জুলাই বিপ্লবীদের রাজনৈতিক দল এনসিপির এক বছর পূর্ণ হলো। নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে স্কুল ড্রেস পরে যে কিশোর-কিশোরীরা রাজপথের দখল নিয়ে বলেছিলো, রাষ্ট্র মেরামতের কাজ চলছে; সাময়িক অসুবিধার জন্য দুঃখিত; তারাই তারুণ্যে এসে জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে ভারত সমর্থিত হাসিনা রাজত্বের পতন ঘটায়। হাসিনার সময়টাতে সেই ১৭৯৩-এর চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের আদলে বাংলাদেশ কালের জমিদারি ব্যবস্থা জমিয়ে বসেছিলো। দুর্নীতি বসন্তে দ্রুত ধনী হওয়ার এই সময়টাতে বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায় ফ্যাসিস্ট শাসনের পক্ষে সম্মতি উৎপাদন করেছে। নাগরিককে প্রজায় রূপান্তরিত করে প্রশাসন-পুলিশ-সেনাবাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার সর্বময় কর্তৃত্ব তৈরি করে বাংলাদেশকে কার্যত ভারতের ছায়া উপনিবেশে পরিণত করা হয়। বাংলাদেশের কালচারাল ফ্যাসিস্টেরা এই উপনিবেশের সংস্কৃতিকে বাংলাদেশ সংস্কৃতি হিসেবে প্রতিষ্ঠার প্রাণান্ত প্রচেষ্টা চালিয়েছে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিএনপি ও জামায়াতকে ঘায়েল করতে তারা স্টিগমা বা কলঙ্ক আরোপের রাজনীতি করেছে। আওয়ামী লীগ ও কালচারাল ফ্যাসিস্টেরা যখন বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ভারতের পায়ে সঁপে দিয়ে দুর্নীতি বসন্তে স্লামডগ মিলিওনিয়ার হয়েছে; গুম-হত্যা-ক্রসফায়ার-আয়নাঘর-কারাগারে নির্যাতনের মাধ্যমে ভারতীয় ধনুক ব্যবসার নরভোজী দাস হয়েছে; তখন নিজেদের স্বাধীনতা বিরোধী কলঙ্ক ঢেকে রাখতে দূরবর্তী ইতিহাসের কলঙ্ক দিয়ে বিএনপি-জামায়াতকে স্বাধীনতা বিরোধী বলে খারিজ করে দিয়েছে। কালচারাল উইং-এর নিরন্তর কলঙ্ক লেপন আর ভারত নিয়ন্ত্রিত গোয়েন্দা সংস্থার উইচ হান্টিং-এর মুখে বিএনপি ও জামায়াত যখন অস্তিত্বের লড়াইয়ে কোণঠাসা; তখন ইতিহাস-রাজনীতি-সংস্কৃতির পাঠচক্র আর বিতর্ক চর্চার মাঝ দিয়ে জুলাই তারুণ্য নিজেদের প্রস্তুত করতে থাকে।
২০২৪ সালের জুলাই মাসে স্থানীয় গদি মিডিয়ার সাংবাদিকদের উস্কানিতে শেখ হাসিনা যখন বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনের তরুণ-তরুণীদের সেই বহু ব্যবহারে জীর্ণ 'রাজাকার' তকমা দিয়ে স্টিগমা বা কলঙ্ক লেপনের খেলা খেলতে যান; তখন জুলাই তারুণ্য তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক সামর্থ্য দিয়ে হাসিনার পোষ্য কালচারাল উইং-এর চর্বিত চর্বণমূলক বয়ান বিকল করে দেয়; শাণিত যুক্তি ও বাগ্মিতা দিয়ে। ভারতের মিডিয়া বেঙ্গল রেনেসাঁর গেরুয়া কাঁথা গায়ে দিয়ে জুলাই বিপ্লবীদের বিরুদ্ধে ডেফেমেশন করে ব্যর্থ হতে থাকে। ইন্টারনেট যুগে বিশ্বের খোলা জানালায় চোখ রেখে যে নতুন প্রজন্ম বিশ্ববীক্ষা অর্জন করেছে; তারা বাসি ও বস্তাপচা সাম্প্রদায়িক বয়ানকে বিন্দুমাত্র পাত্তা না দিয়ে লক্ষ্যে স্থির থেকেছে। আওয়ামী লীগের ১৬ বছরে সুসংগঠিত রাজনৈতিক দল বিএনপি ও জামায়াত নিপীড়ন ও নির্যাতনে বিপর্যস্ত হয়ে যখন হাসিনার ফ্যাসিস্ট শাসনের বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেনি; তখন বাংলাদেশ তারুণ্য হঠাৎ আলোর ঝলকানির মতো ভারতীয় প্রভাব বলয়ের ঘাতক কাঁটা ফ্যাসিস্ট হাসিনাকে উপড়ে