এক.
রাতটা ছিল ঘোর কৃষ্ণপক্ষের। আকাশে চাঁদ নেই, কিন্তু কিংসটনের ট্রেঞ্চটাউনের গভর্নমেন্ট ইয়ার্ডে ঠিকই আলো জ্বলছে। সেই আলো চাঁদের না, সেই আলো জর্জির জ্বালানো আগুনের।
জর্জি মানুষটা বড্ড অদ্ভুত। সারারাত জেগে সে আগুন পোহায়। বব তার পাশে গিয়ে বসলেন। ববের চোখে তখন বিশ্বজয়ের স্বপ্ন নেই, আছে তীব্র ক্ষুধা। জর্জি কাঠের চুলায় বড় একটা হাঁড়িতে কর্নমিল পরিজ রান্না করছে। ওটাকে আমরা সহজ বাংলায় জাউ ভাত বলতে পারি। জর্জি এক বাটি পরিজ ববের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, খাও বব। শরীর ঠিক না থাকলে গান আসবে কোত্থেকে?
বব সেই বাটি হাতে নিয়ে আগুনের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তার মনে হলো, মানুষের পা দুটোই আসলে তার আসল রথ। এই রথে চড়েই তাকে বহুদূর যেতে হবে। তিনি বিড়বিড় করে বললেন, সব ঠিক হয়ে যাবে জর্জি। দেখিস, একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে।
স্মৃতি বড় আজব জিনিস। মানুষ যখন অনেক উপরে উঠে যায়, তখন সে পেছনের ফেলে আসা ধুলোবালির দিনগুলোকেই সবচেয়ে বেশি মিস করে। বব মার্লের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল।
দুই.
মায়াবতী কোনো এক তরুণী কাঁদছে। বব তার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। জ্যামাইকান ভাষায় বললেন, নো ওম্যান, নো ক্রাই।
অনেকে ভাবেন, বব বুঝি বলছেন, নারী নেই বলেই কান্না নেই। আরে না! বব বলছেন, হে নারী, তুমি কেঁদো না। চোখের জল মোছো। সামনে সোনালী দিন আসছে।
গল্পের সবচেয়ে সুন্দর অংশটা অবশ্য গানের কথা নিয়ে নয়, গানের স্বত্ব নিয়ে। ভিনসেন্ট টাটা ফোর্ড নামে ববের এক বন্ধু ছিলেন। টাটা ফোর্ড সাহেব কিংসটনের বস্তিতে একটা লঙ্গরখানা চালাতেন। ক্ষুধার্ত মানুষদের খাওয়ানোই ছিল তার জীবনের একমাত্র নেশা।
বব মার্লে যখন গানটা লিখলেন, তিনি জানতেন এটা পৃথিবী কাঁপাবে। তিনি এক অদ্ভুত কাণ্ড করলেন। গানের কাগজের নিচে নিজের নামের বদলে লিখে দিলেন ভিনসেন্ট টাটা ফোর্ড।
এ এক চমৎকার মহৎ প্রতারণা। কেন জানি না, মহৎ মানুষদের মাথায় এই ধরণের পাগলামি চেপে বসে। বব চাইলেন, এই গানের রয়্যালটি থেকে যে কাড়ি কাড়ি টাকা আসবে, তা দিয়ে যেন টাটা ফোর্ডের লঙ্গরখানাটা সারাজীবন টিকে থাকে। কিংসটনের কোনো একটা মানুষ যেন রাতে না খেয়ে না ঘুমায়।
এখন যখন বৃষ্টি পড়ে, কিংসটনের কোনো এক গলিতে হয়তো এখনো টাটা ফোর্ডের লঙ্গরখানার ডাল-ভাতের ঘ্রাণ পাওয়া যায়। সেই ঘ্রাণের ভেতরে বব মার্লে বেঁচে থাকেন। বেঁচে থাকে তার গান।
সবকিছুই আসলে শেষ পর্যন্ত ঠিক হয়ে যায়। না হলেও ক্ষতি নেই, নীল জোছনা তো আছে!



পাঠকের মন্তব্য