লেখকঃ রাজু নরুল
ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনিকে হত্যা করা হয়েছে। দীর্ঘ ৪৬ বছর ধরে খামেনিদের শাসনব্যবস্থা অনেকের কাছেই ছিল দমনমূলক ও কঠোর। কিন্তু তাই বলে খামেনিকে যেভাবে হত্যা করা হলো, তাতে কি ইরানিয়ানদের মুক্তি মিলল?
চলুন একটু পেছন থেকে শুরু করা যাক—
১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর খোমেনি (খামেনির পূর্বসূরি) যখন ফ্রান্স থেকে ফিরে এলেন, বিমানের সিঁড়ি বেয়ে নামার সময় তাঁর হাতে ছিল কোরআন শরীফ। তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন নতুন সংবিধান উপহার দেবেন, জনগণের অধিকার ফিরিয়ে দেবেন, গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা করবেন।
কিন্তু তিনি প্রতিশ্রুতি রাখেননি। সপ্তাহ না পেরোতেই ঘোষণা হলো ইসলামিক রিপাবলিক। পুরোনো সংবিধান বাতিল হলো, এবং ক্ষমতার কেন্দ্র এক ব্যক্তিকে ঘিরে আবর্তিত হতে শুরু করল। বিপ্লবীদের মধ্যে যারা উদার, বামপন্থী ঘরানার ছিল, তাদের জীবন ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল। বড় একটা অংশকে দেশ ছাড়তে হলো।
এরপর বছরের পর বছর ধরে দুর্নীতি, অর্থনৈতিক সংকট, বেকারত্ব, নৈতিক পুলিশিং হয়ে উঠল ইরানিয়ানদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তবে দৈনন্দিন জীবনে স্থিতিশীলতা ছিল।
কিন্তু তাই বলে ৪৬ বছর ধরে রুদ্ধ যাপিত ইরানিয়ানদেরকে উদ্ধারের নিমিত্তে ইসরায়েল ও আমেরিকা ইরানে হামলা চালায়নি। কষ্টে থাকা মানুষের প্রতি দয়াপরবশ হয়ে খামেনিকে হত্যা করেনি তারা। শুধু মানবিকতার জন্য বাইরের কেউ এসে সরকার উচ্ছেদ করে দিয়ে গেছে—পৃথিবীর ইতিহাসে এমন কোনো উদাহরণ নেই। ইতিহাস বলে, পরাশক্তির হস্তক্ষেপের পেছনে মানবিকতার চেয়ে ক্ষমতা, প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণের রাজনীতি বেশি কার্যকর থাকে।
২০০৩ সালে ইরাকে হামলার সময় “গণবিধ্বংসী অস্ত্র” ছিল অজুহাত, আর স্বাধীনতা ছিল প্রতিশ্রুতি। বলা হয়েছিল, “আমরা তোমাদেরকে স্বপ্নের স্বাধীনতা এনে দেব।” বাস্তবে প্রাণ গেছে লাখো মানুষের। একটা স্থিতিশীল দেশকে তছনছ করে দেওয়া হয়েছিল।
আফগানিস্তান, লিবিয়া, ইয়েমেন, সিরিয়ার অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে—বাইরের শক্তির সামরিক হস্তক্ষেপ সাধারণ মানুষের জীবনে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতা ছাড়া আর কিছু বয়ে আনে না।
১৯৩৭ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইরানের ক্ষমতার পালাবদলের পেছনে তেলের সরবরাহ নিশ্চিত করাই ছিল মূল স্বার্থ। স্বাধীনতা ও আধুনিক ইরানের প্রতিশ্রুতি ছিল ভাষণের অলংকার মাত্র। এবারও ইরানে হামলার আগে আমেরিকার প্রেসিডেন্টের দেওয়া বার্তা শুনুন—যেন রেকর্ড বাজছে: স্বপ্নের দেশ গড়ার প্রতিশ্রুতি, ইতিহাস বদলে দেওয়ার সুযোগ, এমন মুক্তির সুযোগ নাকি কয়েক প্রজন্মে একবার আসে। তাও সেই মুক্তি এনে দিচ্ছে স্বয়ং ডোনাল্ড ট্রাম্প। কী সেলুকাস!