ফেলে; স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব পুনর্দাবি করে। পাঠচক্র ও বিতর্ক চর্চার মাঝ দিয়ে গড়ে ওঠা ছাত্রশক্তি নামের একটি ছোট্ট ছাত্র সংগঠন; বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনে তার রাজনৈতিক কৌশলে আকৃষ্ট করে বিএনপি ও জামায়াতের ছাত্র সংগঠনগুলোকে। যেহেতু দুর্নীতির মাধ্যমে গড়ে ওঠা বন্দোবস্তের সুফলভোগী এরা নয়; দেশের স্বার্থ বিকিয়ে দিয়ে ক্ষমতা ও সম্পদ অর্জনের ঘৃণ্য লোভ এইসব তরুণমনে প্রবেশ করেনি; তাই তারা সারাদেশে ফ্যাসিস্টের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। সন্তানদের সার্বভৌমত্ব ও বৈষম্যমুক্ত রাষ্ট্রের আকাঙ্ক্ষার শক্তি দেখে; অভিভাবকেরাও যোগ দেন এই স্বাধীনতার মিছিলে।
দেশের মেহনতী মানুষ যারা ১৮৫৭, ১৯৪৭, ১৯৭১-এ ইতিহাসের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁকে রক্ত ও ত্যাগের লড়াইয়ে যুক্ত হয়েছে স্বাধীনতা ও বৈষম্যমুক্ত সমাজ-রাষ্ট্র পাওয়ার আকাঙ্ক্ষায়; তারা ২০২৪-এর জুলাই বিপ্লবে তরুণদের সহযোদ্ধা হয়। গেরুয়া কালচারাল ফ্যাসিস্টদের তৈরি করা বিভাজন ও বিদ্বেষের লক্ষ্মণরেখা অতিক্রম করে টি-শার্ট পরা তরুণ-দাড়ি-টুপি পরা তরুণের হাতে হাত রেখে; জিনস-টপস পরা তরুণী হিজাব পরা তরুণীর হাতে হাত রেখে ফ্যাসিস্ট বিরোধী লড়াইয়ে অংশ নেয়। ভারত সমর্থিত হাসিনার দখলদার খুনে বাহিনীর বিরুদ্ধে এ ছিলো অহিংস প্রতিরোধ। ফ্যাসিস্টের খুনে বাহিনী নির্মমভাবে গুলি চালিয়েছে নিরস্ত্র তরুণ-কিশোর-শিশুদের ওপর। মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেটের সুযোগ নিয়ে জুলাই বিপ্লবীরা হাসিনার খুনে বাহিনীর মানবতাবিরোধী অপরাধের চিত্র ধারণ করে প্রচার করেছে। বিশ্বের মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই ভিডিওগুলো যাচাই করে গোটা বিশ্বকে জানিয়ে দিয়েছে ফ্যাসিস্ট হাসিনার অন-ক্যামেরা মানবতাবিরোধী অপরাধের কথা। জাতিসংঘ তদন্ত করে এই মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িতদের বিচার ও যথাযথ শাস্তির পরামর্শ রেখেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের হলোকাস্ট সংঘটিত করার কারণে নাৎসি পার্টির কার্যক্রম যেমন নিষিদ্ধ হয়েছিলো; জুলাই বিপ্লবে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম একইভাবে স্থগিত করা হয়েছে। নাৎসিদের মানবতাবিরোধী অপরাধের পক্ষে সাফাই গেয়ে জার্মানি বা ইতালির কালচারাল ফ্যাসিস্টদের কোনো সক্রিয়তা না থাকলেও; আওয়ামী লীগের মানবতাবিরোধী অপরাধের পক্ষে সাফাই গেয়ে ভারতের মিডিয়া ও বাংলাদেশে ভারতীয় আশীর্বাদপুষ্ট মিডিয়া ফ্যাসিস্ট ও কালচারাল ফ্যাসিস্টদের আওয়ামী হিতৈষী সংঘ গড়ে তুলতে দেখা গেছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ দিকে ও যুদ্ধোত্তর অস্থির সময়ে নিহত ঘাতক নাৎসিদের মৃত্যুর বিচারের দাবি রেডিও জাপানকে তুলতে দেখা যায়নি। অথচ রেডিও শিলং জুলাই বিপ্লবে নিহত ঘাতক পুলিশের মৃত্যুর বিচার তদন্তে সক্রিয় হয়েছে। এ যেন একাত্তরের ঘাতক পাকিস্তানি খুনে সেনাদের মৃত্যুর বিচার দাবির মতো ঘটনা। আসলে ভারতের নেতা প্রণব মুখার্জি, সুজাতা সিং, নরেন্দ্র মোদি আর গোয়েন্দা সংস্থা প্রধান অজিত দোভাল মিলে যে সুখী স্বামী-স্ত্রীর সংসার গড়েছিলেন; সেই সুখস্মৃতি আওয়ামী কালচারাল ফ্যাসিস্টেরা ভুলতেই পারে না। ফলে গত আঠারো মাসে এরা