজেকে প্রাইভেট মার্কসিস্ট বলি, দল নেই, কিন্তু দর্শনটা তো মজ্জায়। মধ্যবিত্তের ভণ্ডামি, তাদের ভেতরের কুৎসিত স্বার্থপরতাগুলো যখন পর্দায় ফুটিয়ে তুলতে চাইতাম, লোকে বলত আমি বড্ড বেশি আক্রমণাত্মক। আমি বলতাম, আয়না যদি ময়লা দেখায়, তবে দোষ তো আয়নার নয়, দোষ মুখের।

সংগ্রামের সেই চড়াই-উতরাই পার করে একটা সময় এসে দাঁড়াল ১৯৬৯ সাল। ভুবন শোম নামে এক খিটখিটে আমলা আমার মাথায় ঘুরছে। গুজরাটের ধুধু মরুভূমিতে ক্যামেরা নিয়ে হাজির হলাম। সঙ্গে একটা আনকোরা ছেলে, অমিতাভ। ওর গলার স্বরে কেমন একটা গভীরতা ছিল। ন্যারেশনের জন্য ওকেই নিলাম। পকেটে পয়সা নেই, কিন্তু স্বপ্নটা ছিল বিশাল। কে জানত, ওই রেলওয়ের আমলার গল্পই ভারতীয় সিনেমার মোড় ঘুরিয়ে দেবে? লোকে বলতে শুরু করল, এটাই নাকি নিউ ওয়েভ!

জীবনটা আসলে একটা ছেঁড়া সিনেমার রিল। জোড়া দিলেই নতুন গল্প তৈরি হয়। সেই গল্পগুলোই তো আজীবন বলার চেষ্টা করেছি।

দুই.

কলকাতা। শহরটা তখন ফুটছে। সত্তর দশক মানেই তো রাজপথে বারুদের গন্ধ, দেয়ালের চুনকাম করা স্লোগান আর ট্রামের ঘড়ঘড় শব্দের ভেতর চাপা পড়া চিৎকারের প্রতিধ্বনি। আমার ক্যামেরা তখন আর শুধু ড্রয়িংরুমের গল্পে আটকে থাকতে পারল না। আমি জানতাম, আমাকে ঘর থেকে বেরিয়ে রাস্তায় নামতে হবে।

শুরু করলাম আমার কলকাতা ট্রিলজি। ইন্টারভিউ ছবিটার কথা ভাবুন। একটা স্যুটের অভাবে একটা ছেলের চাকরি হচ্ছে না, শুনতে খুব সামান্য মনে হয় না? কিন্তু ওই যে শার্ট-প্যান্ট আর ধুতি-পাঞ্জাবির লড়াই, ওটাই তো ছিল ঔপনিবেশিকতা আর বেকারত্বের টানাপোড়েন। আমি সিনেমার পর্দা ছিঁড়ে দর্শকের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে পড়তে চাইতাম। ব্রেশট শিখিয়েছিলেন দূরত্ব বজায় রাখতে, কিন্তু আমি চেয়েছিলাম দর্শক যেন নিজেকেই দেখে অস্বস্তিতে পড়ে।

তারপর এল কলকাতা ৭১ আর পদাতিক। নকশাল আন্দোলনের সেই উত্তাল দিনগুলো। চারদিকে পুলিশি জুলুম, যুবকগুলো সব হারিয়ে যাচ্ছে। আমি ছবি বানাতে গিয়ে ভাবতাম, আমি কি কেবলই একজন দর্শক? নাকি আমি নিজেই এই অস্থির সময়ের অংশ? নিজেকে আমি প্রাইভেট মার্কসিস্ট বলতাম এই কারণেই,৷ কারো কাছে দায়বদ্ধ থাকব না, শুধু নিজের বিবেকের কাছে ছাড়া। কোনো রাজনৈতিক দল আমাকে পকেটে পুরতে পারেনি, আমি বারবার তাদের ভুলগুলো আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছি। লোকে বলল মৃণাল সেন প্রচারক হয়ে গেছেন। আমি হেসে বলতাম, শিল্প যদি সময়ের দলিল হতে না পারে, তবে সেই শিল্প দিয়ে কার কী লাভ?