যুদ্ধ কিছু মানুষের জন্য অঢেল মুনাফার দরজা খুলে দেয়, আর সাধারণ মানুষের জন্য রেখে যায় ধ্বংসস্তূপ, শোক আর অনিশ্চয়তা। যে সুখের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়, তার মূল্য দিতে হয় নিরস্ত্র মানুষদেরকে। ইরানিয়ানদের জীবন সুখে ভরিয়ে দেওয়ার তাৎক্ষণিক মূল্য হলো এক বালিকা বিদ্যালয়ে চালানো বোমা হামলায় নিহত দুইশ’র বেশি নিষ্পাপ শিশুর জীবন।
ফলে সিন্দবাদের দৈত্যের মতো ঘাড়ে চেপে থাকা একনায়কের অবসান মানুষ যেমন চায়, ঠিক তেমনি বিদেশি আর্মি ঢুকিয়ে আধুনিক সমরাস্ত্র দিয়ে আরেক দেশের সরকারপ্রধানকে হত্যার তীব্র নিন্দা জানায় মানুষ।
ইরানের যে সকল মানুষ খামেনি হত্যার কারণে ক্ষুব্ধ হয়ে রাস্তায় নেমেছে, তাদের মধ্যে কেউ যেমন দীর্ঘ অস্থিতিশীলতার আশঙ্কায় আতঙ্কিত, কেউ আবার আদর্শিক আনুগত্যে বিহ্বল।
অপরদিকে যারা রাস্তায় নেমে আনন্দ মিছিল করছে, তাদের কেউ কেউ যেমন বছরের পর বছর ধরে চলা স্বৈরতন্ত্র থেকে মুক্তির আনন্দে উদ্বেল, কেউ আবার গন্ধ পাচ্ছে ক্ষমতার। আজ তাদের খুশির দিন।
ফলে ইরানের জনতার লড়াই বহুমাত্রিক। তাদের লড়াই যেমন খামেনি, নেতানিয়াহু, ট্রাম্পের বিরুদ্ধে, আবার নিজ দেশের সার্বভৌমত্ব বিকিয়ে দিতে রাজি নয় তারা। “৭১ সালের স্বাধীনতা ঠিক না বেঠিক”—এরকম প্রশ্নে বিভক্ত নয়!
একজন শাসকের দমনমূলক অধ্যায়ের অবসান যেমন কাম্য হতে পারে, তেমনি বিদেশি সামরিক শক্তি দিয়ে আরেকটি রাষ্ট্রের সার্বভৌম নেতৃত্বকে হত্যা করাও সমানভাবে প্রশ্নবিদ্ধ, অপরাধ। ইতিহাস আমাদের শিখিয়েছে—বাইরের বন্দুক দিয়ে ভেতরের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা যায় না।
শেষ পর্যন্ত, যুদ্ধের লাভ ঢুকে গুটিকয়েকের পকেটে; দুঃখ বহন করে বিপুলসংখ্যক সাধারণ মানুষ।
খামেনির মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে বিতর্কিত এক শাসনব্যবস্থার পতন প্রায় নিশ্চিত হলেও, তার পরিবর্তে ইরানের মানুষ কিন্তু আমেরিকার পুতুল কাউকে চায় না, তারা আশা করে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত কেউ ক্ষমতায় আসবে!
ইরান যেন “আমেরিকার বাংলাদেশ প্রজেক্ট” হয়ে না ওঠে—এই শুভকামনা ছাড়া আর কী-ই বা করার আছে আমাদের?



পাঠকের মন্তব্য