১.
আমার জন্ম হয়েছিল এক পাহাড়ি গ্রামে, যেখানে মাটির সোঁদা গন্ধে আর বৃষ্টির শব্দে জীবন শুরু হয়। আমার বাবা ছিলেন সাদা চামড়ার এক আগন্তুক, যিনি আমাদের জীবনে ছিলেন ছায়ার মতো। কখনও আসতেন, আবার হুট করে মিলিয়ে যেতেন। মা ছিলেন মাটির একদম কাছের মানুষ। ১৮ বছর বয়সের সেই তরুণী মা আমাকে আঁকড়ে ধরেছিলেন এক প্রবল জাদুকরী মায়ায়।
শৈশবটা কেটেছিল সেন্ট অ্যানের সেই উঁচু নিচু পাহাড়ে। আমি তখন খুব শান্ত এক বালক। লোকে বলত, আমি নাকি হাত দেখে মানুষের ভবিষ্যৎ বলে দিতে পারি। অথচ নিজের ভবিষ্যৎ যে সুরের সাগরে ভাসবে, সেটা তখন কে জানত? ৫ বছর বয়সে একবার বড় শহরে গিয়েছিলাম বাবার হাত ধরে। বাবা চেয়েছিলেন আমাকে ভদ্রলোক বানাতে, স্কুলে দিতে। কিন্তু মায়ের মন মানেনি। তিনি আমাকে ফিরিয়ে আনলেন পাহাড়ে। সেই দিনটা আমার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। আমি শহরের কৃত্রিমতা থেকে বেঁচে গিয়েছিলাম প্রকৃতির কোলে।
তারপর এক সময় আমাদের ঠাঁই হলো শহরের এক বস্তি এলাকায়। নাম তার ট্রেঞ্চ টাউন। চারদিকে শুধু অভাব আর জরাজীর্ণ সব ঘর। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো, সেই দারিদ্র্যের ভেতরেই ছিল সুরের খনি। মানুষ সেখানে পেট ভরে খেতে পেত না ঠিকই, কিন্তু তাদের গলায় গান ছিল। সেই সরু গলিগুলোতে আমি প্রথম খুঁজে পেলাম আমার জীবনের ছন্দ। বন্ধুদের সাথে মিলে পুরনো টিন আর তার দিয়ে আমরা তৈরি করতাম আমাদের স্বপ্নের যন্ত্রগুলো। অভাব আমাদের শরীরের চামড়া পুড়িয়ে দিচ্ছিল, কিন্তু আমাদের ভেতরের সুরটাকে আরও ধারালো করে তুলছিল। আমরা জানতাম না সামনে কী আছে, শুধু জানতাম, গানই হতে যাচ্ছে আমাদের একমাত্র বেঁচে থাকার ভাষা।
২
শহরের সেই ঘিঞ্জি এলাকাটা ছিল এক আজব জায়গা। আমরা যে সরকারি দালানগুলোর উঠানে বসে থাকতাম, সেখান থেকেই জন্ম নিল আমাদের এক নতুন পৃথিবী। আমি, বানি আর পিটার, তিনজন মিলে ঠিক করলাম, আমাদের যন্ত্রণার কথাগুলো আমরা সুর দিয়ে বলব। লোকে একে একে আসতে শুরু করল আমাদের কাছে। জো হিগস নামের এক মানুষ আমাদের শিখিয়ে দিলেন কীভাবে গলার স্বরকে শান দিতে হয়। আমরা নাম দিলাম ‘দ্য ওয়েলার্স’। অর্থাৎ, যারা বিলাপ করে। কিন্তু আমাদের সেই বিলাপ ছিল প্রতিবাদের।
প্রথম দিকে আমরা গাইতাম দ্রুত তালের গান। পা নাচানোর মতো সুর। কিন্তু ধীরে ধীরে সেই সুর ধীর হতে শুরু করল। কেন জানি মনে হলো, জীবন তো এতো দ্রুত দৌড়ানোর কিছু নেই। জীবন হলো ধীরলয়ে উপভোগ করার জিনিস। বৃষ্টির ফোঁটা যেভাবে টিনের চালে পড়ে, আমাদের ড্রামের বিটও ঠিক সেভাবে বাজতে শুরু করল। গিটারের তন্ত্রীতে অদ্ভুত এক টুংটাং শব্দ, যাকে লোকে বলে অফবিট। সেই সুর যখন মানুষের কানে পৌঁছাল, তারা থমকে দাঁড়াল। জ্যামাইকার সমুদ্রের নোনা বাতাস আর আমাদের গানের সেই ভারী বেস লাইন মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল।
১৯৭৪ সালের এক রাত। ট্রেঞ্চ টাউনের সেই পুরোনো স্মৃতিগুলো মাথার ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছিল। আমি ভাবছিলাম সেইসব মায়েদের কথা, যারা অভাবের সাথে যুদ্ধ করে আমাদের বড় করেছেন। ভুট্টা দিয়ে বানানো জাউ খেয়ে আমাদের দিন কাটত। চোখের সামনে কত কষ্ট দেখেছি, কিন্তু আমাদের বলা হয়েছিল, কেঁদো না। সেই ভাবনা থেকেই একটা সুর গুনগুন করে উঠল। আমি বলতে চাইলাম, হে নারী, তুমি কেঁদো না। জীবন কষ্টের, কিন্তু এই কষ্টই আমাদের শক্তিশালী করে। গানটা যখন তৈরি হলো, আমি বুঝলাম এটা শুধু আমার একার গান নয়; এটা পৃথিবীর প্রতিটা মানুষের গান যারা হার না মেনে লড়ে যাচ্ছে। ভালোবাসা আর শান্তির এক অদ্ভুত শক্তি আমার ওপর ভর করেছিল। আমি জানতাম, এই ওয়ান লাভ একদিন সারা দুনিয়াকে এক সুতোয় বাঁধবে।
৩.