মাঝেমধ্যে খুব ক্লান্ত লাগত। অর্থের অভাব তো ছায়ার মতো পিছু ছাড়ত না। বড় বড় প্রযোজকরা আমার নাম শুনলে দরজা বন্ধ করে দিতেন। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার দেখুন, দেশের মানুষ না বুঝলেও বিদেশের উৎসবগুলো আমাকে ডাকতে শুরু করল। বার্লিন, কান, ভেনিস, সবখানে ঘুরছি। ভাবলে হাসি পায়, ফরিদপুরের সেই ছেলেটা এখন কানের জুরিতে বসে পৃথিবীর তাবড় সব পরিচালকদের ছবি বিচার করছে! কিন্তু গ্ল্যামার আমাকে কখনো টানেনি। আমার মন পড়ে থাকত কলকাতার গলিঘুঁজিতে, মধ্যবিত্তের ভণ্ডামিতে।

একদিন প্রতিদিন বা খারিজ  যখন বানালাম, তখন সমাজকে একদম উলঙ্গ করে ছেড়ে দিয়েছিলাম। একটা অল্পবয়সী কাজের ছেলে মারা গেল, আর আমাদের দুশ্চিন্তা হলো,৷ পুলিশ কেস হবে না তো? এই যে আমরা ভদ্রলোকেরা, বাইরে ফিটফাট আর ভেতরে পচাগলা, এই সত্যটা দেখানোর জন্য তো কেউ দরকার ছিল। আমি ঠিক করলাম, আমিই সেই নিষ্ঠুর মানুষটা হব।

তবে আমার এই সব লড়াইয়ের আড়ালে যে মানুষটা বটগাছ হয়ে ছিল, সে গীতা। আমার স্ত্রী। আমার অনেক ছবির অভিনেত্রী, কিন্তু বাস্তবে আমার জীবনের মূল স্তম্ভ। ও না থাকলে হয়তো মাঝপথেই ক্যামেরা কাঁধ থেকে নামিয়ে রাখতাম। আমার পাগলামিগুলো ও যেভাবে সামলেছে, তা আর কেউ পারত না। সিনেমা আর জীবন, এই দুটোর সীমানা আমার কাছে মাঝে মাঝে ঝাপসা হয়ে যেত। গীতা সেটা বুঝতে পারত।

আসলে জীবনটা একটা দীর্ঘ লং শট। আপনি যত দূরে যাবেন, তত পরিষ্কার হবে ক্যানভাসটা।

তিন

জীবনটা যখন শেষ বিকেলের ছায়ায় এসে দাঁড়াল, তখন দেখলাম লড়াইয়ের ময়দানটা বদলে গেছে। বাইরে আর আগের মতো মিছিল নেই, ট্রামের দেয়ালে সেই চুনকাম করা স্লোগানগুলো রোদে-বৃষ্টিতে ফিকে হয়ে গেছে। মানুষের ভেতরের অস্থিরতাগুলো আর রাজপথে আছড়ে পড়ছে না, বরং সেগুলো ঢুকে গেছে ড্রয়িংরুমের ভেতর, মনের গহীনে। আমার ছবির ভাষাও তাই বদলে গেল। খণ্ডহার বা এক দিন আচানক করার সময় আমি আর চেঁচিয়ে কিছু বলতে চাইনি। আমি চেয়েছিলাম নীরবতার শব্দ শোনাতে। ধ্বংসস্তূপের মাঝেও যে মানুষের স্মৃতি আর হাহাকার বেঁচে থাকে, সেটাই ছিল আমার দেখার বিষয়।