জুলাই হত্যাযজ্ঞের ব্যাপারে কোনো অনুশোচনা প্রকাশ করেনি। বরং তাদের দুধভাতে উৎপাত জুলাই বিপ্লবীদের প্রতি প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধের বয়ান উৎপাদন করে চলেছে। এনসিপি যেহেতু জুলাই বিপ্লবীদের প্রতিনিধিত্বশীল রাজনৈতিক দল; তাই তাদের ছিদ্রান্বেষণে মিডিওকার কালচারাল ফ্যাসিস্টদের দিন-রাত গুজরান হয়। হিন্দুত্ববাদের কোলে চড়ে তারা বারবার এনসিপিকে ইসলামপন্থীর তকমা দিতে চেষ্টা করেছে। ভারতে সংখ্যালঘু মুসলিম সংখ্যাগুরু হিন্দুত্ববাদের অধীনে দাসের জীবনযাপন করবে; বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানকে সংখ্যালঘু হিন্দুত্ববাদের অধীনে দাসের জীবনযাপন করতে হবে; এই যে ভারতীয় ডকট্রিন; সেখান থেকে ইসলাম শব্দটিকে স্টিগমা বা কলঙ্ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে বাংলাদেশে। বেঙ্গল রেনেসাঁর প্রাণপুরুষ বঙ্কিমচন্দ্র পূর্ব বাংলার মুসলমানদের নিম্নবর্গের মানুষ হিসেবে স্টিগমাটাইজড করেছিলেন। সেই থেকে পূর্ব বাংলার মুসলমান একটু শিক্ষিত হলেই; নিজের ধর্ম নিয়ে কুঞ্চিত হয়ে; পশ্চিম বাংলার বেগুনি মুখমণ্ডলের হিন্দু দাদার কাছ থেকে 'আর্য' হতে গেলে পূজা ও দীপাবলিতে আলুথালু হতে হবে; আর আমি তো নামাজ পড়ি না বলে কল্পিত আর্য সমাজে আদৃত হতে হবে; এই অসাম্প্রদায়িকতার মন্ত্রে দীক্ষিত হয়েছে। হিন্দুত্ববাদী দাদার ব্যবহৃত এই অসাম্প্রদায়িক শব্দটি পৃথিবীর সবচেয়ে সংকীর্ণ সাম্প্রদায়িকতার প্রকাশ। এনসিপির ছেলে-মেয়েরা এমন এক প্রজন্মের প্রতিনিধিত্ব করে; যেখানে বহুত্ববাদ হচ্ছে যুগের অনুশীলন। ধর্ম-গোত্র-কাস্ট-ইজমের ভিত্তিতে মানুষকে বিভাজিত করে নিজেরা উচ্চবর্গ সাজার যে আদিম মানুষেরা আজও তকমা বা ট্যাগিং-এর মাধ্যমে কলঙ্ক আরোপের সাব-কালচার নিয়ে ধুঁকছে; তারা আউটডেটেড। তাদের সাম্প্রদায়িক অন্ধত্ব জেনজি'র আই এম দ্য ওয়ে আই এম; এই লাইফস্টাইল বুঝতে অক্ষম। ঘোরতর প্রজন্ম ব্যবধানে কালচারাল ফ্যাসিস্টেরা নতুন সময়কে বুঝতে ব্যর্থ হয়েছেন। তাদের চিন্তার বন্ধ্যাত্ব পুরোনো ব্যবস্থার জোয়াল কাঁধে নিয়ে তেলাঞ্জলির বিনিময়ে তেল উৎপাদনের ঘানি টানছে। এনসিপি ও অন্যান্য রাজনৈতিক গোষ্ঠীর অনুসারী জুলাই বিপ্লবীদের চিন্তার অন্তর্মিল বাকস্বাধীনতা, গণতন্ত্র, সার্বভৌমত্ব, অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ, দুর্নীতি ও বৈষম্যমুক্ত রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে বিদ্যমান ব্যর্থ রাষ্ট্রব্যবস্থার সংস্কারের প্রশ্নে। এই প্রজন্মের উইলফোর্স এতই বেশি যে, জুলাই বিপ্লবে ফ্যাসিস্ট ঘাতক আক্ষেপ করেছে, গুলি করলে একজন মাটিতে লুটিয়ে পড়ে; বাকিরা দাঁড়িয়ে থাকে। মৃত্যুভয়কে জয় করে যারা বলতে পারে, মাতৃভূমি অথবা মুক্তি; তাদেরকে বিংশ শতকের ষড়যন্ত্রের অপসংস্কৃতি আর কলঙ্ক আরোপের অপকৌশল দিয়ে পরাস্ত করা অসম্ভব। হাসিনার তারুণ্য হত্যার মাধ্যমে ভবিষ্যৎ নিশ্চিহ্ন করে; ক্ষমতার বন্দোবস্ত টিকিয়ে রাখার ক্যানিবাল কৌশল যদি কেউ পুনরাবৃত্তি করতে চায়; তাকেও হাসিনা ও তার দোসরদের পরিণতি বরণ করতে হবে; এটা একটা সরল অঙ্ক। শেখার বয়স নেই। আমরা আমাদের সন্তান ও অনুজপ্রতিমদের কাছ থেকেও শিখতে পারি। যা আমাদের চিন্তাকে হালনাগাদ করতে পারে। এতে বার্ধক্য জেঁকে বসবে না অচল চিন্তার ফুরিয়ে যাওয়া মানুষদের।



পাঠকের মন্তব্য