মানুষের শরীরটা খুব নশ্বর, কিন্তু বিশ্বাসটা অবিনশ্বর। আমি যখন আমার চুলে জট পাকাতে শুরু করলাম, যখন আমি নিজেকে উৎসর্গ করলাম আমার ধর্মের কাছে, তখন অনেকে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়েছিল। তারা ভাবত, এটা কেবলই একটা নেশা। কিন্তু আমার কাছে ওই পবিত্র ভেষজ ছিল ঈশ্বরের সাথে যোগাযোগের এক অদৃশ্য সেতু। ওটা আমাকে শেখালো এই মায়াবী পৃথিবীর আসল রূপ দেখতে। আমি বুঝলাম, এই যে শাসন-শোষণ আর কৃত্রিম শৃঙ্খল, যাকে আমরা ব্যাবিলন বলি, একে ভাঙতে হলে তলোয়ার লাগে না, সুরই যথেষ্ট।
আমার পায়ে একবার চোট লাগল। ফুটবল খেলতে গিয়ে নখের নিচে যে কালচে দাগটা পড়েছিল, সেটাকে আমি তুচ্ছ মনে করে উড়িয়ে দিয়েছিলাম। আমি তো পাহাড়ি ছেলে, ছোটখাটো চোটকে পাত্তা দেওয়া আমাদের রক্তে নেই। কিন্তু সেই ছোট ক্ষতটাই গোপনে আমার শরীরের ভেতর শিকড় গেড়ে বসছিল। ডাক্তাররা যখন পা কেটে ফেলার কথা বললেন, আমি হেসেছিলাম। যে শরীর নিয়ে আমি পৃথিবীতে এসেছি, সেই শরীর অপূর্ণ রেখে আমি ওপারে যেতে চাইনি। আমার সুর তখন সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে, হাজার হাজার মানুষ আমার গানে শান্তি খুঁজছে, অথচ আমার নিজের শরীরের ভেতর তখন যুদ্ধের দামামা বাজছে।
শেষের দিনগুলোতে আমি মিয়ামির এক শান্ত ঘরে জানলার বাইরে তাকিয়ে থাকতাম। ক্যান্সার ততদিনে আমার মস্তিষ্ক আর ফুসফুস দখল করে নিয়েছে। কিন্তু আমার আত্মা ছিল মুক্ত। আমি বুঝতে পারছিলাম, আমার ফেরার সময় হয়ে এসেছে। ৩৬ বছর বয়সটা খুব অল্প মনে হতে পারে, কিন্তু আমি যতটুকু ভালোবাসা দেওয়ার ছিল, তা দিয়ে দিয়েছি। মৃত্যুর ঠিক আগে আমি ইথিওপিয়ান চার্চে দীক্ষা নিলাম, হৃদয়ে ছিল সেই একই সুর, শান্তি। টাকা দিয়ে জীবন কেনা যায় না, এটা আমি আমার ছেলেকে বলেছিলাম। আমার নিশ্বাস যখন থেমে আসছিল, তখন কানে বাজছিল সেই পুরোনো জ্যামাইকান সমুদ্রের গর্জন। আমি চলে গেছি, কিন্তু আমার গানগুলো তো রয়ে গেছে। তারা এখনো মানুষকে বলে, এক পৃথিবী, এক হৃদয়, এক ভালোবাসা।
ওয়ান লাভ!



পাঠকের মন্তব্য