পুরস্কারের আলমারিটা উপচে পড়ছে। দাদাসাহেব ফাল্কে, পদ্মভূষণ, বিদেশের সব নামী সম্মান, সবই এল। লোকে আমাকে নিয়ে সেমিনার করল, প্রবন্ধ লিখল। কিন্তু আমি তো সেই আগের মৃণালই রয়ে গেলাম। সেই যে ফরিদপুরের ছেলেটা কলকাতায় এসে খিদের জ্বালায় মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভের চাকরি করত, সেই ছেলেটার জেদটাই আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছিল। আড্ডায় বসলে এখনো পাশে ঋত্বিকদাকে খুঁজি, মাণিদস  খুঁজি। মাণিকদার সঙ্গে কত বিতর্ক হয়েছে, কাগজে-কলমে লড়াই হয়েছে, কিন্তু আমরা জানতাম আমরা একই পথের পথিক। আমাদের দেখার চোখ ছিল আলাদা, কিন্তু লক্ষ্যটা ছিল এক, সিনেমা।

২০১৭ সালে গীতা চলে গেল। ও যাওয়ার পর আমার পৃথিবীটা হঠাৎ কেমন যেন নিস্তব্ধ হয়ে পড়ল। শরীরের কলকব্জাগুলো সব বিগড়োতে শুরু করল। ঘরভর্তি বই আর ছবির রিলের মাঝখানে বসে আমি ভাবতাম, আমি কি সবটা বলতে পেরেছি? আমার প্রাইভেট মার্কসিজম কি মানুষকে একটুও নাড়া দিতে পেরেছে? উত্তরটা আমি খুঁজিনি, সময় খুঁজবে।

শেষ দিন পর্যন্ত আমি সক্রিয় থাকতে চেয়েছিলাম। বয়স নব্বই পার করল, কিন্তু মনের ভেতরের সেই কিউরিওসিটি বা কৌতূহলটা মরেনি। নতুন প্রজন্মের কোনো ছেলে যখন হাতে একটা ডিজিটাল ক্যামেরা নিয়ে অদ্ভুত কোনো ফর্মাল এক্সপেরিমেন্ট করে, আমার তখন ইচ্ছে করে ওর পাশে গিয়ে বসি। ওকে বলি, শোনো ছোকরা, টেকনিক তো সবাই শেখে, তুমি আগে মানুষকে ভালোবাসতে শেখো, তার সংগ্রামটাকে নিজের ভেতরে নিতে শেখো।

৩০ ডিসেম্বর ২০১৮। শীতের সকাল। কুয়াশার চাদরে মোড়া কলকাতা। আমার দীর্ঘ শুটিংয়ের শিডিউলটা সেদিন শেষ হলো। কোনো লাইট-সাউন্ড-ক্যামেরা অ্যাকশন ছিল না, ছিল শুধু এক বুক প্রশান্তি। আমি তো চেয়েছিলাম একটা আয়না ধরতে। আজ যখন পেছন ফিরে তাকাই, দেখি আয়নাটা ভেঙে হাজার টুকরো হয়ে ছড়িয়ে আছে। প্রতিটি টুকরোয় এক একটা মানুষের মুখ দেখা যাচ্ছে। ওটাই তো আমার সার্থকতা।

আমি চলে গিয়েও থেকে গেলাম আমার ওই ফ্রেমগুলোর ভেতরে। সাদা-কালো জমানার সেই জাম্প কাট কিংবা শ্মশানের নিস্তব্ধতা, সবকিছুর ভেতরেই আমি বেঁচে থাকব। আমি মৃণাল সেন, আমি এক সংগ্রামী চলচ্চিত্রকার, যে শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত সমাজকে প্রশ্ন করতে ভয় পায়নি। আমার জন্মদিন আজ শুধু একটা ক্যালেন্ডারের তারিখ নয়, এটা আমার আজীবন বয়ে চলা বিশ্বাসের উদযাপন।

গল্পটা কি এখানে শেষ? না, সিনেমা কখনো শেষ হয় না। শুধু ডিরেক্টর বদলে যায়।

১৪ পঠিত ... ২ ঘন্টা ১৯ মিনিট আগে

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top